নতুন শতাব্দীতে বুদ্ধিজীবীদের ও বুদ্ধিবৃত্তির রূপান্তর // কাদের চৌধুরী
$post->title

অনুকথাঃ- ‘Debate is the art of intellectual dishonesty ‘. এবং চিন্তাই হল মানুষের জানার শ্রেষ্ঠ আনন্দ ।
একবিংশ শতকে বুদ্ধিজীবীদের ভুমিকা কী ? রাষ্ট্র ও জনগনের নিকট আজ তারা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? তাদের ভূমিকা ও গুরুত্ব কি ক্রমহ্রাসমান ? তা হলে কী করা উচিত? এরা যদি বাঙ্গালী বুদ্ধিমত্তার চুনি- পান্না হন, মানতেই কি হবে জাতি হিসেবে বাঙালি ক্রমশ অধোগামী, না-কি অন্য কিছু ?

পটভূমিঃ- গত চার-পাঁচ দশকে বৈশ্বিকতার বিপরীতে উগ্র জাতিয়তা, কমিউনিজমের পতনের পর মানবতাবাদের বিপরীতে উগ্র মৌলবাদ, উদারবাদের বিপরীতে সংরক্ষনবাদ, উত্তর-দক্ষিন গোলার্ধে গনতন্ত্রের দুরাবস্তা, সনাতন প্রথার হতে নারী মুক্তি, প্রথাগত আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের পরিবর্তে ধারাবাহিক অ-প্রথাগত স্থানীয়/আঞ্চলিক যুদ্ধ ইত্যাদির ক্রমাগত উত্থান ও প্রসার স্পষ্টভাবে লক্ষ্নীয়। বিশেষতঃ সাম্প্রতিক বৈপ্লবিক বিকাশের প্রধান চালিকা শক্তি হিসাবে, বিশ্ব অর্থ-ব্যবস্থায় বস্তগত পুঁজির (অর্থ ও শ্রম- মেশিন ও মানব) পাশাপাশি ‘দলবদ্ধ উদ্ভাবনী মেধা’ (ইলেকট্রনিক তথ্য ও কৃত্তিম মেধা)-এর শক্তিশালী প্রসার আজ প্রায় অপ্রতিরোধ্য ও নিয়ামক। বৃহৎ বানিজ্যিক কর্পোরেশনগুলোর আগ্রাসী চ্যালেঞ্জ প্রেক্ষিতে প্রায় এক শতকের রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক/কূটনৈতিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের ক্ষমতার ভারসাম্য লক্ষনীয় ভাবে ঝাঁকুনি খাচ্ছে, নড়বড়ে হচ্ছে । বিশেষায়িত ও শৃঙ্খলিত জ্ঞান-বুদ্ধি সংখ্যালঘিষ্ঠ ধনীদের হাত হতে উল্লেখযোগ্য ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের হাতে আসছে। এ প্রেক্ষাপটেই বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে উপরুক্ত প্রশ্নগুলো এখানে বিবেচ্য । বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা এবং দায়িত্ব পুনঃযাচাই এবং পুনঃসংজ্ঞায়িত করার সময়ও হয়েছে।
বুদ্ধিবৃত্তির ভূমিকা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মত দার্শনিকদের - যারা সরকার, সমাজবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞান নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন- থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক - যেমন নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) এবং কর্নেল ওয়েস্ট ( Cornel West) - যারা আজ সাধারণ সত্যকে উজ্জলতর এবং গনমানুষের কাছে উম্মুচন করছেন - তাদের পর্যন্ত ।
উনবিংশ শতকে ইউরোপে যখন ইংল্যান্ডের মত সাধারণ শিক্ষা প্রচলন ছিল, তখন যারা সাহিত্য বিষয়ে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কোন বিশেষ জার্নাল, কবিতা, নাটক বা প্রবন্ধ রচনা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের ‘পণ্ডিত’ (Man of Letters) বলা হত। বিংশ শতকে এই কাজটা একাডেমিক বৃত্তে আরও বিস্তৃত ও বিশেষায়িত হওয়ায় তাদের ‘বুদ্ধিজীবী’ (Intellectual) বলে আখ্যায়িত করা হয়।
আধুনিক কালে বিভিন্ন ব্যাক্তি বিভিন্ন সময় ‘বুদ্ধিজীবী’ কে, কি বা কেমন, -তা নিরূপণের চেষ্টা করেছেন।
১- বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদে বিশেষজ্ঞ, তাঁরা মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলকারীদের পরামর্শক, তাঁরা মতাদর্শগত প্রশাসক, ক্ষমতাসীন প্রতিপক্ষ হতে সর্বাধিক হুমকির সম্মুখীন (Noam Chomsky) ।
২- বুদ্ধিজীবীরা হল পৃথিবীর চোখ ( "world's eye.")। বুদ্ধিজীবীরা অতীতের পুরাতন ধারনা-চিন্তা হতে নুতন চিন্তার সূত্রপাত করেন। তা পরে জনগণকেও বলেন, -শুধু বন্ধুদেরই নয়। বিকাশের সুত্র ও কৌশল তিনি শুধু বইয়ের মাঝেই বন্দী করেন না। মাঠে কিভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়, তার উদ্যোগ ও নির্দেশনাও দেন। নিষ্ক্রিয়তা মানে কাপুরুষতা । ( Emerson)
৩- বুদ্ধিজীবীদের কাজ হচ্ছে, মানুষের জ্ঞানের প্রসার করা ও স্বাধীনতাকে মজবুত করা । তার কাজ হল, সমাজে থেকেই এর সংস্থা, গোত্র বা গোষ্ঠীর বিশ্বাসের বাহিরে গিয়ে একাকী হলেও ঘুনে ধরা পুরান ব্যাবস্থাকে আঘাত করা, প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা। বুদ্ধিজীবীর প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে তার আদর্শের প্রতি। আদর্শ হবে বৃহত্তর সমাজের কল্যান।( Edward Said)
বুদ্ধিজীবীরা গড়পড়তায় তিনটি শিবিরে বিভক্ত:- সরকারী(বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে ), স্বতন্ত্র (বেসরকারি) এবং দ্বৈত বুদ্ধিজীবী ।
প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত রাষ্ট্রীয় দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংস্থা, মিডিয়ায়, যারা গবেষণা, লেখালেখি, এবং সেমিনার, টক-শো’তে রাষ্ট্রের সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুল-ছেড়া বিশ্লেষণ করে করতৃপক্ষ ও জনগণের সামনে দেশ-কল্যাণকর অভিমত ব্যক্ত করেন। ইদানীং মনে হয়, এই প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ক্রম-হ্রাসমান, -বিশেষত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ।
স্বতন্ত্র বুদ্ধিজীবীরা মূলত বেসরকারি ব্যক্তিগত গ্রুপ, ফাউন্ডেশন, মিডিয়ায় বা ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থে তাদের বুদ্ধি ব্যবহার করেন । যেমন, ‘রকফেলার ফাউন্ডেশনে’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর মার্টিন এল. লেইবাউৎজ (Martin L. Leibowitz)।
দ্বি-চারী বুদ্ধিজীবীরা উপরুক্ত দুই ক্ষেত্রেই নিযুক্ত থাকেন । যেমন, আমেরিকার রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে বিশিষ্ট দ্বৈত-বুদ্ধিজীবী হলেন জিগনিউ ব্রাজেজিনস্কি Zbigniew Brzezinski । তিনি হার্ভার্ড এবং কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে আসছেন, এবং ইত্যবসরে জন এইচ. হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়েও নিযুক্ত হয়েছেন। একই সাথে তিনি ‘ত্রি-পাক্ষিক কমিশনে’র সহ-প্রতিষ্ঠাতাও, - যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করে। এরা বেশ ক্ষমতাধর ও নাগরিক সমাজে বেশ প্রভাবশালী ।
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক আদর্শের নিরিখে তিন প্রকার বুদ্ধিজীবী:- অনুগত সমর্থক , সংস্কারপন্থী এবং প্রতিবাদী বামপন্থী ।
অনুগত বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতাসীন ব্যবস্থাকেই বহাল রাখতে চায়। এরা সাধারণত এর থেকে ব্যাক্তিগত বৈধ-অবৈধভাবে সুবিধাভোগী । এদের নিকট দেশ ও জনগণের স্বার্থ গৌণ । এদের কাজ হলঃ যেমন বিভিন্ন সংস্থায় পদগুলো করায়ত্ব করা, ক্ষমতাশালী ‘থিঙ্ক ট্যাংকে’ বসে নীতি গঠনে সরকারকে সহায়তা করা, দান-দক্ষিনা- পুরষ্কার-বিদেশ ভ্রমন, উন্নত আয়েসী জীবনের সুযোগ নিজের ও স্বজনের জন্য আদায় করা। পেশায় আগেকার দিনের বুদ্ধিজীবীরা মিথ্যা বলতে ভয় পেত, নীতিভ্রষ্ট হবে বলে। আর এখনকার বুদ্ধিজীবীরা সত্য বলতে ভয় পায়, রোজগার মরে যাবে ভেবে । হুমায়ুন আজাদ এই শ্রেনীর বুদ্ধিজীবিদেরই সম্ভবত ‘গৃহপালিত’ বলেছিলেন।
সংস্কারপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও সাধারণত কায়েমী ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন । তবে এরা এতে কিছু কিছু সংস্কারও চান । বহু বিচিত্রের মাঝে সমতা, ন্যায়বিচার, প্রাকৃতিক পরিবেশ, কুসংস্কার মোচন এবং মানবাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে। বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া, বেসরকারী ‘জ্ঞান-অন্বেষা কেন্দ্রে’র ( think tank) চিন্তকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংস্কারপন্থী বুদ্ধিজীবী। এরা নিজেদের মনে করেন, তারা গণ্যমান্য নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বশীল।
প্রতিবাদী বাম-বুদ্ধিজীবীরা – কট্টর বিপ্লবী না হয়েও - কায়েমী শোষণমূলক কাঠামোর দোষ-ত্রুটি সমালোচনা করে দুর্বল তৃণমূল জনগণের জন্য বিকল্প কাঠামোর প্রস্তাব করেন । এরা সাধারণত বিশেষ আদর্শ নিয়ে কাজ করেন। প্রায়শ ডানপন্থী বা প্রগতিশীল বামপন্থি হিসাবে । সমাজের মৌলিক পরিবর্তন চান। ১৪ই ডিসে. ১৯৭১ ও এর আগে-পরে অনেক মেধাবী ও দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছিলেন । তাদের অনেকই ছিলেন এই ধারার গন-বুদ্ধিজীবী, প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী। তারা যদি বেঁচে থাকতেন, সদ্য স্বাধীন দেশের পরবর্তী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের রূপ, গতি ও শক্তি হয়ত ভিন্নতর হতে পারত। আজ হয়ত দেশ ভিন্ন অবস্থায় দাঁড়াত।
প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীরা এ একবিংশ শতকে এক বিপদগ্রস্থ প্রানী । এমনটা প্রাচীন কালেও ছিল। গ্রীসের সক্রেটিসের কথাই ধরুন। দর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার ইতিহাস শুরুই হয়েছিল সে দিন, যে দিন সক্রেটিস তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দানকারী বিচারকদের সামনে নিজের সামাজিক ঐতিহ্যের বৃত্তের বাহিরে এসে গ্রীক বিশ্বাস ও নৈতিকতা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, যা ছিল সাহসী স্পর্ধার । নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তৎকালে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী দার্শনিক। বিদ্রোহ বা প্রতিবাদ হল সর্বকালের প্রগতিবাদী বুদ্ধিজীবীদের বৈশিষ্ট।
স্বাধীনতার পর হতেই যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অবস্থা, অর্থনীতিক দুরাবস্তা, দমন নিপীড়ন; অন্যদিকে অঢেল অর্থ- স্বার্থ-লোভ, দেশে-বিদেশে পদ-পদবী টোপ দেয়া-নেয়া ইত্যাদি কারনে অনেক বুদ্ধিজীবীই পেশগত দিক হতে দুঃখ জনকভাবে বিচ্যুত হয়েছেন বা হচ্ছেন। অধিকাংশই ক্ষমতার ‘অনুগত’, কেউ কেউ ক্ষমতা ও জনতার মাঝামাঝি অবস্থানে দোলাচলে নিজেদের পেশগত চর্চাকে ধুয়াশাচ্ছন্ন করেছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এর বড় কারন ছিল যে, (~ ১৯৭৪ হতে ~ ‘৮০র দিকে ) দেশে কট্টর ও বিপদজনক রাজনৈতিক মেরু করন হওয়া । তখন দেশে বাম সমাজতান্ত্রিক ধারাসমুহের রাজনীতি – যা পাকিস্তান আমলে ধীরে পুষ্ট হচ্ছিল – করুন ভাবে রুগ্ন ও দুর্বল হয়ে যায় । কেউ কেউ অবশ্য বামপন্থী মুখোসও পড়ে নিয়েছেন। ফলে যারাই বা প্রগতিশীল প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী ছিলেন, তারাও সাহস ও সমর্থন না পেয়ে নীরব হয়ে যান। মূল স্রোতের মিশ্র-চরিত্রের বড় দলে ভিড়ে যান। ফলে, বামপন্থী বুদ্ধিবৃত্তি তেমন জোরদার হয় নি;
বরং বিপদের সম্মুখীন হয় ।
তথাপি, ভরসা ও সাহসর কথা হল, বিগত আশি ও নব্বুই দশকের দিকে দ্বিতীয় প্রজন্মের কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবীরা নুতন ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তৃনমূল জনগণের কাছাকাছি আসতে সচেষ্ট ।
বুদ্ধিজীবীদের প্রথম ও প্রধান কাজ হয়, গবেষণা করে সাধারণ জনগণের স্বার্থে নির্ভেজাল সত্য উদ্ঘাটন করা। প্রধান উদ্দেশ্য হয়, ভুক্ত-ভোগী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে নিজেদের অর্থনীতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার গুলো সম্মন্ধে সচেতন করা। অতীতের পুরানো ধ্যান-ধারনা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তৃণমূল জনগণকে আলোকিত করা । কি উপায়ে সে সকল অধিকার অর্জন করা যায়, তা-ও ব্যাখ্যা করা।
প্রত্যেক জীবই চিন্তাশীল, মানুষ সামাজিক রাজনৈতিক চিন্তাশীল। বুদ্ধিজীবীদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রবণতা থাকতেই পারে । তবে খেয়াল রাখা উচিত, তা যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে হতাশ না করে। তাই বুদ্ধিজীবীদের কাজে নিজেদের আদর্শগত প্রভাব একেবারেই কাট করা অচিন্তনীয়।
একবিংশ শতকের বিস্ময়কর শক্তি হল, নয়া প্রজন্মের টেক-বুদ্ধিজীবী শ্রেনীর দ্রুত ও শক্তিশালী উত্থান।
নয়া টেকনো-শ্রেনীঃ- গেল শতকের আশির দশকে পুজিবাদী শাসকশ্রেণীর ডাকে উঠে আসে এই ‘ভেক্টরবাদী শ্রেণি’ (vectoralist class)। সাধারণত উৎপাদিত পন্যের সংখ্যা, গতি ও মান এবং বাজারজাতকরন, এমন কি কেনা-বেচায় মুদ্রা-প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এরা ; - তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে । তারা ডাটাবেজ, প্রবাহ এবং স্টোরেজের সম্ভাব্য ‘ভেক্টর’ (সংখ্যা, গতি ও মান – যেমন; কাঁচামালের বা পন্যের ) , মেধা-সম্পত্তি আকারে, পেটেন্ট এবং কপি-রাইট ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে ।
বিশ্ব অর্থ-ব্যবস্থার আভ্যন্তরীণ সংকট, আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা, শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ইত্যাদির ফলে বিশ্ব পুঁজিপতিরা এই টেক-বুদ্ধিজীবী শ্রেনী সৃষ্টিতে মদদ দেয় । (যদিও তা শুরুতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, পরে সামাজিক অর্থনীতিক ক্ষেত্রে আসে । ) সাবেক সামন্তপ্রভুদের পেছনে হটিয়ে একদা যেমনি পুঁজিপতিরা (শিল্প + ব্যাংক) ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়েছিল, তেমনি তথ্য-প্রযুক্তিবিদরাও সম্প্রতি সেই রুগ্ন সামন্তপ্রভুদের বিদায় করে তাদের স্থান দখল করেছে । রাষ্ট্র -সমাজের মৌলিক কাঠামোতে এই টেক-বুদ্ধিজীবী শ্রেনী ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে ; এমন কি প্রধান শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বীও হচ্ছে, সরকারেরও মোকাবেলা করছে ।( যেমন; এসেঞ্জ, মাইক্র-সফট, ফে. বু. ইত্যাদি)।
শিক্ষিত ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে চিন্তা-জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও দক্ষতা দ্রুত প্রসার লাভ করে। সামাজিক জ্ঞান এ ভাবে নির্দিষ্ট কিছু কায়েমী বুদ্ধিজীবীদের হাতে বন্দী না থেকে তৃণমূল সমাজে বিস্তৃত হচ্ছে ও আরও হবে । ফলে সনাতন বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক গুরুত্ব এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়ত আগের মত থাকবে না । কমতেও পারে।
লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, তথ্য-প্রযুক্তির বিষয়টা রিকারডো ( Richardo) তো নয়ই, এমন কি মার্ক্সও (Marx) অনুধাবন করেন নি, বা করতে পারেন নি । এমন ধারনা করাও হয়ত বাড়াবাড়ি হবে না যে, এই টেক- বুদ্ধিজীবীরা কয়েক দশকেই হয়ত এ গ্রহকে আশ্চর্যজনক ভাবে আরও অনেক বদলে দেবে।

উপমহাদেশঃ- বাংলায় আধুনিক বুদ্ধিজীবীদের (intelligentsia) -র সন্ধান পাওয়া যায় উনিশ শতকের প্রথমভাগে। সে সময় রাজা রামমোহন রায় এবং ‘ইয়ং-বেঙ্গল’ , – পাশাপাশি ‘অনুশীলন’, যুগান্তর’, ‘ভারতীয় গননাট্য সংঘ’ ইত্যাদি - নামে একটি আধুনিক শিক্ষিত গোষ্ঠী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে অন্যতম ছিল। হিন্দু ও বৌদ্ধ যুগে তখন বুদ্ধিজীবী বলতে যাজকদেরই বোঝানো হতো এবং তাঁরাই এক অর্থে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। সমাজে তাঁদের আধিপত্য বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার ছিল বর্ণ প্রথা ও অন্যান্য। এর ফলে বিদ্যা চর্চা সাধারণত হিন্দু সমাজের উচ্চ বর্ণ ব্রাহ্মণদের ( হাতে গুনা ক্ষত্রিয়রা) মধ্যে সীমিত ছিল ।
ইংরেজ উপনিবেশ-পূর্ব যুগের বুদ্ধিজীবীরা রাজকীয় ভাষা ফারসি এবং ধ্রুপদী ভাষা সংস্কৃত ও পালিতে সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়াবলী নিয়ে লিখতেন। লিখাগুলু সাধারণত যাজক ও শাসক সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করে লেখা হতো। সাধারণত অজ্ঞ নিরক্ষর ভারতীয় জনগণকে খুশী করার চেয়েও, বিদেশী শাসকদের খুশী করাই এদের মুখ্য বিষয় ছিল।
এমন কি বাংলার প্রথম আধুনিক ব্যক্তিত্ব বলে কথিত রামমোহন রায়ও তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘তুহফাত-উল-মুউয়াহহিদ্দীন’ রচনা করেছেন আরবী মিশ্রিত ফারসিতে। অন্যান্য হিন্দু পন্ডিতরাও চিকিৎসাবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতিষ, ধর্ম, সমাজ ইত্যাদি বিষয়ে লিখেছেন সংস্কৃতে। তখন দেশীয় বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নিজস্ব ভাষায় উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু লেখেন নি ।
প্রথম দিককার বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের মৌল প্রেরণা লাভ করেন - উপনিবেশিক শাসকদের শিল্প – সাহিত্য – দর্শন -বিজ্ঞান , ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ ও ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ হতে । তখন কলকাতা ছিল নব্য-বুদ্ধিবাদের কেন্দ্রস্থল। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে তাঁদের হিতকারী বিবেচনা করেছেন। রামমোহন রায়, রাজা রাধাকান্ত দেব, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা ইংরেজদের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন। ভারতীয় প্রতিপক্ষ বুদ্ধিজীবীদের কথা আলাদা। কেউ ধর্মের আশ্রয়ে, অন্য কেউ উগ্র নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে বৃটিশ-রাজ বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন।
উপমহাদেশের সে সব বিচিত্র চরিত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ফলাফল বা প্রভাব পরবর্তীতে সুদূর প্রসারীত হয়ে আজও প্রবাহিত হচ্ছে।

বৃটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্বরাজ তথা ‘৪৬এ ভারত স্বাধীনতার বার্তা, ঢাকায় ‘৫২তে ভাষা আন্দোলন, ’৬২-‘৬৪তে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ‘৬৯এ স্বাধীকার আন্দোলন , তথা ‘৭০এ স্বাধীনতা আন্দোলন সাধারন ভাবে প্রথমত জাতীয়তাবাদী বাম বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা প্রসুত ছিল। পরে রাজনীতিবিদ সহ অন্যান্য পেশজীবীরা সে সব আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সফলতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছান । এখানে তির্যক প্রশ্ন হল, স্বাধীনতা লাভে পর বিভিন্ন সংকট কালে বুদ্ধিজীবীরা কি সেই পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য এ যাবত প্রশ্নাতীত ভাবে পালন করে আসছেন? রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বৈরাচারীদের বিভিন্ন ডামাডোলের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ কালে জনগণের মাঝে সুস্থ মতামত গঠনে বুদ্ধিজীবীরা কি ব্যর্থ ছিলেন ?
বিপদজনক ভাবে তখন পরিলক্ষিত হয়, কিছু গর্হিত ও বিতর্কিত অপব্যাখ্যা ও প্রচারাভিযান - যেমন, ইতিহাস বিকৃতি, স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ ব্যাক্তিত্বদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার, ধর্মতাত্ত্বিক জাতীয়তার নব নব সংস্করণ, এমন কি ‘ জনগণ স্বাধীনতার মূল চালিকা শক্তি’- ইতিহাসের এই মৌলিক সত্য পদদলিত করে ব্যাক্তি গোষ্ঠীর বংশ-গৌরবকে বিশ্বে অভূতপূর্ব কায়দায় ফুলিয়ে-ফাফিয়ে জনগণের মগজে পুটলা বেঁধে পুতে দেয়া ইত্যাদি। ফলে দেশ জাতী বহুধায় বিভক্ত হয়েছে, তাতে মারা-মারি কাঁটা-কাটি হচ্ছে। অন্যান্যদের কথা বাদ দিলেও, দেশের বুদ্ধিজীবীরা কি এর দায় এড়াতে পারবেন ?
যাক, এ যুগে ‘বুদ্ধিজীবি’ শব্দটাতেই কারো কারো নাক ছিটকানোর ভাব পরিলক্ষিত । কারো মতে, এটা বিভাজন সৃষ্টি করে মাত্র। কেউ বুদ্ধিমান আর বাকিরা বোকা ? এ রকম ঠিক নয়। মানবসভ্যতার বিবর্তন একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল।
কেহ হয়ত প্রশ্ন তুলতে পারেন, ‘বুদ্ধিজীবী’ কি কোন পেশার নাম? না। কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কারুজীবী, গায়ক, আলেম-পণ্ডিত প্রমুখরা হন পেশাজীবী। নিজ নিজ ক্ষেত্রে জটিল জ্ঞান-দক্ষতা বিক্রি করে অর্থোপার্জন করে তারা জিবিকা নির্বাহ করেন। তাই বলে যদি তাদের ‘‘বুদ্ধিজীবী’ নামে ডাকতে হয়, তা হলে – একজন ফুটবল খেলোয়াড় – শারীরিক কৌশলী কর্মী- যে মাঠে সুযোগের দীর্ঘ অপেক্ষায় থেকে যখন দেখলেন প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের বাম দিক অরক্ষিত, সে দিকেই চট করে বুদ্ধি করে বল সুট করে গোল করে নিজ দলকে জিতিয়ে দিলেন, সে অর্থে কি সে-ও ‘বুদ্ধিজীবী’ নয় ? এক মাত্র পরজীবীরা বাদে, সকল পেশাজীবীরাই ‘বুদ্ধিজীবী’ । সুস্থ চেতনাশীল সকল প্রানীই নির্দিষ্ট মাত্রার ‘বুদ্ধি’ নিয়েই সাধারণত জন্ম লাভ করে। জীবন যাত্রায় বিভিন্ন কর্মেই তার বিকাশ হয়।

উপমহাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাক্তিগত বুদ্ধিজীবীরা স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্য প্রণোদিত রাজনৈতিক দলভুক্তি , কিংবা -সম্প্রদায়-গোষ্ঠী, ধর্মে-বর্ণে, বিদেশী-বলয়ে লেজুর হবার কারনে সততা, নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ ভাবে পেশাগত কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে হয়ত তারা তেমন মনোযোগী না । ফলে, জনগণের শ্রদ্ধা ও আস্থা হারাবার ঝুঁকিতে নিপতিত হচ্ছেন । অন্য দিকে প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীরাও ক্ষমতাবান মহলের নিপীড়ন ও আক্রমণের ভয়ে প্রায় নির্জীব। রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যানে এসব বুদ্ধিজীবীরা সৎ ও ন্যায্য অভিমত অবাধে পোষনের তেমন কোন সুযোগ পান না।
গেল শতকের আশির দশকে - কমিউনিস্ট –উত্তর সময়ে - ইউরোপে, বিশেষত পূর্ব ইউরোপে বুদ্ধিজীবীদের প্রতি জনগণের মাঝে স্পষ্টভাবে এক নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। এদের অবাস্তব ও কাল্পনিক ধ্যান-ধারনার কারনেই এ সব সাধারণ বুদ্ধিজীবীরা হাস্যস্পদে অবনমিত হন। কেহ কেহ মনে করেন, বুদ্ধিজীবীরা ক্ষেত্র বিশেষে এমন কি ক্ষতিকারকও । কারন, তারা চলমান আর্থ-সামাজিক ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করতে অক্ষম।
গণমুখী বুদ্ধিজীবীরা -অসংগত ও অন্যায্যতার বিরুদ্ধে জনগণকে প্রশ্ন করার প্রতিবাদ করার সাহস ও শিক্ষা দিতে; -আদর্শ ও বৃহত্তর সমাজের স্বার্থে, সুবিধাবাদী বৃত্ত হতে প্রয়োজনে বের হয়ে, সংশ্লিষ্ট জনগণের মাঝে এসে নীতি-আদর্শ সম্মিলিত ভাবে মাঠে ময়দানে প্রয়োগ করতে হবে। আধুনিক জ্ঞানকে একান্ত নিজের মুঠোয় বন্দী না রেখে নিম্নতলার সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তবে টেক- বুদ্ধিজীবী শ্রেনীর দাপটে সনাতন বুদ্ধিজীবীরা যে রাতারাতিই অবসর গ্রহণ করতে হবে, তা-ও সম্ভব নয়। কারন, টেকনোলজির মানবিক অনুভূতি নেই, সৃজনশীল চিন্তা করতে পারে না, কল্পনা করতে পারে না, স্বপ্ন দেখতে পারে না; - যা মানুষ পারে । হ্যা, টিকে থাকতে হলে, সনাতন বুদ্ধিজীবীরা নিজের পরিবর্তন করতে হবে – বৃহত্তর সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের সাথে মিলে, সৃজনশীল ও দলবদ্ধ ভাবে নব নব ধারনা নিয়ে, তা দ্রুত প্রয়োগ করে, ‘ডাইনোসর যুগে’র (!) মগজের ‘চিন্তা-সুত্র’ ( Mind set) ঝেড়ে ফেলে, একচেটিয়া ‘অতীতে’র কীর্তন ত্যাগ করে ভবিষ্যতের দিকে নিবেদিত হতে হবে বলে মনে হয়।
ভুললে চলবে না যে, আধুনিক মানব-সভ্যতায় ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লব সহ অনেক প্রগতিবাদী বিবর্তনের পেছনে গন-বুদ্ধিজীবীরাই ছিলেন অগ্রনী পুরুধা, -যারা রাজনীতিক, সৈনিক ও সাধারন জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ।

# ১৩জানু.২০২০
(লেখক স্বত্ব সংরক্ষিত)


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান