কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
দীর্ঘ গুচ্ছকবিতা ।। মোহাম্মদ রকিবুল হাসান
$post->title
ফটোগ্রাফার

একটা ছবি তুলে দাও ফটোগ্রাফার
এমন একটা ছবি, যেটা আগে কেউ দেখেনি
ছবির মানে বদলায় না, অবজেক্টিভ
একটা ছবি তুলে দাওনা ফটোগ্রাফার
একটা ছবি তুলে দাও
এমন একটা ছবি,
যেখানে বাজিমাতের কোনো হিসেব নেই,
নেই কোনো সহমরণের তীর্থ
অর্থ বদলায় না ক্ষনে ক্ষনে ;
কোনো খেলা নেই, শুধু আলো ছায়া ছাড়া
কোনো জুয়ারী নেই ছবির টেবিলে
তাসের দান নেই,
সোনালী গেলাসে মদের নিশানা নেই
বড়লোকের নেশা নেই ছোটলোকের চেহারায়
নন্দন গবেষণার ।
কোনো হিসেবের ছবি না,
না কোনো বেহিসেবির মতন দাওয়াতী ছবি
বাস পোড়ানো
ধুন্ধুমার একশন ছবি, মারদাঙ্গা টাইপ
জোশ, ওয়াও, কি দারুন দেখতে
সেরকম তো নয়ই ;
আমায় একটা ছবি তুলে দাওনা
যে ছবিতে মায়ের মমতা আছে, নিষ্পাপ, সরল
ভিখারি মায়ের আর্তনাদটুকু তুলে দাও
না, না, ওমন সাধারণ ছবি নয়, যাকে বলো ক্লিশে
মা থাকবে বাচ্চাটাকে ধরে,
রাস্তায় মানুষ হেঁটে যাবে ভ্রুক্ষেপহীন
তুমি বলবে এখানে দাড়াও,
না ওখানে আলোটা ভালো,
না এপাশ ফিরে তাকাও
এসব কিছুই না,
তুমি আমায় একটা ছবি তুলে দাও,
স্বদেশের মুখ মা’র মতো অবিকল দেখতে
শালিকের দল উড়ে যায় পর্বত পেরিয়ে
সবুজ ধান ক্ষেতের উপর
ঊষার আলো ফোটার অপেক্ষায়
বাচ্চাটা মায়ের সাথে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে
আহা অপরূপ সে দৃশ্য
পারবে এমন ছবি তুলতে ?
আমি অন্ধ, তবু দেখি,
যাদের চোখ আছে অথচ কিছুই দেখে না
ওদের সাথে তোমরা এক ঘাটে জল খাও
সহচর, বড় বড় দালানে আবাস
চিকেন ফ্রাই খায়
বিলেতি সাহেব আসে, পোষ মানে,
পোষায় তাই না ?
এই জীবনব্যাপী দীর্ঘ নাটকে,
তোমার রোল — তুমি ফটোগ্রাফার
তুমি আলোর দিশারী, কাণ্ডারি
মেহনতি মানুষের, ঘামে ভেজা কৃষকের,
অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকা গৃহহীন
অথবা দেয়ালের বাইরের দেয়াল ঘেঁষে
ইমারতের আকাশ প্রমান পুঁজিবাদীর
গোপন অভিসার ফাঁস করা
ভেল্কিবাজ তুমি ।
তুমি দেশে দেশে স্বাধীনতার দৃশ্য দলিল
পরাজিত হিটলারদের চেহারা তুলে নেবার
যান্ত্রিক কৌশল, কলাকুশলী
তুমি মেহেরজানের এক টুকরা ছবি
ওই লোটা কম্বল শেষ সম্বল আমার
আমি অন্ধ, জন্মান্ধ,
কত কত ছবি ভেসে বেড়ায় নিউরনে
নির্বিকার, আমি স্বাধীন ছবিয়াল
আমার ক্যামেরা আমার মন
মন দিয়ে ছবি তুলি আমি, তোমার মতন নই
মেহেরজানের ছবিটা কেবলি আমার,
কপি হয় না, কেউ দেখে না শুধু আমি
ফটোগ্রাফার তুমি ছবি তুলতে জানলে না ।

আজীবন কারাবাস

যাবতজীবন আমাকেই ভালোবেসে
যেতে হবে অকারণেই,
এটাই শাস্তি — আজীবন কারাবাস !
কোনো গল্পের শেষ নেই,
শেষ থেকে গল্পের নতুন মোড় নেয়
ভালোবাসার অপরাধে যদি ফাঁসি হয়,
তবে তাই হোক
যাবতজীবন আমাকেই ভালোবেসে
যেতে হবে অকারণেই, এটাই নিয়তি,
গল্পের শেষে
নতুন গল্পের সূচনায় তোমাকে আবার
নায়িকা হতে হবে
একটা গানে ঠোঁট মেলাতে হবে সমস্বরে
আমাকেই ভালোবাসতে হবে বার বার
হাজার হাজার বার
গল্পে অনেকগুলো ভিলেন থাকবে
কেউ কেউ সত্যিকারের কেউবা সিমুলেটেড
নায়িকা বলবে “ছেড়ে দে শয়তান,
তোর কি মা বোন নেই”
নায়ক ভিলেনকে ধোলাই করবে,
শারীরিক কসরত হবে, স্লো মোশন চলবে
দর্শক শিস বাজাবে, হাত তালি পড়বে,
হল ভর্তি মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়বে
আমি তোমাকে বাঁচিয়ে আনবো
রাখবো কাছে, বুকে জড়িয়ে,
কাছাকাছি হবে মুখমণ্ডল, গ্রীবা, ওষ্ঠ,
চুম্বনের দৃশ্য হবে এখন,
সেন্সরে কাঠ কয়লা পোড়ানো দৃশ্য এটা
অনেক দামি
দর্শক এইবার লাফিয়ে উঠবে,
শিস বাজবে অবিরাম, ভালোবাসা চলবে
যাবতজীবন আমাকেই ভালোবেসে
যেতে হবে অকারণেই,
এটাই শাস্তি !

পাগল প্রলাপ

কিছু কিছু গান আছে শোনা হয় না
কিছু কিছু প্রেম আছে ভোলা যায় না
কিছু কিছু নাম আছে ডাকা হয় না
কিছু কিছু হাত আছে ধরা যায় না
কিছু কিছু রাত আছে ভোর হয় না !
কিছু গাছ মরে যায়, ফুল ফোটার আগেই
কিছু ফুল ফোটে, রাতেই ঝরে যায়
কিছু মানুষ কখনোই পায় না, যা কাছে চায়
কিছু ভুল সবাই ভুলে যায় ;
কিছু মানুষ কখনোই ভোলে না, যে ছেড়ে চলে যায় ;
কিছু কিছু না পাওয়া নিয়ে,
কিছু কিছু ভালোবাসা মরে যায়,
সময় ফুরিয়ে যায় বলে ;
আর কিছু জনপদ বিলীন হয়ে যায়,
লোভের আগুনে পুড়ে,
উদ্বাস্তু শিবির ভরে যায় মানুষে ভিড়ে,
কিছু মুনাফা ব্যাবসায়ী বাণিজ্য করে
মানুষকে উপজীব্য করে,
কিছু কিছু মানুষ ধরে নামে অধর্ম করে, মানুষ মারে,
কিছু কিছু জিহাদ নিজের নফসের সাথে
কিছু লোকের কাছে অর্থ বদলায়, ঈশ্বর কাঁদে
কিছু কিতাবের অর্থ বদলায়, বদলে দেয়
কিছু মানুষ ধর্ম পুঁজি করে
রাজনীতি চলে, চাল ডালের হিসাব হয়
কিছু চেতনা আর ফিরে আসে না
একবার অচেতন হলে, বিশ্ব জগৎ ধুলায় উড়ায় ;
কিছু প্রেম নিরবে কাঁদে,
এভাবেই কারো কেউ হারিয়ে যায়
বালিশ ভেজে, কেউ দেখে না
কিছু কষ্ট সারা জীবন গোপন থেকে যায় ;
আজকের এই বিশ্বলোকে
কিছু মানুষ শপথ নেয়
কিছু গান আবার বেজে ওঠে
কিছু প্রেম আবার জেগে ওঠে
মৃত আত্মারা ফিসফিস করে বলে
আমাদেরও সাধ হয় আবার বেঁচে ওঠার
আমাদেরও নিয়ে চলো জীবনের মিছিলে
কিছু কিছু অতৃপ্তির শুদ্ধি হোক ;
কিছু কিছু অমানুষের কোনো বিচার হয় না
কিছু কিছু অপমৃত্যু আর মনে রাখিনা
কিছু কিছু ট্রাজেডি শেক্সপীয়ারের নাটকের মতন
বিয়োগ অংকে শেষ হয়
কিছু কিছু পিতা তার সন্তান হত্যার প্রতিশোধ নেয়
কিছু কিছু নারী যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া
মানুষটার অপেক্ষায় নিঃশেষ হয়ে যায়
কিছু কিছু সড়কে বাস চাপায় মৃত্যুর বিচার হয় না
কিছু কিছু সাগর-রুনির চার্জশিট
আজীবন পিছিয়ে যায়
কিছু কিছু রাজা-রানী প্রজাদের ভালোবাসে না
কিছু কিছু রক্তের দাগ মুছে যায় না ;
পৃথিবীর সব কিছুর উত্তর হয় না,
এখন ঘুমাতে যাও পাগল
কিছু পাগলের কোনোদিন কোনো গতি হয় না ।

আমার চোখের জল

মৃত্যুর পরোয়ানা লিখা হয়ে গেছে
যমদূত ধারালো ছুরিতে শান দিচ্ছে
গলায় ছুরি চালাবার আগে যদি জিজ্ঞেস করে
শেষ ইচ্ছে কি ?
কোনো প্রিয়মুখ দেখতে ইচ্ছে হয় ?
— সবাই অচেনা হয়ে গেছে
কোনো কিছু খেতে ইচ্ছে করে ?
— পৃথিবীর সব স্বাদ উঠে গেছে
নামাজ পড়তে চান ?
— আমার কোনো পাপ নেই
কারো সাথে শেষ কথা বলতে চান ?
— কথা ফুরিয়ে গেছে
— একদিন তো মরতেই হতো
— সেই দিন যেকোনো দিন
যমদূত ছুরি চালালো
গলা কাটলো না
আবার চালালো ছুরি
গলা কাটলো না
যমদূত রাগে একটা পাথরের ওপর ছুরি চালালো
পাথরটা দুই টুকরা হয়ে গেলো
যমদূত আবার গলায় ছুরি চালালো
ছুরিটা বেঁকে গেল !

সিনেমার একটা দৃশ্য চলছিল
একটা টেকেই হয়ে গেছে
ডিরেক্টর অনেক খুশি ;
সিনেমার নাম ‘আমার চোখের জল’
নায়ক সেট থেকে এসে
বরফ কুচি দেয়া এক পেগ হুইস্কি চাইলো
ধকল গেছে অনেক
যমদূত বুকের উপর চড়ে বসে ছিলো
মৃত্যু অনেক কঠিন
বেঁচে থাকার অভিনয়ের চেয়ে !
কত সুন্দর সুন্দর মানুষ দেখি হাট বাজারে
এরা যদি সুন্দর করে ভালবাসতে পারত !
নায়কের চোখে জল টলমল করছে
সামলে নিয়ে পার্কিং থেকে গাড়িটা বের করলো
কেন এমন হলো ?
সুজাতা তো বলেছিলো,
‘ছুঁয়ে দেখতে পারো, কখনোই ছেড়ে যাবো না ...’
এসব ভাবতে ভাবতে অনেকগুলো
ল্যাম্পপোস্ট পেরিয়ে, বাড়ি ফিরে
একটা কাগজ টেনে লিখলো
... এখানেই এর পরিসমাপ্তি ; জীবনের সব গল্পে
মধুর মিলন নেই ... দৈনন্দিন চড়াই উৎরাইয়ে
কেউ জিতে যায়, কেউবা হারে ... কেউ মনে রাখে না,
রাখবারও কোনো মানে হয় না, ভালো থেকো
পৃথিবীর মানুষ, কেউ কেউ আর ফিরবেনা জেনেও,
কাউকে আর ফেরানোও যায় না ...

কেউ তখনও দেখেনি
অভিমান করে চলে গেলো ড্রাগ ওভারডোজে
একটা দুঃখী মানুষের প্রাণ ...
এভাবেই কেউ কেউ আর ফিরে আসে না !

অপমৃত্যু

আমার মৃত্যুতে কারো কোনো যায় আসবে না
পৃথিবীতে কোনো সুনামি ধেয়ে আসবে না
উল্কাবৃষ্টি পড়ে লক্ষ মানুষ মরবে না
অথবা তাদের বসতি নষ্ট হবে
আমার মৃত্যুতে গাছে গাছে দাবানল লাগবে না
আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মানুষেরা
দিব্বি সুরক্ষিত থাকবে
ক্রন্দনরত শিশুরা মাতৃদুগ্ধ পাবে আগের মতোই
কারফিউ জারি শহরগুলোতে
কেউ একশো চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবে না
স্বাধীনতাকামী মানুষেরা যন্ত্রনায় কাতরাবে
সবকিছু ঠিক যেমনি
হবার কথা ছিলো
ঠিক তেমনি চলবে
খবরের কাগজ বেরুবে যথা সময়ে
সূর্য উঠবে, অস্ত যাবে
কোনো ন্যূনতম জিনিষের হেরফের হবে না
ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলে যাবে
এস্থেটিক ঠিক করবে, ছবির প্রসেস চলবে
এক্সিবিশন চলবে, কেউ কেউ পুরস্কার পাবে
কেউ পাবে দুঃখ
নায়িকারা শুটিং শেষে মেকআপ ধুয়ে ফেলবে
নতুন আরেকটা দৃশ্যের জন্য
অন্যদিন প্রস্তুতি নিবে — সস্তা সংলাপ আওড়াবে
‘কেন আমি ভুলতে পারি না
কেন তোমাকেই ভালোবেসে ...’

আমার মৃত্যুতে সন্ধ্যায় শাঁখের আওয়াজ
থমকে যাবে না
সুন্দরী নারীরা সহসাই বলে উঠবে না
একবারও ফিরে দেখতে পারতাম —
বেঁচে থাকতে অন্তত আমাদের কারোর জন্য
মৃত্যু কারোর কিছুই কেড়ে নেয় না
মৃত্যু শুধু ব্যক্তির নিজস্ব পলায়ন —
হিসেবের গরমিল, নিউরোনে গোলযোগ
চেস্টার বেনিংটন কি পারতো না, রথকো
অথবা কেভিন কার্টার, ভ্যান গগ,
রবিন উইলিয়ামস ?
আমার মৃত্যুতে তুমি থুথু ছিটাতে এস
আমন্ত্রন রইলো
মূর্খদের যোগ্যতাই পৃথিবীতে অধিক
মূর্খ মন্ত্রী, মূর্খ তাবেদার, মূর্খ রাজায়
বিশ্ব আজ টালমাটাল
আমার মৃত্যুতে এরা কেউ শিক্ষিত হবে না
মূর্খ জানেই না যে সে কতটুকু মূর্খ ।

আমি এক ব্যর্থ মানুষ
জীবনের গল্প এক জটিল গাণিতিক, মানুষিক
দ্বন্দ্বের ফলাফল
কেউ জিতে যায় সোশ্যাল ক্যাপিটালে
কেউ হেরে যায় দীর্ঘ অভিযাত্রার শূন্য ফল নিয়ে
মোটিভেশনাল স্পিকার চেঁচিয়ে বলে
বাঁচো বাঁচো কুকুরের মতো হলেও বেঁচে থাকো
শালা মাননীয় স্পিকার
কত টাকায় বিক্রি হোস প্রতিরাতে ?
আমার মৃত্যুতে বহু মানুষের সমাগম হবে না
অপমৃত্যুর ফাইল খোলা হবে, ময়না তদন্ত হবে
মোটিফ খোঁজা হবে
আমার মৃত্যুতে কাঁদতে হবে না
চোখের জলের অনেক দাম
দামি কোনো মানুষের জন্যে রেখে দাও
অবসন্ন লাগছে
জনমানুষ হতে আজ আমি
এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ
বিদায় বন্ধু, বিদায় ।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান