কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
বানীবালা মল্লিক - সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক
$post->title

০১.

মাহমুদ আল হাসান বিপুল। চল্লিশোর্ধ স্বাস্থ্যবান দীর্ঘদেহী এক ব্যক্তি মূল সড়কের ফুটপাথের ওপর দিয়ে ক্রাচে ভর করে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে সামনের দিকে। ওর কন্যা তিত্লিকে স্কুলে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে ওর FLAT-এ। তিতলি KG- One -এর ছাত্রী। তিত্লির স্কুল থেকে ওর FLAT-এর দূরত্ব আধা কিলোমিটারের সামান্য বেশী। তিত্লিকে স্কুলে পৌঁছে দেবার সময় এবং স্কুল থেকে নিয়ে যাবার সময় বিপুল রিকশাতেই ওকে নিয়ে আসে এবং স্কুল ছুটির পর রিকশাতেই ওকে নিয়ে যায়। তবে স্কুলে ওকে দিয়ে যাবার পর এবং স্কুল থেকে ওকে নিয়ে যাবার আগে বিপুল হেঁটেই আসা যাওয়া করে। কারণ ক্রাচে ভর করে হাঁটবার সময় বিপুল তিত্লির হাত ধরতে পারে না দু’হাত দিয়ে ক্রাচ দু’টিকে ধরতে হয়।    তখনও সকাল ন’টা অতিক্রম করে নি। এর মধ্যেই রাস্তা প্রচন্ড যানজটে আক্রান্ত। ফুটপাথে কীট পতঙ্গ- বিশেষ করে উভয় প্রান্ত থেকে অগ্রসরমান অসংখ্য পিপীলিকার সারির মতো অস্বাভাবিক মনুষ্য জ্যাম যা আবার পিপীলিকাদের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়। অবাক হবার মতো বিশৃঙ্খল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিপুল হাঁটবার গতি বাড়াতে চাইলেও ওর উপায় থাকে না। কারণ, মানুষ তো নয় সব পিঁপড়ের সারির ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ক্রাচ দু’টির ওপর শরীরের পুরো ভার অর্পণ করে ওকে হাঁটতে হয়। এ মুহুর্তে বিপুল যেন প্রকৃতই অসহায়। একমাত্র অসহায় ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না বিপুল নিজেকে। 

 

বিপুলের শরীরের রংকে ফর্সা বলা যায় না। মোটামুটি উজ্জ্বল শ্যাম। পরনে কালো প্যান্টের সাথে সাদা সার্টের Combination. সার্টটি প্যান্টের ভেতর ইন করা। পায়ে Grand Colored -কালো জুতো। মাথায় প্রচুর দীর্ঘ চুল ঘাড় পর্যন্ত প্রলম্বিত। তবে অবিন্যস্ত। চোখে একটি পুরু Bi-Focal Lense -এর Brown Colored Frame -এর চশমা যা ওর প্যান্ট, সার্টের সাথে Adjust -করেছে খুবই অদ্ভুতভাবে। বোঝা যায় বিপুলের রুচি ঋদ্ধতায় ভরপুর।  Masters -করেছে অনেক আগেই। Masters Course Completion -এর আগেই বিয়ে করেছে ওরই Class এবংSubject-mate--বানী বালা মল্লিক নামের একটি Christian - মেয়েকে। মেয়েটির বাবা অনেক আগেই হিন্দু ধর্ম থেকে Christian -ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। সে সূত্রেই মেয়েটি Christian.Varsity -তে বিপুল আর বানী বালা দু’জনের বিষয়ই ছিলো ‘সাংবাদিকতা’। Varsity -তে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই দু’জনের মধ্যে প্রেমের সূত্রপাতÑ যা MastersCompletion -এর আগেই বিয়েতে পরিণতি প্রাপ্ত। বিয়ের পরপরই বিপুল ওর গ্রামের বাড়ী থেকে একজন মধ্যবয়স উত্তীর্ণ নারী ‘আলোর মা’-কে ঢাকায় ওর ভাড়া করা FLAT-এ নিয়ে এসেছিলো ওদের দু’জনের ছোট্ট সংসারের টুকিটাকি কাজ কর্ম দেখাশোনা করবার জন্যে। যেহেতু স্বামী স্ত্রী দুজনই ওরা কর্মজীবী। বিপুল কাজ করতো একটি Electronic MediaÕi News Editor - হিসেবে এবং ওর স্ত্রী বানী বালা মল্লিক কাজ করতো একটি প্রথম শ্রেণির Print Media এরSub Editor -হিসেবে। সেইহেতু ওদের রান্না বান্নাসহ FLAT-টিতে রক্ষিত ওদের আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদি রক্ষনাবেক্ষণের জন্যেও একজন নারী কর্মীর প্রয়োজন ছিলো। আর এ সব কারণেই আলোর মা’কে বিপুলের FLAT-এ নিয়ে আসা। আলোর মায়েরও ওর একমাত্র কন্যা ‘আলো’-ছাড়া আর কেউ ছিলো না। কিন্তু অনেকদিন আগে আলোর বিয়ে  হয়ে যাবার পর থেকে মায়ের কোনো খোঁজ খবর রাখতো না আলো, এখনও রাখে না। আলোর বিয়েটিও হয়েছিলো গ্রামবাসীদের আর্থিক এবং অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতায় পাত্র পছন্দের বিষয়টি আলোর মায়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলো না। গ্রামের লোকজনরাই পাত্রটিকে পছন্দ করেছিলো এবং জুটিয়েও এনেছিলো। শুণ্য-বিত্ত পিতা মাতার কন্যা-বিবাহের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এই-ই বোধকরি হয়ে থাকেÑ একেই ওরা ওদের বিধিলিপি ভেবে মেনেও নিয়ে থাকে। কারণ দ্বিতীয় কোনো বিকল্প যে ওদের হাতে থাকে না।  এ সব নানা দিক বিবেচনা করে আলোর মা-ও ঢাকায় আসতে কোনো আপত্তি করে নি, বরং মনে মনে এক ধরনের খুশিই অনুভব করেছিলো। ঢাকায় আসবার পর আর পেছন ফিরে তাকায় নি আলোর মা। বিপুলের কাছেই থেকে গিয়েছিলো। বিপুলের সংসারকেই নিজের মনে আপন করে নিয়েছিলো। আর গ্রামে ফিরে যাবার কথা ভাবে নি কখনও। আসলে গ্রামের বাড়ীতে নিজের আশ্রয় বলে কিছু ছিলো না ওর। নিজের বলতেও কেউই ছিলো না। অন্যের বাড়ীতে একটি চালা ঘর তুলে কোনো রকমে রাত্রি যাপন করতো আর অন্যের বাড়ীতে ঝি’য়ের কাজ করে অন্নের সংস্থান করতো। কখনও কোনো কারণে ঝি’য়ের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে আহারও বন্ধ হয়ে যেতো। কোনো দিন একবেলা খেয়ে, কোনো দিন একেবারে কিছু না খেয়েই কাজের সন্ধানে ঘুরতো। কাজ জুট্লে এক রকম আর না জুট্লে উপোস এই হলো আলোর মায়ের ভাগ্যচক্র। এই ভাগ্যচক্রকে মেনে নিয়েই বেঁচে ছিলো আলোর মা। না মেনে কোনো উপায়ও ছিলো না যে ওর। সঙ্গতি যে ওর কিছুই নেই। সঞ্চয়ের ভাণ্ডটিও শুণ্য। সত্যি কথা বলতে, ভাণ্ড না বলে ওটিকে ভাগাড় বলাই বোধ করি সঙ্গত।  

 

বিয়ের অনেক পরে বানী বালা একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দান করে। স্বামী স্ত্রী উভয়ের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতেই বিয়ে হবার দীর্ঘদিন পর ওরা সন্তান গ্রহণ করে। এ সিদ্ধান্তটি ওরা বিয়ের আগেই গ্রহণ করে রেখেছিলো। সন্তানটি জন্মাবার পর ওরা আনন্দ-আবেগে উচ্ছ¡সিত হয়ে ওর নামটি রেখেছিলো ‘তিত্লি’- অর্থাৎ প্রজাপতি। প্রজাপতিকে কার না ভালো লাগে, কে না ভালোবাসে পতঙ্গটিকে ? এদিকে সন্তানটিকে জন্ম দেবার পর থেকে বানী বালা ভেতরে ভেতরে নারীত্বের পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্তির একটি বিশেষ গর্ব অনুভব করতে শুরু করেছিলোÑ যা ওর আচার আচরণে সে সময়ে খুব স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠতো।  এবং এটিকে অত্যন্ত যথেষ্ট উৎফুল্লতার সাথেই গ্রহণ করেছিলো বিপুল। একই সাথে বানী বালাকে মনে মনে একটি ভিন্ন রূপের আলোক-আঙ্গিকে আবিস্কার করে নিয়েছিলো। কিন্তু বানী বালার এ বাহ্যিক আচরণটি ছিলো সম্পূর্ণই মেকী। যে কারণে এ আবিস্কারটি খুব বেশী দিন স্থায়ী হয় নি বিপুলের। সন্তানটি জন্ম দেবার তিন বছরের মধ্যেই আবিস্কারটি কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোর অন্ধকার রাত্রির গায়ে জ্বলা জোনাকির আলোর মতোই প্রহেলিকায় রূপান্তরিত হবার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলো। এ রকম রাত্রিতে জোনাকির ‘নিভে-জ্বলা’- আলোকে তো আংশিক হলেও প্রহেলিকাই মনে হয়। চার বছরের মাথায় পরিপূর্ণ প্রহেলিকার রূপ লাভ করেছিলো বিপুলের আবিস্কারটিÑ যখন একদিন অফিস থেকে FLAT-এ ফিরবার পথে একটি রাজনৈতিক দলের জনসভার পাশের রাস্তা অতিক্রম করবার সময় ওই জনসভায় প্রচণ্ড Granade -বিস্ফোরিত হলে ওই Granade -এর কয়েকটি Splinter -এসে সরাসরি বিধে গিয়েছিলো বিপুলের ডান পা’টিতে। বিপুল লুটিয়ে পড়েছিলো রাস্তার ওপরেই। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো বিপুল। Granade -বিস্ফোরণের বিকট শব্দে ভীত, সন্ত্রস্ত, আতঙ্কিত পথচারীদের হৈ হুল্লোর, চেচামেচি, ছুটোছুটি হুটোপুটি, লুটোপুটি এ সবের মধ্যেও পথচারীরাই জ্ঞান হারানো বিপুলকে একটি Clinic -এ পৌঁছে দিয়েছিলো। এ দুর্ঘটনার সংবাদটি কিছু সময়ের মধ্যেই প্রচারিত হতে শুরু করেছিলো সবগুলি Electronic Media তে। আর  Media র সংবাদের মাধ্যমেই বিষয়টি অবহিত হয়েছিলো ওর স্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট Clinic -এ এসেছিলো ওর স্ত্রী। দু’দিন পর জ্ঞান ফিরেছিলো বিপুলের। কিন্তু জ্ঞান ফিরবার পর বিপুলকে স্থানান্তরিত করা হয়েছিলো ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। সেখানে দু’মাস চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিলো ওকে। চিকিৎসা শেষে বিপুল যখন ওর ছোট্ট নীড়টিতে ফিরে এলো তখন ওর ডান পায়ের হাঁটুর ওপর পর্যন্ত অংশটুকু নেইÑকেটে ফেলা হয়েছে ওই অংশটিকে। দু’টি ক্রাচে ভর করে FLAT-এ ফিরেছিলো বিপুল। ঠিক এখান থেকেই ওদের ভাঙ্গাচোরা, কোনোমতে টিকে থাকা দাম্পত্য সম্পর্কটিও একটি আকস্মিক বাঁক নিয়ে পুরোপুরি উল্টোদিকে চলতে শুরু করেছিলো।

 

০২.

পা হারানোর পর থেকে বিপুলের সান্নিধ্য থেকে অনেকটাই দূরে দূরে থাকতো বানী বালা। নিতান্ত প্রযোজনে কাছে ডাকলেও কাছে আসতো না ওর স্ত্রী। কন্যা সন্তানটিকে লালনের ভার অনেক আগেই বানী বালা দিয়েছিলো আলোর মা’কে।  শিশুটির মায়ের মমতামাখা সান্নিধ্যের স্পর্শ প্রাপ্তির আকুলতাকেও যেন কোনোভাবেই গ্রাহ্য করতো না বানী বালা। অফিসের কাজের শেষে নির্দিষ্ট সময়েও আর বাড়ী ফিরতো না। কোনো কোনো দিন অনেক রাত্রিতে বাড়ী ফিরতো। বাড়ীতে ফিরে স্বামীর সঙ্গে কথাও বলতো না। আলোর মা টেবিলে খাবার খাবার দিয়ে গেলে কোনো কথা না বলে কোনোমতে খেয়ে নিয়ে আলাদা একটি কক্ষে বিছানা পেতে শুয়ে পড়তো। শিশুটিকে দেখতে চাওয়া তো দূরের কথা, কোনো প্রশ্নও করতো না সন্তানটিকে নিয়ে। আলোর মা সব বুঝতো কিন্তু কিছু বলতো না। তবে এটি যে একটি চূড়ান্ত সর্বনাশের ইঙ্গিতÑ বুঝতে পারতো আলোর মা। বুঝতে পেরেও কিছু বলতে পারতো না। কারণ বানী বালাকে বোঝাবার মতো কোনো যোগ্যতা অথবা সাহস কোনোটাই ছিলো না আলোর মায়ের। বিপুল সব কিছুই বুঝতো কিন্তু ও-ও কিছু বলতো না। ওর পঙ্গুত্ব ওকে অসহায়ত্বের এমন একটি স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলো যে, যে স্তর থেকে ও ওর স্বামীত্বের অধিকারটুকুকেও ক্ষোভে, দুঃখে, অভিমানে নিজেই অস্বীকার করতে শুরু করেছিলো। এবং এ কারণে সময় প্রবাহের সাথে সাথে স্ত্রীর সংস্পর্শ থেকে নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলো যোজন যোজন দূরে। বুঝতে পারছিলো বানী বালা মল্লিকের সাথে ওকে আর মানায় না। কেন না ওর ভাবনার পূরো ভাণ্ডটিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো ওর পঙ্গুত্ব এ বিষয়টিকে ও মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো। এই পঙ্গুত্ব ওকে একজন অসম্পূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত করেছিলো বলে সব সময় একটি অসহনীয় যন্ত্রণা ওকে তাড়িত করে ফিরতো। আর যেহেতু বিপুল বানী বালার প্রকাশিত আচরণেও বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছিলো যে, বানী বালা ওকে করূণা করছে। যে কোনো কারো কাছ থেকে এই করুণা করণের বিষয়টিকে বিপুল চিরকালই ঘৃণা করে এসেছে। ‘করুণা’- শব্দটিই বিপুলের কাছে একটি চরম নোংরা অনুভূতির প্রকাশ বলে প্রতীয়মান হতো। আর সেই করুণা নিজের স্ত্রীর কাছ থেকে প্রাপ্তিকে ও কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারতো না। স্ত্রীর কথা মনে হলেই ওর দৃষ্টির সম্মুখে এসে দাঁড়াতো সেই করুণার বিন্ধ্যাচলটিÑ যাকে কোনোমতেই বিপুল ওর অনুভবের উপলব্ধি থেকে অপসারণ করতে পারে নি কখনও। এভাবেই ধীরে ধীরে উভয়ের মধ্যে একটি অতি সূত্র অবিশ্বাসের শীর্ণ রেখা স্থুল থেকে স্থুলতর হতে শুরু করেছিলো। শেষ পর্যন্ত এই স্থুলতর বিভাজন রেখাটি ক্রমেই স্থুলতম আকার ধারণ করে দু’জনের মধ্যে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের রেখা টেনে দিয়েছিলো। পৃথক হয়ে গিয়েছিলো দু’জন দু’জনের কাছ থেকে। যদিও কাগজে কলমে নয় তবুও পৃথক তো পৃথকই।

 

এভাবেই কেটে গিয়েছিলো অনেক দিন। আর এই দিনগুলির কোনো মুহুর্তে দু’জনের মুখোমুখি দেখাও হতো না। এ জন্যে প্রকাশ্যে কেউ কাউকে অভিযুক্তও করতো না। যে যার মতো করে সময় কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করতো। তবে দু’জনের কেউই স্বস্তিতে ছিলো না। বিপুলের অস্বস্তি ছিলো এক রকমের আর বানী বালার ছিলো অন্য ধরনের। বিপুল অস্বস্তিতে মুহ্যমান থাকলেÑ সেটি প্রকাশ পেতো ওর আচরণে এবং শারীরিক ভঙ্গিমায় কিন্তু বানী বালার অস্বস্তির প্রকাশ সেভাবে ঘটতো না। অস্বস্তিটিকে ওর বহিরাবরণে সেভাবে মূর্ত না করে বরং কিছুটা উৎফুল্লই থাকবার চেষ্টা করতো বানী বালা। কিন্তু তারপরেও অস্বস্তির একটি খুবই সরু মাত্রার ভাবানুষঙ্গ কখনও কখনও ফুটে উঠতো ওর মুখোমণ্ডলের পরিধিতে আর দৃষ্টির শুন্যতায়। স্বাভাবিক থাকবার প্রাণান্ত চেষ্টা করলেও কখনও কখনও চেষ্টাটি সফল হতো না। মনের অবচেতনাতেই অস্বাভাবিক হয়ে উঠতো যা বানী বালা বুঝতে পারতো না।

 

এ রকমভাবে চলবার মধ্যেই বানী বালা হঠাৎ একদিন মধ্যরাত্রিতে বিপুলের কক্ষে প্রবেশ করলো। বানী বালা জানতো বিপুল ঘুমোয় নি। ওর ঘরে আলো জ্বলছে। সাধারনত অনেক রাত পর্যন্ত বিপুল Laptop -এ কাজ করতো। শেষ রাত্রির দিকে বিছানায় যেতো। ঘরে প্রবেশ করে খোলা দরোজাটি বন্ধ করে দিলো বানী বালা। দরোজা বন্ধ করবার শব্দে Laptop -থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বানী বালাকে ভেতরে আসতে দেখে আবার Laptop -এর Screen -এ-ই দৃষ্টি নিবদ্ধ করে Keyboard -এ হাত রাখলো। বানী বালাকে কিছুই বললো না। বিপুলের বিছানায় বসে বানী বালা-ই প্রথম কথা বললো ‘তোমার সঙ্গে আমার কয়েকটি জরুরী কথা ছিলো, বিছানায় এসো।’বিপুলের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না এবং ও কিছুই বললো না। পূর্বের মতোই Keyboard -এর Button -চাপতে থাকলো। এভাবে কিছু সময় কেটে যাবার পর আবার বানী বালা কথা বললোÑ‘কি হলো, এখানে এসো।’ এবার বিপুল কথা বললো ‘কি বলবে ওখান থেকেই বলো, আমি শুনতে পাবো।’বিপুলের এ কথা শুনবার পর বানী বালা যেন কতকটা নিরুৎসাহিত হলো একই সাথে বিরক্তির চিহ্নও ফুটে উঠলো বানী বালার চেখে মুখে। বানী বালার ধারণা ছিলো এতদিন পর বিপুলের কাছে গেলে বিপুল হয়তো ওর প্রতি কিছুটা হলেও আকর্ষিত হবে। দু’জনের মধ্যে এতদিনের বিকর্ষণের মাত্রা কিছুটা হালকা হলেও হতে পারে। কিন্তু বিপুলের আচরণে সে ধরনের কিছুই লক্ষিত হলো না। বরং আগে যা ছিলো তার চাইতেও যেন খানিকটা বেশী মাত্রার Rigid -বলেই মনে হলো বিপুলকে বানী বালার। কিছু বললো না বানী বালা। বিছানা থেকে উঠে এসে বিপুলের পাশের চেয়ারটিতে বসে বিপুলকে কিছু না বলেই Keyboard -এর Button - চেপে Laptop -টিকে Off -করে দিলো। বিপুল তাকালো বানী বালার দিকে, দৃষ্টি স্থির করলো সরাসরি বানী বালার চোখের ওপর। হঠাৎ করেই বানী বালা যেন চুপসে গেলো। কিছু সময় নিয়ে নিজেকে সামলাবার পর কথা বললো বানী বালা ‘দেখো বিপুল, আমি আর এভাবে তোমার সাথে থাকতে চাই না।’

‘কীভাবে থাকতে চাও ?’বানী বালার চোখের ওপর দৃষ্টি স্থির রেখেই প্রশ্নটি করলো বিপুল। উত্তরে বানী বালা যা বললো তা এ রকমের‘আমি যেভাবে চাই সেভাবে তুমি চাইতে পারবে না। কারণ তোমার একটি পা-ই তো নেই। তাছাড়া তোমার যা ভালো লাগবে সেই ভালো যে আমারও লাগতে হবে এমন কেনো কথা আছে কি ?’

‘অবশ্যই নেই। আর নেই বলেই তোমার ভালোলাগা অথবা স্বাধীনতা নিয়ে আমি তো কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করি নি। তুমি তোমার ভালোলাগাকে প্রশ্রয় দিয়ে পুরোপুরি স্বাধীনভাবেই জীবন যাপন করছো, আমি তো কোনো বাধা দিই নি। তাহলে নতুন করে তোমার ভালো লাগবার প্রশ্ন আসছে কেন ?’

‘আসছে এ কারণে যে, তুমি একটি নিস্প্রাণ মানুষ। তোমার মধ্যে জীবনের কোনো সজীবতা নেই। প্রাণের কোনো চাঞ্চল্য নেই। তুমি সম্পূর্ণতই Introverted. আর এত আত্মকেন্দ্রিক মানুষের সঙ্গে বসবাস করা আমার পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়।’

‘আমি জানি তুমি সর্বাঙ্গ শরীরে শুধু নয়, বরং আত্মাগত দিক থেকেও নির্জলা Extroverted. অনেক কিছু না বুঝলেও অন্ততঃ এটুকু বুঝবার মতো জ্ঞান বোধকরি আমার আছে, তাই আমিও নিজেকে আমার নিজের মধ্যেই গুটিয়ে নিয়েছি।  তাছাড়া একজন পঙ্গু মানুষের কাছে করবার মতো আর থাকতেই বা পারে কী!। তবে হ্যাঁ, আর একটি বস্তুকে বুঝবার মতো ক্ষমতা হয়তো আমার মধ্যে থাকতেও পারে, যদিও আক্ষরিক অর্থে সেটিকে বস্তু বলা যায় না, তবুও................।’

‘সেটি কী ?’

‘অন্যের করুণা প্রাপ্তি। আর এ বস্তুটিকেই আমি ঘৃণা করি সবচাইতে বেশী। আমি নিজেও যেমন কাউকে করুণা করি না ঠিক তেমনি অন্য কারো কাছ থেকে আমি নিজেও কোনো করূণা প্রত্যাশা করি না এবং পেতেও চাই না।’

‘তার অর্থটি কি এ রকমের যে, আমি তোমার পঙ্গুত্বের কারণে তোমাকে করুণা করছি?’

‘সেটি তোমার নিজেকেই তুমি প্রশ্ন করে দেখো।’

Right. সময় হলে নিশ্চয়ই প্রশ্নটি আমি আমার নিজেকে করবো, তবে এখন নয়। এখন এত সময় আমার হাতে নেই। মাত্র দু’টি কথা। তুমি শুনতে না চাইলেও আমাকে বলতে হবেÑ ‘প্রথমÑ আগামীকাল থেকে আমি আর তোমার সঙ্গে বসবাস করবো না। দ্বিতীয়Ñ তিত্লি তোমার কাছেই থাকবে।’ আর কিছু বললো না বানী বালা। নিজে মা হয়ে অতটুকু বয়সের একমাত্র শিশুকন্যাটিকে ওর পিতার কাছে রেখে যেতে ওর মনে যে কোনো কষ্ট অথবা নেতিবাচক কোনো প্রতিক্রিয়া কিছুই ওর চোখ মুখ দেখে মোটেও বোঝা গেলো না। যেন একেবারেই অতি-স্বাভাবিক। কিন্তু এ অতি-স্বাভাবিকতার মধ্যে দিয়েই ওর এভাবে চলে যাবার নেপথ্যেও যে একটি বিশেষ ঘনিভুত উদ্দেশ্য কাজ করেছিলো বানী বালার মননেÑ সে দিকটিকেই ইঙ্গিত করে। উদ্দেশ্যটি এমনও হতে পারে যে, পিতার কাছে থাকা অবস্থায় ভবিষ্যতে যদি কন্যাটির কিছু হয়ে যায় অথবা এমন কি ওর জীবনে যদি Missing -এর মতো বড় কোনো ঘটনাও ঘটে যায় তাহলে সেটির পুরো দায়টি আপনা আপনিই এসে পড়বে বিপুলের ওপর। বানী বালা এ দায় থেকে নিশ্চিন্তে নিজেকে শতভাগ মুক্ত রাখতে পারবে। আসলে বানী বালার Total Planning -মূল Essence -টি ছিলো এখানেই। যে পথে বানী বালা পা বাড়িয়েছিলো সে পথে ওই Essence -টিকে একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহন করা ছাড়া ওর সামনে আর বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিলো না বলেই বিশ্বাস বানী বালার। পরবর্তীতে ওই Essence -টি বানী বালার বিশ্বাস অনুযায়ী পুরোপুরি কার্যকর হয়েছিলো।

 

কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলো বানী বালা। বিপুল আবার Laptop -এর Screen -এ দৃষ্টি স্থির করলো। বানী বালার চলে যাওয়াটি বিপুলকে বিন্দু মাত্র বিচলিত করলো না। বিপুল নিশ্চিত জানতো এ ধরনের একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি কোনো এক সময় ওকে হতেই হবেÑএটি নিশ্চিত। কারণ বিয়ের আগের বানী বালা এবং বিয়ের পরের বানী বালার মধ্যে একটি অতি সূত্র পরিবর্তন লক্ষ করে আসছিলো বিপুল অনেক দিন আগে থেকেই। বিশেষ করে তিত্লি ওর পেটে আসবার পর থেকেই পরিবর্তনের সূত্রতাটি ক্রমাগত স্থুলতার দিকেই ধাবিত হচ্ছিলো যা বিপুলের উপলব্ধিকে মোটেও এড়িয়ে যেতে পারে নি। এর কারণ যতটুকু বুঝতে পেরেছে বিপুল সেটি দীর্ঘ বিলম্বনে সন্তান নেবার বাহ্যিক যে সিদ্ধান্তটি বানী বালা গ্রহন করেছিলো সেটির নেপথ্যের মূল সিদ্ধান্তটি ছিলোÑ ‘সন্তান গ্রহণ না করা।’ শুধু বিপুলকে খুশী করবার জন্যেই বিলম্বে সন্তান গ্রহণের বিষয়টি ওকে জানিয়ে দিয়ে বিপুলের দৃষ্টির সম্মুখে একটি নিখুৎ অভিনয় করেছিলো মাত্র যে অভিনয়টি বিপুল মোটেও বুঝতে পারে নি। কিন্তু বানী বালার এ সিদ্ধান্তে বিপুল মনে প্রাণে খুশি হয়েছিলো, বিশ্বাস করেছিলো বানী বালার সিদ্ধান্তকে। কেটেও গিয়েছিলো অনেক দিন, বানী বালা সন্তান ধারণ করেনি। কিন্তু কোনো একটি Period Miss - হয়ে যাবার বিষয়টির দিকে লক্ষ রাখতে ব্যর্থ হবার কারণে বুঝতে পারে নি বানী বালা ওর পেটে ভ্রæনের সঞ্চার হচ্ছে। যখন জরায়ুতে সন্তানটির ভ্রনটি উদ্গমিত হতে শুরু করেছিলো কেবল তখনই বুঝতে পেরেছিলোÑ ও সন্তান-সম্ভবা। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ভ্রনটিকে Abort -করবার। কিন্তু বিপুল সম্মত না হবার করণেই বানী বালার পক্ষে আর Abortion -এর দিকে এগিয়ে যাবার সাহস হয় নি। অর্থাৎ সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারে নি বানী বালা এককভাবে। আর তখন থেকেই সৃষ্টি হতে শুরু করেছিলো ওদের দু’জনের মাঝের বিশাল ব্যবধানের অতি-সু² প্রাথমিক প্রক্রিয়ার সুত্রতিসু² লক্ষণটি। মাঝে মাঝে এ লক্ষণের ইঙ্গিতটি স্পষ্ট হয়ে উঠতো বানী বালার আচরণে। কখনও কখনও বিপুলকে সহ্যই করতে পারতো না। বিপুলের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করতো। বিপুল কিছু বলতো না। সবই সহ্য করে যেতো। শুধু একটি কারণে বিপুল বানী বালাকে প্রকৃতই একান্ত আপনার করে ভালোবাসতো। বিপুলের এ ভালোবাসাতে কোনো মিথ্যে অথবা প্রতারণা ছিলো না। বিপুলের এই নীরবতা, সহনশীলতা এবং স্বার্থহীন নিটোল ভালোবাসার সুযোগটিকেই গ্রহণ করেছিলো বানী বালা। উভয়ের মধ্যে ভালোবাসা এবং বিয়ের আগে বিপুল মোটেও বুঝতে পারে নি বানী বালার এত অতিমাত্রিক উচ্চাকাক্সক্ষার সামান্যতম ইঙ্গিতটিসহ অবিশ্বস্ত অন্তরের নির্মমতাটিকেও। বিয়ের পর থেকে কিছু কিছু করে বুঝতে শুরু করেছিলোÑ বানী বালা আকাশে উড়তে চায়, বাধভাঙ্গা জোয়ারের পানির মতো সব কিছুকে তছনছ করে দিয়ে ধ্বংসের ভাগার সৃষ্টি করে অনিশ্চিতের দিকে ধাবিত হতে চায় প্রকারান্তরে যা উচ্ছৃখলতারই অন্য নাম- যাকে কখনই প্রশ্রয় দিতে চায় নি বিপুল। বরং যতই বাধা দিয়েছে ততই যেন আরও অধিক মাত্রায় উচ্ছৃখলতায় ডুবে গেছে বানী বালা।

 

সন্তানটি যখন ভূমিষ্ঠ হয়েছিলো তখন প্রথম সন্তানের মুখ দেখে খুশি হলেও কালাতিক্রমণের ধারার সাথে ছন্দোবদ্ধ থেকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছিলো বানী বালা। ধীরে ধীরে সন্তানটির কাছ থেকেও দূরে সরে যাচ্ছিলো ও। এতটাই সরে যাচ্ছিলো যে, কখনও কখনও বুকের দুধও পান করাতো না শিশু সন্তানটিকে বানী বালা। এ কারণে বানী বালার আজকের এ আচরণের জন্যে মোটেও বিষ্ময় বোধ করলো না বিপুল। তাছাড়া এ ধরনের একটি মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার জন্যে নিজেকে অনেক আগে থেকেই তৈরী করে রেখেছিলো বিপুল যা একটু আগেই বলা হয়েছে, তাপরেও বলা হলো শুধু বিষয়টির গভীরতাটিকে একটি বিশেষ মাত্রা দান করবার জন্যে। কারণ বানী বালার ধারাবাহিক আচরণে বিপুলের অন্তরায়নে এ ধারণাটি বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিলো যে, বানী বালা আর বিপুলের কাছে থাকবে না। সে বিবাহ বিচ্ছেদ করেই হোক অথবা না করেই। আর বিপুলেরও সিদ্ধান্ত ছিলো বানী বালার এ ধরনের কোনো প্রস্তাবকে যদি সে প্রস্তাব ওর দিক থেকে কখনও আসেই বিপুল বাধাও দেবে না সমর্থনও করবে না। আরও একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলো বিপুল যদি বানী বালা চলেই যায় এবং পরবর্তীতে ওর জীবদ্দশায় কোনো দিন ওর কাছে ফিরেও আসেÑ বিপুল আর দ্বিতীয়বার ওকে গ্রহণ করবে না। এই সিদ্ধান্তটিতে বিপুল ছিলো Adament. সব দিক বিবেচনা করে এ রকমের একটি ধারণার ওপর বিশ্বস্ত থেকেছিলো বিপুল বানী বালাকে নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাববার অর্থই হলো নিজের সঙ্গে নিজেই প্রতারণা করা।

 

০৩.

ফিরে এলো নিজের FLAT-এ বিপুল। কক্ষে প্রবেশ করে বসলো Laptop -টির সামনে রক্ষিত ওর নির্ধারিত চেয়ারটিতে। Laptop -টির Keyboard -এ ডান হাতটি রাখতে গিয়েও রাখলো না। Laptop -টি ON করলো না। বসে রইলো কিছুক্ষণ। এক সময় উঠে দাঁড়িয়ে ডান দিকের জানালাটির পর্দা সরিয়ে দিয়ে আবার এসে বসলো ওর চেয়ারটিতে। এবার আর Laptop -এ নয়, দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো জানালার টুকরোর ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান শরতের অসীম আকাশের দিকে। শরতের নীল আকাশ জুড়ে পলকা সাদা মেঘের ওড়া উড়ি, সে মেঘের হৃদয় চিড়ে বেরিয়ে এসে আর এক টুকরো দুগ্ধ-সফেদ মেঘের হৃৎপিন্ডের মাঝখানে ছোট ছোট পাখিদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, সুদূর আকাশ থেকে ভেসে এসে জানালার সীমানা ভেঙ্গে শির শিরে মসৃণ বাতাসের বিপুলের শরীরকে স্পর্শ করা, টেবিলে রক্ষিত কাগজের স্তুপকে এলোমেলো করে দেয়া, জানালার গ্রিল গ’লে ছোট্ট একটি পাখির হঠাৎ করেই কক্ষে প্রবেশ করা, প্রবেশ করে সঙ্গীকে খুঁজে না পেয়ে আবার জানালার গ্রিল গ’লে চোখের পলক না পড়তেই বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বাতাসের সাথে একাকার হয়ে যাওয়া এসব দেখতে কী যে ভালো লাগে বিপুলের- প্রকাশ করতে পারে না। অবিরল তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখতেই থাকে বিচিত্র প্রকৃতির অপরূপ লীলা- লাল নীল সবুজের পালা। ভাবে প্রকৃতির এত আনন্দের মেলা থেকে কোথায় হারিয়ে গেলো বানী বালা ? ভাবতে চায় না তবুও যেন আপনা আপনি ভাবনা এসে দু’চোখের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে যায়। এভাবে কত সময় কেটে যায় বুঝতে পারে না বিপুল। হঠাৎ আলোর মায়ের কণ্ঠস্বরে যেন কেঁপে ওঠে বিপুল। Ñ‘মা’মনিরে আনবার যাইবেন না ? সময় তো পার অইয়্যা যায় !’ আলোর মায়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ঘড়ি দেখে বিপুলÑ দশটা কুড়ি মিনিট। এগারোটা তিত্লির স্কুল-ছুটির নির্ধারিত সময়। এর আগেই ওকে তিত্লির স্কুলের সামনে পৌঁছুতে হবে। আর দেরি করে না। ক্রাচ দুটি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।   

 

খুব দ্রুত ফুটপাথের ওপর দিয়ে ক্রাচের মাধ্যমে হেঁটে এসে পৌঁছে যায় বিপুল নির্দ্ধারিত সময়ের আগেই তিত্লিদের স্কুলের সামনে। অসংখ্য নারী পুরুষের ভীড় স্কুলটির সামনে। সবাই স্কুলের ছাত্র, ছাত্রী শিশুদের অভিভাবক অভিভাবিকা। সবাই এসেছে ওদের বাচ্চাদেরকে নিয়ে যেতে। কেবল ছুটির দিন ব্যতীত এটিই এ মুহুর্তের স্কুলের সামনের একেবারেই সাদামাটা চিরাচরিত চিত্র। কারণ শিশুরা একা স্কুলে আসতেও পারে না আবার স্কুল থেকে বাসায় ফিরতেও পারে না। তাই সব শিশুদের অভিভাবক অভিভাবিকাকেই ওদের বাচ্চাদেরকে আনা নেয়ার কাজটি করতে হয়। আর এ জন্যেই এ স্বাভাবিক ভীড়টির সৃষ্টি। আর সাধারণ পথচারীরা কিছুটা কষ্ট হলেও এটিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করে।     

 

তিত্লিদের ক্লাস ছুটি হয়েছে। এখুনি হয়তো ওর ক্ষুদে বান্ধবীদের সাথে তিত্লি বেরিয়ে আসবে। বিপুলের ধারণাই সঠিক হলো বেরিয়ে আসছে তিত্লি কয়েকটি শিশুর সাথে। স্কুলের মূল ফটক পেরিয়ে বাইরে  এসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, এত ভীড়ের মধ্যে ওর বাবার মুখটি খুঁজছে। ওর বাবাও ওকে দেখেছে। একটু এগিয়ে গিয়ে বিপুলই তিত্লিকে ডাকলো ‘মা’মনি আমি এখানে।’ তিত্লিও বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত ভীড় ঠেলে বেরিয়ে এসে বাবার হাতটি চেপে ধরলো। এরপর বাবা ওকে সঙ্গে নিয়ে ফুটপাথের ওপর অপেক্ষাকৃত স্বল্প ভীড়ের একটি স্থানে এসে দাঁড়ালো। খুঁজতে থাকলো একটি ফাঁকা রিকশা। পেয়েও গেলো মুহুর্তেই। তিতলিকে রিকশায় তুলে দিয়ে নিজে উঠবার উপক্রম করতেই একটি নতুন চক্চকে PrivateCar - এসে দাঁড়ালো রিকশাটির পাশে খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে Car -এর দরোজা খুলে একটি শক্ত সমর্থ কালো লোমশ হাত বেরিয়ে এসে নিমেষেই তিতলিকে রিকশা থেকে সেই Car -এর ভেতর  তুলে নিয়েই অসম্ভব দ্রুত গতিতে সম্মুখের দিকে ধাবিত হতে থাকলো Car -টি। চিৎকার করে উঠলো বিপুল। ফুটপাথের ওপর অপেক্ষমান অভিভাবক, অভিভাবিকারাসহ পথচারীরাও চিৎকার করতে শুরু করলো ‘Car -টিকে আটকাও, Car -টিকে আটকাও, বাচ্চাটিকে নিয়ে গেলো’ বলে। কিন্তু ফল কিছুই হলো না। ততক্ষণে Car -টি দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে। একটি অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো স্কুলটির সামনের ফুটপাথ থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত। সাধারণ মানুষের চেচামেচি, হৈ হুল্লোর, অভিভাবকদের আতঙ্কিত চিৎকারের ভেতর দিয়ে নিজ সন্তানটিকে খুঁজে বের করবার প্রাণপাত চেষ্টা, সড়কের ওপর মানুষের পাকানো জটলায় সড়কের দু’প্রান্তের দীর্ঘ যানজট, মুহুর্মুহু আটকে যাওয়া গাড়ীগুলির তীব্র  Hydrolic Horn -এর উৎকট শব্দ সব মিলিয়ে এ যেন এক উদ্ভট অস্বাভাবিকতা। পোকা মাকড়ের মতো কিলবিল করা মানুষগুলির ভয়ানক ভীতি-সঙ্কুল বিষম অস্থিরতা। এ সব ছাপিয়ে বিপুলের বুকভাঙ্গা আর্তনাদ ‘ আমার তিতলিকে এনে দাও, আমার তিতলিকে এনে দাও।’ বিপুলের এই আর্তনাদ ইথারে মিশে গিয়ে সড়কের দু’পাশের Highrise Building -গুলিতে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে কম্পমান শব্দের মতো আবার এ মানুষগুলির মাঝেই ফিরে আসা যেন আরও ভয়ঙ্কর কী এক অবিমৃষ্য অন্ধকারকে অনিবার্য করে তোলার মতো অধিকতর এক ভীতিকর আবহ সৃষ্টির ইন্দ্রজালের প্রতিটি গিটের সাথে অষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে বারবার করে মানুষগুলিকে। আর চরম অসহায়ের মতো বিপুল শুধু হা-হাকার করেই চলেছে। আর কিছুই যে করবার নেই ওর।  

এরই মধ্যে কেউ কেউ এসে ওকে সেই গৎবাঁধা শেখানো বুলির মতো সান্ত¦না দেবার চেষ্টা করছে ‘কী করবেন! শিশুটিকে খুঁজে বের করবার চেষ্টা তো আপনাকেই করতে হবে। আপনি তো ওর বাবা।’ আবার কেউ বা পরামর্শ দিচ্ছেন পুরো বিষয়টি Police -কে Inform -করতে। কেউ বা বলছেন ঘটনার পুরো বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব সকল TV Channel এবং জাতীয় সংবাদপত্রে প্রচার করবার জন্যে। 

 

কিংকর্তব্যবিমূঢ় বিপুল এখন কী করবে অথবা কী করা উচিত কিছুই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। বারবার শুধু মনে হচ্ছে কাকে নিয়ে আর বাঁচবে ও। বেঁচে থাকবার নিভু নিভু প্রদীপের শেষ শিখাটুকুও তো নিভে গেলো। কিছুই তো অবশিষ্ট রইলো না আর !

ইতিমধ্যে মনুষ্য-জ্যাম কিছুটা শিথিল হতে শুরু করেছে। যান চলাচলের গতিও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। চ্যাচামেচি, চিৎকার, হাঙ্গামাও অনেকটাই কমে এসেছে। খুব ধীর গতিতে হলেও পরিবেশটি মোটামুটি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। শুধুই স্বাভাবিক হতে পারছে না বিপুল। দাঁড়িয়ে আছে যেন কোনো ভাস্করের হাতে গড়া স্পন্দন-বিহীন এক ভাস্কর্যের মতো।

 

০৪.

বিপুল ওর শোবার ঘরের টেবিলে রক্ষিত একটি Laptop -এর সামনে একটি চেয়ারে বসে নিবিষ্ট চিত্তে ভেবে চলেছে । Laptop -টি ON করা।  Laptop -এর Screen page -টির তিন চতুর্থাংশ জুড়ে বাংলায় Compose -করা লেখা। লেখার সর্বশেষ শব্দটির ডান দিকে Cursor -টি  Fluctuate -করছে। অবশিষ্ট এক চতুর্থাংশ ফাঁকা। এখনও কিছু লেখা হয় নি। শুধু ভেবেই চলেছে বিপুল। Laptop -এর Screen page -টির ওপরেও দৃষ্টি নিবদ্ধ নেই ওর। কোথায় যে বাঁধন ছেঁড়া নৌকোর নির্ঝরিনীর জল-তরঙ্গে এলোমেলো ভেসে চলা আর মুক্ত আকাশের নীচে দুরন্ত স্বাধীন উড়ে চলা পাখিদের ডানা ঝাপটানোর মতো অবিরাম চিন্তা-তরঙ্গ ওকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে হয়তো নিজেই জানে না বিপুল। এখন রাত্রি কি দিন তা-ও বুঝি জানা নেই ওর। কেবলই মগ্ন চৈতন্য জুড়ে বিরামহীন ভাবনার তুমুল আনাগোনা। রোধ করতে পারছে না কিছুতেই এ দুঃসহ আনাগোনার পদচারণাকে মুহুর্তের জন্যে হলেও। এ যে কী নিদারুণ যন্ত্রণা যাকে কোনো অনুভূতির সাথেই তুলনা করা যায় না।

 

নির্বাক নিশ্চল বিপুল। দৃষ্টি প্রসারিত পূর্বের মতোই। একজন অনুভূতিহীন নিস্প্রাণ মানুষের মূর্তিত আকৃতি নিয়ে যেন নিঝুম প্রান্তরের কোনো এক কোণে নিঃশব্দে বসে রয়েছে বিপুল। কোনো চঞ্চলতা নেই, নেই কোনো চপলতা অথবা দীর্ঘশ্বাসও। একেবারেই বিমূর্ত একটি প্রচ্ছায়া বুঝি। শীত শেষ হয়েছে। বসন্তের আগমনী সঙ্গীতের প্রতিধ্বনি শ্রুত হচ্ছে বিপূলা প্রকৃতির শ্যামলিমা-ঘন অরণ্য-ললনার শাখা প্রশাখায়। পুষ্পে পুষ্পে অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে অনুপম শোভায় শোভিত হতে চলেছে ধরিত্রীর এক সৌম্যকান্তি বাসন্তিকা। কিন্তু এ সবের প্রতি বিন্দু পরিমাণের আগ্রহও নেই বিপুলের। হঠাৎ করে জ্বলে ওটা  দু’টি Energy Bulb -এর তীব্র আলোকে কতকটা যেন চমকে ওঠে বিপুল। তাকায় কক্ষের চারদিকে। আলোর মা কখন এসে কক্ষটির আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে লক্ষ করে নি বিপুল।

 

LAPTOP-এর Screen page -টি অসমাপ্ত অবস্থায় রেখে page -টি Change - করে পরবর্তী পৃষ্ঠায় চলে গেলো বিপুল। Blank Page -টির ওপর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে LAPTOP-টির Key Board -টির ওপর ডান হাতটি রাখলো। শুরু করলো একটি Sketch Creating -এর কাজ। অনেক সময় ধরে অনেক কষ্ট করে Sketching -এর কাজটি শেষ করলো। যখন শেষ হলো তখন SCREEN-এ দেখা গেলো ছোট্ট বাচ্চাদের জন্যে নির্মিত একটি তিন চাকার গাড়ী। গাড়ীটিকে বিভিন্ন Angle -থেকে বার বার করে দেখে নিলো বিপুল। এরপর টেবিলের ওপরে রাখা সিগরেটের প্যাকেট থেকে একটি সিগরেট নিয়ে জ্বালালো বিপুল। সিগরেটটি শেষ করে আবার Key Board -এর ওপর হাত রাখলো। ওর চোখ মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেলো  Sketch -টির ওপর মোটামুটি সন্তুষ্ট ও। এবার Animating -এর পালা।       

 

LAPTOP-টেবিলের Drawer -থেকে একটি বড় আকারের ডায়েরী বের করলো বিপুল। যেটিকে Normally ও LAPTOP Log book -বলে থাকে। Log book -টির কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টিয়ে একটি নির্ধারিত পৃষ্ঠা দেখতে থাকলো বেশ কিছু সময় ধরে যে পৃষ্ঠাটিতে Animating -করণ সংক্রাণÍ বিষয়গুলির দিক নির্দেশনা দেয়া আছে। Log book -টি দেখা শেষ করে ও-টি টেবিলের ওপর রেখে একের পর এক Key Board -এর বিভিন্ন Button -গুলি দ্রæত গতিতে চাপতে শুরু করলো। আর বারবার তাকাতে থাকলো SCREEN-এর ওপর। এভাবে পূরো দু’ঘন্টা অতিক্রান্ত হবার পর থামলো বিপুল। বোঝা গেলো Animating -করণের কাজটি শেষ হয়েছে। আর একটি সিগরেট পান করলো বিপুল। সিগরেট পান শেষে LAPTOP-এর Left Button - চেপে সাইকেলটিকে Move -করতে শুরু করলো। সাথে সাথে সাইকেলটিও সচল হলো। একটি প্রশান্তির শ্বাস গ্রহণ করে চেয়ারের পাশে রাখা ক্রাচ দু’টিতে ভর করে কক্ষটির ভেতর পায়চারি করলো কিছুক্ষণ। পায়চারি শেষে আবার এসে বসলো চেয়ারে। এখন হঠাৎ করেই যেন খুবই ক্লান্ত লাগছে ওর। এর মধ্যেই আলোর মা প্রবেশ করে রাতের খাবার খেতে ডাকলো ওকে। কিন্তু বিপুল শুধু এক কাপ চা চাইলো আলোর মায়ের কাছে। সাথে সাথেই আলোর মা বলে উঠলো ‘অহন চা খাইলে রাইতের ভাত খাইবেন ক্যামনে ? এই না খাইয়্যা, না খাইয়্যাই তো শরীলডির এই হাল বানাইছেন। যে যাইবার হ্যায় তো গ্যাছেই, হ্যার লাইগ্যা নিজে মরবেন ক্যান ? আর মাইয়্যাডি ! আমার বিশ্বাস হ্যায় বাইচ্যা রইছে, বড় অইছে। আমার মনে কয় একদিন না একদিন দ্যাখবেন হ্যায় ঠিকই আইস্যা আপনের সামনে খাড়াইছে। তখন আপনে অরে বুকে জড়াইয়্যা লইবেন। আমি কইয়্যা রাখলামÑ আমার কতা ফলবোই।’কথাগুলি বলে দাঁড়িয়ে থাকলো আলোর মা পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায়। কিন্তু বিপুল আর নতুন কোনো নির্দেশ দিলো না। বরং উল্টো আলোর মা’কেই প্রশ্ন করলো ‘তুমি একসাথে এত কথা বলো কি করে আলোর মা ? তোমার কথা শুনে আমারও ইচ্ছে করে তোমার মতো করে কথা বলতে। কিন্তু পারি না যে !’

‘হ, পারেন না বইল্যাই তো ভিতরে ভিতরে নিজের মরনরে নিজেই ডাইক্যা আনেন। কী লাভ অইবো আপনের এই রকুম কইর‌্যা সুদা সুদাই আজরাইলরে ডাইক্যা আইন্যা ? নিজের মাইয়্যারে দ্যাখবার জন্যেও তো আপনের বাইচ্যা থাকন লাগবো  নাকি ?’ কথা শেষ করলো আলোর মা। বেরিয়ে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই বিপুল বললো ‘চা’টি দিয়ে আমার খাবার এই ঘরে ঢেকে রেখে দিয়ো।’ আর কিছু বললো না বিপুল। অনেক দিন থেকে বিপুলের সংসারে থাকবার কারণেই বিপুলের ওপর বোধকরি আলোর মায়ের একটি প্রচ্ছন্ন অধিকার জন্মে গেছে নিজ সন্তানের মতো। নইলে বিপুলকে এভাবে এতগুলি কথা বলতে পারতো না আলোর মা। সবগুলি কথাতেই একটি অধিকার এবং একটি ক্ষোভের ইঙ্গিত স্পষ্ট। এই ইঙ্গিতটির ভেতরেই যেন আবাল্য মাতৃ স্নেহের একটি অপরূপ স্বভাবজঃ অনুভূতি উপলব্ধ।

 

আলোর মা বেরিয়ে গেলে আবার LAPTOP-এর KEY BOARD-এ হাত রাখলো বিপুল। LAPTOP-টি সচল হলো। তিন চাকার সাইকেলটিও আবার ঘুরতে শুরু করলো SCREEN-জুড়ে। ধীরে ধীরে সেটি রূপ নিলো দু’চাকার একটি বড় সাইকেলে। এবার সাইকেলটি LAPTOP-এর SCREEN-থেকে বেরিয়ে চলতে শুরু করলো বিপুলের FLAT-এর সামনের ছোট ছোট সবুজ তৃণে আচ্ছাদিত প্রশস্ত Lawn -এ। ঘুরতে ঘুরতে একসময় দ্বি-চক্রযানটি রূপান্তরিত হয়ে গেলো একটি Automobile -এ। অর্থাৎ চার চাকার একটি অভিজাত CAR-এ। CAR-টি Drive - করছে একটি পূর্ণাঙ্গ তরুণী যার নাম তিত্লি। পাশে এক ভিনদেশী পুরুষ সম্ভবতঃ British অথবা Irish যার মাথার চুলগুলির অধিকাংশই সাদা, শরীরের বর্ণও উজ্জ্বল ফর্সা। দু’গালের মাংস কিছুটা ঝুলে গেছে। চোখের দৃষ্টিও ম্রিয়মাণ। বোঝা যায় মধ্যাহ্ন পেরিয়ে এখন অস্তাচলের দিকে ধাবমান লোকটি। কিন্তু লোকটি বিপুলের পরিচিত নয়। কখনও কোথাও ওকে দেখেছে বলেও মনে পড়ে না বিপুলের।

বিপুলের মধ্যাহ্নও উত্তীর্ণ হয়ে গেছে এর মধ্যে। বিপুলও এখন মহাসড়কের ওপর দিয়ে ধুকে ধুকে হেঁটে চলা সব হারানো দীন হীন ন্যুব্জ অগণন যাত্রীদের মতো নিতান্তই একজন অতি-সাধারণ যাত্রী। যাদের নিজেদের শরীরের ভারটিই বহন করবার ক্ষমতা নেই বিপুলও ঠিক তাদেরই মতো একজন এখন যেন। উপরন্তু বিপুলের তো একটি পা-ই নেই। 

আসলে বিপুলের ডান পা’টি কেটে ফেলবার পর থেকেই বিপুল অসুস্থ। চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিপুল সুস্থ হলেও মাঝে মাঝে ওই পা’টিতে প্রচণ্ড যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো সে যন্ত্রণা এত বেশী বেড়ে যায় যে, বিপুল সহ্যই করতে পারে না। উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকে, অস্থির হয়ে ওঠে। নিজের ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা হয় তখন ওর। নিজেকে নিজেই নিহত করতে ইচ্ছে করে।          

 

তিত্লি যেদিন Kidnapped -হয়েছে সেদিন থেকেই বিপুল Introverted -হতে শুরু করেছে। এমনিতে বিপুল স্বল্পবাক হলেও কখনই INTROVERTED-ছিলো না। অফিসের সবার সঙ্গেই ওর আন্তরিক এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভেতর আত্মকেন্দ্রিকতার বিন্দুমাত্র ইঙ্গিতও থাকতো না। বিভিন্ন বিষয়ে সতীর্থদের সাথে স্বল্প পরিসরে কথা বললেও সামাজিক এবং রাষ্ট্রিয় বিষয়টি আলোচণায় এলে ও মুক্তবাক হয়ে যেতো। সামাজিক অগ্রগামীতা, মানুষের প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়বদ্ধতা এবং মানুষের চৈতণ্যকে ঋদ্ধ করবার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এসব নিয়ে প্রচুর কথা বলতে যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে উঠতো বিপুল। এক কথায় প্রগতিকে ভালোবাসতো বিপুল। সাধারণ মানুষের কল্যান কামনাই ছিলো ওর সার্বক্ষণিক একমাত্র আরাধ্য। অথচ সেই বিপুল আজ একেবারেই আত্মকেন্দ্রিক। কারো সঙ্গেই তেমন বেশী কথা বলে না, কারো সংস্পর্শেও আসতে চায় না। নিজেকে যেন পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছে একান্তই নিজের মধ্যে কতকটা বোধকরি একটি জড় পদার্থের মতো। রাত্রি আর দিবসের মধ্যে এখন আর কোনো ব্যবধানই খুঁজে পায় না বিপুল। অতীব আশ্চর্য পরিবর্তন হয়েছে ওর।

 

তিত্লি KIDNAPPED-হবার পর Electronic -এবং PRINT MEDIA বিজ্ঞপ্তির আকারে তিত্লির KIDNAPPED-হবার  সংবাদ প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ করেছে বিপুল। যথারীতি চড়ষরপব-কে-ও ওহভড়ৎস- করেছে।  কিন্তু কোনো ফল হয় নি। কেউই তিত্লির বর্তমান অবস্থানের সংবাদটি দিতে পারে নি ওকে। এতে অনেক সময় বিপুলের মনে হয়েছে তিত্লি হয়তো জীবিত নেই। জীবিত থাকলে হয়তো কোনো না কোনো দিক থেকে একটি না একটি সংবাদ নিশ্চয়ই পেতো বিপুল। আর স্বাভাবিকভাবেই এ রকমের একটি অবস্থায় এ ধরনের কিছু কিছু ধারণা নিশ্চিতভাবেই ক্রিয়াশীল হতে থাকে সেই ব্যক্তিটির মননেÑ যে তার সন্তান হারিয়েছে। যদিও এ ধরনের কোনো ধারণা পোষন নিছকই সন্দেহ মাত্র। তবুও বাবা মায়ের মননের গভীরে জন্ম নেয়া তীব্র আতঙ্ক থেকেই এ জাতীয় সন্দেহের উত্থান হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। আর বিপুলের ক্ষেত্রে আতঙ্কটি আরও অধিক মাত্রায় স্থিত হয়েছে এ কারণে যে, তিত্লি KIDNAPPED-হবার দু’বছর পর একটি অসমর্থিত সূত্র থেকে বিপুল জানতে পেরেছিলো যে, অবিকল তিত্লির মতো দেখতে একটি কন্যা শিশুকে কোনো এক IRISH- নাগরিক অনেক টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়েছিলো। দীর্ঘদিন থেকেই লোকটি নাকি ঢাকার পল্লবী এলকার একটি FLAT-এ একাই বসবাস করে আসছিলো। কিন্তু এ সংবাদটির কোনো সত্যতা কোনো বিশ্বস্ত সুত্র থেকে সমর্থিত হয় নি। বহু চেষ্টা করেও সংবাদটির মূল উৎস খুঁজে পায় নি বিপুল। শুধুই লোক মুখে শোনা। যার কাছ থেকে সংবাদটি শুনেছিলো বিপুল সে-ও ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে নিÑ অন্যের মুখ থেকে শুনেছিলো।

০৫.

Nicholas Ivan Mansfeld - একজন রুশ বংশোদ্ভূত IRISH- নাগরিক। বাবা ছিলেন Russ. মা IRISH,    কিন্তু জাতিগতভাবে British. কারণ Ireland- Britain -এরই অধীনস্থ একটি অঙ্গরাজ্য মাত্র। সে দিক থেকে NICHOLAS-এর নাগরিকত্ব Ireland -এর হলেও জাতীয়তা বিবেচনায় British. এবং Britain -সরকারের অনুমোদনক্রমেই  জাতিসংঘেরÑ‘Public RelationsÕ’-বিভাগের একজন প্রতিনিধি হিসেবেই NICHOLAS-এর বাংলাদেশে আগমন। ওর দায়িত্ব বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার ধারা, উপার্জন ক্ষমতা, সামাজিকতাসহ জীবন-ঘনিষ্ঠ বিষয়গুলি সম্পর্কে সত্যনিষ্ঠভাবে অবহিত হয়ে জাতিসংঘকে সঠিক Report প্রেরণ করা। সে সুত্রেই NICHOLAS-কে নিয়মিত এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমন করতে হতো এবং সে সব অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে তাদের জীবন-যাপন এবং জীবনাচরণের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত ছোট বড় সব বিষয়কে গভীরভাবে উপলব্ধি করে লিপিবদ্ধ করতে হতো। NICHOLAS-এর কাজ Monito-এবং সমন্বয় করতো ঢাকার জাতিসঙ্ঘ মিশন। ওই জাতিসঙ্ঘ মিশনের অফিসেই NICHOLAS-কে ওর Report - গুলিকে Submit -করতে হতো। বসবাস করতো ঢাকার একটি অভিজাত এলাকার একটি FLAT-ভাড়া করে।  একা। NICHOLAS-এর স্ত্রী প্রথম সন্তানটি জন্ম দেবার সময়েই মারা যায়। সন্তানটি কন্যা। পাঁচ বছর বয়সেই কন্যাটিও মারাত্মক Bronchitis -এ আক্রান্ত হয়ে আর বাঁচে নি। অকালেই নিভে গেছে টিম টিম করে জ¡েল থাকা ছোট্ট প্রদীপটি।

আর বিয়ে করে নি NICHOLAS. কত বছর হয়ে গেছে এখনও তাড়া করে ফেরে ওই ছোট্ট নিস্পাপ কন্যাটির অনাবিল হাসি মাখা লাবণ্য-ভরা মুখশ্রীটি। বাংলাদেশে এসেও কখনও কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোমন্থন করে চলে NICHOLAS শিশুটির টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতির ভালো লাগাকে। সঙ্গে সঙ্গে আবার বেদনায় বিষণœ বিধুর হয়ে যায়। তখন যেন আর কিছুই ভালো লাগে না, বারবার করে শুধু মেয়েটির মুখটিই দেখতে ইচ্ছে করে। না দেখার যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে NICHOLAS. এই যন্ত্রণা ভীষণভাবে অস্থির করে তোলে ওকে। সহ্য করতে পারে না। এক সময হয়তো থিতিয়ে আাসে যন্ত্রণাÑ চোখ ভরা পানি দু’গাল বেয়ে নেমে আসে। হয়তো চোখের পানিতেই শেষ আশ্রয় খোঁজে ওর সব যন্ত্রণাগুলি। অসহায়ের মতো নির্বাক তাকিয়ে থাকে কক্ষের সিলিংয়ের ঘূর্ণায়মান ফ্যানের গতির দিকেÑ যদিও গতি অদৃশ্য, কখনই দৃশ্যমান হয় না- জানে NICHOLAS তবুও তাকিয়ে থাকেÑ নিরুপায় যে! তারপরেও ও আকাশ কুসুম ভাবনা ভাবতে থাকেÑ যদি কোনোভাবে ওর কন্যাটির মতো একটি শিশু পাওয়া যেত! যদি কোনো মা তার শিশু সন্তানটিকে চিরদিনের মতো ওকে দত্তক দিতো অথবা কোনো পিতা মাতা তাদের শিশুটিকে অর্থে বিনিময়ে ওর কাছে বিক্রয় করতো! IRELAND-এ থাকতে NICHOLAS জেনেছিলো দক্ষিণ এশিয়া অথবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো কোনো দরিদ্র রাষ্ট্রে এ রকমের ঘটনা কখনও কখনও ঘটেই থাকে। তবে Incidentally.

কিন্তু জাতিসংঘ যখন ওকে জনসংযোগ প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশেই উবঢ়ঁঃব- করলো তখন ও খুবই আশান্বিত হয়েছিলোÑ এই ভেবে যে, যদি বাংলাদেশে এসে সে ধরনের একটি সুযোগ ও পেয়ে যায়Ñ স্বপ্নটি ওর পূরণ তো হয়েও যেতে পারে। বাংলাদেশ নিতান্তই একটি দরিদ্র রাষ্ট্রই তো! অথচ যখন ও বাংলাদেশে এসে বসবাস করতে শুরু করলো এবং ভেতরে ভেতরে ও ওর স্বপ্নটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উপায়ের সন্ধান করতে থাকলো তখন ও স্পষ্ট বুঝতে পারলো IRELAND-থেকে যে স্বপ্নের ডানায় ভেসে NICHOLAS বাংলাদেশে এসেছিলো সে স্বপ্নটির পূরোটিই ভ্রান্ত। বাংলাদেশ এখন অনেক উন্নত। হয়তো কোনো এক সময় রাষ্ট্রটি প্রকৃতই দরিদ্র ছিলো কিন্তু এখন আর তা নয়। বাংলাদেশে এখন ওর স্বপ্নের বাস্তবায়নটি ঠিক মধ্যাহ্নিক সূর্যের আলোকে স্বপ্ন দেখার মতোই অর্বাচিনের কাণ্ড। সময়ের বরাতে বেয়ে ধীরে ধীরে ওর মনের গহিন থেকে ওর স্বপ্নের রেখাচিত্রটি স্বাভাবিকভাবেই মুছে যেতে শুরু করলেও একেবারেই মুছে যায় না থেকে যায় নিদারুণএকটি শীর্ণ আকৃতি নিয়ে। আর NICHOLAS ভেসে যেতে থাকে এক অনিশ্চিতির কোনো এক অজানা প্রান্তের দিকে। আর এমনই ভাসমান অবস্থার এক পর্যায়ে কতকটা আকস্মিকভাবেই যেন NICHOLAS-এর দেখা হয়ে যায় বানী বালা মল্লিকের সাথে। এবং এ প্রথম দেখাতেই NICHOLAS-কে ভীষণ রকমের ভালো লেগে যায় বানী বালার। আর এ ভালোলাগার স্বাপ্নিক পথ ধরে অতি দ্রæতবেগে ধাবমান চিন্তা প্রবাহ নামের একটি সতেজ অশ্বের পিঠে চড়ে বানী বালা উর্ধ্বশ্বাসে ধাবিত হতে শুরু করে NICHOLAS-এর সাথে পরিচিত হবার জন্যে। ভুলে যায় ওর স্বামী আছে। ভুলে যায় একটি কন্যা সন্তানের জননী ও।

 

০৬.

বানী বালা মল্লিক। সুন্দরী বলতে সাধারণতঃ যা বোঝায় ও তা নয়। অবশ্য সৈৗন্দর্যের বিষয়টি এক এক জনের কাছে এক এক রকমভাবে অনুভূত হয়। একজনের ভালোলাগার সাথে আর একজনের ভালোলাগার কখনও কিছু মিল থাকলেও মোটেই শতভাগ মিলে যায় না। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে বানী বালাকে একেবারে অসুন্দরীও বলা যাবে না। বানী বালা দীর্ঘদেহী না হলেও খর্বাকৃতও নয়। শরীরের রং শ্যামল হলেও দেহের গঠন সুঠাম এবং বাঁধন অটুট। বক্ষের প্রসারণ এবং স্ফীতি ওর বয়সের আর দশজন তরুণীর থেকে পৃথক রকমের প্রসারিত এবং স্ফীত। এ দু’টির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ওর পশ্চাদ্দেশের লোভনীয় গড়ন। মাথাভর্তি চুল থাকলেও চুলগুলি দীর্ঘ নয় অথবা ও ইচ্ছে করেই দীর্ঘ হতে দেয় নি। মাত্র ঘাড় পর্যন্ত প্রলম্বিত খোলা চুলগুলির ওপর অর্থাৎ মাথার ঠিক মাঝখানে একটি Curved Plastic Band -ওর খোলা চুল গুলির শোভাটিকে যেন অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচাইতে আকর্ষণীয় ওর মুখমণ্ডলটি। ঠোঁট দু’টি পুরু, ভ্রণ দু’টি ঘনকালো, নাকটি টিকোলো। প্রশস্ত ললাটের নীচে দু’টি চোখ অদ্ভুত রকমের বড় এ ধরনের চোখকেই বোধ করি ‘মৃগনয়ন’-বলে আখ্যায়িত করেছিলেন বহু যুগ আগের নারী সৌন্দর্য বিশেষজ্ঞরা। চিবুকটির ঠিক মাঝখানে একটি অতি সূত্র ভাঁজ যা ওর মুখমÐলের সৌন্দর্যের আর একটি বিশেষ মাত্রা। ঠোঁট দু’টির কোনে অস্ফুট একটি অনাবিল হাসির রেখা সব সময়ের জন্যে লেগেই থাকে। এ হাসি প্রসারিত হলে ওর দু’গালে যে দু’টি টোলের আবির্ভাব ঘটে তা এক কথায় অতুলনীয়। এই টোল দু’টির সঙ্গে তুলনা করতে গেলে অনেক যুগ আগের সুদূর পারস্যের একজন বিখ্যাত কবির একটি কবিতার বিশেষ একটি পঙ্তি আপনা আপনিই স্মরণে স্থান করে নেয়Ñ‘তোমার কপোলের একটি তিলের জন্যে আমি গোটা ‘সিরাজ নগরী’ তোমাকে দান করতে পারি।’ বানী বালার হাঁটা চলাও খুবই ছন্দায়িত। দেখলে মনে হয় মেয়েটি যেন মেপে মেপে পায়ে হেঁটে চলেছে। হেঁটে চলবার এই ছন্দের সাথে এক ধরনের সম্পর্ক রেখে ওর কথা বলার ভঙ্গিটিও যেন কোনো রাতে বিহীন ছোট নদীর নিস্তরঙ্গ পানিতে বাতাসের স্পর্শ লেগে সৃষ্টি হওয়া শান্ত ঢেউয়ের মতো ছন্দায়িত হতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ওর অপূর্ব মিষ্টি কণ্ঠস্বরের অদ্ভুত মাদকতা। ওর ছন্দোবদ্ধ হেঁটে চলবার ভঙ্গিমা, কথা বলায় ছোটো ছেটো ঢেউয়ের মতো ভেঙ্গে পড়া কিশোরী মেয়েদের হাতে পরা কাঁচের চুড়ির টুং টাং শব্দের মতো প্রাণ জুড়োনো শব্দ-তরঙ্গ যা ধীরে ধীরে বয়ে চলা অতি শীর্ণ একটি নদী তীরে জন্মিত খুবই ছোট্ট একটি উদ্ভিদের শাখায় বসে ক্ষুদ্র একটি দোয়েলের দোল খাওয়ার অন্তরঙ্গতা মাখা আহবান সব মিলিয়ে যে কোনো পুরুষকে আন্দোলিত করবার জন্যে যথেষ্ট। যা ঘটেছে NICHOLAS-এর বেলায়। বানী বালাকে প্রথম দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলো NICHOLAS-এটি যেমন ঠিক তেমনি এটিও ঠিক যে, বানী বালাকে কখনই NICHOLAS ওর জীবন-সঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করবার চিন্তা করে নি কখনও। কারণ NICHOLAS-এর জীবন, মন সবই বাঁধা রয়ে গিয়েছিলো ওর মৃত স্ত্রীর কাছে। আর প্রথম দেখবার পর সেভাবে ভাবেও নি ও। কিন্তু বিপুলের ক্ষেত্রে ঘটেছিলো ঠিক এর উল্টো। Varsity -জীবনে প্রকৃতই মন, প্রাণ দিয়ে বিপুল ভালোবেসেছিলো বানী বালাকে যে ভালোবাসাকে ও মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত ভুলতে পারে নি। কিন্তু বিয়ের পর বিপুলের এ সামান্য ভালোবাসার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে পারে নি বানী বালা। একটি বৃক্ষের একটি শাখা থেকে অন্য আর একটি বৃক্ষের কোনো শাখায় আবার সে শাখাটি থেকে ভিন্ন আর একটি কোনো পরিচিতি বিহীন বৃক্ষের প্রশাখায় দুর্ণিবারভাবে বিচরণ করে চলেছিলো বানী বালা। কখনই ও স্থির হতে পারে নি কোথাও। ঠিকানা বিহীনভাবে শুধু ছুটতেই থেকেছিলো বানী বালা কেবলই বিত্ত-প্রাচুর্যের উতুঙ্গ আকাক্সক্ষার অনিশ্চিত বিবমিষার পেছনে যার পরিণতি হয়েছিলো বড়ই করুণ। এই হলো মোটামুটি বানী বালার কায়িক এবং মানসিকতার বর্ণনার সামান্য কিয়দাংশ।

বানী বালাকে ওর পেশাগত কারণেই মাঝে মাঝে ঢাকায় থাকা বিভিন্ন রাষ্ট্রের High Commission, Embassy অথবা Consulate Office, জাতিসংঘ মিশনের Office - ইত্যাদিতে যেতে হয়। এই আসা যাওয়ার এক পর্যায়ে কতকটা অনাকাক্সিক্ষত ভাই যেন পরিচয় হয়ে যায় বানী বালার সাথে NICHOLAS-এর BritishHigh Commission - কার্যালয়ে। যদিও এর আগেও ওদের একবার দেখা হয়েছিলো। কিন্তু সে পর্বটি ছিলো প্রথম এবং সীমাবদ্ধ ছিলো শুধুই ওদের দু’জনের সাথে এক অপরের দেখা হওয়ার মধ্যেই। দ্বিতীয় পর্বটিতে এসে ওরা পরিচিতি পেলো দু’জন দু’জনের। আর এ পরিচয়ের সূত্র ধরেই বুঝি অতি সন্তর্পণে ওদের দু’জনের অন্তর্লোকে সঞ্চরণ করতে শুরু করলো প্রেম নামের একটি সর্বনাশী অঙ্কুর বানী বালার ধারণায়। শেষ পর্যন্ত এই অঙ্কুরটি সম্পূর্ণতঃই বিদ্ধস্ত করে দিলো বানী বালার জীবন, সঙ্গে তিতলির হৃৎপিণ্ডেও জ্বালিয়ে দিলো মায়ের প্রতি ঘৃণার লক্ লকে আগুনের শিখা। যে শিখা তিত্লির হৃৎপিণ্ড থেকে কখনই নিভবে না।

 

বানী বালা চরম উচ্চাকাক্সক্ষী এবং অত্যন্ত লোভী স্বভাবের একটি মেয়ে এটি ওর স্বভাবজাত কিন্তু যা ওর বাইরের দিকটি দেখে মোটেও বুঝবার উপায় নেই। এই সামঞ্জস্যহীন এবং অবাঞ্ছিত উচ্চাকাক্সক্ষা আর লোভের আগুন থেকে কোনোভাবেই ও নিজেকে কখনই নিবৃত্ত রাখতে পারবে না। বিত্ত বৈভবের প্রাচুর্যের আকাক্সক্ষায় প্রতিটি মুহুর্ত ও নিমগ্ন থাকতো। যে বিত্ত বৈভবের প্রাচুর্য প্রপ্তি কোনোভাবেই ও বিপুলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে না। কারণ বিপুল একজন নিতান্ত সীমিত আয়ের মানুষ যে আয় দিয়ে বানী বালার আকাক্সক্ষা কোনো দিনই পূরন করতে পারবে না এ বিশ্বাসে ও একেবারেই নিশ্চিত। অথচ বিয়ের আগে বিপুল সম্পর্কে বানী বালার ধারণা ছিলো সম্পূর্ণই বিপরীত। বানী বালার ধারণা ছিলো Masters Completion -এর পর বিপুল এমন একটি কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখবে যে কর্মে অর্থের প্রচুর্য থাকবে সীমাহীন। কিন্তু তা হয় নি এবং হবেও না ভবিষ্যতেও এ জন্যে যে, বিপুল ওর পেশা হিসেবে যে কর্মটিকে বেছে নিয়েছে সে পেশার মাধ্যমে বানী বালার উচ্চাকাঙাক্ষাকে কোনোদিনই বিপুল পূরণ করতে পারবে না। আর ঠিক এ বিশ্বাসকে মোক্ষ জ্ঞান করেই বানী বালা বেছে নিলো NICHOLAS-কে। বানী বালার দৃষ্টিতে NICHOLAS-একজন খুবই উঁচু মাপের মানুষ। এ দেশে জাতিসঙ্ঘের জনসংযোগ বিভাগ কর্তৃক প্রেরিত Mission - এর প্রধান সে। মাসিক বেতনের পরিমাণ অতি উচ্চ স্তরের। ওর বেতনের Payment - হয় Dollar -এর মাধ্যমে। এ দেশীয় টাকার মাধ্যমে নয়। এ সব কিছু বিবেচনা এবং গভীরভাবে উপলব্ধি করবার ভেতর দিয়েই ওর উচ্চাকাক্সক্ষার পাখনা দু’টির আকারও দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বানী বালা NICHOLAS-কে নিয়েই ও নতুন করে ঘর বাঁধবে এবং NICHOLAS-এর সাথেই ও IRELAND-এ চলে যাবে। সিদ্ধান্তটি নেবার পর থেকেই বানী বালা ঘন ঘন NICHOLAS-এর FLAT-এ আসা যাওয়া শুরু করে। বিশেষতঃ বিপুলের ডান পা’টি হারাবার পর থেকে এ আসা যাওয়ার মাত্রাটি হঠাৎ করেই যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। কোনো কোনো দিন রাত দু’টোরও অধিক সময় ধরে NICHOLAS-এর FLAT-এ-ই থেকে যায় বানী বালা। ওদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করলেও যতটা গভীরতর হতে শুরু করে বানী বালার দিক থেকে NICHOLAS-এর দিক থেকে সেটি প্রায় উল্টো। NICHOLAS-বানী বালাকে প্রেমের কথা বললেও মূল উদ্দেশ্যটি ওর ভিন্ন যেটি পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ বানী বালা। বুঝতে পারে নি NICHOLAS-এর মূল উদ্দেশ্যটিকে। অথচ বানী বালা যতই নিজের সবকিছুকে NICHOLAS-এর কাছে সমর্পণ করবার জন্যে এগুতে থাকে NICHOLAS-যেন ততই বানী বালার কাছ থেকে পিছিয়ে আসতে শুরু করে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে। বানী বালা বিষয়টিকে এভাবে ভেবে নেয় ‘বানী বালার সাথে বিয়ের আগে পর্যন্ত হয়তো NICHOLAS-নিষ্পাপ হিসেবে প্রমাণ করতে চায় নিজেকে। বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।’Ñ এ ধারণাতেই স্থিত থাকে বানী বালা।  কিন্তু ভেতরে ভেতরে বদলাতে শুরু করে NICHOLAS- যেটি কোনোভাবেই বানী বালাকে বুঝতে দেয় নি ও। NICHOLAS-এর বুঝতে এতটুকু কষ্ট হয় না যে, যে নারী শুধুই বিত্ত বৈভবের জন্যে নিজের সন্তানকে চিরদিনের জন্যে অপরের হাতে তুলে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না তাকে আর যা-ই হোক বিয়ে করে জীবন-সঙ্গী করা যায় না। বিয়ের পর NICHOLAS-এর সন্তান যদি বানী বালার গর্ভে আসে এবং সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হয় তার ক্ষেত্রেও বানী বালা যে তিত্লির মতো একই আচরণ করবে নাÑ এর নিশ্চয়তা পাবার উপায়ও থাকবে না। তাছাড়া বানী বালার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্যটি বানী বালার প্রতি ছিলো না, ছিলো তিত্লির প্রতি। কেননা NICHOLAS-এর প্রয়োজন ছিলো ওর মৃত কন্যটির অভাব দুর করবার জন্যে ওই কন্যাটির মতো একটি কন্যা শিশু সন্তানের, সন্তানের মা’কে নয়। বানী বালাকে বিয়ে না করবার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে আরও যে কারণটি ছিলো সেটি হলোÑ NICHOLAS-ওর মৃত স্ত্রীর আত্মার প্রতি কোনোভাবেই প্রতারণা করতে পারবে না NICHOLAS. সব মানুষ যেমন সমান হয় নাÑ ‘NICHOLAS-ও তেমনি সবার মতো হতে পারে নি।’ এখানেই NICHOLAS-এর বিশিষ্টতা। এবং এটিকে ওর একটি বিশেষ গুণ হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। যে গুণটি ওকে অনেকের থেকে পৃথক করেছে। আর এ গুণটিই ওর ব্যক্তিত্বে একটি স্বাতন্ত্র্র্য দান করেছে।

 

অনেক দিন ধরে অনেক কথা হয়েছে ওদের দু’জনের মধ্যে। কিন্তু সব কথার মধ্যে ঘুরে ফিরে যে দু’টি Most Vital- - কথা বার বার এসেছে এবং প্রাধান্য পেয়েছে ওদের আলোচনায় সে দু’টি হলো ০১. বাণী বালাকে IRELAND-এ নিয়ে গিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রতিষ্ঠা করে দিতে হবে NICHOLAS-কে। ০২. এর বিনিময়ে বানী বালা ওর শিশুকন্যা তিত্লিকে চির দিনের জন্যে NICHOLAS-এর কাছে হস্তান্তর করবে। অবশ্য একটি শর্ত সাপেক্ষে। শর্তটি হলে ‘তিত্লিকে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে NICHOLAS-এর।’ NICHOLAS- লুফে নিয়েছিলো তাৎক্ষণিকভাবে বানী বালার প্রস্তাবটি। খুবই ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিনিয়ত এ সব কথা আলোচনা করতে করতে, নতুন নতুন পরিকল্পনার চিত্র আঁকতে আঁকতে রাতের অনেকটা সময় পেরিয়ে যেতো।

 

সে দিন নিজের FLAT-এ ফিরতে রাত প্রায় তিনটে বেজে যায়। জেগে থাকে বিপুল, LAPTOP-এ কাজ করে। কিন্তু বানী বালা ফিরে আসবার শব্দ পেয়েও ডাকে না ওকে। বানী বালাও বিপুলের কক্ষে আসে না। এখানে ‘আসে না’- না বলে বরং-‘আসবার প্রয়োজন বোধ করে না’Ñ বলাই বোধকরি বেশী প্রাসঙ্গিক। এভাবে চলতে চলতে পুরো একটি বছর কেটে যায়। এই সময়ের শেষ দিকে একদিন বানী বালা এবং NICHOLAS-এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি কথা হয়। কথার শুরুটিই করে বানী বালা একটি প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে ‘সবই তো ঙশ. তাহলে আমরা Ok IRELAND-যাচ্ছি?’

‘যে দিন তুমি Clearence -দেবে তার দু’সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে। কারণ আমরা ভারত হয়ে যাবো। ভারতীয় ভিসার জন্যে ওই সময়টুকু আমাদের প্রয়েজন হবে। তাছাড়া বিমানের টিকেট প্রাপ্তির Confirmation -পাবারও একটি বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে আবার তিতলিকেও এখানে নিয়ে আসবার ব্যবস্থা করতে হবে।’ কথা শেষ করে NICHOLAS. চোখে মুখে যেন দারুণ একটি উৎফুল্লতা ফুটে ওঠে ওর। কথা বলবার সময় ওর মুখটি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিছিলো NICHOLAS. এবার পুণরায় মুখটি ফিরিয়ে বানী বালার মুখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। বানী বালা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলোÑ‘সে তোমাকে ভাবতে হবে না। সঠিক সময়ে আমিই ওকে এখানে নিয়ে আসবার ব্যবস্থাটি করবো। তুমি অন্যসব প্রয়োজনীয় Arrangement করে ফেলো, যথার্থ সময়ে তিত্লি ঠিক এখানেই থাকবে।’ NICHOLAS বানী বালার এ কথাটি শুনবার জন্যেই এতদিন উন্মুখ হয়েছিলো। আজকে ও নিশ্চিত হলো। মোটেই আর সময় নষ্ট করবে না NICHOLAS. যা করবার বেঁধে দেয়া এ সময়ের মধ্যেই করতে হবে ওকে। প্রস্তুতি শুরু করলো NICHOLAS. পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছুই গুছিয়ে আনলো ও। VISA - পাওয়া গেলো, German Airlines -এর টিকেটও Confirm -হলো। বিমানটি ভারতের দিল্লীতে যাত্রাবিরতি করে London -এর উদ্দেশ্যে দিল্লীর পালাম বিমান বন্দর ত্যাগ করবে।

এসব করতে পুরোপুরি বাইশ দিন সময় লেগে গেলো। জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তা না হলে হয়তো আরও বেশী সময় লেগে যেতে পারতো। নির্ধারিত Flight -টির Flying Date -এর তিনদিন আগে বানী বালার ইঙ্গিতে তিত্লিকে করফহধঢ়-করে ভিন্ন একটি FLAT-এ নিয়ে যাওয়া হলো। সে FLAT-এ আগে থেকে তৈরী থাকা বানী বালার একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি তিত্লিকে গ্রহণ করলো। দু’দিন পর গভীর রাতে ওই FLAT-থেকে বানী বালা নিজেই তিতলিকে ঘুমন্ত অবস্থায় NICHOLAS-এর FLAT-এ নিয়ে এলো। পরদিন রাত এগারোটা তিরিশ মিনিটে ওদের Flight. নির্দ্ধারিত তারিখ এবং সময়ে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে Flight -টি দিল্লীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। সবকিছুই অতি নির্ঝঞ্ঝাটে সম্পন্ন হলো। Print এবং Electronic Media -তে তিত্লির ছবিসহ এত প্রচারণা, চারদিকে এত খোঁজ খবর, গোয়েন্দাদের এত অনুসন্ধান সবকিছুর পরেও নির্বিঘেœ তিত্লি চলে গেলো বাংলাদেশের বাইরে। অবোধ শিশু যাবার আগে পিতার স্পর্শ আর পেলো না। বিঘœহীন হবে ওদের যাত্রাÑ নিশ্চিত ছিলো NICHOLAS. কারণ সবকিছু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চরম গোপনীয়তার ভেতর দিয়ে পূর্বাহ্নেই Arrange করা ছিলো। এ বিষয়টিকে নিয়ে বানী বালা প্রশ্ন করলেও এড়িয়ে গেছে NICHOLAS, কোনো উত্তর দেয় নি ওকে।

 

০৭.

ঠিক সময়েই ওদের বিমানটি LONDON-এর হিথরো বিমান বন্দরে অবতরণ করেছিলো। বিমান বন্দর থেকে ওরা সোজা গিয়ে উঠেছিলো LONDON-এরই একটি অভিজাত হোটেলে। সে হোটেলে ওদের এক মাস থাকতে হয়েছিলো। কারণ ওর বাবা মা কেউই ছিলেন না। অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ওদের মুত্যুর পর NICHOLAS বাবার FLAT-এ-ই বসবাস করে আসছিলো। FLAT-টি IRELAND-এর রাজধানী Belfast -এর একটি অভিজাত এলাকায় স্থিত। কিন্তু প্রথম সন্তানটি প্রসব করবার সময় স্ত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে শিশু সন্তানটিকে নিয়ে একটি চরম সঙ্কটজনক অবস্থায় নিপতিত হয়েছিলো NICHOLAS. ভেবে উঠতে পারছিলো না কিভাবে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানটিকে বাঁচিয়ে রাখবে। শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং Nursing -এর জন্যে দু’জন Nurse -কে রেখে দিয়েছিলো NICHOLAS. এভাইে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিলো শিশুটি। যখন ওর বয়স মোটে পাঁচ বছর ঠিক তখনই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে Bronchitis -এ আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাসটি ত্যাগ করে। পাগলের মতো উ™£্রান্ত হয়ে পড়ে NICHOLAS. কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে না ও। একাই বসবাস করতে শুরু করে বাবার ওই FLAT-টিতে। কেটে যায় বেশ কিছু সময়। এক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহন করেÑ এ দেশে আর নয়। বাইরের কোনো দেশে গিয়ে যদি কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়! ওর সন্তানটির মতো যদি একটি শিশু সন্তান সংগ্রহ করা যায়! এসব এলোমেলো বিদ্ধস্ত ভাবনার মধ্যেই British সরকারের মাধ্যমে জাতিসংঘের একটি লোভনীয় Offer -পেয়ে যায় ও। ঙভভবৎ-টিকে ও ঈশ্বরের আশির্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে। সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশে আসবার। ওর FLAT-টি ওর পরিচিত আর একজন IRISH নাগরিকের কাছে মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে প্রদান করে বাংলাদেশে চলে আসে NICHOLAS.

LONDON-এর হোটেল থেকেই NICHOLAS  ফোনের মাধ্যমে ওর IRELAND-এর FLAT-টিকে Vacate করে দেবার জন্যে যোগাযেগ করে সেই ব্যক্তিটির সঙ্গেÑ যে ওর FLAT-টি ভাড়ার ভিত্তিতে গ্রহণ করেছিলো। লোকটি পনেরো দিনের সময় প্রার্থনা করে। পনেরো দিন পর লোকটি নিজেই ফোন করে NICHOLAS-কে জানিয়ে দেয়Ñ ওর Family shifting-- হয়ে গেছে। NICHOLAS- IRELAND-এ এসে যেন ওর FLAT-টির দায়িত্ব বুঝে নেয়। এই ফোনটি পাবার পর আর সময় অপচয় না করে NICHOLAS, বানী বালা এবং তিত্লি IRELAND-এ চলে যায়। LONDON-এর হোটেলে এক মাস ব্যাপী ওদেরকে অবস্থান করতে হয় শুধু এ কারণেই।

 

IRELAND-এ পৌঁছে নিজের FLAT-টিতেই শুরু হয় NICHOLAS-এর নতুন সংসার জীবন। সাথে থাকে বানী বালা এবং তিত্লি। তিত্লির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়Ñ ‘মাহমুদ নিকোলাস টিটি’। ‘মাহমুদ’- শব্দটিতে বানী বালার যথেষ্ট আপত্তি থাকলেও NICHOLAS-এর ইচ্ছেকেই মূল্য দিতে হয় ওকে। তিতলির নামের সাথে ওর বাবার নামের কোনো অংশ সংযোজিত হোকÑ এটি চায় নি বানী বালা। তবুও এক রকম বাধ্য হয়েই মেনে নিতে হয় বানী বালাকে শেষ পর্যন্ত তিত্লির নতুন নামকরণটি। আর তখন থেকেই তিত্লির ডাকনাম হয়ে যায় ‘টিটি’। এই FLAT-এ-ই NICHOLAS-এর কেটে যায় আঠারোটি বছর। টিটি এখন তেইশ পেরিয়ে চব্বিশ বছরে পা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই টিটি চিকিৎসা বিদ্যায় উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে একটি বেসরকারি -এ চুক্তি-ভিত্তিক কাজও করতে শুরু করেছে। কিন্তু বানী বালা খুব বেশী সময় NICHOLAS-এর সাথে থাকে নি। এক বছরের মাথাতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো NICHOLAS-এর কাছ থেকে। বানী বালা প্রচÐ চাপ সৃষ্টি করেছিলো NICHOLAS-এর ওপর ওকে বিয়ে করবার জন্যে কিন্তু NICHOLAS সম্মত হয় নি। ঢাকায় থাকতেই NICHOLAS-বানী বালাকে এ ধরনের একটি ধারণা দিয়েই রেখেছিলো। কিন্তু বানী বালা ধারণাটিকে কোনো মূল্য দেয় নি বরং খুবই হালকাভাবে গ্রহণ করেছিলো বিষয়টিকে। ভেবেছিলো IRELAND-এ গিয়েই এ সমস্যাটির সমাধান করে নেবে বানী বালা। IRELAND-এ পৌঁছুবার দু’মাস পর থেকেই প্রচেষ্টাটি শুরুও করেছিলো বানী বালা কিন্তু সফল হয় নি। এই সফল না হবার কারণে দু’জনের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই মনোমালিন্যের সৃষ্টি হতো। এই মনোমালিন্যের ফলাফল কখনও কখনও মারমুখি অবস্থানেও চলে যেতো। আর নিজ কন্যা টিটি-ও বঞ্চিত হতো মায়ের স্নেহ মমতা থেকে।

 

বানী বালাকে দেয়া কথা অনুযায়ী ওকে প্রতিষ্ঠা করবার সার্বিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলো NICHOLAS. এবং সফলও হয়েছিলো। একটি Multinational Electronic Company -এর একটি সম্মানজনক পদে বানী বালার চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। NICHOLAS-এর ধারণা ছিলো নিয়মিত কাজে ব্যপৃত থেকে নিজে উপার্জন করলে ওর পর-নির্ভরশীলতা হয়তো কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে। এবং ধীরে ধীরে হয়তো কোনো এক সময় ওর এখনকার মানসিকতার একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও হতে পারে। উভয়ের মধ্যে এ রকম একটি অবস্থা চলবার মাঝামাঝিতে বানী বালা ওরই অফিসের একজন French -নাগরিক কর্মকর্তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এবং NICHOLAS-এর সাথে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটবার এক পর্যায়ে NICHOLAS-কে কিছু না বলেই একদিন সরাসরি ওই FRENCH-নাগরিকের FLAT-এ গিয়ে ওঠে। এবং ওখানেই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

 

পর পর দু’দিন FLAT-এ না ফেরায় তৃতীয় দিন NICHOLAS-ওকে ফোন করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। বারবার ফোন করলেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেÑ অব্যাহতভাবে Ring - হতে থাকলেও অপর প্রান্ত থেকে ফোনটি Receive -হয় না। চতুর্থ দিন আবার ফোন করে NICHOLAS- এদিন প্রথম কলেই পেয়ে যায় বানী বালাকে। বানী বালা সামান্য দু’একটি কথা বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় NICHOLAS-কেÑ ও আর কোনো দিনই NICHOLAS-এর কাছে ফিরে যাবে না। তিত্লির প্রসঙ্গেও কোনো কথা বলে না বানী বালা। কলটি কেটে দিয়ে ফোনটি Off -করে দেয় NICHOLAS. এটিই শেষ কল। আর কোনো দিনই বানী বালাকে ফোন করে নি ও। অন্য কোনোভাবে কোনো খাঁজও করে নি। মা’কে না পেয়ে কয়েকদিন খুব কেঁদেছিলো তিতলি। ধীরে ধীরে ওর কান্নাও এক সময় থিতিয়ে এসছিলো। কান্নার কয়েকটি দিন দিনের সারাটি সময় তিত্লিকে দিয়েছিলো NICHOLAS. একবারেই বাইরে যায় নি, কোনো কাজও করে নি। মায়ের অভাব পিতার ¯েœহ দিয়ে পূরণ করবার চেষ্টা করেছিলো। পেরেছিলোও ও সেটি করতে। এরপর স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে ওকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নির্দ্ধারিত সময়ে স্কুল থেকে নিয়ে আসা সবই করতো NICHOLAS. টিটি অথবা তিতলির মধ্যেই যেন খুঁজে পেয়েছিলো নিজের ছোট্ট শিশুকন্যাটিকে। আর হারাতে চায় নি ওকে। সুদীর্ঘ আঠারো বছরের ¯েœহ, মমতা, শ্রম, মেধা আর পরিচর্যা দিয়ে একজন উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী ডাক্তার হিসেবে গড়ে তুলেছিলো ‘মাহমুদ নিকোলাস টিটি’কে। বয়সের ভারে এখন ন্যুব্জ NICHOLAS. বাবার কাছ থেকে তিতলিকে বিচ্ছিন্ন করবার অপরাধে ও অপরাধী। এই অপরাধ বোধ তিল তিল করে এখন ওকে দগ্ধ করছে। যদিও ও জানে এ অপরাধের কোনো ক্ষমা হয় না তবুও ওর শেষ ইচ্ছেÑ বাংলদেশে গিয়ে তিত্লির বাবার হাতে ওকে তুলে দিয়ে ওর বাবার কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করবে। এতে তিতলির বাবা ওকে ক্ষমা না করে যে শাস্তি দেবেÑ মেনে নেবে NICHOLAS. এতটুকু প্রতিবাদ করবে না। তিতলির বয়স যখন বারো বছর তখনই তিতলিকে ওর মা বানী বালা এবং নিজের সব কথা খুলে বলেছিলো NICHOLAS-নিজের ওপর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং আস্থাশীল থেকে। বলেছিলোÑ ‘শুধু আমার অকালমৃত শিশুকন্যাটির অভাব পূরনের জন্যেই এতবড় একটি অপরাধ আমি করেছিলাম মা। যদি পারো আমার এ চরম অপরাধটিকে তুমি ক্ষমা করে দিও।’Ñ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলো NICHOLAS.Ñ কথাগুলি শুনবার পর NICHOLAS-কে জড়িয়ে ধরে শূধুই কেঁদেছিলো তিত্লি, বাবাকে কিছুই বলে নি। মনে মনে শুধু ওর মা’কে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলো। আর NICHOLAS-কে একজন আদর্শ পিতার স্থানে স্থাপিত করেছিলো। একজন পিতা হিসেবে NICHOLAS-এর সন্তান হারানোর ব্যথাটি অনুভব করতে পেরেছিলো। পাশাপাশি ওর নিজের বাবার সন্তান হারানোর বেদনাটিও অনুভব করতে পেরেছিলো। কিন্তু সবকিছুই ঘটেছিলো ওর মা বানী বালার কারণে। বানী বালার লোভের আগুনে দু’জন পিতার মানসিক অস্তিত্ব দু’রকমভাবে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলো। একজন পিতা সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় পুড়ছিলো। আর একজন অন্যের একটি সন্তান লাভ করলেও চরম অপরাধ বোধে একই রকমভাবে পুড়ে যাচ্ছিলো। টিটিও সে আগুনের দহন থেকে মুক্তি পায় নি।

 

০৮.

প্রায় ছ’মাসের মতো সময় সেই FRENCH-নাগরিকের সঙ্গে ওর FLAT-এই অবস্থান করে বানী বালা। ওদের দু’জনের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। বানী বালার ইচ্ছে ছিলো ঋৎধহপব-এ চলে যাবার এবং ওদের দুজনের মধ্যে সে রকমের একটি সিদ্ধান্তও হয়েছিলো। কিন্তু বিধি বাম। সিদ্ধান্তটি ওদের কার্যকর হয নি। সিদ্ধান্তটি কার্যকর করবার আগেই শুরু হয়ে যায় Britain -এর বিরুদ্ধে IRELAND-এর জাতীয় স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধ। এতদিন যেটি ছিলো শুধু গেরিলা তৎপরতার মধ্যেই সীমায়িত সেটি এখন প্রকাশ্য সম্মুখ-যুদ্ধে রূপ নিলো। কয়েক দিনের মধ্যেই IRELAND-এর চারদিক BRITISH  সেনাবাহিনীর Additional Force - দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো। IRELAND-এর আকাশ প্লাবিত হতে থাকলো  BRITISH  যুদ্ধ বিমানের প্রবল প্রবাহে। চারদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। রাত্রিতে Black-out  শুরু হলো। গোটা IRELAND- যেন ডুবে গেলো ঘোর অন্ধকারে। সন্ধ্যের সঙ্গে সঙ্গেই আলো ঝলমল বিপনী বিতানগুলি বন্ধ হয়ে যাবার কারেণে IRELAND-এর রাজধানী Belfast -এ যেন শুরু হলো কৃষ্ণপক্ষের মধ্যরাত্রিতে শশ্মানের শুন্য প্রান্তর থেকে বাতাসে ভেসে আসা শব্দের বিভীষিকা। কখনও বা ঝাক ঝাক যুদ্ধ বিমানের আকাশ বিদীর্ণ করা গর্জনের আতঙ্ক আবার কখনও বা প্রায় সবগুলি মুল সড়কের ওপর দিয়ে যন্ত্রদানব ট্যাঙ্কের মর্ত কাঁপানো ভয়ঙ্কর ভীতির উৎকট প্রণোদনা। আবার কখনও বা দূর সীমান্ত এলাকায় অব্যাহত শক্তিশালী বোমা বর্ষণের সিংহ-গর্জন। দিন দিন গুজবের মাত্রা অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। সাধারণ জন মানুষের মধ্যে একটি অদৃশ্য শঙ্কার গর্ভ থেকে জন্ম নিতে শুরু করলো সন্দেহ নামের ভয়াবহ বৃক্ষটিরÑ অতি দ্রæত পল্লবিত হতে থাকলো শাখা প্রশাখায়। সব সময় একজন আর একজনকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলো। কেউ কারো কথা শোনে না, কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এ অবস্থা শুধু BELFAST-এ নয় গোটা IRELAND-জুড়েই দৃশ্যমান হতে শুরু করলো।

 

এ অবস্থায় সেই FRENCH-নাগরিকÑ Piere Fransis Dekarte -আর IRELAND-এ বসবাস করা নিরাপদ মনে করলো না। DEKARTEঃব-এর সাথে ঘনিষ্ঠ হবার পর থেকে ব্যাংকে রক্ষিত বানী বালার টাকা, পয়সা DEKARTEঃব-ই উত্তোলন করে বানী বালাকে প্রদান করতো। বানী বালা DEKARTEঃব-কে এতবেশী বিশ্বাস করতো যে, ওর Account - এর Cheque Book -টি-ও DEKARTEঃব-এর কাছেই থাকতো। স্বামী স্ত্রী হিসেবেই বসবাস করতে শুরু করেছিলো ওরা। কিন্তু DEKARTEঃব-বানী বালাকে বিয়ে করে নি। বিয়ের জন্যে বানী বালা চাপ সৃষ্টি করলেও DEKARTEঃব-বিভিন্নভাবে বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছে। বানী বালাকে বিয়ে করে নি। কিন্তু বানী বালা DEKARTEঃব-এর প্রেমে এতটাই ডুবে গিয়েছিলো যে, বুঝঝতেই পারে নি DEKARTEঃব-ওর সাথে প্রতারণা করছেÑ যেমনটি বানী বালা করেছিলো ওর স্বামী বিপুলের সাথে। এমন কি ভিন্ন অর্থে NICHOLAS-এর সাথেও। বানী বালা DEKARTEঃব-এর প্রেমে চূড়ান্তভাবে ডুবে গিয়ে ওর জীবনে ঘটে যাওয়া প্রায় সব Event -কে-ই DEKARTEঃব-এর কাছে দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছিলো। ভেবেছিলো এ সব শুনে DEKARTEঃব-বানী বালাকে আরও গভীর করে পেতে চাইবে। কিন্তু বানী বালার এ হিসেবটি অভ্রান্ত ছিলো না। DEKARTEঃব-এটিকে গ্রহণ করেছিলো বানী বালার চরম দুর্বলতা হিসেবে। এবং স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলো যে, এ ধরনের কোনো মেয়েকে ব্যবহার করা যায় কিন্তু গ্রহন করা যায় না। নিজের প্রতারণার কাছে নিজেই প্রতারিত হয়ে গেলো বানী বালা। নিয়তি বোধকরি একেই বলে।   

 

এদিকে DEKARTEঃব-তার নিজের নেয়া সিদ্ধান্তে অবিচল থেকে বানী বালার পুরো দুর্বলতাটির সুযোগ গ্রহন করে একদিন বানী বালাকে কোনো প্রকার Inform -না করেই বানী বালার হিসেব থেকে সব টাকা উত্তোলন করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো DEKARTEঃব. নিরুদ্দেশ হবার আগের রাতে বেশকিছু টাকা DEKARTEঃব-বানী বালাকে দিয়েছিলো FLAT-এর ভাড়া পরিশোধ করবার নাম করে। সে টাকা গুলিও বানী বালারই ছিলো। বহু খোঁজাখুঁজির পরেও আর ওকে পাওয়া গেলো না। ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে বানী বালা জানতে পারলো কয়েকদিন পূর্বেই বানী বালার ACCOUNT- থেকে প্রায় সব টাকাই DEKARTEঃব- উত্তোলন করে নিয়ে গেছেÑ মাত্র সামান্য ক’টি টাকা ওই ACCOUNT- এ রেখে। আর ঠিক তখনই বানী বালা বুঝতে পেরেছিলোÑ‘জীবনের চরম ভুলটি সে করে ফেলেছেÑ যে ভুলের সংশোধন আর কোনো দিনই হবার নয়।’ সবকিছু জেনে স্থির নিশ্চিত হবার পর  বানী বালাও আর FLAT-এর ভাড়া পরিশোধ করে নি। যেহেতু সে দায় বানী বালার ছিলো না। যে  Cheque-টি দিয়ে DEKARTEঃব- টাকা উত্তোলন করেছিলো সেটি Complete -করাই ছিলো। যেহেতু DEKARTEঃব-এর ওপর বানী বালার অতি বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় টাকা উত্তোলনের কথা বলে DEKARTEঃব- Book -টির একটি Blank -পাতায় পূর্বেই ওর একটি স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে রেখেছিলো। এ রকম একটি অবস্থায় বানী বালা যেন একেবারে প্রায়-উন্মাদে পর্যবসিত হয়ে গিয়েছিলো। অফিসের সহকর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করেছিলো। FLAT-এ এসে অকারণেই চ্যাচামেচি করতো, একা একাই অতি উচ্চৈস্বরে চিৎকার করতো। পুরোপুরি যেন বিদ্ধস্ত হয়ে গিয়েছিলো বানী বালা। 

 

বানী বালার FLAT-এর পাশের FLAT-এ-ই থাকতো BRITISH  সেনাবাহিনীর একজন Captain. লোকটি তরুণ এবং যথেষ্ট Smart. ও ছিলো BRITISH  সেনাবাহিনীর Intelligence -এর সাথে সম্পৃক্ত। অনেকদিন থেকেই লোকটি DEKARTEঃব- এবং বানী বালার সম্পর্কটিকে Observe -করে আসছিলো। লোকটি বানী বালার এ রকম অবস্থা লক্ষ করে একদিন নিজেই বানী বালার অনুমতি নিয়ে বানীবালার কক্ষে প্রবেশ করলো। জানতে চাইলো ওর কী হয়েছে? বানী বালা অকপটে সবকিছু খুলে বললো এবং ওর সাহায্য কামনা করলো। CAPTAIN ওকে আশ্বস্ত করলো। ইতিমধ্যেই IRELAND-এর সাথে Britain-এর গোটা সীমন্ত জুড়ে BRITISH  সেনাবাহিনীর প্রচÐ সম্মুখ-যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিলো। এই যুদ্ধের ভেতর দিয়েই কেটে গেলো আরও বেশ কিছুদিন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই CAPTAIN-ও ডুবে গেলো বানী বালার প্রেমে। আর এই প্রেমের সুযোগ নিয়ে বানী বালা রাজি করালো CAPTAIN-কে ওকে ENGLAND-এ নিয়ে যেতে। CAPTAIN-টি যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেলো। দু’সপ্তাহ পর CAPTAIN-টির সাথে বানী বালা ENGLAND-এ চলে গেলো। কিন্তু যে প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছিলো বনী বালাÑ তা হলো নাা। মাত্র দু’টি রাত LONDON-এর একটি অভিজাত হোটেলে কাটিয়ে বানী বালাকে হোটেলে রেখে WilliumFrederic Martin -অর্থাৎ সেই Young British Captain -টি পুণরায় IRELAND-এ চলে গেলো। দিশেহারা হয়ে পড়লো বানী বালা। তবুও ভাগ্য বলতে হবেÑ DEKARTEঃব-এর দেয়া টাকাগুলি শেষ সম্বল হিসেবে বানী বালার কাছে ছিলো। শুধু ওই সীমিত পরিমাণের টাকাগুলি ছাড়া চরম উচ্চাকাক্সক্ষী এবং প্রবল উন্নাসিক বানী বালা এখন কর্দক-শুণ্য ভিখিরিনী মাত্র। বিশাল এই LONDON-শহরে জীবিকা নির্বাহের জন্যে সামান্য ওই নির্ধারিত অঙ্কের টাকা কতটুকুই বা ভূমিকা পালন করতে পারবে! কিন্তু কোনো উপায়ও আর ওর নেই। এখানে ওর পরিচিতও কেউ নেই। একেবারে পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো বানী বালা। যে হোটেলে CaptainFrederic Martin - ওকে নিয়ে উঠেছিলো সে হোটেলটি থেকে বেরিয়ে এলো বানী বালা। কোনো উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত   অপেক্ষাকৃত নি¤œ মানের একটি হোটেলে ওকে উঠতে হলো। সে হোটেলের বিছানায় শুয়ে সারা রাতব্যাপী শুধু ভাবতেই থাকলো। দু’চোখে একফোটা ঘুম এলো না। এখন কী হবে? টাকা ক’টি ফুরিয়ে গেলে কী করবে ও? একমাত্র  দেহজীবিনীতে রূপান্তরিত হওয়া ছাড়া আর তো কোনো উপায়ই থাকবে না ওর জীবনটিকে বাঁচিয়ে রাখবার। শেষ পর্যন্ত Call Girl -এর পেশাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে হবে ওকেÑ যা ও কখনই পারবে না। তারপরেও বয়সের ভারে শরীরের যে অবস্থা এখন ওর তাতে ও পেশাটিও ওর জন্যে সহনীয় হবে না। এভাবে কিছুদিন চলবার পর আর পারছিলো না বানী বালা। এর মধ্যেই দুশ্চিন্তায়, উত্তেজনায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে ও। সঠিক চিকিৎসাও গ্রহন করতে পারছে না অর্থের অভাবে। অথচ বিধির কী বিধানÑ ওরই কন্যা আজ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত একজন উচ্চ মানের ডাক্তার! আসলে লোভের আগুন যে কোনো লোভীকেই নিস্কৃতি দেয় নাÑ এটি বোধকরি তারই জ্বলজ্যান্ত প্রমান। এ প্রমাণটি থাকবার পরেও, প্রমাণটি সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রমানটির পরিনতি দেখিয়ে দিলেও লোভীরা লোভ থেকে কিছুতেই নিবৃত্ত হয় না, লোভকে সংবরন করতে পারে না বলে সবাই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়Ñ এটি একটি শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষাটি কেউ গ্রহণ করে না। সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে শেষ রাত্রির দিকে দু’টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো বানী বালাÑ যেভাবেই হোক LONDON-এর বাংলদেশ High Commission -এর সাথে আজকেই যোগাযোগ করতে হবে এবং NICHOLAS-কে ফোন করে সবকিছু জানাতে হবে। এ দু’টি ছাড়া ওর সামনে আর ভিন্ন কোনো পথ খোলা নেই। আর যা-ই হোক দেহজীবিনী অথবা Call Girl - হতে পারবে না কিছুতেই। একটি Western Country -তে এসে Call Girl -এর অভিশপ্ত পরিচয় নিয়ে নিজ দেশের পবিত্র মাটিতে ফিরে গিয়ে সে মাটিকে অপবিত্র করতে পারবে না ও কোনো দিন।

 

এতদিন পর এত  আঘাত পেতে পেতে, এত কষ্ট সহ্য করতে করতে এতদিনে বুঝতে পারলো বানী বালাÑ কতটা বিভ্রান্তিতে ডুবে গিয়েছিলো ও। অন্ততঃ বিপুলের মতো স্বামী যার আছে তার তো এত বিভ্রান্ত হওয়া মোটেই উচিত ছিলো না। তাছাড়া বানী বালা তো অশিক্ষিত নয়। তবুও কেন এমন হলো? কী এমন পাপ করেছিলো যে কারণে ওকে এতটা বিভ্রান্ত হতে হলো? এত মূল্য দিয়েও নিজের সবকিছুকেই হারাতে হলো, বিসর্জন দিতে হলো তা-ও নিজের হাতেই। এ কেমন বিধান বিধাতার! অনুশোচনার আগুন ছাড়া আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না আর বানী বালার মনের আয়নায়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলো  যে ভাবেই হোক নিজ দেশে ফিরে গিয়ে বিপুলের কাছে করজোরে ক্ষমা ভিক্ষা করতে হবে ওকে। নিশ্চয়ই বিপুল ক্ষমা করবে ওকে। এসব ভেবে অনেকটাই আশান্বিত হলো বানী বালা। কিছুটা সাহস আর শক্তিও ফিরে পেলো নিজের মনে। এই আত্ম-সান্ত¦নাটিই এখন একমাত্র ভরসার জায়গা বানী বালার। অতি ভোরবেলা এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো জানে না বানী বালা। ঘুম যখন ভাঙলো তখন সকাল আটটা বেজে গেছে। হোটেলের Attendant - সকালের Bed Tea -দিতে এসেও বানী বালার কোনো সাড়া না পেয়ে ফিরে গেছে। দ্রæত বিছানা থেকে উঠে সকালের ক্রিয়াগুলি সম্পন্ন করে Fresh - হয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লো বানী বালা। উদ্দেশ্য বাংলদেশ HIGH COMMISSION. OFFICE. ঙভভরপব-টি ন’টার মধ্যেই শুরু হয়ে যায়। সাড়ে ন’টার মধ্যেই বানী বালা ওখানে পৌঁছে যাবে।

 

হলোও তাই। ন’টার সামান্য কিছু পরে ও পৌঁছে গেলো বাংলদেশ HIGH COMMISSION. OFFICE-এর সামনে। Taxi -এর ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে এগুতে থাকলো HIGH COMMISSION. OFFICE ঙভভরপব-এর মূল ফটকের দিকে। মূল ফটকটি বন্ধ। তবে ফটকের ডান দিকের ঝরহমষব-দরোজাটি খোলা। ভেতরে কয়েকজন Sentry - যথেষ্ট সতর্কভাবে টহল দিচ্ছেÑ দরোজটি খোলা থাকবার কারণে বাইরে থেকেও দেখা যায় এবং ওদের সতর্কতার মাত্রাটিও বোঝা যায়। মূল ফটকের সামনে বেশ কিছুক্ষণ এলোমেলো পায়চারি করলো বানী বালা। পায়চারি করতে করতে একবার হঠাৎ পায়চারি থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। কী যেন ভাবলো সামান্য ক্ষণ তারপর একটি Taxi -ডেকে ফিরে গেলো হোটেলে। কাঁধের ব্যাগটি টেবিলে রেখে কাপড় চোপড় Change - না করেই শুয়ে পড়লো বিছানায়। ভাবতে থাকলোÑ ‘বাংলাদেশ HIGH COMMISSION. OFFICE ঙভভরপব-এ এ মুহুর্তে এ অবস্থায় যাওয়া হয়তো ঠিক হবে না। কারণ সেখানে সব কর্মকর্তা, কর্মচরীই বাঙ্গালী। কেউ কেউ ওর পরিচিতও থাকতে পারে। যদি হিতে বিপরীত হয়ে যায়! ওকে চিনবার পর কোনো কর্মকর্তা অথবা কোনো কর্মচারীর নেতিবাচক প্রশ্নের জালে ও যদি আটকে যায়Ñ তাহলে কী করবে ও সে মুহুর্তে? যদি বেরিয়ে আসতে আর না পারে ওখান থেকে? তখন কি হবে? এ রকম বিভিন্ন চিন্তা করে পরিকল্পনাটি ত্যাগ করলো বানী বালা। সিদ্ধান্ত নিলো NICHOLAS-কেই প্রথম ফোন করবে। যদি ব্যর্থ হয় তখন না হয় ভিন্ন চিন্তা করা যাবে। এ সিদ্ধান্তেই স্থির থাকলো বানী বালা। আর ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো না। ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে হাতে নিলো। ফোনটি হাতে নিয় আবার ভাবলোÑ‘বিপুলের মতো একজন নিস্পাপ আর নিষ্ঠাবান স্বামীকে অগ্রাহ্য করে যে পাপ বানী বালা করেছে সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত তো ওকে করতেই হবে। যদি বিপূল বেঁচে থাকে তাহলে যে শাস্তি বিপুল ওকে দেবে হৃষ্ট-চিত্তে ও তা মেনে নেবে। একটি প্রশ্নও করবে না। বড় ¤্রয়িমাণ আজ বানী বালা।

 

NICHOLAS-এখন অসুস্থ। কয়েকটি জটিল রোগে আক্রান্ত NICHOLAS. রাতদিন সেবা করে চলেছে টিটি। চিকিৎসার দায়িত্বটিও তুলে নিয়েছে নিজ কাঁধে। অসংখ্য Test - করানো হয়েছে ওর । Test -গুলি অন্যান্য সিনিয়র ডাক্তারদের সাথে দিনের পর দিন আলোচনা করেছে টিটি। এবং সে সব আলোচনার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা করে যাচ্ছে টিটি। এবং টিটি নিশ্চিত বাবা ভালো হয়ে যাবে। NICHOLAS-কে টিটি বাবা বলেই ডাকে। তিতলির বারো বছর বয়সে NICHOLAS-যখন তিতলির মায়ের এবং নিজের সম্পর্কে ওকে সবকিছু খুলে বলেছিলো তখন থেকে পেরিয়ে যাওয়া এই এই এক যুগের মধ্যে একটি বারের জন্যেও মায়ের নাম অথবা প্রসঙ্গটি মুখে আনে নি টিটি। টিটির বয়স এখন চব্বিশের কাছাকাছি। বুঝতে পারে NICHOLAS-মা’কে প্রচÐ রকম ঘৃণা করে টিটি। মায়ের ওপর কতটা ক্ষোভ টিটির! এটি হওয়াই বোধকরি স্বাভাবিক। NICHOLAS-খুব সহজভাবে বিষয়টি টিটিকে বোঝাতে চাইলেও বুঝতে চায়নি টিটি কখনও। কোনো কারণে কখনও প্রসঙ্গটি উঠলেও সে প্রসঙ্গটি তখুনি পাল্টেছে টিটি। মোটেই শুনতে চায় নি ওর মায়ের সম্পর্কে সামান্য কিছুটিও।    

 

এত অসুস্থ থেকেও NICHOLAS-এর দুশ্চিন্তা শুধু একটি বৃত্তকে ঘিরেÑ টিটিকে যদি ওর বাবার কাছে ফিরিয়ে দিতে NICHOLAS-ব্যর্থ হয় তাহলে টিটির বাবা কোনো দিনও NICHOLAS-কে ক্ষমা করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর পর NICHOLAS-এর বিদেহী আত্মাও শান্তি পাবে না। এবং NICHOLAS ওর দায় থেকে মুক্তি পাবে না।  এই একটি ভাবনা ভাবতে ভাবতেই NICHOLAS-এর দিবস রজনী শেষ হয়ে যায়। বিছানায় চিৎ হযে শুয়ে আজকেও সে ভাবনাই ভাবছে NICHOLAS. বেড টেবিলে রাখা মোবাইল ফোনটি কিছুক্ষণ বেজে থেমে গেলো। থেমে যাবার পর ফোনটি হতে নিয়ে SCREEN-এ ভেসে ওঠা নামটি দেখে কলটি আর Receive -করলো না NICHOLAS. রেখে দিলো পূর্বের জায়গাতেই। ইচ্ছে হলো না কলটি জবপবরাব- করবার। কিছু সময় পর আবার ফোনটি বেজে উঠলো। বাজতেই থাকলো। NICHOLAS জানে ফোনটি কে করেছে। কিছুটা বিরক্তির সাথেই ফোনটি হাতে নিয়ে SCREEN-টি দেখে কলটি জবপবরাব- করলো। ফোনটি করেছিলো টিটি। দু’জনের মধ্যে যে কথা বার্তা হলো তার সারমর্মটি হলোÑ “বানী বালার জীবন সঙ্কটাপন্ন। ওর বেঁচে থাকবার মতো কোনো অবলম্বন নেই, সম্বলও নেই। সারাটি জীবন ও শুধু ভুলই করে এসেছে, সংশোধন করতে পারে নি নিজেকে। নিজের সন্তানটিকেও ও ভালোবাসতে পারে নি, ওর প্রতি মায়ের কোনো কর্তব্য, দায়িত্বও পালন করে নি। তবুও এ রকম একটি অন্তিম মুহুর্তে এসে তিত্লিকে দেখতে এবং ওর কাছে ক্ষমা চাইতে খুব ইচ্ছে করছে বানী বালার। NICHOLAS-কে-ও দেখতে ইচ্ছে করছে একই সাথে NICHOLAS-এর কাছেও ও ক্ষমা প্রার্থণা করছে। IRELAND-এ ফিরে গিয়ে NICHOLAS-এর কাছে যাবার সামর্থ্যও এখন আর ওর নেই। LONDON-এর বড় বড় সড়ক গুলির ফুটপাথের ওপর বসে থেকে রাত্রি দিন যাপন করা ছাড়া হয়তো আর কোনো উপায়ই থাকবে না আর কয়েকদিন পর। তাছাড়া, IRELAND-এর সাথে ENGLAND-এর যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। অধিকন্তু ও তো বাঙ্গালীÑ কখন যে কী ঘটবেÑ কিছুই বলবার উপায় নেই। ও বড় অসহায়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে শরীর এবং মনের ওপর প্রচÐ চাপের কারণে কয়েকটি রোগেও আক্রান্ত হয়ে পড়েছে ও। একমাত্র সহায় ভেবে NICHOLAS-কে ফোনটি করেছে। NICHOLAS-যেন এখান থেকে ওকে নিয়ে যায়Ñ এটুকুই ওর শেষ মিনতি।”Ñ এরপর ঝর ঝর করে কেঁদেছে বানী বালা। বানী বালার কথাগুলি শুনে NICHOLAS-স্থির থাকতে পারে নি। ওর ঠিকানাটি জানতে চেয়েছে। বানী বালা ওর ঠিকানা জানালে সেই ঠিকানাতেই ওকে চার দিন অপেক্ষা করতে বলেছে। ওই চার দিনের মধ্যে- ‘ÔRichard Becon FrankÕ - নামের একজন BRITISH - নাগরিক ওর ঠিকানায় যাবে এবং ওর সঙ্গে দেখা করে ওকে IRELAND-এ নিয়ে আসবার সব ব্যবস্থা করবে। বানী বালা যেন FRANK-এর সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখে।

 

NICHOLAS-এর এ কথাগুলি শুনবার পর বানী বালা যেন নতুন একটি জীবন প্রাপ্তির আস্বাদ লাভ করলো। সত্যিই NICHOLAS-একজন ‘মানুষ’। অথচ ওই মানুষটিকেই ভুল বুঝে ওর কাছ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছিলো বানী বালা। যেমনটি এসেছিলো বিপুলের কাছ থেকে। কিন্তু বিপুল তো ওর স্বামী, NICHOLAS-কি তাই? না, তা তো তা নয়! ভাবনার কুলহীন পাথারে এ প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পায় না বানী বালা।

 

বানী বালার সাথে কথা শেষ করে NICHOLAS-ফোন করলো FRANK-কে। FRANK- IRELAND-এর রাজধানী BELFASTঃ-এর উত্তরাঞ্চলে স্থিত NICHOLAS-এর Cattle Farm -এর উচ্চ মানের একজন কর্মকর্তা। BELFASTঃ-এর উত্তরাঞ্চলে আরও তিনটি Cattle Farm -রয়েছে ওর। এসব ঋধৎস-এর সবগুলিকেই প্রতিষ্ঠা করেছিলো NICHOLAS-এর বাবা Mikhile Ivan Nicolaevich - জন্মগতভাবে Russian. বিয়ে করেছিলো এক IRISH- তরুণীকে। ওই তরুণীর গর্ভেই জন্মেছিলো Nicolas Ivan Mansfeld. বাবা নিজের নামের সাথে মিল রেখে পুত্রর নামকরণ করেছিলো Nicolas Ivan Mansfeld. বাবা Mikhile Ivan Nicolaevich -এর মৃত্যুর পর একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে সবগুলি CattleFarm এরOwnership -চলে আসে NICHOLAS-এর হাতে। Nicolas - ছাড়া Nicolaevich -দম্পতির আর কোনো সন্তান ছিলো না। সে কারণেই Nicolaevich -এর মৃত্যুর পর Nicolas -ওর বাবার একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে বাবার সব সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী হয়েছিলো আইনী প্রক্রিয়াতেই। একই কারণে Cattle Farm -গুলি ছাড়াও অন্যান্য যেসব বাণিজ্যিক এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিলো ওর বাবার সেগুলিরও আইনগত Ownership - NICHOLAS-অনায়াসেই পেয়ে যায়। এত সম্পদ থাকবার পরেও জাতিসংঘের চাকুী নিয়ে বাংলাদেশে যাবার ওর মূল কারণটি ছিলো ওর মৃত শিশু কন্যাটির মতো একটি শিশুকন্যাকে নিজের মতো করে পাবার প্রত্যাশা। আর কিছুই নয়। একটি শিশু কন্যাকে ও পেয়েছিলোও ঠিকই কিন্তু পাবার পর থেকেই একটি দুর্লঙ্ঘ পাপবোধও কাজ করছিলো ওর মননের গভীরে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। যা কখনই NICHOLAS-বাইরে কারো কাছেই প্রকাশ করে নি। 

 

Farm -এর কাজেই FRANK-কে LONDON-এ পাঠিয়েছিলো NICHOLAS. এক সপ্তাহের মধ্যেই ওর IRELAND-এ ফিরে আসবার কথা। এর মধ্যেই NICHOLAS-এর ফোন পেলো FRANK. ফোনটির মাধমে সব কথা জানিয়ে দিলো ওকে। সময় একটু বেশী লাগলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বানী বালাকে নিয়ে FRANK-যেন NICHOLAS-এর কাছে চলে আসে। আরও বলে দিলোÑ খাবার দাবার, কাপড় চোপড় থেকে শুরু করে যা কিছুর প্রয়োজন ওর সবকিছুর ব্যবস্থাই যেন FRANK-ওকে করে দেয়। 

NICHOLAS-বানী বালার ফোনের মাধ্যমে বলা সবগুলি কথাকেই অগ্রাহ্য করতে পারতো কিন্ত তা করে নি শুধু বানী বালার এই মুহূর্তের মানবিক দিক এবং ওর প্রতি NICHOLAS-এর চরম কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে। কেননা বানী বালা সম্মত না হলে টিটিকে ও কোনোদিনই পেতে পারতো না। তাছাড়া NICHOLAS-তো বানী বালাকে ওর কাছ থেকে তাড়িয়ে দেয় নি। নিজের ইচ্ছেতেই ও NICHOLAS-কে-ও কিছু না বলে চলে গিয়েছিলো। তারপরেও বানী বালার প্রতি NICHOLAS-এর কৃতজ্ঞতাবোধের মাত্রা এতটুকুও হ্রাস পায় নি। এর চাইতে বড় উদারতা আর মানবিকতা কী থাকতে পারে?   

০৯.

পুরো দশদিন পর বানী বালাকে নিয়ে FRANK-ফিরে এলো NICHOLAS-এর কাছে। FRANK-চলে যাবার আগে NICHOLAS-কে শুধু বলে গেলো LONDON-এর সব কাজ নিয়মানুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। এবার NICHOLAS-তাকালো বানী বালার দিকে। দাঁড়িয়ে আছে বানী বালা। দু’চোখেই পানি। বানী বালাকে দেখে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো NICHOLAS-‘এই কি সেই বানী বালা?’ চেনাই যায় না। শীর্ণ শরীর, বড় বড় চোখ দু’টি বসে গেছে কোটরে। আগের দু’গালের সেই মোহমাখা টোল আার নেই। শ্যামল দেহের রং একেবারেই ঘন কালো হয়ে গেছে। বোঝে NICHOLAS-ওর দেহের ওপর দিয়ে কত যে Tornado -বয়ে গেছে এতদিনে! দু’জনের মধ্যে কিছু কথা হলো অতি সাধারণ। শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বললো NICHOLAS-বানী বালাকে। বললোÑ ‘আমার ইচ্ছেÑ তুমি টিটিকে নিয়ে তোমার দেশের মাটিতে গিয়ে টিটির বাবার হাতে টিটিকে তুলে দাও। আমার বিশ্বাস টিটিকে ফিরে পাবার অনন্দে, খুশিতে টিটির বাবা অবশ্যই টিটির সাথে সাথে তোমাকেও গ্রহণ করবে, তোমার সব অপরাধ ক্ষমা করে দেবে। আমার এ অনুরোধটিকে তুমি প্রত্যখ্যান করো না বানী। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলামÑ আমিই বাংলাদেশে গিয়ে টিটিকে ওর বাবার হাতে তুলে দেবো। কিন্তু আমার এ অসুস্থ শরীর এত দূরের Journey - মোটেই সহ্য করতে পারবে না। আমি আরও অসুস্থ্য হয়ে পড়বো। এবং তারপর হয়তো বাঁচবোই না। তুমি আমাকে কথা দাও বানী তুমি টিটিকে নিয়ে যাবে।’Ñ সবগুলি কথা শুনবার পর বানী বালা শুধু বলেছিলোÑ ‘টিটি কি আমার সঙ্গে যেতে রাজী হবে? এত দিন পর ও কি আমাকে চিনতে পারবে? তার চাইতেও বড় কথা এতদিনে এতকিছু ঘটে যাবার পর ও কি আমাকে মা বলে মেনে নিতে পারবে?’Ñ বানী বালার কথা শেষ হলে NICHOLAS-ওকে বলেছিলোÑ ‘সে বিষয়টি দেখবার দায়িত্ব আমার ওপরই থাক না বানী। এখন তুমি Change -করে Fresh - হয়ে কিছু খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম নাও।’Ñ কথা শেষ করে একজন মহিলা Attendant -কে ডাকলো NICHOLAS. Attendant -টি এলে ওকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে বানী বালাকে ওর সাথে যেতে বললো। বানী বালাকে সাথে নিয়ে Attendant -টি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।   

 

ঠিক রাত আটটায় Clinic -এর Duty -শেষ করে বাসায় ফিরে এলো টিটি। এসেই বাবার কক্ষে প্রবেশ করলো। বাবার শরীর নিয়ে কিছু কথা বললো। বাবার জিভ, চোখ এসবও দেখলো। দেখে Pressureএবং Heart bit, Pulse bit -ও Check up -করে নিলো। মোটামুটি সব Possitive. এবার NICHOLAS-কথা বললোÑ‘টিটি যাও, Fresh - হয়ে আমার কাছে একবার এসো। কয়েকটি কথা তোমাকে আমার বলবার আছে।’Ñ আর কিছু বললো না বাবা। টিটি বেরিয়ে গেলো। টিটি বেরিয়ে যাবার পর কিছু সময় ভেবে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলো NICHOLAS. সিদ্ধান্তটি নেবার পর অনেকটা স্বস্তি এবং হালকা বোধ হলো নিজের কাছে NICHOLAS-এর। কিছুক্ষণ পর কক্ষে প্রবেশ করলো টিটি।

 

প্রবেশ করে বাবার মাথার কাছে বসলো। বাবা ওর একটি হাত নিজের হাতে টেনে নিলো। অনেকক্ষণ ধরে অনেক কথা হলো বাবা মেয়ের মধ্যে। এক পর্যায়ে বাবা মেয়ে উভয়ের চোখেই পানি ঝরতে শুরু করলো। দু’জন দু’জনকে ঘনিষ্ঠ আবেগে জড়িয়ে ধরলো। এভাবে কিছু সময় অতিবাহিত হলো। এর পর বাবার চোখে নিজের চোখ রেখে টিটি শুধূ বললোÑ‘তোমার সব কথাই আমি মেনে নিলাম বাবা। আমি আমার দেশে ফিরে যাবো। আমার বাবা বেঁচে আছেন কিনা আমি জানি না। যদি বেঁচে থাকেনÑ আমি ওঁকে নিয়ে এখানেই চলে আসবো। আর বাবাকে একা থাকতে দেবো না। আমার দেশের কথা কত শুনেছি, কলেজে শুনেছি, ভার্সিটিতে শুনেছি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর উন্নয়নের ওপর র্স্যারা যখন ক্লাসে Lecture -দিতেনÑ গর্বে আমার বুক ভরে যেতো। সহপাঠীরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। ক্লাস শেষে বাংলাদেশকে নিয়ে কত প্রশ্ন আমাকে করতোÑ আমি একটি প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারতাম না। কতবড় হতভাগী আমি,  নিজের দেশটিকেই দেখা হয় নি আমার! বাংলার আকাশ, বাংলার জল, বাংলার অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতিÑ যে সব সময়ের জন্যেই পূর্ণ যৌবনা তরুণীর শোভা নিয়ে সবুজ শাড়ী পড়ে আর ললাটে লাল টিপ ধারণ করে প্রতি মুহুর্তে সবাইকে  কাছে ডেকে আপন করে নিতে চায় বলে স্যারদের কাছ থেকে শুনেছি, যে দেশের মুক্ত বিহঙ্গরা ডানা ঝাপটিয়ে মানুষের কাঁধে এসে নিশ্চিন্ত মনে বসে সেই মানুষটিকে আপনার করে নেয়, যে দেশের ¯্রােতহীন ছোটো ছোটো নদীতে আত্মহারা হয়ে সঁতার কাটে আমার দেশের ছোটো ছেটো শিশুরাÑ সেই আমার অপরূপ জন্মভূমিটিকেই দেখা হলো না। এ দীনতা আমি কী দিয়ে পূরণ করবো বাবা? ’Ñ থামলো টিটি। হাত দিয়ে চোখ মুছলো, বাবার চোখও মুছে দিলো। মুছে দিয়ে আবার বললো টিটিÑ‘তোমার নির্দেশে মেনে আমি আমার দেশে অবশ্যই যাবো বাবা কিন্তু মায়ের সাথে আমি কোনো কথা বলবো না।’Ñটিটির কথা শেষ হলো। বাবা শুধু বললোÑ‘সেটি একান্তই তোমার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, এটিতে আমার কোনো মতামত নেই।’Ñ কথা শেষ করে মহিলা Attendant -কে ডেকে বানী বালাকে এখানে পাঠিয়ে দিতে বললো। Attendant -চলে যাবার কিছু সময় পরেই বানী বালা কক্ষে প্রবেশ করে টিটিকে দেখেই যেন আঁতকে উঠলো এবং বুঝতে পালো কত বড়টি হয়েছে ওর তিত্লি। কিন্তু তিত্লির সঙ্গে কথা বলবার সাহস পেলো না। NICHOLAS-ই বানী বালাকে বসতে বললো। ও বসবার পর NICHOLAS-বানী বালাকে প্রশ্ন করলোÑ ‘নিজের কন্যাকে চিনতে পারছো বানী? দেখো কত বড়টি হয়ে গেছে তোমার তিত্লি। ও এখন ডাক্তার, খুব বড় মাপের ডাক্তার। তোমার গর্ব হয় না?’Ñ তিত্লির কাছে যাবার সাহস বানী বালার হয় না। তবুও এগুতে চায় বানী বালা কিন্তু পিছিয়ে যায় তিত্লি। আর এগোয় না বানী বালা। NICHOLAS-কে বলেÑ ‘তিত্লি বেঁচে আছেÑ এর চাইতে বড় প্রাপ্তি আমার আর কী! এখন শুধু বিপুল।’Ñ আর কিছু বলতে পারে না বানী বালা, শুধুই কাঁদতে থাকে। তিত্লি আপাদমস্তক বানী বালাকে নিরীক্ষণ করতেই থাকে আর ভাবেÑ ‘এই মহিলাই আমার মা? আমার ভাগ্যে এ ছাড়া কি আর কিছুই ছিলো না?’

 

NICHOLAS-এর কথায় ভাবনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় টিটি। তাকায় বাবার দিকে। বাবা বলেÑ ‘যাও খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আগামীকাল থেকেই আমি তোমাদের বংলাদেশে যাবার Total Arrengement - শুরু করে দেবো।’ আর কোনো কথা বলে না NICHOLAS. বানী বালা বেরিয়ে গেলেও থেকে যায় টিটি। হঠাৎ একটি প্রশ্ন করে বাবাকেÑ ‘আচ্ছা বাবা, এই মহিলা কি প্রকৃতই আমার মা?’Ñ বাবার উত্তরÑ ‘হ্যাঁ মা, আমি মিথ্যা বলি না। এই মহিলাই তোমার মা। তবে হতভাগী, তোমার মতো একটি মেয়েকে পেয়েও তোমাকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারলো না। এর চাইতে কোনো মায়ের দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? আর একটি কথা মা, একটু বসো’Ñ বলে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ওর Waredrob -টি খুলে একটি সাদা রংয়ের মোটা খাম বের করে সে খামটিকে টিটির হাতে দিয়ে বললোÑ ‘এ খামের ভেতর যা আছে সবই তোমার। আমিই ছিলাম আমার বাবার একমাত্র সন্তান। সে কারণে আমার কোনো উত্তরাধিকারী ছিলো না। IRELAND-এবং LONDON-এ আমার পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত যে সম্পত্তি তার সবই আমি তোমাকে ‘উইল’ করে দিয়েছি। আমার মৃত্যুর পর আমার সকল সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী তুমিই হয়ে যাবে মা। আমার সম্পত্তিগুলি তুমি রক্ষা করো। উইলে সেভাবেই সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে। এ কাগজগুলি যতেœর সাথে খুবই সাবধানে রেখে দিও। এখন থেকে ভাববে এ সম্পদগুলি তোমারই। যাও খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।’ আর কোনো কথা বললো না NICHOLAS. খামটি নিয়ে টিটিও কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো। শুয়ে শুয়ে ভেবে ভেবে বিশ্বাসই করতে পারলো না টিটি যে, এতো বড় হৃদয়ের একজন মানুষ সারা জীবন শুধু দুঃখই পেয়ে গেলো। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো টিটিÑ ‘কেন এমন হয়?’ এই ভাবনার ভেতর দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো টিটিÑ ‘দেশ থেকে ফিরে এসে বাবার সম্পদ বাবাকেই ফিরিয়ে দেবে। বাবা যা ওকে দিয়েছে- কোনো সম্পদ দিয়েই তার মাপ জোক করা যায় না। কোনো সম্পদের সাথে তার তুলনাও হয় না।’

 

১০.

এক যুগেরও অধিক সময় পেরিয়ে যাবার পর আজকে যেন সে অসমর্থিত সংবাদটিকেই সত্য বলে মনে হচ্ছে বিপুলের কাছে। এর কারণÑ কয়েকদিন আগে Internet -থেকে Download -করে ওর Computer- এ IRELAND-এর একজন চলচ্চিত্রকারের নির্মিত একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দেখেছিলো বিপুল। ছবিটি সার্বিয় ভাষায় নির্মাণ করা হলেও Sub-title -করা ছিলো ইংরেজী ভাষায়। ছবিটির নামকরণটিও করা হয়েছিলো ইংরেজীতেÑ ‘AS IF I AM NOT THERE’. ছবিটির নামকরণ থেকেই কিছুটা হলেও বোঝা যায়Ñ যেখানে সে থাকতে চায় নি কী ঘটেছিলো সেখানে ? ছবিটির বিষয়বস্তু ছিলোÑ  বসনীয় যুদ্ধে বসনীয় মুসলিম জনগণের ওপর বর্বর সার্বিয় সেনাবাহিনীর নির্মম, হৃদয়হীন অত্যাচার, নির্যাতন এবং All out-- হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরও মুসলিম জাতিটিকে তারা নিশ্চিহ্ন করতে ব্যর্থ হয়। এবং জাতিটি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। ছবিটির দর্শনটি ছিলো এ রকমেরÑ ‘কোনো জাতির মননে স্বাধীনতার স্পৃহা একবার জাগ্রত হলে মৃত্যুও সে স্পৃহার কাছে তুচ্ছ ধূলিকণা ব্যতীত আর কিছুই থাকে না।’

 

এই দর্শনটিকে চূড়ান্ত প্রেক্ষিত হিসেবে গ্রহণ করে একজন নিষ্পাপ, প্রাণবন্ত এবং উচ্ছল বসনীয়  অবিবাহিতা তরুণী স্কুল শিক্ষিকাÑ বয়স খুব বেশী হলে ২২ থেকে ২৪-এর মধ্যেÑ যার বড় বড় চোখ দু’টি হালকা নীল, সে নীলের আহŸানে বিশাল সমুদ্রের অথৈ নীল জলও বুঝি প্রলুব্ধ হয়। ঠোঁট দু’টি Lipstic -এর প্রলেপ ছাড়াই অদ্ভুত রক্তিম, শরীরের রং উজ্জ্বল ফর্সা, মাথা ভর্তি একরাশ ঘনকালো এলোমেলো চুলের শোভা, শরীরের একটি অংশের সাথে আর একটি অংশের অদ্ভুত নিখুঁত সমন্বয়Ñ সব মিলিয়ে অপূর্ব এক স্বর্গীয় দেবশ্রী যেন- তারই ওপর নোংরা লোভাতুর আর কুৎসিত কুকুরের চাইতেও নিকৃষ্ট কোনো অসভ্য জন্তু, জানোয়ার আর নিকৃষ্টতর কীট পতঙ্গের মতো মানুষ নামীয় কদাকার কীটগুলির দলবদ্ধভাবে রাত দিন একাকার করে দংশন আর ধর্ষণ, নিষ্পেষণ করবার পরেও তরুণীটি শুধু তার মানসিক শক্তির ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত জীবিত থাকে এবং একটি মুক্ত, স্বাধীন শিশুর জন্ম দান করে। অর্থাৎ একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টিকে সম্ভব করে তোলে। সদ্য ভুমিষ্ঠ নিস্পাপ শিশুটিকে সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের একটি প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই সৃষ্টিটি ওর কাছে চরম দুঃখ, বেদনা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, নিপীড়ন, নির্যাতন আর সম্ভ্রম বিসর্জনের বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে হলেও এতে যে নির্বাধ উচ্ছ¡সিত আনন্দের উৎপ্লবন এবং স্বাধীন মুক্ত নিঃস্বাসের ¯িœগ্ধতা দিয়ে নিজ বুক ভরপূর করবার যে অবর্ণনীয় অস্বাদ তা কি আসলেই ভাষা দিয়ে বর্ণনা করা যায় ? যায় না। আর সে কারণেই এটি প্রাপ্তির জন্যে প্রাপ্তি-পূর্ব পর্বের নেপথ্যে যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন তার সবই গরিয়ান হয়ে থাকবে স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে মহিমান্বিত ত্যাগ হিসেবে। আর এটি আরও প্রমানিত করে যেÑ মহান যে কোনো কিছুকে অর্জনের লক্ষ্যে স্থিরভাবে দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখলে এবং সংকল্পে দৃঢ় থাকলে কোনো ত্যাগ কখনই বৃথা যায় নাÑ নিরবধি জ’¡লে জ’¦লে শুধু আলোকই ছড়াতে থাকে বিশাল প্রশান্ত মহাকাশের গায়ে স্থিত তারকা পূঞ্জের মতো। এবং সংকল্প সুদৃঢ় হলে মোক্ষ লাভও যে ত্বরান্বিত হয়Ñ সে বোধটি তো আমরা আমাদের জাতিয় স্বাধীনতা অর্জনের ভেতর থেকেই লাভ করেছি।

 

ছবিটি দেখবার পর বিপুল একদিকে যেমন জাতিটির স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে প্রশান্ত উদার আকাশের মুক্ত নীলিমায় অসংখ্য মুক্ত স্বাধীন পাখিদের বাধাহীন ওড়া উড়ির আনন্দকে নিজের মনের সিংহ দুয়ারে আহŸান শেষে মনের মনিকোঠায় ধারণ করে নিজেই আনন্দের আতিশয্যে আবেগ-উদ্বেলিত হয়ে পড়ে আর একদিকে ঠিক তেমনি অনাকাক্সিক্ষত কোনো এক ভয়ানক আতঙ্কিত উৎকন্ঠায় উৎকন্ঠিত হয়ে ওঠে। তার অন্তরের গোটা শুণ্য প্রান্তরটিতে হঠাৎ করেই যেন কৃষ্ণপক্ষের ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। প্রচÐ রকমের বিভিষিকাময় ভীতির আক্রমণে আক্রান্ত হয়ে পড়ে বিপুল। আবেগে উদ্বেলিত হবার কারণটি ছিলো বিপুল আপাদমস্তক প্রগতিবাদী এবং স্বাধীনতাকামী মানুষ। আর আতঙ্কের উৎকণ্ঠায় উৎকণ্ঠিত হবার নেপথ্যে ওর মানসিকতায় কাজ করছিলোÑ‘তিত্লিকে যেন সেই বসনীয় ছবি ‘AS IF I AM NOT THERE’’-এর তরুণী স্কুল শিক্ষিকার দুর্ভাগ্যকে কোনোভাবেই বরণ করতে না হয়। কেননা IRELAND-ব্রিটেনের একটি প্রদেশ বা রাজ্য হলেও IRISH- জাতিটি তাদের নিঃশর্ত স্বাধীনতার জন্যে BRITISH -সেনাবাহিনীর সঙ্গে সসস্ত্র নিয়মিত সম্মুখ যুদ্ধ না করলেও গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে আসছিলো দীর্ঘদিন থেকে। যেহেতু বিপুল শুনেছিলো একজন IRISH- নাগরিক তিত্লিকে কিনে নিয়েছিলো সেইহেতু ওর মননে একটি বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গিয়েছিলো যে, যদি তিত্লি IRELAND-এ-ই গিয়ে থাকে এবং জীবিত থাকে তাহলে এতদিনে সে একজন পূর্ণাঙ্গ তরুণীর রূপ লাভ করেছে। এ অবস্থায় যদি সে BRITISH -সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে কোনোভাবে পড়ে  যায় তাহলে তার ভাগ্যে সেই বসনীয় শিক্ষিকার মতো নিগ্রহ, নির্যাতন আর নিজের সর্বস্য হারানোর অস্ফুট যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। কারণ এই ভারত উপমহাদেশে দু’শ বছরের BRITISH -শাসনামলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত BRITISH -সেনাবাহিনীর চরিত্র দি¦তীয় বিশ্বযুদ্ধ-কালীন জার্মানীর Chancellor- Adlof Hiteler -এর নাৎসী বাহিনীর অবিকল হিং¯্র চরিত্রের প্রতিবিম্বিত রূপ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। অথচ সে IRISH- নয়, পুরোপুরি বাঙ্গালী। এবং যদি তাই হয় তাহলে পিতা হিসেবে বিপুলের করণীয় কী থাকবে? কিছুই ভেবে উঠতে পারছে না বিপুল। শুধু কালের প্রবাহে কালই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

 

এ ভাবেই কেটে গেছে আরও অনেকটা সময়। প্রায় ছ’বছরেরও ওপর। বিপুলের মাথার চুলগুলি প্রায় সবই সাদা হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে নানা রোগে। বিশেষতঃ মাঝে মাঝে ওর Cardiac Failure--এর বিষয়টি একটি Severe Problem -হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনবার জন্যে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার পরেও চিকিৎসকদের Prescription সবগুলি রোগেরই সৃষ্টি হয়েছে ওর Hypertension থেকে। এ সব রোগের মৌলিক ওষুধ রোগীর Tension-free -থাকা। ওষুধ গ্রহণ করতে হবে তবে ওষুধটি ততটা Potential নয় যতটা Additional. Potentiality টি পুরোপুরি নির্ভরশীল রোগীর Tension-free -থাকবার ওপর। কিন্তু বিপুলের এই মুহুর্তের মানসিক অবস্থান যে পর্যায়ে সে পর্যায়ে থেকে কি Tension-free -থাকা বিপুলের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব? স্ত্রী বিচ্ছেদের পর যে কন্যা সন্তানটিকে অন্ধের যষ্ঠির মতো আঁকড়ে ধরে নতুন করে বেঁচে থাকবার স্বর্নাভ স্বপ্নের জাল তিল তিল করে বুনে চলেছিলো বিপুল সেও তো আজ থেকে প্রায় আঠারো বছর আগে কোথায় মিলিয়ে গেছেÑ জানে না বিপুল। আর কী অবলম্বন আছে ওর বেঁচে থাকবার? স্ত্রী নেই, সন্তান নেই, আর কী আছে ওর? আসলেই কিছু নেই। আর এ না থাকবার গøানি থেকেই জীবনের মূল্যও ওর কাছে হয়ে গেছে একেবারেই শুণ্য। বানী বালার কথা মনে হলে শুধুই চোখ দিয়ে পানি ঝরে। এই মুহুর্তে জীবন মৃত্যুর দোলাচলে  অস্থির হয়েও জীবনের প্রথম প্রেমকেÑ ভুলতে পারে না বিপুল। এক সময় নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলোÑ বানী বালা ওর কাছে ফিরে এলেও ওকে আর গ্রহণ করবে না বিপুল। কিন্তু সন্তানটিকে হারাবার পর আর সে সিদ্ধান্তে অবিচল থাকতে পারে নি ও। সিদ্ধান্তটি থেকে সরে এছিলো বিপুলÑ মনে মনে স্থির করেছিলোÑ যদি কখনও ওর কাছে ফিরে আসে বানী বালাÑ ওকে আর ফিরিয়ে দেবে না বিপুল। যে ক’টি দিন বাঁচবে ওকে নিয়েই বাঁচবে। বানী বালা ভুল করেছে, সংশোধন যদি ও না করে তাহলে স্বামী হিসেবে সেটি তো বিপুলকেই করতে হবে। কিন্তু কোথায় পাবে সে এখন বানী বালাকে? বানী বালা কি বেঁচে আছে? আর থাকলেও সে কি আর ফিরে আসবে ওর কাছে? এই একটি প্রশ্ন বারবার করে উত্থিত হয় বিপুলের মনে। আর তখন স্থির থাকতে পারে না বিপুল। অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। তার ওপর তিত্লির হারিয়ে যাওয়াÑ কী যে যন্ত্রণা আর Tension -সহ্য করতে পারে না বিপুল। এই Tension -নামের অদৃশ্য যন্ত্রণার অঙ্কুরটিকে তো কোনো মানুষই নিজের মননে ইচ্ছে করে রোপন করে না। বিশেষ কিছু কিছু ঘটনার কারণে অঙ্কুরটি তো আপনা আপনিই মানুষের মনের অতলান্তে ধীরে ধীরে উদ্গমিত হতে থাকে। মানুষ ইচ্ছে করলেই তো সে অঙ্কুরটিকে উৎসাদিত করতে পারে না। নিজের স্বভাবজঃ প্রক্রিয়াতেই অঙ্কুরটি উদ্গমিত হতে থাকেÑ যেটি কারো কোনো বাধা মানে না, কোনো প্রতিরোধেরও ধার ধারে না। এটির কাছে মানুষ প্রকৃতই অসহায়Ñ যেমনটি এখন বিপুলের প্রকৃত বাস্তবতা।

 

বাংলাদেশের একমাত্র Specialized Cardiac Hospital-‘SURVIVAL’-এর একটি Cabin -এর একটি বিছানায় চিৎ হয়ে শায়িত মাহমুদ আল হাসান বিপুল। একেবারেই নীরব, স্পন্দনহীন, নিষ্প্রাণ যেন। চোখ দু’টি মুদিত। শ্বাস প্রশ্বাস বইছে তবে খুবই ধীর গতিতে। পূর্বের সে স্বাস্থ্য আর নেই বিপুলের। বিছানার সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে বুঝিÑ হঠাৎ দেখলে তাই মনে হয়। বড় মায়া হয় এ অবস্থায় ওর দিকে তাকালে। তিনজন Nurse -পর্যায়ক্রমিকভাবে সার্বক্ষণিক ওর সার্বিক অবস্থা Monitor -করছে। Monitor -এর তথ্য অনুযায়ী Report - তৈরী করে চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।  যে Electronic Media -তে ও কর্মরত সে Media Authority-B Hospital - কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে ‘SURVIVAL’-এ-ই ওর Free of cost -চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। দেশের বাইরে আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে ‘SURVIVAL’-ই সে ব্যবস্থা করবে। সেটিও-‘ SURVIVAL’-নিশ্চিত করেছে।  এর বাইরে বিপুলের অন্যান্য প্রয়োজনগুলি পূরনের দায়িত্ব Media Authority--পালন করবে। আলোর মা রাতে বিপুলের Cabin -এ-ই থাকে। দিনের বেলা চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী বিপুলের খাবার FLAT-এ গিয়ে রান্না করে FLAT-টি Lock--করে দিয়ে Hospital -এ নিয়ে আসে। Admission -এর আগে কয়েক দিন বিপুলের সাথে আলোর মা Hospital -এ আসা যাওয়া করতো। এখন কারো সাহায্য ছাড়া একাই ও আসা যাওয়া করতে পারে। বিপল এভাবে অসুস্থ হওয়াতে সবচাইতে বেশী আঘাত পেয়েছে আলোর মা। একেবারেই মুষ্ড়ে পড়েছে ও। কিন্তু বিপুলকে কিছু বলতেও পারে না। সান্ত¦না দেবার কোনো ভাষাই আলোর মায়ের জানা নেই। শুধু চোখের পানি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টাÑ এই যা।

 

এখন রাত্রি প্রায় দু’টোর কাছাকাছি। আলো মা Cabin -এর একটি টুলে বসা। আজকে  Nurse -রা খুবই ঘন ঘন Computer -থেকে Report - নিচ্ছে। ডাক্তারদেরকে দেখাচ্ছে। এর মধ্যেই পরপর কয়েকজন ডাক্তার এসে বিপুলের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে গেছে। বলে গেছে আগামী কালকে ওকে আর ICU -তে Shift - করবার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ বিপুলের সঙ্কটকালীন অবস্থাটি কেটে গেছে। কারণ পুরো দু’দিন, দু’রাত নিশ্চেতন থাকবার পর কিছু আগে ওর জ্ঞান ফিরেছে। ধীরে ধীরে খুব নীচু স্বরে কথাও বলতে পারছে। আলোর মা’কে জিজ্ঞাসা করেছে কতদিন থেকে ও এখানে? আলোর মা উত্তর দিয়েছেÑ ‘অনেকদিন।’Ñকথাটি শুনবার পর দু’চোখ বন্ধ করেছে বিপুল। চিকিৎসকরা আশান্বিত হয়ে বলেছেÑ ‘ÔPatient Survive করেছে। ওর ক্রান্তিক সময়টি অতিক্রান্ত হয়েেেছ।’ মুদিত চোখেই ডাক্তারদের কথা শুনেছে বিপুল। কিন্তু ডাক্তাররা আশান্বিত করবার পরেও আলোর মায়ের মুখের ওপর বিম্বিত আধারের প্রলেপটি এতটুকুও কাটে নি। বরং আরও যেন ঘনিভুত হয়েছে। বার বার টুল থেকে উঠে গিয়ে বিপুলের শ্বাস প্রশ্বাসের গতির মাত্রা অনুভব করবার চেষ্টা করেছে। বুকে কান পেতে হৃৎপিÐের শব্দ শুনবার চেষ্টা করেছে। বিপুল চোখ বন্ধ করেই আলোর মায়ের ষ্পর্শ অনুভব করেছে। রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই তবুও আলোর মা যেন মায়ের মমতার ষ্পর্শই বুলিয়ে দিচ্ছে বিপুলের শরীরে। মা বেঁচে থাকলে হয়তো এভাইে ষ্পর্শিত করতো বিপুলকেÑ একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিলো বিপুলের হৃৎপিÐটিকে চুরমার করে দিয়ে। আলোর মা আবার এসে টুলে বসেছে। টুলে বসে নির্বিকার ভাবতে শুরু করেছে। অসুস্থ্য হবার পর থেকে বিপুলের অতীত রোমন্থন করেছে। কতকিছু ভাবনায় এসেছে আবার চলেও গেছে। তারপরেও আলোর মায়ের মনে কেন জানি একটি প্রশ্ন বারবার করে ঘুরে ফিরে উথ্লে উঠেছেÑ ‘বাত্তিটি এ্যাক্করেই চিরকালের মতো নিইভ্যা যাওনের আগে দপ্ কইর‌্যা জ্বইল্যা উঠলো না তো?’Ñ আর ভাবতে পারে নি আলোর মা। আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছেছে।            

 

১১.

BRITISH  Air Ways -এর একটি বিমান বাংলাদেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে এসে পৌঁছেছে আজ রাত এগারোটা তিরিশ মিনিটে। ওই বিমানটিতেই এসেছে বানী বালা এবং তিত্লি। বিমান থেকে নেমে Immigration--এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ওরা সোজা এসেছে ওই Electronic Media Office -এÑ যেখানে বিপুল কাজ করতো। ওই Office -এর দু’একজন Staff - বানী বালাকে চিনতো। তবে  বানী বালার বর্তমান চেহারা দেখে ওরা কিছুটা বিব্রত বোধ করছিলো। কারণ বানী বালার যে প্রতিকৃতিটি ওদের দৃষ্টিতে আটকে ছিলো এতদিন পর সে প্রতিচ্ছবিটি বানী বালার এখন আর নেইÑ ওকে এখন চেনাই যায় না। তবে পূরো পরিচয় দেবার পর ওরা চিনতে পেরেছিলো। ওরাই টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে রাতের মধ্যেই বানী বালা এবং তিত্লিকে Patient -এর সাথে দেখা করবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। এবং ওদের Office -এর গাড়ীতে করেই ওদের দু’জনকে ওই হসপিটালে পৌঁছে দিয়েছিলো। ইতিমধ্যেই চিকিৎসকদের নির্দেশে Patient -এর মুখমÐল থেকে Oxygen Mask -টি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন ও অনেকটাই স্বাভাবিক তবে খুব দুর্বল। এই মুহুর্তে Patient -এর Cabin -এ আলোর মা ছাড়া আর কেউ নেই। বিপুল আলোর মায়ের কাছে এক গøাস পানি খেতে চাইলো। আলোর মা ওকে পানি খাওয়ালো। খালি গøাসটি বেড টেবিলে রেখে আবার নিজের জায়গায় এসে বসলো। বিপুল চোখ বন্ধ করলো। আলোর মা ওর টুলটিতে বসবার পরপরই একজন Nurse-Cabin--এ প্রবেশ করলো। ওর পেছনে আরও দু’জন মহিলা। ওদেরকে Cabin -এ রেখে Nurse -টি চলে গেলো। যাবার আগে মহিলা দু’জনকে শুধু বলে গেলোÑ‘আপনারা খুব কম কথা বলবেন এবং খুবই নীচু কণ্ঠে।’প্রথম বানী বালাই বিপুলকে ডাকলোÑ ‘বিপুল..............।’ Ñ‘কে?’-চমকে উঠে চোখ খুললো বিপুল। বোঝা গেলোÑ বুঝি এ রকম একটি ডাকেরই অপেক্ষা করছিলো বিপুল। চোখ খুলেই প্রশ্ন করলোÑ ‘কে ডাকলো আমাকে?’Ñ বানী বালা কাছে গিয়ে ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললোÑ ‘আমি বানী বালা বিপুল। তোমার স্ত্রী। আমাকে চিনতে পারছো না?’

‘তোমাকে চেনা যাচ্ছে না কেন বানী? কোথায় ছিলে এতদিন?Ñ এ কথার উত্তর না দিয়ে বানী বালা বললোÑ ‘তোমার মেয়ে তিত্লি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে বিপুল, কত বড়টি হয়েছে দেখো। ও এখন অনেক উন্নত মানের ডাক্তার। কাছে ডাকবে না ওকে?’Ñ বিপুল তিত্লির মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর বললোÑ ‘তিত্লি! এত বড়টি হয়েছে এর মধ্যে? কই ও তো আমার কাছে আসে নি কখনও।’Ñ অতীতের স্মৃতি খুঁজে ফিরছে বিপুল। তিত্লির চোখে পানির রেখা। প্রচÐ চেষ্টা করছে সামলাবার। কিন্তু আর পারলো না। কতকটা যেন দৌড়ে গিয়েই বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকলো শব্দহীন। এই প্রচÐ আবেগঘন অবস্থায় বেশ কিছু সময় কেটে গেলো। আলোর মায়ের মুখে ফুটে উঠলো যেন খুবই করুণ একটি হাসির সামান্য এতটুকু সরু রেখা। কী আঁচ করলো আলোর মাÑ সে-ই জানে।

 

বিপুল ওর দু’হাত দিয়ে তিতলির গাল দু’টি চেপে ধরে ধীরে ধীরে ওর মুখটি নিজের চোখের সামনে নিয়ে এলো। দেখতে থাকলো অবাক বিস্ময়ে। দু’চোখ বেয়ে অবিরাম ঝরতে থাকলো পানি। তিত্লির চোখেও পানির বন্যা। পিতা কন্যার এ মুহূর্তের এ দৃশ্যটি শুধুই অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করবার, বর্ণনা করবার নয়। এ অবস্থাতেই হয়তো আবেগাপ্লুত হয়ে খুবই কষ্ট করে বিপুল বললোÑ ‘বড় অসময়ে তুই এলি মা। আমার হাতে সময় যে আর নেই। শুধু একটি অনুরোধÑ “আমি তোর মা’কে ক্ষমা করে দিয়েছি। তুইও ওকে ক্ষমা করে দিস।” ও যে তার মা।’Ñ এ কথাগুলি বলবার সময় বিপুলের হাত দু’টি মৃদু মৃদু কাঁপছিলো, এবার একেবারেই শিথিল হয়ে তিত্লির কোলের ওপর পড়ে গেলো। স্থির হয়ে গেলো ওর শরীর। চোখ দু’টি খোলাই থাকলো। চাপা চিৎকার করে উঠলো তিত্লিÑ ‘বাবা!’

 

বাবা আর ফিরে এলো না। চিরদিনের জন্যে বিক্ষত হয়ে গেলো তিনটি জীবন।  

 


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান