কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
সাহিত্যের অনুপম রৌদ্রালোকে ব্যক্তিজীবনের শুদ্ধতম ক্রমবিকাশ - সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক      
$post->title

     শৃঙ্খলাবদ্ধ সামাজিকতায় জীবনের অধিষ্ঠান কোথায়? বিতর্কিত প্রশ্নকিন্তু উন্মুক্ত জীবনসীমায় বিধিবদ্ধ সামাজিকতার স্থান কোথায় বা আদৌ আছে কিনা নতুন করে বিচার্য্য বিবেচিত হতে পারেঅবশ্য এ প্রশ্নের সাথে ওই বহু বিতর্কিত প্রশ্নটি যে সম্পৃক্ত নয়, তা নয়, সম্পৃক্ত অবশ্যই তবে ভিন্ন ভাবেসামাজিকতার প্রয়োজন এবং প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়ে সে সামাজিকতার নিয়ম-সর্বস্ব নিয়ন্ত্রণ জীবন প্রসারণের মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ করে নিঃসন্দেহেকিন্তু এর পাশাপাশি অনিবার্যভাবে আর একটি সংগত প্রশ্নও নিশ্চিত যে ওই সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এক অপ্রতিহত সত্ত্বার অধিকার অর্জনে প্রবুদ্ধ করে কিনা? 

       মেঘে ঢাকা সূর্যের বিকীর্ণমান শিখা দূর্ভেদ্য মেঘের স্তর চূর্ণ করে যখন আত্মপ্রকাশের তৃপ্ততায় অহংকার অনুভব করে তখন অনুমেয় ওই তৃপ্ততার পরিপূর্ণ আনন্দ সে প্রাপ্ত হয় ওই দূর্ভেদ্য মেঘের ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেযদি সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকত তবে দীপমান সূর্যের শিখা সে যত উজ্জ্বলতার মধ্য দিয়ে বিকীর্ণিত হোক না কেন হয়তো এত বেশী স্বার্থকতায় পরিপ্লুত হতে পারতো না আর এ জন্যেই সূর্য স্বার্থক মেঘের অনিবার্যতাকে স্বীকার করে নিয়েইসামাজিকতাকেও এভাবে বিচার করলে অসঙ্গত হবে না হয়তোব্যতিক্রম শুধু একটি মাত্র স্থানেই যেখানে পুরো সামাজিক অবয়ব নির্মিত অসংখ্য ছোট ছোট বিক্ষিপ্ত জীবনের খন্ড খন্ড চিত্র দিয়েকিন্তু এ মুহূর্তে এ-ও স্বীকার্য্য যে, ছোট ছোট জীবন-চিত্র দিয়ে সামাজিক দেহ নির্মাণ মৌলিক সত্য হলেও ওই জীবন নির্ভর সামাজিকতাই আবার বিশেষ কতকগুলো ক্ষেত্রে এই মৌলিক সত্যের অর্থাৎ জীবনের মুখোমুখি এক সংশয়াতীত প্রতিদ্বন্দ্বির ভূমিকা নিয়ে অবতীর্ণ হয়কিন্তু জীবন এবং সামাজিকতার মধ্যে এই চিরাচরিত সংঘর্ষের উৎপত্তি নিতান্তই জীবনের আত্মবিরোধিতার উৎসারণ থেকেকেননা সামাজিক শরীর নির্মাণপূর্ব পর্যায়ে জীবন ব্যতিক্রমী কোন সিদ্ধান্তের কার্যকরী ক্ষমতার ওপর আস্থা স্থাপন করতে পারে না বরং সামাজিকতার প্রয়োজনকেই স্বীকার করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে পড়েঅন্যভাবে সকল সামাজিক ক্রিয়াকলাপের কাছে নীতিবিরোধী হলেও নিজেকে সমর্পণ করে ঐ সামাজিকতারই মুখোপেক্ষী হয়ে যায়কিন্তু যখনই সামাজিকতার সামষ্টিক কেন্দ্র মূল ব্যক্তি জীবনের ইচ্ছা-বিরুদ্ধ সত্বাঘাতী কোন চরম পথ পরিক্রমণে অকুন্ঠ চিত্তে প্রলুদ্ধ হয় তখনই ব্যক্তি জীবনও আপনা আপনি ঐ সামজিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণে উচ্চকন্ঠ হয়ে ওঠেফলে স্বনির্মিত সামাজিক অস্তিত্বের সামগ্রিক প্রয়োজন শুধু অর্থহীন হয়ে পড়ে না ব্যক্তি জীবনের কাছে সাথে সাথে দুর্বিষহও হয়ে উঠেএবং সে ক্ষেত্রে ব্যক্তি জীবন যেন অস্থিরভাবে কামনা করে সামাজিকতার সকল সুদৃঢ় গ্রন্থি ছিন্ন করে নিজস্ব উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে আকাক্সক্ষার চূড়ান্ত চরিতার্থতাকেএ চরিতার্থতার প্রশ্নে প্রকৃত অথ্র্ইে জীবন যদি সামাজিকতার বিরুদ্ধে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে তবেই সে তুলিত হবার যোগ্যতাকে বিতর্কের উর্দ্ধে স্থানান্তরিত করতে পারে সূর্যের সাথেআর যদি না পারে তবে ব্যক্তি জীবনের নিজস্বতার  কোনো মূল্যই থাকে না- সামাজিকতাই নগ্ন সত্য হয়ে দাঁড়ায়

      প্রসঙ্গক্রমে এখানে আর একটা কথা বিবেচিত হওয়া উচিৎ যা- এ সামাজিকতার মূল উৎস কোথায় অথবা কোত্থেকে এ সামাজিকতার উদগম? খুব ছোট্ট এবং সংক্ষিপ্তির মধ্যে দিয়ে বলতে গেলে হয়ত বলা যাবে মানুষ হিসেবে মানুষের ঈশ্বর প্রদত্ত জীবিয় স্বভাবকেননা মানুষের জীবনে সামাজিকতার দোর্দন্ড প্রতাপশালী প্রভাব-সম্পাতি চরিত্র যেন বংশানুক্রমিকভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে স্তরে স্তরে বিজড়িতসভ্যতার প্রশ্নে পৃথিবী যখন দ্বিধাহীন নির্লিপ্ত ছিল তখনও এ সামাজিকতার গ্রন্থিতে জাতি হিসেবে অসভ্য প্রতীয়মানÑ এরাও গ্রন্থিত ছিলযুগীয় বির্বতনে কখনও কখনও এ গ্রন্থি শিথিল হয়েছে মাত্রকিন্তু একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নিকারণ হিসেবে একটিই- প্রত্যক্ষ জীবিয় স্বভাবকিন্তু স্বভাবের অনেক উর্দ্ধের আরেকটি বস্তুর স্থিতি অবশ্যগ্রাহ্য যা - মানুসী মূল্যবোধএ মূল্যবোধের তাড়না যখন সামাজিক ভ্রমাশ্রিত যন্ত্রণায় অস্বস্তি বোধ করে অবাধ্য হয়ে ওঠে তখন এ জীবিয় স্বভাব মূলতঃ মানুসী মূল্যবোধের কাছে সমর্পিত হয়ে যায়ফলস্বরূপ ঐ মূল্যবোধের তাড়নায় সামাজিক গ্রন্থিভুক্ত ব্যক্তি-জীবন লাভ করে সামাজিকতা অস্বীকারের অনিঃশেষ অনুপ্রেরণাআর এ অনুপ্রেরণাই ব্যক্তি-জীবনকে উদ্ধুদ্ব করে তার আত্মবিশ্লেষণের সার্বিক প্রয়োজনীয়তাকে - যে বিশ্লেষণ শেষ পর্যন্ত জীবনকে পৌঁছে দেয় এক অনাবিল সুখ-সমুদ্রের গভীর অন্তরঙ্গতায় এবং একই সাথে সামাজিকতাকেও ইঙ্গিত করে তার ভ্রমাত্মক নীতিবোধ অথবা সিদ্ধান্তকে বিসর্জন দিয়ে সত্যনিষ্ঠ অনুভূতির আলোকে নিজেকে বিকশিত করবার আগ্রহেসামাজিকতা অনস্বীকার্যজীবনের প্রতি যত উন্নাসিকতাই প্রদর্শন করুক অথবা যত উৎকেন্দ্রিক মনোভাবের অসহ্যতা প্রকটিত করুকযেহেতু বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের মনোজ প্রসব অনুক্রমে ব্যক্তি জীবনের স্বভাবী চরিত্রের সাথে সম্পর্কিত- সেই হেতু সামাজিকতার অহংকারী ঋদ্ধি অসহ্য অনুমিত হলেও ব্যক্তি-জীবনে অবশ্যম্ভাবী

    ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থাকে সামগ্রিক সামাজিকতার একটি বিশেষ শক্তিশালী অংশ হিসাবে  অর্থাৎ সমার্থক অন্যান্য পারিপার্শি¦ক সবকিছুর প্রশ্নকে বিসর্জন দিয়ে শুধু নির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রীক ব্যবস্থাকেই সামাজিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বিচার করলে বিশ্লেষণের প্রেক্ষিত আরোও বি¯তৃত এবং বিশুদ্ধ হবে

০১.

In our western world in the so called modern chapter of it’s history we have seen war placed on the same shelf as hunting during an eighteenth century LULL – when war was only in vogue as the sport of king. …..The kings who took their sport on the western battle fields of that age were militarists beyond question.

-Arnold Toyenby.

 

লক্ষ্যণীয় ইতিহাসের আধুনিক (ভিন্নভাবে তথাকথিত) অধ্যায়ের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মানষিকতা কত হীন সংকীর্ণতায় সীমায়িতঅথচ স্বাভাবিক বিশ্লেষণে আধুনিকতাই সর্বশেষ কথা যার পরে বিশ্লেষেণের সুফল প্রাপ্তির সম্ভাবনা আর কিছুতেই অবশিষ্ট থাকে নাকিন্তু তবুও আধুনিকতার মধ্যেই সভ্যতাহীনতার চরম লক্ষণ প্রকটিত এবং হীনগ্রাহ্য সংকীর্ণতার পরিসর প্রলম্বনের ভেতর দিয়েঅথচ সভ্যতাহীনতার লক্ষণ, সংকীর্ণতার প্রলম্বনÑ এতকিছু অমার্জিত দুর্বলতা থাকা সত্বেও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থা কিছুমাত্র বিচলিত নয় এসবের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তি জীবনের  ক্লিষ্ট প্রতিরূপ অবলোকন করেওআর ব্যক্তি জীবনের স্বকীয়তা? যেহেতু সামাজিকতার শরীর নির্মিতির পূর্ব পর্বে দ্বিধান্বিত চিত্তের স্বরূপ প্রদর্শনকারী- অতএব স্বকীয়তার প্রশ্ন সরাসরিই অবান্তরশুধু মাত্র প্রশ্ন থাকতে পারে মূল্যবোধ ওই স্বকীয়তার স্বার্থে জীবনকে তার নির্লিপ্ত স্বভাব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সাহায্য করে কিনা? এ প্রসঙ্গে আর একটি উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারেÑ

০২.

Signor Mussolini defined ----- `We are becoming – and shall become so increasingly, because this is our desire – a military nation . A militaristic nation , I will add, since we are not afraid of words ; to complete this picture; Warlike – that is to say endowed ever to a higher degree with the virtues of obedience , sacrifice and dedication to country.’

 

‘The doctrine of facism ; He wrote ; ‘War alone brings all human energies to their highest tension and sets a seal of nobility on the peoples who have the virtue to face it’. 

 

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এরকম চিন্তাধারার ফলশ্রুতি একমাত্র স্বেচ্ছাচারিতার লজ্জাহীন ক্রমবিকাশের  অবলম্বন ছাড়া আর কি হতে পারে? তাছাড়া সমগ্র জাতিকে যেখানে একমাত্র সামরিক সিদ্ধান্তের পরিধিতে চিররুদ্ধ করবার পরিকল্পনা সেখানে ব্যক্তি-জীবনের নিজস্ব স্বকীয়তার মূল্যই বা কতটুকু? কিন্তু তবুও সামাজিকতা উপেক্ষণীয় নয়অবশ্য একটা প্রশ্ন উত্থিত হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে সর্বান্তকরণে সামরিক উদ্যোগ যে একেবারেই অসাধু হবে এমন ধারণারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? তবে ইতিহাসকে অবলম্বন করে এ প্রশ্নের সমাধান-উদ্ধারে যদি প্রবৃত্ত হওয়া যায় তবে এ-ও অস্বাভাবিক আকার নিয়ে ফুটিত হবে না যে কালানুক্রমিকভাবে সামরিক উদ্দেশ্যের যে ভূমিকা তা কখনই মুখ্য অর্থে সাধু বলে বিবেচিত হয়নিকিন্তু বিবেচিত না হলেও যুগীয় প্রবাহে এর প্রভাব অবধারিতÑ এটাই সবচাইতে সত্যি কথা এবং সে অর্থেই সামাজিকতা সামরিক আচ্ছাদনে আবৃত হোক অথবা অসামরিক, সামাজিকতাকে উপেক্ষা করতে চাইলেও সেও উপেক্ষনীয় নয়মুসোলিনির রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বিকৃততা, হিটলারের স্বেচ্ছাচারিতা কোনকিছুই ব্যক্তি-জীবনের অমঙ্গলাকাক্সক্ষী বলে নিরুৎসাহিত হতে দেখা যায় নি কোনক্রমেই সামরিক শাসকদের দৃষ্টিতেব্যক্তি জীবন তাদের ওই স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিক্রিয়ায় নির্যাতিত হয়েছে, নিগৃহীত হয়েছে যেন ঈশ্বর প্রদত্ত তাদের ওই স্বভাবকে অস্বীকার করতে না পেরেইকিন্তু যদিও ব্যক্তি-জীবন লাভ করেছে এক অবিনাশী সচেতন মূল্যবোধের প্রত্যক্ষতাকে- যে প্রত্যক্ষতা আগামী দিনের  জন্য সামাজিকতায় এই স্বৈরাচারী চরিত্রকে প্রবাহিত করবার প্রয়াস পেয়েছে এক ভিন্ন স্রোতে যে স্রোতে সামজিকতার ওই স্বৈরাচারী চরিত্র চূর্ণিত হয়ে গেছে- জন্ম নিয়েছে তারই অভ্যন্তরে এক নতুন চরিত্র-দীপ্তিরপ্রমাণ তৎকালীন ওই সব রাষ্ট্রের পরবর্তী অধ্যায়তাই সামগ্রিক প্রশ্নে ব্যক্তি-জীবন সীমায় সামজিকতার প্রয়োজন অনিবার্য তার নিজের প্রয়োজনেই

(দুই)

সাহিত্যের জরায়ুতে সামাজিকতার স্বরূপ উদঘাটন নিতান্তই অতি সাধারণ কিন্তু স্থিতি প্রথম অর্থে মৌহুর্তিক দ্বিতীয় অর্থে চিরকালের- অনশ্বরমৌহুর্তিক এজন্যে যে, সামাজিকতার প্রশ্নে সাহিত্য তার অনেক উর্দ্ধে, সামাজিকতার মৌলিকত্ব কোন ভাবেই সাহিত্যে সিদ্ধ- স্বীকৃতির অপেক্ষা রাখে না   কিন্তু সাধারণভাবে অপেক্ষা না রাখলেও সাধারণতার বাইরে  মূলগতভাবে স্থিতিশীলতা হয়ে যায় চিরকালেরকেননা মৌহুর্তিক চিন্তা প্রবাহে চকিত বিদ্যুৎ পতনের মতো সামাজিকতার আর্বিভাব ক্ষণস্থায়ী হলেও তার যে অনুরণন তাকে কখনই অস্বীকার করতে পারে না সাহিত্যবরং সাহিত্যের মুক্ত চিন্তা স্রোতকে সামাজিকতার ওই অস্পষ্ট অনুরণন আকর্ষিত করে সাহিত্যকে প্রতিক্ষণেসেদিক থেকে আরো বিশ্লেষণ করলে বলা যাবেÑ যেহেতু সাহিত্যের মূল সম্পর্ক ব্যক্তিক মূল্যবোধের সাথে অতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত সেইহেতু সাামজিকতার অনেক উর্দ্ধে অধিষ্ঠিত থেকেও সাহিত্য সামাজিকতার প্রথম নিরীক্ষণকারীঅর্থাৎ ব্যক্তিক মূল্যবোধকে অবিরাম সক্রিয় রাখবার দায়িত্বেই সাহিত্য সামাজিকতার চরিত্র নিরীক্ষায় উন্মুখ

ব্যক্তিক জীবনের সাথে যদি সাহিত্যের সম্পর্ক অনিশ্চিত হতো তবে হয়তো ভিন্ন বোধের সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল নাকিন্তু যেখানে জীবনই সাহিত্যের উৎসনির্ঝর সেখানে অন্যকিছুর কল্পনা শুধু অবান্তর নয় রীতিমতো অর্থহীনওঅবশ্য এখানেও একটা প্রশ্ন উত্থিত হতে পারে সামজিকতাও তো জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, কিন্তু তা না হলেও নির্দিষ্টতায় সীমাবদ্ধএবং সীমাবদ্ধ বলেই সাহিত্যের মুখ্য লক্ষ্য সামাজিকতায় নয়- অতি স্পষ্টভাবে ব্যক্তি-জীবনেব্যক্তি-জীবনের মূল্যবোধের মুক্তায়নের স্বার্থেই দৃষ্টি সামাজিকতায় আকৃষ্টপ্রমাণ হিসেবে সাহিত্যের একটি নির্দিষ্ট অঙ্গকে পর্যালোচনা সাপেক্ষে গ্রহণ করা যেতে পারেÑ          

এমন সময়ে ঈষান, তোমার

বিষান উঠেছে বাজিয়া

বাজে রে গরজি বাজে রে

দগ্ধ মেঘের রন্ধ্রে রন্ধ্রে

দীপ্ত গগন মাঝে রে

চমকি জাগিয়া পূর্বভুবন

রক্ত বদন লাজে রে।।.......

ভীষণ দুঃখে ডালি ভরে লয়ে

তোমার অর্ঘ্য সাজাব

এসেছে প্রভাত এসেছে

তিমিরান্তক শিব-শঙ্কর

কী অট্টহাস হেসেছে

যে জাগিল তার চিত্ত আজিকে

ভীম আনন্দে ভেসেছে।।

Ñ রবীন্দ্রনাথ ঠ্কাুর

০২.

মৃত্তিকার হে বীর সন্তান,

সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতে মুক্তি দান

মরুর দারুন দুর্গ হতে! যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে;

সন্তরি সমুদ্র-উর্মি দুর্গম দ্বীপের শুন্য তীরে

শ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায়;

দুস্তর শৈলের বক্ষে প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়

বিজয়-আখ্যান লিপি লিখি দিলে পল্লব-অক্ষরে

ধূলিরে করিয়া মুগ্ধ; চিহ্নহীন প্রান্তরে প্রান্তরে

ব্যাপিলে আপন পন্থা।।.............

সেদিন অম্বর মাঝে

শ্যামে নীলে মিশ্র মন্ত্রে স্বর্গলোকে, জ্যোতিস্ক সমাজে

মর্তের মাহাত্মগান করিলে ঘোঘণাযে জীবন

মরণ তোরণ দ্বার বারম্বার করি উত্তরন 

Ñরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

এসব কবিতা নিঃসন্দেহে জীবনকে এবং জীবনের মূল্যবোধকে পরম নিষ্ঠার সাথে ধরে রেখেছে তার মর্মমূলে এবং  উদ্দীপিত করেছে তার প্রজ্বলন্ত উন্মেষ প্রকাশের স্বার্থে বিস্ফোরণ ঘটাতেএবং এসব উদ্দীপনাই উন্মুক্ত জীবনকে উদ্ধুদ্ধ করেছে তার সত্যনিষ্ঠ আত্মোদ্ধারেজীবনের আত্মোদঘাটনে জীবনকে উন্মুক্ত করবার প্রতিশ্রুতি রবীন্দ্র সাহিত্য সীমায় যতদূর প্রলম্বিত নজরুল এবং সুকান্তের সাহিত্য পরিধি ঐ প্রতিশ্রুতির পথ ধরে আরও বেশি উত্তরিতরবীন্দ্রনাথ গাম্ভীর্যের মোড়কে প্রতিশ্রুতিকে যেভাবে আবৃত করে স্বতন্ত্র মূল্য দিয়েছেন নজরুল এবং সুকান্ত সে মোড়ককে বিশ্বাস করতে চাননিফলতঃ তাদের প্রতিশ্রুতি আরও দূর্বার হয়ে আঘাতের পর আঘাত করেছে ব্যক্তি-জীবনের অবচেতন মূল্যবোধের শরীরেÑ

আমরা এসেছি নবীন প্রাচী-র নবস্রোতে

ভীম পর্বত ক্রকচ গিরির চূড়া হতে

উচ্চ অধিত্যকা প্রণালিকা হইয়া পার

আহত বাঘের পদচিন্ ধরি হয়েছি বার ;-------

বলগা-বিহীন শৃংখল ছেঁড়া  প্রিয় তরুণ

তোমাদের দেখিয়া টগবগ করে বক্ষে খুন

কাঁদি বেদনায়, তবু রে তোদের ভালোবাসায়

উল্লাসে নাচে আপনা-বিভোল, নব আশায়।...........

অভয় চিত্ত ভাবনা মুক্ত যুবারা শুন !

মোদের পিছনে চিৎকার করে পশু, শকুন !

ভ্রুকটি হানিছে পুরাতন পচা গলিত শব,

রক্ষণশীল বুড়োরা করিছে তারই স্তব------

Ñকাজী নজরুল ইসলাম

মাটিরে জড়ায়ে উপুড় হইয়া কাঁদিছে শ্রমিক, কুলি

বলে, - “মা গো”Ñ তোর উদরে মাটির মানুষই হয়েছে ধূলি,

রতন মানিক হয় না তো মাটি, হীরা সে হীরাই থাকে

Ñকাজী নজরুল ইসলাম

নজরুল সাহিত্যেও প্রবল উন্মাতাল কন্ঠস্বর জীবনকে আহবান করেছে যেন প্রকাশ্য সব পারিপার্শ্বিক তন্দ্রা হন্তারকের ভূমিকা নিয়েসামাজিকতার স্বেচ্ছা-উল্লসিত মুহূর্তটির সকল উন্নাসিকতার মূলোচ্ছেদ পরিকল্পনা যেন তার কন্ঠের প্রতিবিন্দু রক্তের সাথে বিমিশ্রিততারপরেও সময়ের বিবর্তনে সামজিকতা যেমন ব্যতিক্রম নয়, তেমনি সাহিত্যকেও অঙ্গীভূত কল্পনা করা অন্যায়নজরুল সাহিত্যের গতিস্রোতও ঐ সময়ের পথ ধরে প্রবাহিতসময়কে স্বীকার করে নিয়েই তিনি সামাজিকতাকে বিচার করেছেন- সামাজিকতার মৌহূর্তিক প্রক্ষিপ্তি তার চিন্তা প্রবাহে যে অসাধারণ ইমেজের সৃষ্টি করেছে  তার বিভ্রান্তিক অস্তিত্বের বিরুদ্ধেই নজরুলের কন্ঠস্বর উৎপ্লবিত যেন দুর্বার গতিতেযে উৎপ্লবনের ক্ষমতায় আরো অধিক শক্তি সঞ্চার করেছেন কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যÑ

শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ ভীরুতা পেছনে ফেলে

পেঁৗঁছে দাও এ নতুন খবর অগ্রগতির মেলে,

দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি-

নেই, দেরী নেই আর,

ছুটে চলো, ছুটে চলো, আরও বেগে দুর্দম হে রানার

রানার ! রানার!

এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?

রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?

Ñসুকান্ত ভট্টাচার্য

০২.তখন চিৎকার করে রক্ত বলে উঠে ধিক,ধিক

এখনও দিল না দেখা দেহে দেহে নির্ভয় সৈনিক!

 

কবে দেখা দেবে; কবে প্রতীক্ষিত সেই শুভক্ষণ

ছড়াবে ঐশ্বর্য পথে জনতার দূরন্ত যৌবন?’

 

প্রমত্ত কস্তুরিমৃগ ক্ষুদ্ধ চেতনায়

বিপন্ন করূন ডাকে তোলে আর্তনাদ

ব্যর্থ আজ শব্দভেদী বান-

সহস্র তীর্যক শৃঙ্গ করিছে বিবাদ

জীবন মৃত্যুর সীমানায়

লাঞ্ছিত সম্মান ফিরে চায় ভীরু দৃষ্টি দিয়ে

দূর্বল তিতিক্ষা আজ দুর্বাসার তেজে

স্বপ্ন মাঝে উঠিছে বিষিয়ে

Ñসুকান্ত ভট্টাচার্য

 

 

       অনায়াসে লক্ষ্যণীয় নজরুলের চৈতন্য রশ্মিকে জীবনের মর্মলোকে প্রোথিত করবার শক্তিতে আরো কয়েক ফোঁটা উজ্জীবনী সুধা যেন সুকান্তের উচ্ছৃত চিৎকারসামাজিকতাকে সামনে রেখে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সুকান্ত পর্যন্ত সবাই যেন তাদের সাহিত্যকে স্বীয় জীবন-চেতনার মধ্যে দিয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে গেছেন ব্যক্তি-জীবনের কাছেজীবন যখনই সামাজিকতার যুক্তিহীন অত্যাচারে চিৎকৃত হয়েছে তখনই যেন সাহিত্য আবির্ভূত হয়েছে ঐ চিৎকারের সর্বশেষ সান্ত¡না হিসেবেএবং পরিণতিতে ব্যক্তি-জীবন যা পেয়েছে তাই সামাজিকতাকে পরাজিত করবার সূর্যিক আনন্দ নিঃসংকোচেআর সামাজিকতার বিজিত বিগ্রহ ঐ আনন্দ থেকে লাভ করেছে নিজেকে সংশোধন করবার জন্য কোষমুক্ত উলঙ্গ কৃপাণের তীক্ষ্মধারকেতাই সামাজিকতা যেখানে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের প্রতিনিধি সেখানে তাকে অস্বীকার না করেই সাহিত্যের প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিৎ তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তি-জীবনের মূল্যবোধকে বিরামহীনভাবে প্রস্তুত রাখাÑ যেন সে যে কোন মুহুর্তে সামাজিকতার অসুন্দর, অমঙ্গলতাকে উৎসাদিত করতে পারে ব্যক্তি-জীবনের সার্বিক সুন্দরতার প্রয়োজনেই 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

         

 

 

 

 

 

 


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান