কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
কৃষ্ণপক্ষে চন্দ্রালোক - সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক ।। মনজুরুল ইসলাম
$post->title


আত্ম-প্রতিভার স্ফুরণ প্রত্যক্ষ করবার পরও জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে যখন একজন জ্যেষ্ঠ লেখক কিংবা প্রতিভাবান  ব্যক্তিত্ব ইতিবাচক মূল্যায়ন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন তখন সেটি তার অন্তঃকরণে প্রবলভাবে ক্ষতের সৃষ্টি করে- করবারই কথা। এক্ষেত্রে অন্ধকারের মধ্যেও আলোর বাতিঘর হিসেবে বিবেচিত হয় যে বিষয়টি সেটি হলো- সমাজ কর্তৃক প্রক্ষিপ্ত সেই নেতিবাচক প্রভাবটির স্থিতি খুব বেশি সময় অবধি অবস্থান করতে পারে না সেই লেখক অথবা ব্যক্তিত্বের দৃঢ়চেতা স্থিতধী মননের কাছে। কিন্তু একই ধরনের অনুভূতি যখন একজন প্রতিভাবান তরুণ শিক্ষার্থীর জীবনে উপলব্ধ হয় তখন সেই অনুভূতিটিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া তার জন্য অধিকতর কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রবল যন্ত্রণার উদ্রেক সৃষ্টিকারী সেই অনুভূতিটিকে কোনোভাবেই নিবৃত্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না সেই তরুণটির পক্ষে। যেহেতু অসীম সীমাবদ্ধতার ভেতর তাকে অবস্থান করতে হয়। সঙ্গত কারণেই যন্ত্রণা গ্রহণের প্রকৃত প্রেক্ষিতটি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করবার পরও মুক্তি পেতে ব্যর্থ হয় সীমাবদ্ধতার কারণেই।

     সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক। কৈশোর এবং তারুণ্যে রাজ্জাক নামেই ছিলেন সবার কাছেই অধিক পরিচিত। ইট পাথরের অট্টালিকাময় আজকের কুড়িগ্রাম শহরের সাথে একদমই অপরিচিত সেই সময়ের কুড়িগ্রাম শহরে ঘুরে বেড়াতেন হামিংবার্ড পাখির মতো। বন্ধুদের সাথে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতেন অসীম প্রশান্তি নিয়ে। ইচ্ছের আঙ্গিনাটিকে বর্ধিত করবার স্বপ্ন বুনে উপভোগ করবার মাত্রাটিকে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টিত হয়েছিলেন। নিবিড় মনোযোগের সাথে ব্যাপৃত থেকেছিলেন অধ্যয়নে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন এমন মুহূর্ত সৃষ্টির পূর্বেই অপ্রত্যাশিত প্রতিবন্ধকতা এসে উপনীত হয়েছিল তার জীবনে। প্রবলভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি যখন অনুসন্ধিৎসু চোখ দুটি দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না দডরঃযযবষফশব্দটিকে

কী করবেন তিনি? কী করবারই বা সামর্থ্য ছিল একজন তরুণ রাজ্জাকের মধ্যেওইক্রান্তিক মুহূর্তটিতে? তার মননজুড়ে সমস্যাটিকে মোকাবেলা করবার উতুঙ্গ অভিপ্রায় বিরাজমান থাকলেও অভিভাবকবৃন্দের উদাসীনতা কিংবা অজ্ঞতা যে কারণেই হোক না কেন, বোর্ড চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি তার পক্ষে। তাছাড়া সেই সময়ে কুড়িগ্রামের মতো প্রত্যন্ত মহকুমা থেকে রাজশাহী শহরে গিয়ে সমস্যাটিকে মোকাবেলা করা ছিল সুদূর কল্পনার বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। চোখে মুখে বিষণœতার ছাপটি প্রত্যক্ষ করবার পরেও কেউই তার জন্যে ইতিবাচক কোনো উপলক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে নি। সেই সময়গুলিতে চাপা কষ্টকে বয়ে নিয়ে বেশ কিছুটা সময় অতিক্রান্ত করে অতঃপর মেনে নিয়েছিলেন সেই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতাটিকে। কিন্তু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন নি তিনি শিক্ষা নামীয় সৌন্দর্য হতে নিজেকে বঞ্চিত করতে। ব্রতী হয়েছিলেন জ্ঞান অর্জন করবার মাধ্যমে নিজের মননকে ঋদ্ধ থেকে ঋদ্ধতর করবার। অতঃপর প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিফলিত হয়ে আসছিল সেই ব্রততার ছাপ।

     স্থানীয় পাঠাগার খুলবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় প্রতিদিনই প্রথম পাঠক হিসেবে পাঠাগারে প্রবেশ করতেন তিনি। গৃহস্থালি কোনো কাজেই ব্যাপৃত না থাকবার কারণে পড়াশুনো করবার সুযোগটি পেয়েছিলেন সীমাহীন সময়ের জন্যে। তাই জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় পরিব্রাজনের মাধ্যমে নিজেকে ঋদ্ধ করবার ক্ষেত্রে হতে পেরেছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বৈষয়িক কোনো উপাদানই তার এই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যটি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি তাকে।

     এরপর কালে কালে অনেক জল গড়িয়ে গেছে, পরিবর্তিত হয়েছে প্রকৃতি, প্রতিবেশ এবং যাপন করা অজ¯্র জীবনের ব্যাকরণ। আর এরই ধারাবাহিকতায় তার জীবনের মানচিত্রটিও বাঁক নিয়েছিল ভিন্নভাবে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, বৈবাহিক জীবনে প্রবেশ, জীবিকা নির্বাহের মতো কঠোর বাস্তবতার ভেতর দিয়ে খর¯্রােতা নদীর মতোই অব্যাহত রেখেছিলেন জ্ঞান চর্চার বিষয়টিকে। তার এই প্রজ্ঞা, বাস্তব জীবনের প্রতি নিবিড় অনুসন্ধিৎসা যাপিত জীবনের সমস্যাগুলিকে প্রবলভাবে রেখাপাত করেছিল। এবং সমস্যা সমাধানের অভিপ্রায়েই কলম হাতে নিয়েছিলেন কোনো ধরনের দ্বিধা এবং দীনতা ছাড়াই। হয়তো কুড়িগ্রামবাসী নিভৃতাচারী শব্দচাষী হিসেবে সরদার রাজ্জাককে পেতেন না যদি না তার জীবনের রেখাটি অঙ্কিত হতো এমনভাবে।

     বহুমাত্রিক প্রজ্ঞার লেখক হিসেবে জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন ধরলা বিধৌত সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামের কিছু মানুষের মনন জুড়ে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, তার এই প্রখর প্রতিভার বিস্তৃতি যে পরিমাণ সীমানা অথবা মনন জুড়ে প্রতিষ্ঠা পাবার কথা ছিল সেটি আজ অবধি বাস্তব রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ভাবনায় নিমগ্ন থাকলেও পরবর্তীতে সময় যতই পেরিয়ে গেছে ততই তিনি সাহিত্যের অমৃত রস আস্বাদনে দেশী এবং বিদেশী সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় পরিব্রাজনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। সাহিত্যে অন্তরিত সৌন্দর্যটি আবিষ্কারে এমন দৃঢ় ব্রতই হয়ত তাকে অমূল্য সাহিত্য সৃষ্টি রচনা করবার ক্ষেত্রে সক্ষম করেছিল।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থিত হতে পারে যে, সরদার রাজ্জাকের রচনাগুলিকে মহার্ঘ্য লেখনী হিসেবে স্বীকৃতি দেবার প্রশ্নে ইতিবাচকতার রায় দেয়া হবে কেন? কিংবা তার লেখাগুলিকে ধ্রæপদী লেখা হিসেবে ভবিষ্যতের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে কিসের ওপর ভিত্তি করে? ধ্রæপদী হিসেবে কোনো সৃষ্টিকে আখ্যা দেবার পূর্বে যে বিষয়গুলিকে বিবেচনা করা প্রয়োজন সেগুলি মূলত সেই সৃষ্টিটির শিল্পমান, বিষয়বস্তু এবং বিষয়বস্তুর সাবলীল উপস্থাপনার মাধ্যমে সমাজকে অথবা সমাজের প্রতিটি মানুষকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করা। এবং সেই উপযোগিতা যখন মহাকালব্যাপী টিকে থাকবার ক্ষেত্রে প্রশ্নাতীতভাবে উত্তীর্ণ হতে পারে কেবল তখনই সেটিকে ধ্রæপদী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

     এখানে আরো একটি প্রশ্ন উত্থিত হবার সম্ভাবনা থেকে যায়-ইউরোপ, আমেরিকার সমাজ ব্যবস্থা এবং এশিয়া কিংবা আফ্রিকার সমাজ ব্যবস্থা কিংবা সামাজিক আবহ কি একই ধরনের? উত্তরটি যদি ‘না’ সূচক হয় তাহলে একজন লেখক কীভাবে তার সৃষ্টির মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাÐের ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হবেন? ঠিক এ কারণেই সক্ষম হবেন- সামাজিক আবহ ভিন্ন হলেও যখন একজন লেখক তার নিজ সমাজের এবং একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র এবং জাতিসমূহের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে মৌলিক সমস্যাগুলিকে শনাক্ত করবার ক্ষেত্রে সফল হবেন তখন তার সেই মৌলিক সৃষ্টির প্রভাব সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাÐের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হবে। এখানে আর একটি বিষয় আপনা-আপনি চলে আসে, সেটি হলো- শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে পাঠকের হৃদয়রাজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করবার ক্ষমতা। যে ভাষাতেই কোনো লেখক লিখুন না কেন, যদি তিনি সেই ভাষার সর্বোচ্চ সৌন্দর্যটিকে আত্মস্থ করে লেখনীর মাধ্যমে প্রয়োগ করতে পারেন তবে ভবিষ্যতে সেই সৃষ্টিটি যে ভাষাতেই অনূদিত হোক না কেন, বিশ্বের সব প্রান্তের পাঠককে তা নাড়া দিতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস। এবং এই ধরনের সৃষ্টিকর্ম উপহার দেয়া শুধু সেই রাষ্ট্রের পাঠকদের জন্যই মহার্ঘ বিবেচনায় বিবেচিত হবে না বরং বিশ্বের সকল পাঠকের জন্য অমৃত হিসেবে গণ্য হবে।

     সরদার রাজ্জাক সৃজিত সকল সৃষ্টিকর্মকে যদি প্রকৃত অনুসন্ধিৎসার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টায় ব্যাপৃত থাকা যায় তবে খুব সহজেই তার রচনায় উপর্যুক্ত বিশিষ্টতাগুলি প্রতিভাত হয়ে উঠবে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, কাব্যনাটক এবং কবিতাসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই একজন সার্থক শব্দচাষী হিসেবে স্বর্ণালি সাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি। যে কোনো বিষয়ে লিখিত তার সৃষ্টির স্বল্প অংশ পাঠ করলেই যেমন সেই বিষয়ের শিল্পবোধ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় তেমনি পুরো সৃষ্টিটি পাঠ করবার পর সহজেই উপলব্ধ হয়- বিষয়বস্তুর গভীরতা এবং উপযোগিতা। যতই তার সৃজিত রচনার শব্দ ধরে সামনের দিকে এগুনো যায় ততই মনে হয় প্রকৃতির মাঝে স্থিত শোভনীয় এবং সুদৃশ্য কোনো সেতু বেয়ে গভীর কোনো সৌন্দর্যময় শব্দ-শহরের দিকে হেঁটে যাওয়া হচ্ছে। যে শাব্দিক শহরটি সাজিয়েছেন তিনি তার নিজের মতো করেই। শব্দের ওপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সৃজন করেছেন অসংখ্য অমূল্য সৃষ্টি।

কথাসাহিত্য রচনা করবার ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর পাশাপাশি যে দুটি বিষয় মুখ্য হিসেবে বিবেচিত হয় সে দুটি মূলত বিষয়বস্তু এবং চরিত্রের সূ² বর্ণনার পাশাপাশি চরিত্রের মুখে পরিমিত অর্থযুক্ত সংলাপ। যে দুটি বিষয়েই তিনি পারঙ্গমতার পরিচয় প্রদানে সক্ষম হয়েছেন বলে সহজেই ধারণা করা যায়। বিষয়বস্তুর বর্ণনায় বাংলা সাহিত্যের ধ্রæপদী কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর এবং মানিক বন্দোপাধ্যায়ের রচনাসমূহে অতি উচ্চমান যেমন লক্ষ করা যায় ঠিক তেমনি চরিত্রের বর্ণনা এবং সংলাপ রচনায় ম্যাক্সিম গোর্কি, লিও তলস্তয় এবং আন্তভ শেখভকে তার লেখায় খুঁজে পাওয়া যায়।



সরদার রাজ্জাক সৃজিত উপন্যাস প্রাণহীন প্রতিকৃতি এবং গল্পগ্রন্থের প্রচ্ছদ।

প্রকৃত অর্থেই তার প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘প্রাণহীন প্রতিকৃতি’ এর চরিত্রটিকে ব্যবচ্ছেদ করলে যে সত্যসারটি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সেটি মূলত বর্ণনার অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা এবং যৌক্তিক আবেগের যথার্থ প্রয়োগ। গভীরতর বিশ্লেষণের মাধ্যমে চরিত্রের নামকরণ যে অতিরিক্ত দ্যোতনার সৃষ্টি করতে পারে সেটি বোধকরি তিনি সক্ষমতার সাথে প্রমাণ করতে পেরেছেন। তার উপন্যাসটি পাঠ করলে অবচেতনাতেই যেন বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ কিংবা দেবেশ রায়ের ‘তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত’ অথবা সমমানের উপন্যাস পাঠ করবার পর যে ধরনের স্বাদকে অর্জন করা যায় ঠিক সে ধরনেরই স্বাদ উপলব্ধ হয়।   

     পাশাপাশি প্রবন্ধ এবং নাটক রচনার ক্ষেত্রে তার পরিমিতিবোধ তার রচনার একটি বিশেষ স্বকীয়তা। কাব্য এবং সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ওপর রচিত তার প্রবন্ধসমূহে তিনি যে আত্মদর্শন প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করেছেন তা বাংলা সাহিত্যের অমিয় ভুবনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে সহজেই অনুমেয়। বিশেষত কবিতার ওপর চিরকালের আধুনিক কবি জীবনানন্দের ভাবনা এবং তার ভাবনার মধ্যে সূ² পার্থক্য লক্ষিত হলেও দু’জনের চিন্তার মধ্যে যে উচ্চমার্গীয় মাত্রার সাযুজ্য রয়েছে তা সহজেই অনুভূত হয়।


সরদার রাজ্জাক রচিত প্রবন্ধগ্রন্থের প্রচ্ছদ।

মঞ্চ নাটক উপভোগ এবং সেই উপভোগের নির্যাস দ্বারা স্নাত হয়ে শেকসপিয়র, ইউজিন ও’নীল, হেনরিক ইবসেন, রবীন্দ্রনাথ, সাইদ আহমেদ, নুরুল মোমেন সহ অসংখ্য প্রথিতযশা নাট্যকারের জগতে বিচরণ ব্যক্তিগতভাবে নাটক পরিচালনায় তাকে উদ্যোগীর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ করেছিল। পরবর্তীকালে ব্যক্তিগত জীবনসঞ্চাত বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞানকে সমন্বয় করে রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন নয়টি নাটক এবং একটি কাব্য নাটক।

     সংখ্যায় অপ্রতুল হলেও তার কাব্যের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে যে ইতিবাচক বিষয়গুলি সহজেই প্রতিভাত হয়ে ওঠে সেগুলি মূলত- প্রতীকের যথোপযুক্ত ব্যবহার, চিত্রকল্পের সার্থক রূপায়ণ এবং কবিতার দর্শন। একটি কবিতায় যে ধরনের সাবলীলতায় পাঠক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ঠিক তেমন করেই যেন তার শব্দগুলো একের পর এক সাজানো। একটি পংক্তি পাঠ করা শুরু করলেই চৌম্বকীয়ভাবে যেন পরের পংক্তিগুলির দিকে ধাবিত হওয়া যায়। এবং পুরো কবিতাটি পাঠ করবার পর সৌন্দর্যের বোধ দ্বারা পুলকিত হবার পাশাপাশি এক ধরনের জীবনঘনিষ্ঠ দর্শন তার কবিতাকে উপযোগী করে তোলে। সংখ্যার অপ্রতুলতা, কবিতার নামকরণ, দর্শন বিচার এবং প্রকৃতি বর্ণনায় জার্মান কবি গ্যেটের প্রতিমূর্তিটি আপনা আপনি প্রতিফলিত হয়। 

ঠিক কোন সময় এবং কাদের অনুপ্রেরণায় স্নাত হয়ে তার এই অসামান্য সৃষ্টির পথে যাত্রা? ষাট এবং সত্তরের দশকে ধারাবাহিকভাবে দৈনিক সংবাদ, দৈনিক খবর এবং দৈনিক পূর্বদেশের মতো জাতীয় দৈনিকগুলির সাহিত্য পাতাতে যখন তার লেখাগুলি প্রকাশিত হতো তখন যেন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন তিনি। যে লেখাগুলি নিতান্তই স্বজনদের অনুরোধে পাঠাতেন এবং পত্রিকায় ছাপবে বলে প্রত্যাশা করতেন না, সে লেখাগুলিই  যে অবিকল ছাপার অক্ষরে জাতীয় পত্রিকার পাতা জুড়ে দৃশ্যমান হবে সেটি কখনো ভাবতেই পারেন নি তিনি। এবং বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা সাহিত্যিক আহসান হাবিব, সম্পাদক শামীম রেজাসহ গুণীসম্পাদকবৃন্দ যখন তার উচ্ছ¡সিত প্রশংসা করেছিলেন এবং আজীবন লেখালেখি চালিয়ে যাবার অকুণ্ঠ আহŸান জানিয়েছিলেন তখন নিজে থেকেই নিজের ভেতর শক্তি সঞ্চার করেছিলেন সাহিত্যঙ্গণে কাজ করবার। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে-সেই সময়ে আহসান হাবীব সম্পাদিত যে কোনো পত্রিকায় যদি কোনো লেখকের লেখা ছাপাবার জন্যে নির্বাচিত হতো সেক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ ব্যতিরেকে সেই লেখাটিকে সবাই উত্তীর্ণ লেখা হিসেবে বিবেচনা করতেন। এবং সেই মনোনীত লেখার লেখক আত্মবিশ্বাস অর্জনের পাশাপাশি বোধ করতেন সীমাহীন প্রশান্তি। সরদার রাজ্জাক কর্তৃক কবিতার ওপর সৃজিত ‘কবিতার চরিত্র এবং চরিত্রের শিল্পরূপ’ প্রবন্ধটি যখন পরপর দুই সংখ্যাজুড়ে ধারাবাহিকভাবে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল তখন তিনিও সেই অনুভূতিকে জয় করেছিলেন এবং লিখবার ক্ষেত্রে লাভ করেছিলেন অসীম অনুপ্রেরণা।      

     শুধু তাই নয়, বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা নাট্যপ্রতিভা সেলিম আল দীন যখন জাতীয় দৈনিক আজকের কাগজের সাহিত্য সাময়িকী সুবর্ণরেখায় প্রকাশিত তার একটি প্রবন্ধ পাঠ করবার পর দূরালাপনীর মাধ্যমে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেছিলেন এবং সেই কথোপকথনে সীমাবদ্ধ না থেকে তাকে একটি চিঠি লিখে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তখন থেকে লেখার গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেলিম আল দীনের যে কথাটি তার মননকে বারংবার উদ্বেলিত করে সেটি হলো -‘আপনি কখনই লেখার গতি রুদ্ধ করবেন না, যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিনই লিখে যাবেন,এটি আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ।’-কতজন মফস্বল লেখকের পক্ষে এতটা সৌভাগ্য হবে যে, সেলিম আল দীনের মতো একজন অতি উঁচু মানের ভাষাশিল্পীর কাছ থেকে এমন মন্তব্যকে অর্জন করা?

     সঙ্গত কারণেই কুড়িগ্রামের মতো মফস্বল শহরে সীমাহীন প্রতিবন্ধকতার মাঝেই লেখালেখি চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। আর্থিক দীনতার মাঝেই গ্রন্থ সহায়তা নেবার জন্য কষ্টার্জিত অর্থ নির্বাহ করে নিয়তই ছুটে যেতেন রংপুরে অবস্থিত তৎকালীন ইউসিস লাইব্রেরিতে। বিরামহীন গতিতে লেখালেখি এবং অধ্যয়নের কাজটি চালিয়ে গেলেও গ্রন্থ প্রকাশের কথা  ভাবতেই পারেন নি কখনো। হয়ত সুযোগের অপেক্ষায় অপেক্ষিত ছিলেন কিন্তু সে সুযোগটিও মেলেনি তার লেখক জীবনে প্রারম্ভিক পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারেই প্রান্ত পর্যায়ে এসে। তাছাড়া সংসারের ব্যয় নির্বাহের বাড়তি চাপতো ছিলই। আট ভাইবোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হিসেবে সব সময় দায়িত্ববোধের চাপটি তার ওপরই এসে বর্তাতো। আর  তিনিও কখনোই ভাইবোনদের বিমুখ করতেন না। নিজের মতো ভাইবোনেরা উচ্চ শিক্ষার স্বাদ আস্বাদনে ব্যর্থ হবে সেটি কখনও কামনা করতে পারেন নি তিনি।

     পরিবারের মূল ভূমিকাটি পালন করবার পাশাপাশি অবচেতনাতেই কখন যে কুড়িগ্রাম সাহিত্যের অভিভাবকের ভূমিকাটি পালন করেছিলেন বুঝতেই পারেন নি। তরুণ বয়সে মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে নাটকের জগতে প্রবেশ করে যে অকৃত্রিম সুখানুবোধ দ্বারা স্পর্শিত হয়েছিলেন, সেই স্পর্শনাভূতির ব্যাপ্তিটিকে দীর্ঘায়িত করবার জন্যে নিজের সৃষ্টিশীলতার পুরো নির্যাসটুকুই ব্যবহার করেছিলেন। অলৌকিক লোকালয়ের মতো কাব্যনাটক মঞ্চস্থ করে সমাজের ওপর যেমন প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন তেমনি তৈরি করেছিলেন অসংখ্য প্রতিশ্রæতিশীল নাট্যকর্মী। নানামুখী সংগঠনে নিজেকে ব্যাপৃত রাখবার মাধ্যমে সেই সংগঠনের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে নিজের অন্তঃপ্রাণ মানসিকতাটিকে যথাযথভাবে নিবেদন করেছিলেন। আজ এতটা সময় পেরিয়ে যাবার পরেও পরোক্ষভাবে স্থানীয় সংগঠনগুলোকে নানাভাবে পরামর্শ প্রদানের কাজটি করেই চলেছেন। তার প্রকাশিত প্রথম সাহিত্য প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আত্মদার্শনিক প্রেক্ষিতে কবিতার অবস্থান’ উৎসর্গ করেছেন কুড়িগ্রাম সংস্কৃতির ঐতিহ্যের প্রতীক ‘প্রচ্ছদ’-কে। তার এই উৎসর্গ থেকেই এটি সহজেই অনুমান করা যায় সংগঠনের প্রতি তার আত্মনিবেদন এবং ঐকান্তিক অনুরাগের মাত্রাকে।

     নাটকের পাশাপাশি কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, এবং কাব্য জগতেও তার কাছ থেকে নির্দেশনা, অনুপ্রেরণা এবং উৎসাহ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন তারই গুণগ্রাহীরা। নিজের গ্রন্থ প্রকাশ না হলেও সেই সব গ্রন্থগুলি যখন প্রকাশিত হতো তখন তীব্রভাবে উচ্ছ¦সিত হতেন তিনি। আকাশের মতো উদার হতে পেরেছিলেন বলেই তার পক্ষে এমনটি সম্ভব হয়েছিল। আর সন্দেহাতীতভাবে তার হৃদয়রাজ্যের সীমানা এত দূর অবধি বিস্তৃত যে- যে কেউ অনায়াসেই সেখানে জায়গা করে নিতে পারে। যত ধরনের সমস্যাই বোধ করুন না কেন, নবীন থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ কোনো লেখক যখন তার কাছে কোনো ধরনের পরামর্শ অথবা লেখা সংশোধনের নিমিত্তে শরণাপন্ন হন তখন তিনি কখনোই তাদের বিমুখ করেন না। তার সাধ্যের মধ্যেই সেই লেখাটিকে সংশোধন করে দেবার চেষ্টা করেন। এবং লেখাটি যদি একেবারেই প্রকাশের অযোগ্য হয় সেক্ষেত্রে সেই লেখার প্রকৃত ভাবটিকে অক্ষুণœ রেখে মোটামুটি একটি মানের ওপর দাঁড় করিয়ে দেবার চেষ্টা করেন।

প্রকৃত প্রেক্ষিত বিবেচনায় সার্থক সাহিত্য সৃজন করবার প্রশ্নে কেমন মানসিকতা জরুরি? যদি এমন প্রশ্ন আহŸান করা হয় তাহলে মনে হয় সরদার রাজ্জাকের মতো এমন আকাশচুম্বী উদার মানসিকতাই প্রয়োজন। আর এমন মানসিকতার উদয় না হলে প্রকৃত সাহিত্য সৃজন তো সম্ভবই নয় বরং সেই ধরনের লেখক, লেখক হিসেবে জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত নিজের সাথে অভিনয় করে যাবেন। লেখনীর মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে আত্মসুখ সৃষ্টি করা তো দূরের কথা, তিনি নিজেই কখনো নিজের মধ্যে স্থিরতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না। আর আকাশের মতো এমন উদার মানসিকতার অধিকারী ছিলেন বলেই কিনা সরদার রাজ্জাকের পক্ষে সম্ভব হয়েছে এমন উচ্চমার্গীয় রচনা সৃষ্টি করা। তার এই মানসিকতার সাথে বোধকরি বুদ্ধদেব বসুকে খুব সহজেই মেলানো যায়। বুদ্ধদেব বসু ঠিক যেমন করে উদীয়মান প্রতিশ্রæতিশীল লেখকদের তার তীক্ষè বিশ্লেষণ ক্ষমতার দ্বারা সাহিত্যের অমিয় অঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করে গিয়েছিলেন, সরদার রাজ্জাকের ক্ষেত্রে যেন ঠিক তেমনটিই ঘটেছে। অজ¯্র পাÐুলিপি অগ্রন্থিত অবস্থায় রয়ে গেলেও বিন্দুমাত্র অন্তর্দ্ব›েদ্ব না ভূগে তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করে গিয়েছিলেন এবং এখনও যাচ্ছেন। তাদের লেখার মান যেন উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে সেটি ছিল তার প্রকৃত কামনা। তবে তার মননে যে প্রত্যাশাটি নিয়ত ক্রিয়াশীল সেটি হলো- একজন সত্যিকারের লেখক যেন তার হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের অমিয় ভুবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে। আর এই বিবিধ ভাবনাগুলিকে লালন করতে গিয়ে নিজের গ্রন্থ যে প্রকাশ করতে হবে সেটি অন্তরালেই রয়ে গিয়েছিল। এ যেন আত্মত্যাগেরই একটি জীবন্ত উৎপ্রেক্ষা! 

     হয়ত অনবরত চর্চার মাধ্যমে তার মননে এই বোধটি স্থির হয়েছিল যে, সৃষ্টি যদি প্রকৃত হয়, সৃষ্টির মধ্যে যদি সত্যিকারের বার্তা অন্তরিত রয়ে যায় তবে সেটি কোনো না কোনো একদিন বিকশিত হবেই। আর এ বোধ সৃষ্টি বোধকরি একজন লেখকের প্রকৃত সার্থকতা। একজন লেখক ঠিক কোন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হলে ধারাবাহিকভাবে শব্দের চাষ অব্যাহত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন? অথবা লেখার মান কি তখনই উৎকৃষ্ট হবে যখন সেই লেখক লেখালেখির কর্মটিকেই সর্বোচ্চ ভালোলাগার কর্ম হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন? অবশ্যই লেখালেখির ওপর প্রকৃত ভালোবাসা সৃষ্টি তো বাঞ্ছনীয়, পাশাপাশি এই ভালোবাসা সৃষ্টি হবে তার অভিজ্ঞান এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে লেখালেখির ওপর ডেভোশনটিকে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন কিনা এই প্রশ্নটির ওপর। আর এটি করতে পারলে কেবল তখনই প্রতিটি মুহূর্তের জন্যে নিজেকে সেই লেখক ব্যাপৃত রাখতে সক্ষম হবেন সৃষ্টির অতলান্তে থেকে আরো উচ্চমার্গীয় সৃষ্টির সম্ভাবনাকে সম্ভব করবার। সরদার রাজ্জাকের যাপিত বর্তমান সময়গুলিকে যদি তীক্ষè দৃষ্টির প্রক্ষেপণ ফেলে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় তবে যে সত্যটি বেরিয়ে আসবে সেটি হলো- তিনি যেন সেই সৃষ্টিরই একজন ধাবমান অগ্রপথিক।

ভাবা যায়! সত্তরের সীমানা পেরিয়েও একের পর এক গ্রন্থ পাঠ করবার যে অকৃত্রিম আগ্রহ তার মধ্যে নিয়ত ক্রিয়াশীল দেখা যায় সেটিকে কোনো ধরনের সন্দেহ ব্যতিরেকে আমাদের সবার জন্যে উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। একটি কক্ষ, যে কক্ষটি বিপুল গ্রন্থরাজি দ্বারা পরিপূর্ণ। কে কখন তার গৃহে প্রবেশ করলো কিংবা বের হয়ে গেলো সেদিকে তার বিন্দু পরিমাণ ভ্রæক্ষেপ নেই। শুধু তার নিজের স্বাপ্নিক কক্ষটিতেই দিনের প্রায় পুরোটা সময় অতিবাহিত করেন লেখালেখি এবং গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে। হাতের আঙুলগুলিতে নেই আজ তারুণ্যের মতো অটুট শক্তি, দৃষ্টিশক্তিও অনেকটাই ¤্রয়িমাণ- তবুও কম্পিউটারে বসে নিজ হাতে টাইপ করে যখন অমূল্য সাহিত্য রচনা করে চলেন তখন সাহিত্যের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসাই স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। তার লেখা উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা গল্প সম্বন্ধে কোনো পাঠক যখন ইতিবাচক মন্তব্য করেন তখন তাকে শিশুর মতো খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে উঠতে দেখা যায়। তৃতীয় দৃষ্টি দিয়ে যদি কেউ তার সেই হাসির গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেন তবে সহজেই আবিষ্কার করতে পারবেন- হাসির অভ্যন্তরে হাজার বছর ধরে সাহিত্যের জগতে নিজেকে টিকিয়ে রাখবার দুরন্ত অবয়বটিকে।


সাহিত্যবার্তায় প্রকাশিত রোহিঙ্গা সমস্যার ওপর রচিত সরদার মোহম্মদ রাজ্জাকের আলোচিত বড় গল্প ‘অবরোধ’ এর প্রচ্ছদ।

 

আজ এ পড়ন্ত বেলায় এসে সাহিত্য সম্পর্কে তার যে মূল্যায়ন সেটিও বোধকরি দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করবার মতো একটি বিষয়। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন-‘সাহিত্য সংস্কৃতির একটি শাখামাত্র। তবে সংস্কৃতির বহুবিধ শাখা- প্রশাখার মধ্যে সাহিত্য এমন একটি শাখা, যে শাখাটি একটি জাতির গোটা সংস্কৃতিকে ধারণ করে এবং বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সেই সংস্কৃতির মূল নির্যাসটি তুলে ধরে। সেদিক থেকে সাহিত্যই একমাত্র শাখা যে শাখাটি না হলে সংস্কৃতির কাÐটি পরিপূর্ণতা লাভ করে না। কেননা উন্নত সংস্কৃতি বিকাশের জন্য সাহিত্যের প্রয়োজনীতা অপরিসীম। তবে লক্ষযোগ্য বিষয় হলো- বর্তমানে যারা সাহিত্য চর্চা করেন এবং সংস্কৃতিকে নিজেদের ভেতর লালন করতে চান বা আগ্রহী সেক্ষেত্রে তাদের রচনা কিংবা সাহিত্য কর্মকাÐ যতটুকু প্রকাশিত হয় তাতে হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে।’ তার বিশ্বাস- ‘তরুণ সাহিত্যকর্মীরা সাহিত্যের শাখা-প্রশাখায় অনবরত বিচরণের মাধ্যমে নিজেদের আরো স্থিতধী করে তুলবে। কিন্তু এটি করতে না পারলে আত্মতুষ্টি হয়তো তারা পেতে পারে কিন্তু তাদের সৃষ্টি কখনোই সাবলীল হয়ে উঠবে না।’

     জীবন সায়াহ্নে এসে জাতির কাছে কিছুই চাইবার নেই আজ তার। অতীত জীবনেও কিছু প্রত্যাশাও করেন নি। সাহিত্যের প্রতি তার আত্মনিবেদনের মাত্রা সর্বোচ্চ স্তরে স্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছেন বলেই তিনি কোনো প্রকারের স্বীকৃতি, পুরস্কার, সম্মাননা কিংবা এ ধরনের কিছু প্রাপ্তির আকাক্সক্ষায় প্রলোভিত না হয়ে সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে সাহিত্য চর্চা করে গেছেন, শত প্রলোভনকে অগ্রাহ্য করে নিজের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে অক্ষুণœ রেখেছেন। যেহেতু লেখার ভেতর দিয়ে সব সময় প্রকৃত সত্যটিকে অণে¦ষণ করবার অভিপ্রায়টিকে জাগ্রত রেখেছিলেন সেহেতু প্রলোভনের ফাঁদে নিজেকে আতœসমর্পণ করবার চিন্তাও করেন নি কখনো। স্বমননে অন্তরিত দর্শনের বাইরে গিয়ে দ্বিচারীর মতো জীবনযাপন করবেন কিংবা স্ববিরোধিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন তা কী করে সম্ভব ছিল তার পক্ষে? এবং তার সৃষ্টিগুলি কালকে অতিক্রম করে যাবার মতো শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং সত্যিকার অর্থে সরদার রাজ্জাকের মতো ক্ষণজন্মা ব্যক্তিরা বোধহয় এভাবেই নিজেদেরকে মেলে ধরেন। সারাজীবন কষ্ট করবার মাধ্যমে যে দর্শন জাতির সামনে উপস্থাপন করেন অথবা উপহার দেন তার ওপর ভিত্তি করে সেই জাতির জনসাধারণ লাভ করতে পারে অপরিমেয় প্রশান্তির সঞ্জীবনী শক্তি, বেঁচে থাকবার অনুপ্রেরণা।

তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি, শেষ সময়ে এসে তার জীবনের প্রত্যাশার পরিমাণটি শূন্য? না, সেটি কখনোই হবার নয়। একজন লেখক কখনোই প্রত্যাশাবিহীন কোনো কাজে ব্যাপৃত থাকেন না। তবে তাদের প্রত্যাশার ধরন সমাজের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো হয়ত হয় না। তাদের প্রত্যাশাগুলোর সাথে জড়িয়ে থাকে স্ব-স্ব মননের প্রসন্নতা। বিপরীতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাগুলো অবস্থান করতে পারে শুধু দৈহিক প্রসন্নতার ভেতর দিয়ে। আমাদের এই বিশ্ব মানচিত্রের অতি ক্ষুদ্র সীমায়তি জুড়ে স্থিত রাষ্ট্র যেন উৎকর্ষের শীর্ষ চূড়ায় অধিষ্ঠিত হতে পারে, আমাদের মানুষগুলো যেন কূপমÐুকতার খোলস ছেড়ে আকাশের মতো উদার হতে পারে সেটিই তার নিয়ত প্রত্যাশা। এবং তার লেখা যদি উদ্ধৃত মননের মানুষ সৃষ্টি করবার ক্ষেত্রে এতটুকু হলেও ভূমিকা রাখতে পারে সেটিই হবে তার সর্বোচ্চ সার্থকতা।

তাহলে কি খুব সহজেই এটি অনুমিত নয় যে- তার প্রত্যাশাটি কী? অবশ্যই তার সৃষ্টির অমরতা। যেহেতু তিনি স্থির বিশ্বাসে স্থিত, তার চারপাশের মানুষগুলোও তার এই বিশ্বাসের ওপর উচ্চমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল সেহেতু তার এই চাওয়াটিকে সবার চাইবার মাঝে প্রতিষ্ঠা করাই যেন তার প্রত্যাশা এবং প্রত্যক্ষভাবে প্রত্যাশার এই প্রদীপটিকে প্রজ্জ্বলিত করানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের- রাষ্ট্রের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত জ্ঞান রাজ্যের অভিভাবকবৃন্দের। সে দায়টি যদি সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে না ওঠে সেক্ষেত্রে সেই রাষ্ট্র জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে উৎকর্ষের যে উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হবার কথা সেই উচ্চতায় কখনোই অধিষ্ঠিত হতে পারবে না। একটি প্রদীপশিখা সময়ের সাথে তার সকল ঐশ্বর্য হারিয়ে যেতে থাকবে।

     প্রাসঙ্গিকভাবেই এখন তুর্কমেনিস্তানের প্রথম দিককার গদ্যলেখক নুরমুজাত সারিখানভ রচিত ‘পুঁথি’ গল্পটির উল্লেখ করা যেতে পারে। গল্পটির মুখ্য চরিত্র ভেলমুরাত আগা, যিনি ছিলেন একজন সাধারণ রাখাল। অক্ষরজ্ঞানহীন এই ব্যক্তিটি আরাফাতে গিয়ে তুর্কমেন চিরায়ত সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত মাহতুম কুলি রচিত একটি গ্রন্থের কিছু অংশ শুনবার পর এতটাই বিমোহিত হয়েছিলেন যে, গ্রন্থটি কিনবার জন্যে নিজের একমাত্র সম্বল গর্ভবতী উটটি বিক্রি করেছিলেন। তার এই উট বিক্রি করবার নেপথ্য কারণ হিসেবে যেটি প্রতিষ্ঠিত সেটি হলো- সেই গ্রন্থের কিছু অংশ শুনবার পর তার অসাধারণ ভালোলাগার অনুভূতি। তিনি কখনো ভাবতে পারেন নি যে, একটি গ্রন্থের কিছু শব্দ মানুষের অন্তঃকরণে এতটাই গভীরভাবে উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে। এত বিজ্ঞভাবে জীবনের কথা বলতে পারে, এমন করে মানুষকে বোঝাতে পারে।

     আর এমন অনুভূতির উদ্রেক ঘটেছিল বলেই তিনি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করেই গ্রন্থটি কিনেছিলেন উটটি বিক্রি করে। এজন্য নিয়ত তাকে অপমান সইতে হয়েছিল তার স্ত্রীর কাছে। তবুও তার যে ইচ্ছেটি সবসময় তাকে দৃঢ় রাখতো সেটি হলো- এই গ্রন্থটি তার এলাকার মানুষ পাঠ করবার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করবে এবং নিজেদেরকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। কিন্তু যে সমস্যাটি তাকে নিয়তই ভাবিয়ে তুলেছিল সেটি হলো-তার এলাকাজুড়ে কিংবা পাশের এলাকাতেও একজন শিক্ষিত লোকও ছিলেন না যিনি তাকে এবং তার এলাকার সাধারণ মানুষকে এই গ্রন্থটি পাঠ করে শোনাবেন। তাই তিনি তার সন্তানকে শিক্ষিত করবার নিমিত্তে একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানকে সুশিক্ষিত করে তুলবেন এমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছিল না সেই সময়ে। এরই মাঝে একজন পুঁথি সংগ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে তার কাছ থেকে সেই মূল্যবান পুঁথিটি সংগ্রহের চেষ্টা করে আসছিলেন। অর্থ কিংবা অন্য যে কোনো কিছুর বিনিময়ে তিনি সেই গ্রন্থটি ক্রয়ে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু গ্রন্থটি বিক্রি করবার ক্ষেত্রে ভেলমুরাত আগা কোনোভাবেই রাজি ছিলেন না। শুধু সেই পুঁথি সংগ্রাহকই নয় আরো বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা লেখক এবং গ্রন্থ সংগ্রাহক চেষ্টা করেছিলেন গ্রন্থটিকে ক্রয় করবার। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই বিক্রয় করতে রাজি হন নি। পরন্তু থলের তলা থেকে গ্রন্থটি বের করে হাতে নিয়ে সবাইকে দেখিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলতেন- ‘এই গ্রন্থের প্রতিটি শব্দ এক একটা মাদি উট আর তার বাচ্চার সমান। যারা এসব বইয়ের মূল্য জানে না তারাই বেচে। দুনিয়াতে এমন কয়েকটি জিনিস আছে যা কোনো হাটে কেনা যায় না এবং বিক্রয়ও করা যায় না। আমরা না হয় পড়তে পারি না কিন্তু ছেলেরা বড় হয়ে তো পড়তে পারবে।’ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাবার পরে যখন রাষ্ট্র কর্তৃক একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তারই গ্রামে, তখন তিনি সন্তুষ্ট চিত্তে তার সন্তান মুরাতজানকে সেই স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তার সন্তান শিক্ষিত হয়েছিল। শিক্ষিত হবার পর তাকে এবং তার  গ্রামের সবাইকে গ্রন্থটি পাঠ করে শুনিয়েছিল।

যে বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করবার মতো সেটি হলো, অর্থনৈতিকভাবে একজন দরিদ্র রাখাল অক্ষরজ্ঞানহীন হয়েও বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, একটি গ্রন্থ পাঠ করবার মাধ্যমে তার এলাকার সাধারণ লোকজন আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। তাদের মধ্যে কুসংস্কারের যে বীজ রয়ে গেছে সেটি চিরদিনের জন্যে উৎসাদিত হবে সেই গ্রন্থের শব্দগুলিকে আত্মস্থ করবার মাধ্যমে। সে কারণেই দীর্ঘ সময় অবধি তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু কারো কাছেই কোনো মূল্যেই গ্রন্থটি বিক্রি করেন নি। অর্থাৎ জ্ঞানের যে মূল্য তা অনুধাবন করবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রায় উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছিলেন সেই অসামান্য রাখাল ভেলমুরাত আগা। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে- আমাদের রাষ্ট্রের আপামর জনসাধারণ যখন জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন তখনই সরদার রাজ্জাকের মতো নিভৃতাচারী লেখকবৃন্দের সৃজিত অমূল্য শব্দগুলি তাদের মননকে আলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে উঠবে। এবং তখনই কেবল সৃষ্টি হতে পারে একটি উচ্চ মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র এবং জাতি।

লেখার তারিখ এবং স্থান

১৫-১০- ২০১৭,৩০ আশ্বিন ১৪২৪

কুড়িগ্রাম

 

তথ্যসূত্রঃ

১. রাশিয়ার দশটি গল্প, অনুবাদ সমর সেন, প্রথম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সংস্করণ ফেব্রæয়ারি ২০১৪, পুঁথি, পৃষ্ঠা নং ১৯-৩৩।

২. জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা, এপ্রিল ২০১১, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা। পৃষ্ঠা নং-৭-১৪।

৩. সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক, আত্মদার্শনিক প্রেক্ষিতে কবিতার অবস্থান, ফেব্রæয়ারি ২০১৭, পৃষ্ঠা নং ১৩-২৩।

 

 

 



সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান