মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণঃ দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা এবং সাহিত্যের অনিবার্যতা - সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক
$post->title

অতঃপর এখানে দুটি প্রশ্নের উত্থান অবশ্যম্ভাবীরূপে দৃশ্যমান। একঃমানসম্মত শিক্ষা’- বলতে কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে এবং এর সংজ্ঞাটি কী ? দুইঃদায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ’- অর্থে আমরা কি বুঝবো এবং এরও সংজ্ঞাই বা কি হবে? ফলে দুটি প্রশ্নের উত্তরে যেতে হলে একেবারে নির্মোহ আত্মজ্ঞান দ্বারা প্রশ্ন দুটির নিগুঢ় তাৎপর্যকে উপলব্ধি করতে হবে। উপলব্ধি করতে না পারলে বিষয়টির উপর আলোচনা করাই হবে নিরর্থক। এই প্রবন্ধে প্রথমেই আমরাদায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ’- সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। এখানে আমেরিকার একজন অধ্যাপকের একটি উদ্ধৃতি দেয়া প্রাসংগিক হবে বলে আমার ধারণা। উইলিয়াম আউচি- যিনি সাংগঠনিক আচরণ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের  Graduate Schoolএর ব্যবস্থাপনা বিষয়ের অধ্যাপক। আলোচনায় তাঁকে উদ্ধৃত করবার উদ্দেশ্য একটিই যে, যেহেতু তিনি সাংগঠনিক আচরণ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ এবং যেহেতু সকল শিক্ষায়তনই এক একটি পৃথক পৃথক সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে সেইহেতু সেই সব শিক্ষায়তনের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য যারা সেই শিক্ষায়তনের সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত তাদের আচরণ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করাই তার কাজ এবং যে আলোচনাটি মূলতঃ শিক্ষাবৃত্তেরই অন্তর্গত একটি অংশ। তার- “Why we need to learn "- প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতিটি দেয়া হলোঃ

 

“As a nation we have developed a sense of the value of technology and of a scientific approach to it, but we have meanwhile taken people of granted, Our government appropriates hundreds of millions of dollars for research or new techniques in electrical engineering, physics and astronomy. It supports the development of complex economic ideas. But almost no fund go to develop our understanding how to manage and organize people at work and that is what we have to learn by studying Japanese. The problem of productivity in the United States will not be solved with monetary policy nor through more investment in research and development. It will only be remedied when we learn how to manage people in such a way that they can work together more effectively"

 

এখন আমরা উদ্ধৃত অধ্যাপককে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি কি না? যেহেতু উদ্ধৃত কথাগুলো সমাজের প্রতি তার একান্ত স্বতঃফর্ত  দায়িত্ববোধ থেকে উৎসারিত। এবং যিনি বিশ্বাস করেন সরকারের সুষ্ঠু আর্থিক নীতি অথবা গবেষণা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিক বিনিয়োগকরণ কোন কাজেই আসবে না যতক্ষণ না আমরা জনগণকে একত্রিত করে অধিক মাত্রায় সক্রিয়ভাবে কাজে উদ্ধুব্ধ এবং সম্পৃক্ত করতে পারবো। পাশাপাশি আমরা অন্যের কাছ থেকে নতুন শিক্ষা গ্রহণের মানসিকতাকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারবো। সে অর্থে উদ্ধৃত অধ্যাপককে যদি আমরা একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি তাহলে তার চিন্তাবৃত্তিকে অবশ্যই যথেষ্ঠ মূল্য দিয়ে তার চিন্তাশ্রিত মতবাদকে মূল্যায়ন করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এর ক্ষেত্রে বাস্তব অর্থেই প্রয়োগ করতে হবে। এখানে প্রাসংগিকভাবে উল্লেখ করার যে বিষয়টি আসবে তাহলো আমাদের সমাজে উদ্ধৃত মানের অধ্যাপক এমন কি তার চাইতেও উচ্চ মানের ব্যক্তি মানস এবং মনীষার অভাব নেই।

 

প্রয়াত অধ্যাপক আবুল ফজল যিনি আজীবন বিশ্বাস করে গেছেন চারপাশে অন্যায় হওয়া প্রত্যক্ষ করে তার বিরুদ্ধে বিকলাঙ্গ জড় জীবের মত প্রতিবাদ, বিদ্রোহ না করা অপরাধ সংঘটন করবার চাইতেও নিশ্চিতরূপে মারাত্মক অপরাধ। কারণ যে অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে সেটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করা এবং প্রতিরোধের লক্ষ্যে বিদ্রোহী হয়ে না ওঠা একদিকে যেমন ঘটিত অপরাধটিকে উৎসাহিত করা অন্যদিকে একই সাথে ভবিষ্যতে তার চাইতেও দ্বিগুণ অথবা ত্রিগুণ মাত্রার অপরাধ সংঘটনের পথকে উন্মুক্ত করে দেয়া হিসেবে। এবং তার প্রতিফলনও ঘটিয়েছেন তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনা প্রবন্ধ এবং উপন্যাসে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে চরিত্র সৃষ্টি করে সে চরিত্রের মাধ্যমেই তিনি তার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

   

যোসেফ ম্যাটিনি নামের একজন বিদেশী মনীষীর কিছু কথা তিনি উদ্ধৃত করেছেন এভাবেযখন আপনার চারপাশে আপনি অন্যায় ঘটতে দেখেন তখন যদি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করেন তবে সেটাকে ফাঁকি দেয়া হবে। বিশ্বাসে বিশ্বাসী অনেক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বও দেশে রয়েছেন। দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক এবং নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক তার দুটি কাব্য নাটক "পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়" এবং "নুরলদীনের সারা জীবন" অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এবং ইতিহাসাশ্রিত চরম অন্যায় এবং অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বিদ্রোহ করেছেন সরাসরি। বিশিষ্ট কবি শামসুর রাহমান তাঁর বিভিন্ন কবিতার ভেতর দিয়ে সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায় এবং অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন এমনকি প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি তাঁর সরকারি চাকুরিটি পর্যন্ত ত্যাগ করেছেন অবলীলায়। নিজের ভবিষ্যতের জন্য কোন নিশ্চিতি না রেখেই। বিশিষ্ট শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম অন্যায়ের এবং অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ করবার জন্য সরাসরি মাঠে নেমে এসেছেন নিতান্ত সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করবার মানসিকতাকে লালন করে এবং যে কারণে তাঁকে অপরিমিত নির্যাতন,  নিপীড়ন এবং অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে দিনের পর দিন। এবং এসব নির্যাতন, নিপীড়নের ধারাবাহিকতার এক পর্যাযে তাঁকে তাঁর মাতৃভূমিটিকেও ত্যাগ করতেও বাধ্য করা হয়েছে। যাঁরা এসব নিপীড়ন, নির্যাতন এবং অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিজেদের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তার বিষয়কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে শুধু প্রখর চৈতন্য এবং বিবেকের তাড়নায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষের মঙ্গলাকাঙ্খাকে পূরণের জন্যে আত্ম-দায়িত্ববোধ থেকে মানুষের কল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়েছেন তাদেরকে কি আমরা দয়িত্বশীল ব্যক্তি বলবো না? তাঁরা যে শিক্ষা গ্রহণের ভেতর দিয়ে তাঁদের চৈতন্যকে প্রখর করেছেন এবং যে চৈতন্যবোধ থেকে তাঁরা সকল বাধা বিপত্তিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে মানব কল্যাণে অগ্রগামী হয়েছেনÑ তাঁদের সে শিক্ষাকে কি মানসম্মত বলা যাবে না?

শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্যটিই হলো মানুষকে শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তার জ্ঞান পাত্রটিকে পরিপূর্ণ করে তোলা। যে জ্ঞানের ভেতর দিয়ে তার মানসলোক আলোকিত হয়ে তার বিবেক এবং দায়িত্ববোধটিকে মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যে সর্ব সময়ের জন্যে প্রস্তুত করে রাখবে। যেখানেই অনাচার, যেখানেই নিগ্রহ সেখানেই সে বোধটি সে-সবের বিরুদ্ধে পর্বত-প্রমাণ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে। এবং এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবার কারণেই নিগ্রহ, নির্যাতনের পরবর্তী ধাপ এবং মাত্রাটি ক্রমান্বয়িকভাবে হ্রাস পেতে থাকবে। একজন শিক্ষক তার যে কোনো শিক্ষার্থীকে অথবা একজন যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো মানুষকে এভাবে শিক্ষিত করে তুলতে পারলে অবশ্যই তিনি একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক বা ব্যক্তি হিসেবে সবার কাছ থেকে স্বীকৃতি পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

 

কেননা একজন শিক্ষক বা সেই ব্যক্তি তাদের শিক্ষার্থীদেরকে যে শিক্ষা দান করবেন সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদেরকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে প্রশ্নটির উত্তরটি অনুসন্ধান করবার জন্যে চরমভাবে অনুসন্ধিৎসু করে তুলবেন এবং এই অনুসন্ধিৎসাই প্রশ্নটির উত্তরটি খুঁজে বের করবার জন্যে তাদেরকে বাধ্য করবে তাদের চিন্তাশীলতার গতিমাত্রাকে বৃদ্ধি করবার মাধ্যমে। আর এই চিন্তার গতিশীলতাই তাদেরকে দায়িত্বশীল হবার নেপথ্যের মূল ভূমিকাটি পালন করবে। অর্থাৎ গোটা বিষয়ের নির্যাসটি হলো যে শিক্ষা মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যে নিবেদিত সে শিক্ষাইমান সম্মত শিক্ষা।’- যেহেতু দায়িত্বশীলতা ছাড়া মানুষের কল্যাণীয় কিছু করা মোটেই সম্ভব নয়।

 

তাহলে সঙ্গতভাবেই বলা যায় এই মান সম্মত শিক্ষাই একজন ব্যক্তির মানসিকতার কেন্দ্রবিন্দুতেদায়িত্বশীলতা’-সৃষ্টিরও জনক। যখন একজন  ব্যক্তি এই মানের শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন তখন তার চিন্তা তরঙ্গে দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও আপনা আপনিই প্রোথিত হয়ে যাবে। সকল প্রতিকূলতাকেই তখন তিনি তার এই দায়িত্বশীলতা দিয়েই অনুকূল করে নেবেন। অর্থাৎ যত নিপীড়ন, নির্যাতনের প্রশ্নই আসুক না কেন তিনি সেসব কিছুকে অতিক্রম করেই সম্মুখ পানে অগ্রগামী হবেন। যেহেতু এই শিক্ষাই তিনি মান সম্মত শিক্ষার কাছ থেকে অর্জন করেছেন।

 

এখন এই নির্যাতন, নিপীড়ন সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটনকারী যদি কোনো সাধারণ ব্যক্তি হন তাহলে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের ভাষাটি হবে এক ধরণের, আর সে ধরণের অপরাধটি সংঘটনকারী যদি রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনাকারী কোনো সরকার অথবা সরকারের পৃষ্ঠপোষিত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠি হয় সে ক্ষেত্রে সে অপরাধের বিরুদ্ধের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং বিদ্রোহের ভাষা এবং ধরণটি হবে ভিণœ ধরণের।  

 

এখানে আরও একটি বিষয় প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ্য যে, শুধুমাত্র ব্যক্তি কেন্দ্রিক এবং ব্যক্তি পর্যাযের বৃত্তে মান সম্মত শিক্ষার বিষয়টিকে বৃত্তাবদ্ধ করলেই মান সম্মত শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটি সাধিত হওয়া পূর্ণ আকারে সম্ভব হবে না। কারণ যে কোনো বিবেচনায় ব্যক্তি উদ্যোগ হবে খন্ডিত এবং সীমিত। সে কারণে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সামষ্টিক উদ্যোগের বিষয়টির ওপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। এবং উদ্যোগকে সফল করতে হলে অবশ্যই সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন অপরিহার্য একটি শর্ত হয়ে দাঁড়াবে। কারণে যে, যারা মান সম্মত শিক্ষায় ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত মানুষকে শিক্ষিত করে তুলবার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তাদেরকে ওই পর্যায়ের শিক্ষা প্রদানের জন্যে যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে উপযোগী করে তুলবার দায়িত্বটি গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই। কারণ যারা সে শিক্ষাটি প্রদান করবেন তারাই যদি শিক্ষাটি প্রদানের প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ না করেন তাহলে কিছুতেই মূল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না। জন্যে সরকারকে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দানের জন্যে পৃথক একটি বিশেষায়িত Training Institute - গড়ে তুলতে হবে।

যে Training Institute - টি থেকে তারা ওই শিক্ষার পদ্ধতিগত দিক থেকে শুরু করে প্রায়োগিক দিক সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর সার্বিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সেই প্রশিক্ষনের আলোকে তাদের শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষিত করে তুলবার মাধ্যমে তাদেরকে দায়িত্ববান ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রজ্ঞাবান করে তুলবেন। এবং যারা সব প্রশিক্ষণ প্রার্থীদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন তাঁদেরকেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর যথেষ্ট মেধাবান, দক্ষ এবং যোগ্য হতে হবে।  

 

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা প্রসঙ্গভুক্ত করবো না এজন্য যে, তিনিও তাঁর কিছু রচনা কবিতা গীতের মাধ্যমে বিভিন্ন অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়েছেন। তবে অপেক্ষাকৃত নমনীয় এবং অস্পষ্টভাবে। শুধুমাত্র একটি কারণে তার দৃঢ়তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লক্ষ্যণীয় এবং গ্রহণীয়ও বটে যা বৃটিশ অপশাসনের অপরাধ ভিত্তিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রচন্ড প্রতিবাদস্বরূপ বৃটিশ সরকার কতৃক তাঁর কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে প্রদত্তনাইট’- উপাধি পরিত্যাগকরণ।

 

এটিও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অবশ্যই একটি ভাষা। তবে তাঁর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য তাঁর মতো একজন অসাধারণ মানুষের পক্ষে ওই নমনীয় ভাষাটির ব্যবহার ওই সময়ের প্রেক্ষিত বিবেচনায় অত্যন্ত নমনীয় এবং নিচু কন্ঠের হয়েছে বলেই মনে হয়েছে। কোনো দিক থেকে কোনোভাবেই তাঁকে খাটো না করে এবং তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমার ধারণা তাঁর প্রতিবাদের ভাষাটি যদি আরও উচ্চকন্ঠের হতো, আরও তীব্র এবং তীক্ষè হতো তাহলে বৃটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনটি একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করতে পারতো, এমন কি স্বাধীনতার জন্যে সংগঠিত সাধারণ মানুষের ওই আন্দোলনটি একটি সার্বিক বিপ্লবেও রূপান্তরিত হতে পারতো। সে সময়ে গোটা জাতি তাঁর কাছ থেকে সে ধরণের প্রতিবাদী ভাষাই প্রত্যাশা করেছিলো। এবং তখন বৃটিশ নিগ্রহাত্মক অপশাসনের  নিগড় থেকে আমাদের মুক্তিলাভ হয়তো আরও ত্বরান্বিত হতে পারতো। এর  পাশাপাশি যদি আমরা কবি কাজী নজরুল ইসলামের বৃটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর চরম প্রতিবাদী রূপটির দিকে তাঁকাই তাহলে স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো স্পষ্ট হবে যে,  যেভাবে তিনি বৃটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবার আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন তা রীতিমত অবিস্মরণীয়ভাবে ইতিহাস হয়ে গেছে যা সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করবেন। এবং সে কারণেই তিনি ওই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের একটি অনিবার্য অংশে পরিণত হয়েছেন।

 

এছাড়াও অনেক শ্রদ্ধাস্পদ ব্যক্তি রয়েছেন যারা স্ব-স্ব বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকেও সমাজ সংস্কার এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেকেরই অলক্ষ্যে এবং নীরবেই স্ব স্ব দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের সাধ্যমত কাজ করে চলেছেন অবিরাম। হয়ত কখনো কখনো আমরা তাদের কাজের কিছুটা মূল্যায়ন করতে পারছি। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই আমরা নিজেরাই তাদেরকে ভ্রমাত্মক অবস্থানে অধিষ্ঠিত করছি। এটা তাদের দুর্বলতা নয় বরং এটা আমাদেরই চিন্তা প্রবাহের গতিবেগের অক্ষমতা অযোগ্যতা এবং দীনতা। 

 

এতক্ষণ যাদেরকে উদ্ধৃত করা হলো, যাদের কথা উল্লেখ করা হলো তাদের সার্বিক না হলেও আংশিক কর্মকান্ড গভীর মননশীলতা নিয়ে বিশ্লেষণ এবং পর্যালোচনা করলে আমরা অবশ্যই লক্ষ্য করবো তাদের না জানাকে জানার প্রচন্ড স্পৃহা অন্যের চিন্তা স্রোত থেকে নিজের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে তা দিয়ে আত্মচৈতন্যকে সমৃদ্ধ করে সেই চেতনা নিজ চেতনার সাথে এক করে দিয়ে সমাজের কল্যাণে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করে দেবার কি ঐকান্তিক আকাক্সক্ষা।

এসব নীরব নিভৃতাচারী অথবা সরব উচ্চাঙ্গে উচ্চারণকারী তারা সমাজের অতি উচ্চ স্তর অথবা সর্বোচ্চ নিম্নপর্যায় যেখান থেকেই আসুন না কেন যেহেতু তারা যে কোন ভাবেই হোক সমাজের অগ্রবর্তী পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে প্রচন্ড ভাবে আগ্রহী। তারাই তো সমাজে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্য বলে আমার বিশ্বাস। তারা যে কোন পেশারই হোক। তারা রাজনীতিবিদ হতে পারেন, শিক্ষক হতে পারেন, সাহিত্যিক হতে পারেন, চিকিৎসক হতে পারেন এমনকি সমাজের নিশ্ব পর্যায়ের একজন সাধারণ ব্যক্তিও হতে পারেন। এতক্ষণ তো আলোচনা করা হলো দায়িত্বশীল ব্যক্তি এর সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হলো তার সাথে যে সকলেই এক কথায় একমত হবেন এমন প্রত্যাশা করা বোকামীরই ভিন্ন নাম। তবুও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আত্ম-দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ সাধন করা সম্ভব হলোÑ যাকে অবশ্যই একটি ইতিবাচক প্রভাব-প্রক্ষেপী চিন্তার ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা যায় হয়তো। 

 

এবার দৃষ্টি দেয়া যাকমান সম্মত শিক্ষা’-এর বিষয়ে। আমি প্রথমেই উল্লেখ করছি আলোচিতব্য বিষয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখিত দুটি প্রশ্নের উত্তর যদি না পাওয়া যায় তাহলে আলোচনার প্রয়োজনই হয় না অথবা আলোচনা হলেও তা হয়ে যায় অর্থহীন। বিষয়টিকেই পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়ে আমি সর্বোত্তভাবে চেষ্টা করছি উল্লেখিত প্রশ্নটির উত্তর খুঁজবার।

 

মানসম্মত শিক্ষা বলতে যদি আমরা বুঝতে চাই, যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একজন ব্যক্তি প্রত্যক্ষভাবে হয়ে উঠবেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ যার শিক্ষার বাস্তব অর্থই হবে প্রায়োগিক এবং মানুষের কল্যাণ। সামষ্টিক জনগণ তথা সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং স্তরে যার প্রভাব সম্পাতি ভূমিকা অগ্রগামী সমাজ নির্মাণের প্রয়োজনে অতি মূল্যবান অবদান রাখতে সম্ভব হবে কল্যাণকামী সমাজ নির্মাণের প্রশ্নে শিক্ষার প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। যে শিক্ষার আলোক রশ্মি Nuclear বিস্ফোরণের অত্যুজ্জ্বল রশ্মি সম্পাতের চাইতেও উন্নততর এবং অধিকতর Illuminative structure - এর ভিত গড়ে তুলতে সক্ষম হবে যুগ যুগান্তরের কালানুক্রমিক ধারায় অবিশ্রান্তভাবে।

 

কালাতিক্রান্তিক চিত্ত চৈতন্য সৃষ্টির মৌলিক উপাদান যদি হয় মূল্যবোধের দৃঢ়তা এবং ঋদ্ধতা তাহলে সে ঋদ্ধ দৃঢ়তা অর্জনের জন্যেও প্রয়োজন হবে বিপুলভাবে সৎ এবং সুস্থ শিক্ষা গ্রহণের। বিবেচনা বোধের পরিমিতি ধারণের। এবং সবের বিকাশ ঘটানোর জন্য প্রয়োজন হবে লেখার ওপর দক্ষতা অর্জনের বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট চিন্তা প্রবাহের প্রয়োগ ঘটানোর মাধ্যমে। শুধুমাত্র মৌখিক হলে তা হবে আংশিক। পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে লেখককে সাহায্য নিতে হবে লেখনীর- অপরিহার্যভাবে। অর্থাৎ শুধু মাত্র বলাই যথেষ্ট হবে না লেখার মাধ্যমেও সে চিন্তা প্রবাহের বিকাশ ঘটাতে হবে। এবং সেটি মানুষের মনে বাচনিকতার চাইতে অনেক বেশী স্থায়ীত্ব লাভ করবে। আর এজন্যেই প্রয়োজন সুস্থ সাহিত্যিকের। যেহেতু সাহিত্যিকের কাজটিই হলো জাতির আকাক্সক্ষা নিজ চৈতন্যে ধারণ করে তাঁর চিন্তাশ্রিত মানুষের মঙ্গল বার্তাটি তাঁর রচনার মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া জাতির মানসলোকে। কেননা সাহিত্য সত্যের আঁধারÑ যে আঁধারে অসত্যের প্রবেশাধিকার একেবারেই নিষিদ্ধ। জন্যে শুধু একজন নন হাজার হাজার সাহিত্যিকের প্রয়োজন কথিত মান সম্মত শিক্ষায় জাতিকে শিক্ষিত করে তুলবার কর্মযজ্ঞ সম্পাদণের লক্ষ্য পূরণে। এর সাথে প্রয়োজন সুস্থ শিক্ষকবৃন্দের যাঁরা এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশ গ্রহণ করে জাতির মঙ্গল সাধনে ব্যাপৃত থাকবেন। এবং তাঁদের বিভিন্ন রচনাবলীর মাধ্যমেও তাঁরা জাতিকে অগ্রগামী করবেন মান সম্মত শিক্ষায়Ñ যা এখানে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রসংগে একজন আমেরিকান লেখক, গ্রন্থকার, রসাত্মক রচনাবলী রচয়িতার উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে। | Andrew Ward মূলত একজন Freelance লেখক এবং Photographer.. তার রচিত ‘Fits and starts: The premature memories of Andrew Ward’’- তার এই রচনা থেকে রচনা নির্মাণের ক্ষেত্রে তার কিছু কথা আমরা বিবেচনায় আনতে পারি। কারণে যে, রচনাটি মানুষের জন্যেই এবং ওই রচনার মাধ্যমেই তিনি তার বিশ্বাসিত বার্তাটিকে তাদের মধ্যে পৌঁছে দেবেন। তিনি বিশ্বাস করেন 

 

Although perfect grammar do not make a perfect paper. Such things are important minor errors are like static in your writing. If there are too many of them or they are obvious they distract your reader. They focus the readers attention not on your message, but on your faulty expression. Minor errors can undermine your readers confidence in you as a qualified authority. If you make careless errors in spelling or punctuation. For example, Your reader might assume that you made analogous error in reporting, information. So while a revision is not just a proofreading  should be a part of  the revision process.”

.”

 

উদ্ধৃত বক্তব্যের মূল কথাটি হলো যদিও ভাল একটি লেখা তৈরীর ক্ষেত্রে সঠিক ব্যাকরণ এবং সঠিক শিল্পী অথবা যন্ত্রী হলেই তারা মূল ভূমিকা পালন করতে পারে না। বরং সমগ্র লেখায় যতদূর সম্ভব ছোট হোক অথবা বড় যে  কোন ধরণের ভুলকে পরিহার করা বা এড়িয়ে চলা এবং লেখকের মূল বক্তব্যের নির্যাসটুকু নির্ভুলভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়াই একটি ভালো লেখার স্বার্থকতাকে নিশ্চিত করতে পারে। তা না হলে পাঠকবৃন্দ লেখাটি সম্পর্কে দ্বিধান্বিত হয়ে লেখকের লেখার ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে লেখককে নি¤œ মানের লেখক হিসেব বিবেচনা অথবা কল্পনা করতে পারেন। যখন পাঠকবৃন্দ রচনাটি পাঠ করে লেখককে নিমানের লেখক হিসেবে বিবেচনা করবেন তখন ওই রচনাটির মাধ্যমে লেখক যে বার্তাটি পাঠকবৃন্দের কাছে পৌঁছে দিতে চান সে বার্তাটিতে শিক্ষণীয় যা কিছুই থাক না কেন পাঠকবৃন্দ তা গ্রহণ করবেন না। আর  গ্রহণ না করলে সেটি থেকে ইতিবাচক কোনো ফলও আসবে না।

 

জন্যেই উন্নত লেখার জন্য প্রকৃতভাবে উচ্চ মার্গীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া অবশ্যম্ভাবীরুপে জরুরী। যেহেতু লেখাটির ভ্রমাত্মক ভূমিকা জনগণের চিন্তাপ্রবাহে গঠনমূলক আগ্রহ সৃষ্টির চাইতে অনাগ্রহই সৃষ্টি করবে অধিক মাত্রায়। ফলশ্রুতিতে লেখাটি হয়ে পড়বে নিরর্থক-সমাজের উপকারের চাইতে অপকার সাধনই করবে আরও বেশী করে এবং যে বিশেষ শিক্ষায় শিক্ষিত সে শিক্ষার আলোক সম্পাতে লেখক হবেন সরাসরি এবং পুরোপুরি ব্যর্থ। ব্যর্থতার দায়ভার সম্পূর্ণরূপেই বর্তাবে লেখকের অদক্ষতার ওপরই। এখন সঙ্গত অর্থেই লেখক তার রচনার মাধ্যমে যে শিক্ষা-বার্তাটি সাধারণ মানুষকে প্রদান করতে চাইছেন সেটিকে গ্রহণ করতে মানুষ হয়ে পড়বেন দ্বিধান্বিত। তার রচনার গর্ভজাত শিক্ষা সংক্রান্ত বার্তাটির কোনো মূল্যই থাকবে না সাধারণ পাঠক শ্রেণী অথবা মানুষের কাছে।

 

প্রাসঙ্গিকভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর আর একটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক। তাতে বোধ করি সাধারণভাবে বিষয়টি আরও বেশী মাত্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠবেÑ

Although good effective writing is mechanically and grammatically correct, you cannot reverse the equation. It is perfectly possible to write a paper that has no errors but that is still a poor paper. An effective paper fulfills the requirements of the assignment, has something interesting or meaningful to say includes specific evidence and examples rather than vague generalizations. Effective writing is a combination of many factors -appropriate content, a focused purpose, a clear organization, effective expression.

 

 

উল্লেখিত মন্তব্য থেকে আমরা একটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি যা একটি শক্তিশালী অথবা একটি সন্তোষজনক রচনা বহুকিছু উপাদানের সংমিশ্রণ। উপযুক্ত আয়োতন, বিস্তৃত উদ্দেশ্য, সুষ্ঠু সংগঠন এবং শক্তিশালী প্রকাশভঙ্গি ইত্যাদি ছাড়াও আরো অনেক মৌলিক উপাদানের মিশ্রণের ফলে রচনাটি হয়ে উঠতে পারে সর্বব্যাপী গ্রহণীয়। এখন ধরণের একটি রচনা সৃষ্টির জন্যে যে শিক্ষার প্রয়োজন - এখানে অবশ্যই ভেবে নিতে হবে যেÑ রচনাটি প্রকৃত অর্থেই লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ্য, লক্ষ্যটি হলো রচনাটির মাধ্যমে অথবা রচনাটির মর্মবস্তু কথনের মাধ্যমে হলেও সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের জন্যে সমাজের অভ্যন্তরে প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধনের প্রেক্ষিত নির্মাণ। সে শিক্ষাকেই সম্ভবত মানসম্মত শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিষয়টি আপেক্ষিক। একেবারেই নিস্কলুষ প্রশ্নহীন নয়। বিতর্ক সাপেক্ষ। যেহেতু মান সম্মত শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ-এর নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারিত নয়। তার পরেও  ধরণের শিক্ষাকেই যদি মান সম্মত শিক্ষা হিসেবে ধরে নেয়া যায় তাহলে সে শিক্ষা অর্জন এবং ব্যাপক বিস্তৃতির জন্যেই উদ্ধৃত ধরণের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বর্গের ভূমিকা সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে সুদূর প্রসারী প্রভাব প্রক্ষেপের সব চাইতে তী²ধার অস্ত্র হিসাবে অতিশয় নিশ্চিতরূপে গণ্য হবার যোগ্য। তবে তাঁদের পৃষ্ঠপোষনের জন্যে সবার আগে রাষ্ট্র-যন্ত্রকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

সংস্কৃতির একটি বিশেষ শাখাসাহিত্য সাহিত্য চিরন্তন সতোর আঁধার। মিথ্যাচারের কোন অবকাশ নেই সাহিত্যে। যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, আবারও করা হলো কারণে যে, এই সাহিত্য সৃষ্টি যারা করেন তারা সর্বোতভাবে সর্বকালের জন্যেই চেষ্টিত থাকেন মিথ্যাকে পরিহার করতে। কারণ তাঁরা সৃজনশীল। সৃজনের ভেতর মিথ্যা থাকে না, থাকলে সেটি সৃজন হবে নাÑ হবে আরোপিত, মেকী। সেদিক থেকে সাহিত্যিক সমাজ সব সময়েই লক্ষ্য রাখেন ঘটনা প্রবাহের প্রকৃত সত্যসার বস্তুকে উদ্ধার করে সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে পুরো ব্যাপারটিই ঘটে যায় তাদের দায়িত্ববোধের উৎকর্ষতা থেকে। সে অর্থে সাহিত্যিকবৃন্দ অবশ্যই দায়িত্ববান ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেদেরকে দাবি করবার যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু সাহিত্যিকবৃন্দও নির্মিত হন যথাযথ শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে। আক্ষরিক অর্থে সে শিক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকমের হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে হতে পারে ভিন্ন ভিন্নভাবে পাঠ যোগ্য ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে। কারও কারও ক্ষেত্রে বিশাল প্রকৃতির লীলা বৈচিত্র্যের অপরূপ সৌন্দর্যকে নিগুঢ় অনুভব দিয়ে উপলব্ধি করে এবং অধিলৌকিক রহস্যকে উপলব্ধির গভীরতা দিয়ে উদ্ঘাটন এবং সবার সামনে উন্মোচনের বিরামহীন চেষ্টা করে। একই সাথে নিজ চৈতন্যে জীবনের সমাপ্তি পর্যন্ত ধারণ করবার ভেতর দিয়ে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে হতে পারে গ্রন্থ পাঠ এবং প্রকৃতি-রহস্য উভয়ের মধ্যে দিয়ে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে। 

 

মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিটি জীবই প্রকৃতির অংশ-বিশেষ। বিশেষতঃ মানুষের ক্ষেত্রে নগণ্য থেকে সর্বগণ্য পর্যন্ত। সে প্রেক্ষিত বিবেচনায় একজন অখ্যাত কবির একটি বৃহদায়তন কবিতার কয়েকটি পঙ্তি এখানে উদ্ধৃত করা বোধকরি প্রাসঙ্গিক হবে। কবিতাটিতে কবি শ্বাশ্বত মানুসী প্রেমের একটি রূপ অঙ্কন করতে চেয়েছেন। কবি তাঁর মতো করে মানুসী প্রেমের চিত্রকল্প অঙ্কন করেছেন এবং সে চিত্রকল্পের ভেতর দিয়েই মানুষের কাছে একটি অসাধারণ বার্তা পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টাটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে একেবারেই সাদাটে হলেও অন্তর্লোকের অন্তর্গত দৃষ্টিতে অসাধারণ বলে আমার কাছে মনে হবার কারণেই কবিতাটিকে বেছে নেয়া।  

 

কবিতাটিআহা-মরিজাতীয় কিছু নয়। তবুও কবিতাটির বিষয়বস্তুর ভাবগত গভীরতাটি একজন পাঠককে অবলীলায় আকৃষ্ট করবে এবং পাঠকের ভাবনাকে গতিশীল করবে বলেই আমার বিশ্বাস। একবার পাঠ করলে আর একবার পাঠ করবার আগ্রহ জন্মাবে পাঠকের মনে। এবং সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার কারণেই কবিতাটি প্রাধান্য পেয়েছে প্রবন্ধটিতে

রক্তবিন্দু লাল টিপ ললাটে ধরিয়া   

শীর্ণ-কুন্তল শোভা উঠে উথলিয়া;

কে দেখিবে এই রূপ তুমি ছাড়া মম?

শ্রাবনের ভরপূর দূরন্ত যৌবন সম।

কাঁচুলি বিহীন বক্ষ,

গরবে স্ফীত, আর

কনক কিরণে সে যে ফোঁটে বার বার

পীনোন্নত পয়োধর যুগল-

তোমারেই যাঞ্চা করে, না মানি অর্গল।

না মানে ভ্রæকুটি মোর, যতই করি না বারণ,

রাখিতে চাহে না তাহে কিঞ্চিৎ বসন

উন্মুক্ত করিতে চাহে তোমারই লাগিয়া শুধু-

তাহার এই আকিঞ্চণ

কিসের বারণ আর কিসের শাসন!

সুপুষ্ট অধর দুটি তাম্বুল বরনে

উন্মুখ তোমার ঠোঁটে চুম্বনে চুম্বনে

করিতে তোমার ঠোঁট সিক্ত মায়াজালে-

আমার অধর যেমতি রক্ত-আবরণে।

কটিবন্ধে চন্দ্রহার অপরূপ যামিনির শশী

ক্রন্দন করিছে যেন,

কত- কালের উপোসী!

না পেয়ে তোমার দেখা ফিরি চলে নিশীথচারিনী

বড় অসহায় সে যে, বড় অভিমানী-

ক্লান্ত পদভারে।

কি হবে চন্দ্রহারে,

না থাকে যদি এই মধ্য রজনী?

না আসে রজনীতে যদি আমার মুকুট-মনি

আরÑ প্রভাতের দিনমনি ফুটিবার আগে

কি ফল লভিব আমি, আমার নিলাজ আবেগে

আমারই পরিপাটি অনঙ্গ-শয্যায় ?

সকল আয়োজনই হবে নিমগ্ন ব্যর্থচারিতায়।

একি দুর্দশা ঘটিলো মোর ললাট লিখনে-

আছে কি দৈব কিছু দশা লঙ্ঘনে?

কে দিবে উত্তর এই সামান্য জিজ্ঞাসার?

কে আছে এমন জন বিশ্ব পারাবার

আর চরাচর মাঝে?

আসিবে কি সে আমার কাছে,

মনের দুয়ারে বসি উত্তর দিবার?

কতকিছু মনে আসে অকূল পাথার

শুধুই শুন্য, চারিদিকের দৃষ্টিতে আমার।

কারণে কত বার কত দন্ড ধরি,

খুঁজিনু তোমারে আমি বারে বারে মরি।

অবশেষে উছলিত বিপুল জলধির

অতি নীল অশান্ত মত্ত সলিল 

বুকে- ফেলিনু  আনন ছায়া,  

দেখিতে তোমায়;

না হলেও তোমার দেখা, তাতে কী আসে যায় 

তোমার অতি নির্মম নিঠুর অন্তরে হায়!

তবুও তোমারে আমি যে ভাবে দেখিতে চাহি প্রাণ মন দিয়া

অথৈ জলের মর্ম দীর্ণ ভাবিয়া।

অথচ আমারই কৃষ্ণ-ঘন অক্ষিপল্লবে

খোঁজে কি আপন ঠাঁই নিজেরই ভাবিয়া তবে?

পরিশেষে  হলো তাই, লভিলো আশ্রয়

ঝরো ঝরো আঁখিতে মোর, তাহার আলয়

সেই নীলে-রাঙ্গা,

সেই নুনে-মাখা অথৈ জলরাশি।

দিনমান রাত্রিকাল সেই জলে ভাসি।

কেমন বিধান তোমার হে অবোধ বিধি?

নয়নের নোনা জলে শ্যামের সমাধি!

টিপ নাই আছে শুধু ললাটের আগুন,

জলেও নেভে না ততো বাড়ে যত গুণ।

চূর্ণ করি মম দুই হাতের কঙ্কন,

বহুবর্ণে বিচিত্র চিত্রিত অঙ্কন

আমার হৃদয় মাঝে যাহার নীলোক্ত মুরতি 

করিয়াছি আমি। আরও করিয়াছি শুধু তাহারই আরতি।

সে কেন ভাসিছে আমার পরাণ-পূর্ণ তিক্ত ভান্ড ভরি

বিষম সেই নোনা জলে তিল তিল করি?

আমার চোক্ষের তারায় আসিবেই যদি

শবের আধার হয়ে কেন নীরবে নিরবধি?

যে কী নিদারুণ

যাতনা, আমার মনে কত সকরুণ-

দিয়াছ যে তুমি, হে মহান প্রভ?

প্রহর গুণিয়া চলি তোমার নামেই তবু।

কেমনে সহিব আমি মরণ আঁধারে

যে যাতনা দারুণ বিধি দিয়াছ আমারে!

ভাবিয়া দেখি না কুল, সবই যে তমশা অপার,

করুনা ভিক্ষা ছাড়া কিছু নাই আর

কপালে আমার।

জীবনের দীপটি যে ক্লান্ত দেহ লয়ে

জ্বলিতে পারে না আর; অতি ধীর পায়ে

আমার সমুখে       

পড়িছে ঢলিয়া দুখে,

শিখা নিভু নিভু

একবার নিভে গেলে, আর জ্বলিবে না কভু।

কি দিয়াছ তুমি মোরে

হে অসামান্য বাঁশরীর কবি?

নিয়াছ যা কিছু আমার- সকলই হরণ করি-

রজনী দিবসের কম্পমান কত শত

আঁধার আর রৌদ্রের মেলায়।  

বাঁচিবার সাধ আর

পূরণ হলো না আমার

মধ্যাহ্নের অসহায় এই অবেলায়।

      কবিতার পঙতিগুলিকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা যায়। প্রথম স্তরে প্রেমিকার রূপ-লাবণ্য এবং অঙ্গসজ্জার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় স্তরেÑ প্রেমিকার দেহজঃ কামনা পূরণের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় স্তরে এসে প্রেমিকাকে না পেয়ে প্রেমিকের মৃত্যুর পর সে মৃত্যুর জন্যে নিজেকে অপরাধী ভেবে প্রেমিকা কর্তৃক প্রেমিককে খুঁজে না পাবার তীব্র বেদনায় নিজে জর্জরিত হয়ে, নিজেই নিজের কাছে বার বার প্রশ্ন করে উত্তর না পাবার পর ঈশ্বরকে দায়ী করে তার আত্মবিসর্জনের বিষয়টি বিধৃত হয়েছে।

     অত্যন্ত সাধারণ মানের একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্তি বিশেষ। মধ্যযুগীয় কবিদের রচনা পদ্ধতি অনুসরণে রচিত। কবিতাটিতে অসাধারণত্ব কিছু নেই। তবে কবিতাটি অতি সাধারণ হলেও এর রচনা-ভঙ্গিটিই কবিতাটির বিষয়বস্তুর ভাববোধের গাঢ়ত্বকে একটি বিশেষ মাত্রা দান করেছে যা অতি সহজেই একজন পাঠকের প্রাণ কাঁড়ে। ধরণের অনেক কবিতা আমাদের সাহিত্যভান্ডে রয়েছে এবং সে ভান্ডকে পূর্ণ করবার ক্ষেত্রে খুব সামান্য হলেও ভূমিকা রেখেছে।। আবার ধরণের অনেক কবিতাই এবং এর চাইতেও অনেক উন্নত মানের কবিতাও আলোর মুখ দেখতে না পেয়ে অযতœ অনাদরে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কেউ সে সবের খোঁজও রাখেনি কখনও। এমন অনেক রতœ পুঞ্জকেই আমরা পেয়েও হারিয়ে ফেলেছি এবং এখনও হারিয়ে ফেলছি অহরহ শুধু অবহেলা, আর চিনতে না পারার পাশাপাশি অবমূল্যায়ন করবার কারণে।

     শুধু ধরণের কেন এটি তো একটি নগণ্য উপমা মাত্র। অনেকে হয়তো সাহিত্য-জ্ঞানে এটিকে বিবেচনাতেই আনতে চাইবেন না। তার পরেও ধরণের কবিতা আমাদের সাহিত্য ভান্ডারে চিরস্থায়ীভাবে রক্ষিত হবার মোটেই অযোগ্য নয়।  অবশ্যই এর চাইতেও অনেক অনেক উচ্চ মার্গীয় অসংখ্য কবিতা, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং যুগ যুগ ধরে সমৃদ্ধ করতেই থাকবে না হলে কালের ক্রম-পরিক্রমায় শুধু আমাদের সাহিত্য নয় গোটা বিশ্বের সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে না এটিই যুগ যুগান্তরের নিয়ম। যারা করেছেন এবং ভবিষ্যতে করবেন তাঁরাই সাহিত্যিক। কোনো কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা করে অথবা বিনিময়ে কিছু নেবার আকাক্সক্ষা নিয়ে কোনো সাহিত্যিকই কখনই কোনো কিছু রচনা করেন না তাঁরা রচনা করেন তাঁদের উত্তুঙ্গ চৈতণ্যের তাড়না থেকে মানুষ, মনুষ্য-সমাজ তথা জাতির প্রতি তাঁদের প্রচন্ড দায়বদ্ধতা থেকে। জাতির মঙ্গলার্থে সামান্যতম কিছু হলেও তাঁরা অবিরাম লিখে চলেন তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে তাঁদের বাণীবদ্ধ বার্তাটি জাতির কাছে পৌঁছে দেবার জন্যে। এই যে মানুষের কল্যাণ কামনায় মানুষের কাছে দায়বদ্ধ থাকবার অঙ্গিকার এটিই তাঁদের অনিঃশেষ চৈতন্যবোধের অহংকার যে অহংকারটিই তাঁদেরকে পৌঁছে দেয় দায়িত্বশীলতার সর্বোচ্চ শৃঙ্গে।

    উদ্ধৃত কবিতার পঙ্তি টিতে যদিও প্রেমিক প্রেমিকার নিতান্তই মানবীয় প্রেমের চিরায়ত রূপটিকেই চিত্রিত করা হয়েছে। একই সাথে একজন পূর্ণ যুবতীর শরীরী সৌন্দর্য-সুষুমা যেমন নানা উপমা, উৎপ্রেক্ষার ভেতর দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। আরও যেভাবে বর্ণিত হয়েছে প্রেমিককে প্রেমিকার সবকিছু বিলিয়ে দেবার পরেও প্রেমিককে না পাবার বিলাপ ঠিক তেমনি পার্থিব মানবীয় প্রেমের শেষ স্তরে এসে দেহজঃ কামনা পূরণের আকুলিত আকাক্সক্ষাটিও বিধৃত হয়েছে যা মানবীয় প্রেমের ক্ষেত্রে একেবারেই স্বাভাবিক।  কিন্তু তবুও সে চিত্রটিতে একাধারে আকাক্সক্ষা পূরিত না হবার হা হাকারের সাথে আত্মত্যাগের মহিমাও গুচ্ছ গুচ্ছ নীহারিকার অত্যুজ্জ্বল আলোকে ফুটিত হয়েছে। কবিতাটিতে কবি যে বার্তাটি প্রদান করতে চেয়েছেন তা বোধকরি একের প্রতি আর একের নিঃশর্ত আত্মদানের গৌরব।

অর্থাৎ অন্তিম বিশ্লেষণেনিঃশর্ত ভালোবাসা কারণ শর্তাধীন হলে ভালোবাসা কখনই ভালোবাসা থাকে না প্রতারণা হয়ে যায়। সে প্রেক্ষিতেই একের প্রতি অপরের নিঃশর্ত ভালোবাসা না থাকলে কারও পক্ষেই কারও জন্যে কখনই আত্মদান করা সম্ভব নয়। এই আত্মদানের স্পৃহাটিকে মানুষ যদি তাদের জীবনের প্রতি বাঁকে বাঁকে যে কোনো সঙ্কটে অথবা ক্রান্তিকালে মানুষকে শর্তহীন ভালোবেসে প্রয়োগ করতে সক্ষম হন তাহলে মনুষ্য-সমাজের মূল্যবোধটি একটি ভিন্ন মাত্রার উচ্চতায় উন্নীত হতে পারবে। একজন কবি একজন দায়িত্বশীল মানুষের ভূমিকা নিয়ে ধরণের শিক্ষামূলক বাণীটিই তাঁর কবিতার মাধ্যমে সমাজকে প্রদান করতে চেয়েছেন যেটি একজন কবি অথবা সাহিত্যিকের অবিমিশ্র দায়িত্বশীলতারই স্ফুরণ নিঃসন্দেহে।

    তাহলে এতক্ষণ ধরে আমরা যে বিষয় দুটির ওপর আলোচনা করলাম মানসম্মত শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রাসংগিক অর্থেই আলোচনার উপান্তে এসে ধরণের একটি সিদ্ধান্তে আসা যায়, যে শিক্ষা সমাজ বির্বতনের ধারায় অব্যাহতভাবে অগ্রসরমান চিন্তা প্রবাহের বিস্তার করে চলেছে অবিরাম মানব কল্যাণের লক্ষ্যে- তাই মানসম্মত শিক্ষা। এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসাবে সে ধরণের ব্যক্তি বর্গকেই চিহ্নিত করা যায় যাদের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং সুদৃঢ় মূল্যবোধের উৎসারণ থেকে মানব কল্যাণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সমাজ উন্নয়নের দায়ভার বহন করবার প্রচন্ড শক্তি এবং সামর্থ্যরে নিয়ত স্ফুরণ ঘটতে থাকে সূর্যালোকের মত অবিরত সেই সব ব্যক্তিদের চৈতন্যলোক থেকে তাদেরকেই। এবং দুটি বিষয়কে নিজ বক্ষে ধারণ করে বিষয় দুটির ঔজ্জ্বল্যকে প্রসারমানতার সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে দেবার জন্যেই সাহিত্যের প্রাসঙ্গিক অনিবার্যতা। সাহিত্য ব্যতীত অন্য কোনো মাধ্যমের যা মোটেই নেই। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর এত স্বল্প পরিসরে আলোচনা করে সর্বতোভাবে একটি Concentrated সিদ্ধান্তে আসা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। তার পরেও একটি কথা নির্দ্ধিধায় বলা যেতে পারে যে, মানসম্মত শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি উভয়েই একে অপরের পরিপূরক। কারণে যে- যেমন মান সম্মত শিক্ষা ব্যতীত কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সৃজন সম্ভব নয়। ঠিক তেমনি একই ভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তির সৃজনশীলতা ছাড়াও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণও সর্বার্থেই অসম্ভব। তবে সবার আগে নির্ধারণ করতে হবেমানসম্মত শিক্ষাএবংদায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ’-এর সংজ্ঞা। এবং সংজ্ঞার ভেতরেই নির্ণিত থাকতে পারে মানসম্মত শিক্ষার পরিধি এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের বিচরণের ক্ষেত্রভূমির সীমানা। যেহেতু শিক্ষা এবং দায়িত্ব দুটি বিষয়ই বহুমাত্রিক। 

 

একটি ছোট্ট উদাহারণ দেয়া যাক ধরা যাক, কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পাঁচটি প্রশ্ন দেয়া হলো এবং প্রতিটি প্রশ্নের মান নির্ধারণ করে দেয়া হলো পাঁচ নম্বর করে। অর্থাৎ প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরকে পাঁচ নম্বর করে অর্জন করতে হবে। উত্তর প্রাপ্তির পর দেখা গেলো কোনো কোনো শিক্ষার্থী এক থেকে পাঁচের মধ্যে নম্বর অর্জন করেছে। কোনো শিক্ষার্থী হয়তো কোনো নম্বরই অর্জন করতে পারে নি। সে ক্ষেত্রে উত্তরটির অর্জিত নম্বরটির মাত্রাটিই নির্ধারণ করবে প্রশ্নটির মাত্রা অনুযায়ী উত্তরটি কী পরিমাণের সঠিক অথবা বেঠিক হয়েছে। অর্থাৎ  উত্তরটির সঠিকতা, বেঠিকতার মাত্রা নির্ভর করবে প্রশ্নটির নির্ধারিত মাত্রার ওপর। এবং সে বিবেচনায় প্রশ্ন এবং উত্তরÑ উভয়েরই সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়োজনটি হবে অবশ্যম্ভাবী।

বস্তুত আর একটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা অবশ্যই অনিবার্য যে, যদিও যেমনভাবে মানসম্মত শিক্ষার কোনো সংজ্ঞা এবং পরিধি নির্ধারণ করা হয়নি ঠিক তেমনিভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরও কোন প্রকারভেদ বা শ্রেণী-বিন্যাস এবং সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয় নি। পাশাপাশি তাদের বিচরণ ক্ষেত্রের সীমাও নির্ধারণ করা হয়নি। সেইহেতু সে সব ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষার পরিধি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার স্তর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ধরে নেয়া যেতে পারে। এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিষয়টিও প্রকার বা শ্রেণী নির্বিশেষে বিবেচ্য হতে পারে। চলমান প্রবন্ধে মূল বিষয়টির ওপর সেভাবেই আলোচনা করা হয়েছে। অতঃপর উপসংহারে এসে আমরা এভাবেই একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, সমাজের সার্বিক কাঠামোগত অবয়বের উর্দ্ধতম এবং শক্তিশালী পরিবর্তনের জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা Irresistively Unquestionable, ঠিক তেমনি দায়িত্বশীল ব্যক্তি নির্মিতির ক্ষেত্রেও মানসম্মত শিক্ষার ভূমিকা Most Definitely In-ignorable. একই সাথে মানসম্মত শিক্ষার সঠিক এবং সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়টি নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা রক্ষণের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের মৌলিক ভূমিকা বি¯তৃত এবং ব্যাপক পরিসরে পালন করাও প্রশ্নাতীতভাবে স্থিরীকৃত। এখানে একটি বিষয়কে অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে যে, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা এবং উদ্যোগ গ্রহণ ব্যতীত শুধুমাত্র ব্যক্তি উদ্যোগ কখনই সফলতার মুখ দেখবে না যেহেতু ব্যক্তি উদ্যোগটি হবে খন্ডিত, বিক্ষিপ্ত যেখানে রাষ্ট্রিয় উদ্দোগটি এই বিক্ষিপ্ত খন্ডিত অংশগুলিকে একত্রিত করে অখন্ডিত আকৃতিতে রূপ দানের একমাত্র যোগ্য যন্ত্র হিসেবে গণ্য হবার সবচাইতে অধিক ক্ষমতার অধিকার সংরক্ষণকারী।

আর তাহলেই কেবল মানসম্মত শিক্ষক তথা দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করণ সম্ভব হয়ে উঠতে পারে, যাদের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষায় জাতিকে শিক্ষিত করে তুলবার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। এবং এই নিশ্চিতিই ব্যক্তি থেকে সামষ্টিক পর্যায় পর্যন্ত দায়িত্বশীল হবার বিষয়টিকেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের চেতনায় আঘাতের পর আঘাত করে প্রোথিত করণের মধ্যে দিয়ে যথার্থ শিক্ষার মহাসড়কটিতে উঠবার রুদ্ধ দরোজাটিকে উন্মুক্ত করে দেবে। ফলতঃ জাতি তখন নিশ্চিতরূপেই অগ্রগামীতার পথে অগ্রসরমান হবার আহবান নিজের অন্তর থেকেই অনুভব করবার সক্ষমতা অর্জন করবে। মূল বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে এটিই সর্বশেষ কথা। 


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান