সংবাদপত্রের লক্ষ্যঃ লক্ষ্যের চরিত্রহীনতা  - সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক
$post->title

একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের ভিত, চরিত্র এবং লক্ষ্য তিনটি বিষয়ে উপাদানভিত্তিক অনিবার্যতা সংক্রান্ত প্রেক্ষাপট আলোচনা এবং বিশ্নেষণ করলে Ultimately যা দৃশ্যমান হয় এবং গ্রাহ্যতার দাবী রাখে- তা হলো সংবাদপত্র। যেহেতু সংবাদপত্রের মৌলিক ভূমিকা একটি জাতি গঠনের ক্ষেত্রে চিন্তাপ্রবাহের acute angle থেকে অবশ্যই infinite, সেইহেতু কল্যাণমুখী গণতন্ত্রায়নকে রাষ্ট্রের ভিত্তি ধরে কল্পনা করলে সংবাদপত্র নিশ্চিতভাবেই একটি অপরিহার্যতা।

 

   এ্যারিস্টটল রাষ্ট্রকে কল্পনা করেছেন এভাবে The state is- A union of families and villages having for it’s end a perfect and self sufficient lifeএবং অধ্যাপক বার্জেস রাষ্ট্রকে কল্পনা করেছেন- Aparticular portion of mankind viewed as an organized unity - এভাবে। আমরা যদি দুটি সংজ্ঞাকেই সমান্তরালভাবে পাশাপাশি স্থাপন করি তাহলে দেখব দুজনের দুটি সংজ্ঞাতেই একটি বিষয় স্থিরীকৃতভাবে পারস্পরিক সংশ্লিষ্ট এবং দ্বিতীয়টি প্রথমটির অপরিহার্য শর্ত।

Self sufficing life -এর সঙ্গে Organized unity -এর একটি ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে এবং একে অপরের পরিপূরকও বটে। এখন প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে self sufficing life - এর সঙ্গে Organized unity - এর সম্পর্ক  কী এবং কোথায?

 

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ব্যতীত মানুষের পক্ষে বসবাস করা সম্ভব নয়। প্রাণী হিসেবে মানুষের ক্ষেত্রে যা Congenial . সেদিক থেকে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়- অধিকের সমন্বয়ই যেখানে সমষ্টির সৃষ্টি এবং সমষ্টি থেকেই যেখানে সমাজ নামীয় ধারণাটির মৌলিক উৎপত্তি সেখানে উভয়েই যে উভয়ের পরিপূরক তা প্রশ্নাতীত। মানব সমাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিশেষ যে উপাদানটি আবশ্যিক তা হলো সাধারণ লক্ষ্য। অন্যান্য প্রাণীভিত্তিক সমাজ মানব সমাজকে যা অবশ্যম্ভাবীরূপে পৃথক করেছে। এখন এই সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে সংগ্রাম অব্যাহত প্রচেষ্টা তার জন্যই প্রয়োজন সার্বজনীন মতামতের অভিন্নতা-যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জন্য সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত শক্তির উৎস। আর এখানেই  Organized unity- এর অবস্থান যা সর্বকালে সকল অবস্থাতেই অবিমিশ্রভাবে self sufficing lifeনির্মাণের জন্যে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ভিত রচনার ক্ষেত্রে অবিসংবাদী ভূমিকা পালন করে।

 

   অভঙ্গুর ঐক্যবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা ছাড়া সাধারণ লক্ষ্য অর্জন যেমন সম্ভব নয় পাশাপাশি সাধারণ লক্ষ্য অর্জিত না হলে স্বয়ংসম্পন্ন জীবন নির্মিতিও অসম্ভব। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি পর্যালোচনা করলেও বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। স্বাধীনতাকে সাধারণ লক্ষ্য ধরে সমগ্র জাতি ইস্পাতদৃঢ় ঐক্যের বন্ধনীতে আবদ্ধ হয়েছিল বলেই হিমালয় সাদৃশ্য তুমুল প্রতিবন্ধকতাকে লঙ্ঘন করেও স্বয়ংসম্পন্ন জীবনের পূর্ণ অভিব্যক্তির জান্ত্যব প্রতিভূ হিসেবে মহান স্বাধীনতাকে অর্জন করে আবেগের ভাবালুতায় নয় বরং বাস্তবিক অর্থেই একটি অবিস্মরনীয় ইতিহাস সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিল।

এই যে ইতিহাস সৃষ্টি, এই যে স্বাধীনতা অর্জন, অর্জনের জন্য নিরঙ্কুশ একটি Organized unity - তে রূপান্তরিত করবার যে বিরামহীন প্রচেষ্টা এবং প্রস্তুতি তার পূর্ণ বিকাশটিকেই ধারণ করেছিল  Media - যার সবচাইতে শক্তিধর একটি Concentrated pillarএবং component সংবাদপত্র। সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি এবং তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য এবং তীব্র প্রভাব বিস্তারী আকাক্সক্ষা প্রতিফলনের একটি বিশাল Canvas. যে কোন কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল কথাই সাধারণের আকাক্সক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন। সাধারণ যেহেতু একাধিক সেইহেতু তাদের সমষ্টিগত আকাক্সক্ষার প্রকাশ এবং বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীর ভূমিকা পালন একমাত্র সংবাদপত্রেরই- যার মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনোভূমির অবিকৃত এবং অবিকল একটি অবয়ব আমরা পেয়ে যাই। সংবাদপত্রের কৃতিত্ব এখানেই অর্থাৎ self Sufficing life - নির্মিতির ক্ষেত্রে যা পূর্বশর্ত- সেইOrganized unity’ নিমার্ণের প্রশ্নে প্রথম এবং শেষ শর্ত সংবাদপত্র। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে এটাই চিরন্তণ এবং প্রশ্নাতীত।

      রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী চারটি মূল স্তম্ভের উপর রাষ্ট্রের স্থিতি। নির্দিষ্ট ভূ-খন্ড, জনসমষ্টি, সরকার  এবং সার্বভৌমত্ব। সে চারটি স্তম্ভ এবং নির্দিষ্ট সংজ্ঞার বাইরেও আর একটি স্তম্ভ - ‘সংবাদপত্রকে যদি রাষ্ট্রের ভিত্তিতে  আমূল প্রোথিত করা যায় তাহলে অবশ্যম্ভাবীরূপে স্বাভাবিকভাবে একটি স্তম্ভের অতিরিক্ত শক্তি অন্য চারটি স্তম্ভের শক্তির সাথে সংযোজিত হয়ে  রাষ্ট্রের মূল ভিতকে অধিকতর শক্তিশালী করবে- যা রাষ্ট্রের গৌরব এবং অহংকার বৃদ্ধিতে সহায়ক তো হবেই প্রকারান্তরে যা রাষ্ট্রের নিয়ামক শক্তিকেও এক সময় নিয়ন্ত্রণ করবে। উন্নত বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এখনই যা প্রত্যক্ষ বাস্তবতা। 

যদিও সংবাদপত্রের Total ব্যাপারটাকে একেবারেই positive হিসেবে দেখা যায় না। প্রচুর  Negative দিকও এর রয়েছে  যার মধ্যে মুখ্য হিসেবে বিবেচিত বস্তুনিষ্ঠতার অনুপস্থিতি একটি সংবাদপত্র সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে যদি বস্তুনিষ্ঠতা বিবর্জিত হয় তাহলে তার অন্যান্য সব গুণ- যা- থাকুক না কেন গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে Negative এবং সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে জনসমষ্টির চিন্তায় বিভ্রান্তির উদ্রেককারী। প্রকারান্তরে Organized unity - নির্মাণের ক্ষেত্রে না সূচক ভূমিকা পালনকারী- যেখানে সাধারণের কল্যাণের চাইতে অকল্যাণের আশঙ্কাই বেশি। সুতরাং বস্তুনিষ্ঠতাই সংবাদপত্রের Vital Organ. এবং পঞ্চম স্তম্ভের- Extracted essence, সোজা কথায় সংবাদপত্র নির্জলা সত্য প্রকাশের Virtual platform - এটি সন্দেহাতীত। বিচ্যুতি ঘটলেই চরিত্রহীনতার দায়ে অভিযুক্ত। রার্ষ্টের চরিত্রের উপরেও যার প্রভাব প্রক্ষেপ অবধারিত। সেক্ষেত্রে সংবাদপত্র আর সংবাদপত্র থাকে না তার অপমৃত্যু ঘটে। অতএব সংবাদপত্র সংবাদপত্র হিসেবে থাকলে রাষ্ট্রের কল্যাণ ত্বরান্বিত হওয়া সম্ভব।

 

       এখন একটি সংবাদপত্রকে যথার্থই সংবাদপত্র হিসেবে টিকে থাকতে গেলে তার উৎপত্তি থেকে কালানুক্রমিকভাবে শেষ মূহুর্তটি পর্যন্ত টিকে থাকবার প্রশ্নে যে Fuel infusion-এর মতো একটি বিশেষ বিষয়ের অপরিহার্যতা- সেদিকটি আপনা আপনি আলোচনায় এসে যায়। একটি কাগজের জন্ম, তার বিকাশ, বিকাশের পূর্ণতা, পূর্ণ বিকশিত হবার পর তার স্থিতি-এসব বিষয়ের নেপথ্যে যে বিশাল, ব্যাপকতর Netting system - কাজ করে তাকে স্বাভাবিক ঋজু গতিতে সঞ্চালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করবার বিষয়টিও একটি ভালো কাগজের জন্য খুবই বড় মাপের- Pre-condition.  এই পূর্ব শর্তটি পূরণ না হলে কাগজটি তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে অবশ্যই পৌঁছুতে পারবে না সেদিক থেকে Fuel infusion - এর ভেতর জনবল, জনবলের মেধা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শীতা, Financing  capital infusion - এর পর্যাপ্ততা, সর্বোপরি পাঠক সমাজ তথা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম আকাক্সক্ষা অনুধাবনের যোগ্যতা অর্জন করে এবং সে যোগ্যতা প্রয়োগের মাধ্যমে সংবাদ পত্রের পৃষ্ঠায় জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সবকিছুকে একীভূত করে যদি- Total management - সংবাদপত্রটির সার্বিক ব্যবস্থাপনাকে উন্নততর অবস্থানে স্থাপন করতে সক্ষম হয় তাহলেই কেবল কাগজটির- Fifth pillarহিসেবে মর্যাদা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারে।       

 

উচিত বলেই আমার বিশ্বাস। যেহেতু সরকার নামীয় যে যন্ত্রটি জনগণের আকাক্সক্ষা সমূহের বাস্তবায়নের ওপরে উদ্ধৃতজনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলনএই বিষয়টিই একটি প্রকৃত সংবাদপত্রের আদর্শ এবং লক্ষ্য হওয়া লক্ষ্যে পরিচালিত হয় এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে সেই জনগণের আকাক্সক্ষাকে একটি সংবাদপত্র তার নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং সেই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকারকে অব্যাহতভাবে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরনের ক্ষেত্রে সঠিক পরামর্শ প্রদান করে সে আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে উদ্ধুদ্ধ এবং বাধ্য করতে পারে। কেননা সমূহ মাধ্যমের মধ্যে এই একটিমাত্র মাধ্যম এতটাই শক্তিশালীÑ যাকে অগ্রাহ্য করা কোনো সরকারের পক্ষে কখনই সম্ভব হয়ে ওঠে না। কারণে যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সর্বশেষ কথা এর পর আর কোনো কথা থাকতে পারে না যেটি প্রত্যয়সিদ্ধ এবং সারা বিশ্বের সকল মানুষের কাছে স্বীকৃত।

      একটি বিষয় সকলেরই জানা যে, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় স্তম্ভটিই তার প্রাণ। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভটির মাধ্যমেই সংবাদপত্রটি তার মতামত জনগণ এবং সরকারের সম্মুখে উপস্থাপন করে থাকে। এই মতামতের প্রতিক্রিয়া সে প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক অথবা নেতিবাচকÑ যা- হোক না কেন তাৎক্ষণিকভাবে জনগণের মনন এবং চিন্তাশীলতায় রেখাপাত করে। কারণে সরকারও বিষয়টিকে একেবারেই এড়িয়ে যেতে পারে না। প্রতিক্রিয়াটি ত্বড়িৎ গতিতে না হয়ে বিলম্বে হলেও সরকারকে ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য করে। এই বাধ্যতাই জনগণের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতাকে অধিকতর মাত্রায় নিশ্চিত করে। যখনই এই দায়বদ্ধতা প্রবল শক্তি নিয়ে সরকারের সম্মুখে ঋজু হয়ে দন্ডায়মান হয় তখনই সরকার জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে যত দ্রæ সম্ভব সিঁড়ির পর সিঁড়ি অতিক্রম করে লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হতে থাকে। আর ঠিক তখনই সংবাদপত্র জন-আকাক্সক্ষা পূরণের একটি বিশাল প্রতীকের আকার নিয়ে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সম্মুখে বিপুল শক্তিতে আবির্ভূত হয়। তখন অবশ্যম্ভাবীরূপে সংবাদপত্রটি হয়ে ওঠে আপামর সাধারণ মানুষের আশা, আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের একটি মসৃণ Platform. জনগণ ভরসা পায় এবং সে Platform - ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গর্ব অনুভব করে। উদ্ধৃত প্রেক্ষিত বিবেচনায় এটিই বোধকরি হওয়া উচিত একটি সংবাদপত্রের মৌলিক লক্ষ্য।

         কিন্তু এই মৌলিক লক্ষ্যটি থেকে বিচ্যুত হয়ে কোনো সংবাদপত্র যদি ভিন্ন লক্ষ্যের প্রতি ধাবমানতা অব্যাহত রেখে ভিন্ন কোনো বিশেষ স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে নিমগ্ন হয় তাহলে সংবাদপত্রটি তার বিশুদ্ধ চরিত্রটিকে হারিয়ে চরিত্রহীনতায় আক্রান্ত হয়ে একটি পর্যায়ে এসে স্বীয় অস্তিত্বটিকেই মৃত্যুর মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেবে এবং মৃত্যুর হিমঘরেই তার স্থায়ী নিবাস নিজেই রচনা করবেÑ এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কারণ চরিত্রহীন কোনো কিছুকেই সাধারণ মানুষ গ্রহণ করে না। এবং শুধু মানুষই নয়কাল তাকে সমর্থন করবে না। ফলতঃ চরিত্রহীন আখ্যায় আখ্যায়িত হয়ে অকালেই তাকে চিরকালের মতো কালের গর্ভেই  বিলীন হয়ে যেতে হবে। এই অর্থে যে, সংবাদপত্রের হৃৎপিন্ডটি জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রভূমিতে রক্ত সঞ্চালনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই মানুষের কাছে সকল সময়ের জন্যেই কাক্সিক্ষত। কারণ সংবাদপত্রের কাছে মানুষের চাওয়ার বিষয়টি অনিঃশেষ।

      মঙ্গলাকাক্সক্ষী বুদ্ধিগত চিন্তাগামীতার লক্ষ্য সব সময়ের জন্যেই স্থির থাকে পরিনামের ফলাফলটিকে আগাম প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা পূরনের মাধ্যমে আয়ত্বাধীন করবার জন্যে। যাকে ইংরেজীতে Predictability - বলা যেতে পারে। কারণ এই চিন্তাগামীতা কোনো Mystical Myth -রচনা করে না অথবা Spirituality -এর দিকেও ধাবিত হয় না। কেবল যেটি বাস্তব সেটিকেই আগাম উদ্ধার করে সবার সম্মুখে উন্মোচন করে দেবার ইচ্ছে পোষণ করে মাত্র। সে কারণে এই  মঙ্গলাকাক্সক্ষী বুদ্ধিগত চিন্তাগামীতা প্রতিশ্রæতিটিই হয়ে দাঁড়ায় প্রকৃত অর্থে একটি সুস্থ্য সংবাদপত্রের মূল লক্ষ্যের কল্যাণকামী চরিত্র নির্মিতির একটি একক উপাদান। পক্ষান্তরে এই উপাদানটির বিপরীতগামীতা নিশ্চিতরূপেই সংবাদপত্রটির অকাল মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে তুলতে সক্ষম হলেও সেটি সে করে না, কারণ উপাদানটির উদ্দেশ্যটিই জন-মঙ্গল-কেন্দ্রিক।

    এখন দার্শনিক এবং রাষ্ট্র-চিন্তক এ্যারিষ্টটলের Self sufficing life -এবং অধ্যাপক বার্জেসের Organized unity বিষয় দুটি আলোচিতব্য উপাদানটির অভ্যন্তরে অন্তরিত কিনা? এখানে প্রশ্নটির উত্তরটি একেবারেই স্পষ্ট যে, Organized unity -এর মাধ্যমেই Self sufficing life -এর সৃষ্টি সম্ভব করে তোলা যেতে পারে এবং দুটি বিষয়ই উপাদানটির ভেতরে অন্তরিত। তবে বিষয় দুটির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেসময়’-এর প্রশ্নটি একটি অপরিহার্য শর্ত। কেননা Organized unity -সৃষ্টিতে যে সময়ের প্রয়োজন তার চাইতে অনেক বেশী সময়ের প্রয়োজন Organized unity -অর্জিত হবার পর ঝবষভ Self sufficing life  -নির্মানের জন্যে। অন্ততঃ আমাদের মতো একটি হতদরিদ্র রাষ্ট্রের বিপুল পরিমানের অসমান মাত্রার জনগোষ্ঠির আধিক্যের কারণে। তারপরেও সবকে বাস্তবায়িত করে তুলবার জন্যে বহুবিধ মাধ্যম থাকবার পরেও চরিত্রবান সংবাদপত্র সমূহের ইতিবাচক ভূমিকাটি একটি অনিবার্যতাÑ যেটিকে অস্বীকার করবার কোনো উপায়ই নেই কোনোভাবেই।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে, আলোচিতব্য বিষয়ে সংবাদপত্রের পাশাপাশি Electronic Media -সমূহের ভূমিকাও একটি শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবার অপেক্ষা রাখে। Electronic Media -সমূহের ভূমিকার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা পোষন করেই বলা যায় Electronic Media -এর চাইতেও সংবাদপত্র মাধ্যমটি তুলনামূলকভাবে সাধারণ জন-মানুষের ওপর অধিক মাত্রায় প্রভাব সম্পাতী এবং জনগণের খুবই কাছাকাছিÑ কারণে যেÑ Electronic Media -এখনও দেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে পৌঁছুতে পারে নি। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে যা সহজেই সম্ভব হয়েছে। সংবাদপত্রের রয়েছে যে কোনো বিষয়ের ওপর বিস্তৃতাকারে বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা যা  ঊষবপঃৎড়হরপ গবফরধ-এর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত। সে কারণে Electronic Media -এর চাইতে মানুষ সংবাদপত্রের ওপরেই বেশী আগ্রহী এবং আস্থাশীল।      

 

   জ্ঞান, নীতি এবং সত্যÑ এই হচ্ছে আত্মার সবচেয়ে উত্তম রক্ষক।দার্শনিক প্লেটো। তাঁররিপাবলিকগ্রন্থ থেকে।

অধম প্রবৃত্তির দল এবার তাদের হাতে বন্দি আত্মাকে তার সকল মহৎ গুণ থেকে শোধন করতে শুরু করে। এবার তারা দম্ভ, অনাচার, অমিতব্যয় এবং নির্লজ্জতাকে মশাল শোভাযাত্রা সহকারে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করে এবং প্রশংসার মধুর বাণী উচ্চারণ করে বরণ করে এনে আত্মাশূণ্য ঘরে তাদের প্রতিষ্ঠা করে। এবার তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে, অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা আর মূর্খতাকে বলে বিক্রম।

দার্শনিক প্লেটো। তাঁর  রিপাবলিক’- গ্রন্থ থেকে।

 

       প্লেটোর উদ্ধৃত বক্তব্য বিশ্লেষণ করে যা প্রাপ্তি- তা হলোউত্তমএবংঅধম’-এর মধ্যে যে ব্যবধান সে ব্যবধানের গর্ভ থেকে প্লেটো নির্ণিত ফলাফল। আত্মার রক্ষক অর্থাৎজ্ঞান, নীতি এবং সত্যকে হত্যা করেঅধম প্রবৃত্তির দল’- বলে আখ্যায়িত গোষ্ঠিটিউত্তম’-এর সকল সুকুমারবৃত্তিকে লুন্ঠন করে একই স্থানেদম্ভ, অনাচার, অমিতব্যয়, নির্লজ্জতা, অরাজকতাইত্যাদিকে প্রতিস্থাপন করে রাষ্ট্র, সমাজ তথা গোটা জাতিকে করে তোলে কলুষিত। চিরন্তন সত্যের বক্ষ ভেদ করে সে বক্ষের মর্মমূলে প্রতিষ্ঠা করতে চায় নির্জলা মিথ্যেকে। বস্তুতঃ এটিকে একটি মৌল নিকৃষ্ট শত্রু ঘোষণা করে প্লেটো সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এই ভয়ঙ্কর শত্রুই সারা বিশ্বের বীর্যবান জাতি সমূহকে বীর্যহীন ক্লীব জাতিতে রূপান্তরিত করে। আর এই রূপান্তরনের মাধ্যমেঅধমের দল’-কর্তৃক বীর্যবান সেই জাতি সমূহকে নিরঙ্কুশভাবে শোষনের পথটি উন্মুক্ত হয়ে যায়। প্লেটো তাঁর অসাধারণ আত্মিক শক্তি দিয়ে এই চরম সত্যটিকে উপলব্ধি করেন এবং এই সত্য-উপলব্ধি থেকেই তিনিঅধমের দলকে ভয়ঙ্কর সাধারণ শত্রুহিসেবে আখ্যায়িত করে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত এই ভয়ঙ্করCommon’-শত্রুটির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের স্মারক গ্রন্থটিই হলোরিপাবলিক।প্লেটোর প্রতিবাদকে ধারণ করে এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরেই কিংবদন্তী জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস তারCAPITAL’-গ্রন্থটি রচনা করেন। যে গ্রন্থটিতে কার্ল মার্কস জাতি সমূহকে শোষনের একমাত্রNuclear Weapon’Ñ’Ñজন-বিরোধী পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে জন-বিপ্লবের মাধ্যমে উৎখাত করে সমতা-ভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা প্রবর্তনকে উৎসাহিত করেন। কার্ল মার্কসেরCAPITAL’-গ্রন্থটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার পূর্বে গ্রন্থটির বহু সংখ্যক অধ্যায় বিভিন্ন সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবেও প্রকাশিত হয়।

      যেখানে সে সময়ে জার্মান রাষ্ট্রটি নিজেই একটি ঘোরতর পুঁজিতান্ত্রিক দেশ সেখানে পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধেCAPITAL’-এর মাধ্যমে সমাজতন্ত্র নির্মানের লক্ষ্যে সাধারণ জন-মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবার জন্যেCAPITAL’-এর অধ্যায় সমূহকে সংবাদপত্রে প্রকাশ করা কী পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ এবং দুঃসাহসী  তা খুব সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তা জেনেও সংবাদপত্র সমূহ কেবলমাত্র জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েইCAPITAL’-এর অধ্যায় গুলিকে প্রকাশ এবং প্রচার করেছেÑ এখানেই একটি দায়িত্বশীল এবং সুস্থ্য চরিত্রবান সংবাদপত্রের স্বাতন্ত্র্য।

       

        সংবাদপত্রকে নিয়ে এত কথা বলা হলো, এত আলোচনা করা হলো কেবলমাত্র একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে। লক্ষ্যটি হলো সংবাদপত্র যে একটি রাষ্ট্রের Fifth Pillarহিসেবে মর্যাদাপ্রাপ্ত সেটি সন্দেহাতীত। জন-কল্যানকে মূল বিষয় হিসেবে ধারণ করে জন-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সংবাদপত্র সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শটি রাষ্ট্র পরিচালনা-যন্ত্রটিকে প্রদান করে তার নিজের লক্ষ্যটিকে চরিত্রবান করে তুলবে। এটি যেমন প্রত্যাশিত ঠিক তেমনি চরিত্রহীনতার দায় নিয়ে সংবাদপত্রটি যেন তার নিজের অকাল মৃত্যুকে নিজেই অবধারিত করে না তোলে সেটিও একইভাবে প্রত্যাশিত।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান