শূন্যতার গভীরে / ড. কাজী ইকবাল জামান
$post->title

 

(এই গল্পে কিছু প্রাপ্তবয়স্কতা আছে। যাদের বয়স আঠারোর নীচে, দয়া করে তারা পড়বেন না। গল্পটি যদিও প্রথম পুরুষে লিখা, পুরু গল্পের স্থান, কাল ও চরিত্রগুলো কাল্পনিক। বাস্তবে কারো জীবনের সাথে মেলানোর চেষ্টা করবেন না।)

 

কিছু সুন্দর বুঝি এমনই থাকে, মানুষ তা দূর থেকে দেখেও অনেক আনন্দ পায়কখনো ছুয়ে দেখার বাসনাও জাগেনা মনেচাঁদ তারারা বোধ হয় তাদের দলেই পরেদিনের পর দিন দেখেও দেখার ইচ্ছেটা কখনো লোপ পায় নাআবার কিছু কিছু সুন্দর এমনই আছে, মানুষের মন তাদের মাঝে হারিয়ে যেতে চায়পাহাড়, ঝর্ণা, নদী, সাগর গুলোও বুঝি এমনশুধু একবার নয়, বার বার হারাতে মন চায়

 

প্রেম ভালোবাসার ব্যাপার গুলো মানুষের জীবনে কখন কিভাবে আসে কে জানে? কিংবা একটা ছেলে একটা মেয়ের কি দেখে তাকে পছন্দ করে, কিংবা ভালোবাসে তাও আমার জানা নেই। আমারও একটা বয়স ছিলো, যখন সবার সাথে হাসি আনন্দ, তামাশা আর দুষ্টুমি ভরা মন নিয়েই কাটিয়ে দিতামজীবন চলার পথে অনেকের সাথেই দেখা সাক্ষাৎ, পরিচয়, ঝগরাঝাটিও হয়েছিলোমনের মাঝে ভালো লাগালাগি গুলোও হয়েছিলোবিরহ বেদনার ব্যাপারগুলোও ঘটেছিলোকৈশোর কিংবা তারুণ্যে ঘটে যাওয়া এমন কিছু ব্যাপার কেনো যেনো খুব বেশী মনের মাঝে দাগ কাটি


অধিকাংশ প্রেম ভালোবাসা গুলো বোধ হয় হয়ে থাকে, দীর্ঘ দিনের মেলামেশা থেকে, এক প্রকার মনের টানে। আবার কারো কারো বেলায় বুঝি এমনও থাকে, প্রথম দর্শনেই কোন একটি মেয়ে হঠাৎ করেই মনের মাঝে এমন করে জায়গা করে নেয় যে, তখন মনে হয় পৃথিবীর যে কোন শক্তির বিনিময়ে হলেও তাকে আপন করে পেতে চাআমার বেলাতেও তাই হয়েছিলো।

 

মা পরপারে চলে গিয়েছিলো অনেক আগেই। বাবাও সংসার জীবনে কেমন যেনো একটু উদাসীনই হয়ে গিয়েছিলো। আমি আর মৌসুমী মামার সংসারেই চলে এসেছিলাম। মামার কঠিন তত্বাবধানেই সেবার সবে মাত্র এইচ এস সি পরীক্ষাটা দিয়েছিলাম। পাহাড়ী অঞ্চল, আনন্দ করার মতো তেমন কিছুই নেই। তেমনি দিন কাটছিলো আমার।

সেবার যে মেয়েটি আমার দৃষ্টি কেঁড়ে নিয়েছিলো, সে কোন সাধারন মেয়ে নয়, অপরূপ সুন্দরী, দীর্ঘাঙ্গী, আর চমৎকার দেহের গড়ন যে মেয়েটির। নাম শানু, পাহাড়ী অঞ্চলের রাজকন্যা, যা প্রথম দেখার সময় আমার নিজেরও জানা ছিলো না। যখন জানলাম, তখন আর মনের কথাটি জানাবার সাহসও হলো না। শুধু দূর থেকেই এক নজর দেখতাম, তার স্কুলে যাবার পথে, কিংবা ফিরে আসার সময়।

 

মাঝে মাঝে আমার কেনো যেনো মনে হত, খুব বেশী পছন্দের মেয়ে গুলো ধরা ছুয়াবাইরে থাকেশানু, আমার সবচেয়ে পছন্দের একটি মেয়েঅন্য সব মেয়েদের চাইতে কোথায় যেনো একটু আলাদাঅনেক জনের  মাঝে যদি সে থাকে, আর কারো দিকে নজর না গিয়ে, কেনো যেনো নজরটা পরে ঠিক তার দিকে

সেবার আমি সবে মাত্র এইচ এস সি পরীক্ষাটা শেষ করেছিলামআর শানু তখন ক্লাশ টেনে পড়তোআমি তার স্কুলে যাবার পথে আর ফেরার পথে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। দূর থেকেই তাকিয়ে থাকতাম শুধু এক দৃষ্টিতে। যা সেও অনুমান করতে পারতো। আমার দিকে সেও এক নজর তাকাতো। কি ভাবতো ঠিক অনুমান করতে পারতাম না। আমিও তার শুধু সেই একটি নজর তাকানো দেখে উদাস হতাম। কল্পনায় কিছু ছবিও আঁকতাম।

 

সেদিনও স্কুল থেকে ফিরছিলো শানু। মাথার উপর রঙ্গিন মেয়েলী ছাতা। আমাকে অবাক করে দিয়ে, রাস্তার পাশে আমার দিকেএগিয়ে এলো শানু। মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিয়ে বললো, প্রতিদিন এখানে দাঁড়িয়ে কি আমাকে দেখেন?
আমি হঠাৎই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাইআমতা আমতা করেই বললাম, না মানে, হ্যা
শানু ললো, কেনো?
আমি বললাম, তুমি খুবই সুন্দরী!
শানু খানিকটা গর্বিত হয়ে, মিষ্টি দুধেসাদা দাঁত গুলো বের করে খিল খিল করে হাসলোবললো, শুধু কি তাই?সবাই কিন্তু সুন্দরী!
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। আমতা আমতা করে বলে ফেললাম, না মানে, আমি তোমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?


শানুকে আমি যেমনটি ধরা ছুয়ার বাইরে মনে করেছিলাম, তেমনটি মনে হলো না। হাসি খুশী, খুব মিশুক ধরনের একটি মেয়ে বলেই মনে হলো। শুধু তাই নয়, রাস্তার পাশে আইল্যাণ্ডের মতো উঁচু জায়গাটায় বসে না বোধক মাথা নেড়ে বললো, না, আমাদের রাজ পরিবারআমাদের ফ্যামিলীতে ওসব নেই
আমি বললাম, , তাহলে বুঝি আমি তোমাকে কখনোই পাবো না

শানু উঠে দাঁড়িয়ে বললো, না, ঠিক তা বলছি নাতা ছাড়া এভাবে জানা নেই শুনা নেই, এমন করে রাস্তা ঘাটে প্রেম ভালোবাসা হয় নাতবে, বন্ধু হতে আপত্তি নেই।


শানুর কথা শুনে আমার মনটা হঠাৎই যেনো হাওয়ার উপর ভর করেই উড়তে থাকলোআমি বললাম, ঠিক আছে তাহলে বন্ধু হবে?
শানু উঠে দাঁড়িয়ে বললো, একটা অনুরোধ করবো। এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখবেন না। লোকে মন্দও বলতে পারে। তা ছাড়া জানেনই তো, আমাদের রাজ পরিবার। বাবার কানে গেলে আপনারই সমস্যা হতে পারে।

আমি বললাম, ও! তাহলে তোমার সাথে কোথায় দেখা করবো?

শানু বললো, বন্ধু হিসেবে যখন মেনেই নিলাম, তাহলে আমাদের বাড়ীতেও আসতে পারেন। ছুটির দিনে আমারও করার মতো তেমন কিছু থাকে না। আজকে তাহলে আসি

কিছু কিছু মেয়ে এমন কেনো? পাহাড়ীঞ্চ, আর সেই অঞ্চলের রাজকন্যা,শানু

বড় কোন দেশই হউক, আর ছোট কোন অঞ্চলই হউক, রাজকন্যা তো রাজকন্যাই। তারাও কি কখনো কখনো ভিন অঞ্চলের সাধারন কাউকেও ভালোবেসে ফেলতে পারে? একটুও ভেবে দেখে না, তার জন্ম কোথায়? কি তার পরিচয়?
আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি, আমার মতো মাতৃহীন, মামার বাড়ীতে আশ্রিত কোন এক সাধারন ছেলেকে পাত্তা দেবে শানুআমার নিজের কাছেও কেমন যেনো সব কিছু স্বপ্নের মতোই লাগছিলোআমার কাছে নুতন করেই মনে হলো, প্রেম ভালোবাসা গুলো বুঝি সত্যিই কোন আইন মানে না, সামাজিক বৈষম্যতাও মানে নাধর্মীয় কোন গোত্রও মানে না। আমি শানুকে নিয়ে এক প্রকার স্বপ্নেই বিভোর হতে থাকলামআর অপেক্ষা করতে থাকলাম, পরবর্তী ছুটির দিনটির জন্যে

পাহাড়ী মেয়েদের মাঝে ডোমা (ছেলেদের লুঙ্গির মতোই এক প্রকার সেলাই বিহীন পোশাক, যা তখন পাহাড়ী মেয়েরা নিম্নাঙ্গ ঢাকার জন্যে পরতো) পরার প্রচলনটা তখন ধরতে গেলে উঠেই গিয়েছিলো বিশেষ কোন অনুষ্ঠান কিংবা উৎসব না হলে, পরেইনা বললেই চলে। তবে, শানু প্রায়ই পরতো। এতে করে, তাকে আরো বেশী সুন্দরই লাগতো।


পরবর্তী ছুটির দিন
মনের মাঝে এক প্রকার রোমাঞ্চতা, সেই সাথে দুরু দুরু করা বুকসকালে নাস্তাতেও ঠিক মতো মন বসলো নানয়টা বাজতে না বাজতেই, আমি ছুটে চলি শানুদের রাজবাড়ীর বাগান বাড়ীতে দূর থেকেই শানুকে দেখি, উর্ধাঙ্গে একটা হলদে রং এর ব্লাউজ, আর নিম্নাঙ্গে হলদে রং এর ছিটের একটা ডোমা।

 

আমি এগিয়ে যাই তার সামনা সামনিনুতন করেই দেখি, দীর্ঘাংগী শানুকেঈষৎ ডিম্বাকার শিশু সুলভ মিষ্টি চেহারায় টানা টানা চোখ সোনালী গায়ের রং, সরু চৌকু রসালো ঠোঁট গুলোরনীচে থুতনীটাও চৌকুসেই থুতনীটা ধরেও বুঝি খুব আদর করতে ইচ্ছে করেআর ব্লাউজের নীচের দিকটায় নগ্ন সমতল পেটে গভীর নাভীটাও দৃষ্টি কেড়ে নেয়আর নিম্নাঙ্গের হলদে ডোমাটাতে মনে হলো, সদ্য উড়ে আসা কোন এক হলদে পরী। আমি আপন মনেই ভাবতে থাকি, সত্যিই বুঝি বিধাতা নিজ হাতেই কিছু কিছু মেয়েকে বানিয়ে থাকেআর শানু তাদের মাঝেই একজন

 

আমি খুব মুগ্ধ হয়েই শানুকে দেখছিলাম। শানু বাম হাতের আংগুলটা গালে ঠেকিয়ে, মাথাটা খানিক কাৎ করে বললো, এমন করে কি দেখছো?
আমি বললাম, তোমাকে! যতই দেখছি, ততই শুধু অবাকই হচ্ছি
শানু বললো, কিন্তু যেভাবে দেখছো, মনে হচ্ছে আমি যেনো একটা রসগোল্লা!
আমি বললাম, ঠিকই বলেছো, যদি সত্যিই রসগোল্লা হতে, তাহলে এতক্ষণে খেয়েই ফেলতাম।

 

আমার কথায় শানুর মনটাও খানিক গর্বিত হয়ে উঠে। খিল খিল করে হাসলো কিছুক্ষণ। তারপর আহলাদী গলায় বললো, খেয়ে ফেললে কিন্তু আমাকে আর পাবে না।

আমি বললাম, তা অবশ্য ঠিক। তবে, তোমার দেহের এই সৌন্দর্য্য যদি আমি সারা জীবনও দেখি, তারপরও আমার নয়ন ভরবে না।

শানু আমার দিকেও কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যল করে তাকিয়ে থাকে। বললো, আমার চাইতেও অনেক সুন্দরী মেয়েও কিন্তু আছে। হঠাৎ আমাকে এত পছন্দ হলো কেনো?

আমি বললাম, তা আমি নিজেও জানিনা। জানো, তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকে, আমি আর অন্য কোন মেয়ের দিকেও তাকাইনি।

শানু গর্বিত গলায় বললো, তুমি বাড়িয়ে বলছো।

আমি বললাম, মোটেও বাড়িয়ে বলছি না। জানো, ছোট কালে যখন রাজকন্যাদের গল্প পড়তাম, তখন ভাবতাম, রাজকন্যার কি সত্যিই খুব সুন্দরী হয়?তাদের চেহারা কেমন হয়? তোমাকে দেখেই প্রথম মনে হয়েছিলো, রাজকন্যারা দেখতে বুঝি ঠিক তোমার মতোই হয়।

শানু বললো, তুমি খুব সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারো। আমার মনে হয়, তুমি সব মিথ্যে বলছো।

আমি বললাম, মিথ্যে কেনো বলবো? যদি মিথ্যেই বলতাম, তাহলে কি সব সময় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম?

শানু বললো, তাহলে এত দিন কিছু বললে না কেনো? ঐদিন যদি আমি তোমার কাছে না যেতাম, তাহলে কি করতে?

আমি বললাম, ভয়ে কিছু বলতে পারতাম না।

শানু বললো, কেনো? কিসের ভয়?
আমি বললাম, আমার সব সময়ই ধারনা ছিলো, রাজকন্যারা বুঝি খুব অহংকারী হয়

শানু মুচকি হাসলোবললো, আমি তেমন নইবলতে পারো সবার সাথেই বন্ধু সুলভ আচরনই করিনইলে কি যেচে পরে তোমার সাথে কথা বলতে চাইতাম?
আমি বললাম, সত্যিই, তুমি খুব অসাধারন! আমি তোমাকে মন থেকেই ভালোবেসে ফেলেছি

শানু তার ডান হাতটা বুকের উপর বুকে চেপে বললো, এমন করে বলো না তো!

আমি বললাম, কেনো? তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?

শানু বললো, ঠিক তা নয়। বলিনি, আমাদের ফ্যামিলীতে ওসব নেই। যদি তোমাকে কখনো কাছে না পাই, তাহলে আমিও খুব কষ্ট পাবো।

আমি বললাম, ঠিক আছে, তাহলে আর কখনো বলবো না। শুধু বন্ধু হতে তো আপত্তি নেই?

শানু বললো, হ্যা, দুজনে খুব ভালো বন্ধু। বাবা মা যদি কখনো জেনে ফেলে, তখন তাদেরকেও তাই বলবো।

আমি বললাম, ঠিক আছে।

শানু বললো, আচ্ছা, তোমরা কয় ভাইবোন?

আমি বললাম, চার ভাইবোনই ছিলাম, এখন আমি আর আমার বড় এক বোন।

শানু বললো, আমরা কিন্তু তিন ভাই বোন। আমি সবার বড়। আমার এক বছরের ছোট রেনু, আর তার ছোট এক ভাই সাগর।

আমি বললাম, বাহ! দুই বোনের এক ভাই, অনেকটা স্যাণ্ডউইচের মতো।

শানু বললো, ঠিক বলেছো। মাঝে মাঝে এখনো আমরা তিন ভাইবোন এক সংগে ঘুমাই। সাগর আমাদের দু বোনের মাঝেই চাপা থাকে। আমরা দু বোন তখন খুব মজা করি ওকে নিয়ে।

এই বলে খিল খিল করে হাসতে থাকে।

 

হাসিও এত সুন্দর হয় নাকি? আর রিনি ঝিনি হাসির ফাঁকে মুক্তোর মতো সাদা দাঁতগুলো যখন বেড়িয়ে আসে, তখন আরো অপূর্ব লাগে শানুকে। শানু বললো,চলো, তোমাকে আমার পড়ার ঘরে নিয়ে যাই।

 

শানুর সাথে এত সহজে আমার বন্ধুত্বটা হয়ে যাবে, নিজেও ভাবতে পারিনি। সে আমাকে তাদের বাড়ীর ভেতরেই নিয়ে গেলো। কাঠের তৈরী বিশাল দুতলা বাড়ী। বসার ঘরটা পেরিয়ে ছোট্ট একটা ঘর। পড়ার চেয়ার টেবিল আর বুক সেলফ। শানু জানালাটার ধারে দাঁড়িয়ে বললো, আমার পড়ার ঘর। শোবার ঘর দুতলায়।


আমি ঘরটার চারিদিক একবার চোখ বুলিয়ে নেইচমৎকার গোছানো একটা পড়ার ঘরআমি বললাম, বাহ, খুব সুন্দর তোমার পড়ার ঘর

শানু বললো, তাই? ঠিক আছে, তুমি বসোআমি নাস্তা দিতে বলি
আমি বললাম, প্লীজ, কিচ্ছু লাগবে নাতুমি এখানেই থাকোআমি তোমাকে একটু নয়ন ভরে দেখি
এই বলে আবারো শানুকে দেখতে থাকি, মুগ্ধ নয়নে।

 

শানুও আমার চোখে চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বললো, আচ্ছা, তোমরা তো বাঙ্গালী।

আমি বললাম, হ্যা, বাঙ্গালী। তুমি কি বাঙ্গালী না?

শানু বললো, না, বলতে পারো বাংলাদেশী।

আমি বললাম, হঠাৎ এমন প্রশ্ন, কেনো বলো তো?

শানু বললো, না, এমনিতেই কথায় কথায় আমার বান্ধবীদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমাকে কেউ চিনে কিনা। অনেকেই বললো, ওই বাঙ্গালী ছেলেটা?

 

শানুর কথা শুনে আমি হাসলাম। বললাম, তাহলে আমিও বুঝি তোমার বান্ধবীদের মাঝে খুব ফ্যামাস?

শানু বললো, ফ্যামাস কিনা জানি না। সবাই বললো, তোমার বোনও নাকি খুব সুন্দরী! আমি কখনো দেখিনি।

আমি বললাম, ও! আসলে, ওরও বিয়ে হয়ে গেছে। বলতে পারো আমি এখন একা।

শানু কিছুক্ষন চুপচাপই থাকলোতারপর বললো, তাহলে এখানে কার কাছে থাকো?

আমি বললাম, মামার বাড়ীতে। বলতে পারো, মামা মামীই এখন আমার জন্যে সব।

 

শানু আবারো কিছুক্ষণ আমার চোখে চোখে তাকিয়ে থাকে। ওর চাহনি দেখে মনে হলো, আমার চাইতেও সে বুঝি বেশীই আগ্রহী আমার উপর। বললো, বাঙ্গালীরা তো আমাদেরকে পাহাড়ী বলে। তোমার কি ধারনা?

আমি বললাম, বলেছি না, আমার মামার বাড়ী এখানেই। আমার মামীও কিন্তু তোমদের গোত্রের। মাও তোমাদের গোত্রের রীতী গুলো খুব পছন্দ করতো। মা খুব শখ করে তোমাদের মতো পোশাকও পরতো। মাকে তখন খুব চমৎকারই লাগতো।

শানু বললো, লাগতো বলছো কেনো? এখন কি নেই?

আমি বললাম, না। চার বছর আগেই চলে গেছেন পরপারে। কিন্তু, হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেনো?

শানু বললো, না, এমনিই। স্কুলেও বাঙ্গালী ছেলেরা আমাদেরকে অন্য চোখেই দেখে। খুব বেশী মিশতেও চায় না। কিন্তু, সব সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

 

আমি শানুর ব্লাউজটার দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। তারপর বললাম, তোমাদের এমন পোশাক সবারই নজরে পরে।

শানু খিল খিল করেই হাসলোতারপর, তার বুকটাদু বাহুতে দু পাশ থেকে চেপে ধরে বললো, তাই নাকি? তোমার নজরেও পরে নাকি?

আমি বললাম, জানি না, তবে তোমাকে দেখলে, আমি কেমন যেনো উদাস হয়ে যাই!
শানু বললো, বাঙ্গালী অনেক ছেলেই কিন্তু বলে, এমন পোশাক পরলে আমাকে নাকি সুন্দরই লাগেতোমার কি তাই মনে হয়?
আমি বললাম, হ্যা, বললাম না মাও এমন পোশাক শখ করে পরতোদেখাদেখি বড় আপুও পরতো। বড় আপুর চেহারাটাও এমন ছিলো যে, হঠাৎ দেখলে পাহাড়ী মেয়েদের মতোই লাগতো। বড় আপুরজন্যেও অনেক ছেলে পাগল ছিলো। হঠাৎ একদিন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো, এখনো জানি না।

শানুকিছুক্ষণ চুপ চাপ থাকেতারপর বললো, আমি কি তোমার বড় আপুর চাইতেও সুন্দরী?
আমি বললাম, তুলনা করে বলাটা বোধ হয় খুব কষ্টই হবে। তোমার চেহারায় কোথায় যেনো একটা আলাদা শিল্পের ছয়া আছেসত্যিই খুব ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে করেএকটু তোমার গাল ছুতে দেবে?
শানু হাসলোবললো, বাহ! তুমি তো দেখছি কবি! তবে, এখন না।
আমি বললাম, কেনো?

শানু বললো, কেনোই বা ছুতে দেবো?  

 

আমি হঠাৎই কি বলবো বুঝতে পারি না। আমতা আমতা করেই বললাম, না মানে, থাক। এমনিতেই ইচ্ছে হয়েছিলো।

আমি খানিকটা থেমে বললাম, জানো, মা যখন মারা যায়, তখন আমার বয়স মাত্র চৌদ্দ। সবে মাত্র ক্লাশ নাইনে উঠেছিলাম। মাকে যখন দেখতাম, তখন সব সময়ই মনে হতো, আমাদের মা কেমন যেনো সবার চাইতে একটু আলাদা।

শানু আমার দিকে মমতার চোখেই তাকালো। বললো, তাহলে বলছি, আমাকে যদি সত্যিই তোমার এত পছন্দ, তাহলে বিয়ে না করা পর্য্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আমি চোখ কুচকে বললাম, বলো কি? বিয়ে না করা পর্য্যন্ত ছুতে পারবো না?

শানু বললো, তোমাকে দেখে আমারও মনে হয়েছিলো, তুমি আমাদের রীতীর অনেক কিছুই জানো না। যদি জানতে, তাহলে কখনো আমার দিকে এমন করে তাকিয়েও থাকতে না।


শানুর কথাতে আমার মনটা হঠাৎই কেমন যেনো খারাপ হয়ে উঠেকি বলবো, কিছু ঠিক বুঝতেও পারছিলাম না। শানুর দিকে কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। শানু বললো, কি ব্যাপার, মন খারাপ করলে?

আমি আমতা আমতা করেই বললাম, না মানে?

শানু বললো, আমরা বাঙ্গালী ছেলেদের ভালো করেই চিনি। অনেকেই আমাদের সাথে প্রেম করতে চায়। কিন্তু আমাদের সব সময় পাহাড়ীই ভাবে। বিয়ের কথা কখনোই ভাবে না।

 

আমি হতাশ হলাম না। বললাম, না শানু, আমি ওদের কারো মতোই নই।

শানু বললো, কি করে বুঝবো? অধিকাংশ বাঙ্গালী ছেলেদেরই ধৈর্য্য নেই। ওরা পাহাড়ী মেয়েদের কি ভাবে, তাও বুঝি না। ওরা আমাদের গোত্রের মেয়েদের অপমানও করে। বলে, আমরা নাকি নির্লজ্জ!  ব্লাউজ ডোমা পরি! আচ্ছা, তুমিই বলো, এটা আমাদের কালচার! আমরা কি আমাদের কালচার বাদ দিতে পারি?

আমি বললাম, এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা আমারও আছে। মা যখন মাঝে মাঝে শখ করে এমন পোশাক পরতো, তখন সবাই মন্দ বলতো। বাবাও একদিন খুব নোংরা কথা বলেছিলো। সেই কষ্টেই মা আত্মহত্যা করে ছিলো।

শানু চোখ কুচকে বললো, বলো কি? আত্মহত্যা?

আমি বললাম, হ্যা শানু, প্রয়োজনে আমি তোমার জন্যে সারা জীবনও অপেক্ষা করে থাকতে পারবো। বলেছিই তো, আমি তোমাকে খুব বেশী ভালোবেসে ফেলেছি।

 

শানু হঠাৎই চোখ দুটি বন্ধ করে কেমন যেনো এক মধুর জগতেই হারিয়ে যায়। খানিকটা আবেগ আপ্লুত গলাতে বললো, আমিও তোমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি। মাঝে মাঝে মনে হয় কি জানো? আমিও তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।

হঠাৎ আমারও কি হয় বুঝতে পারি না। কেমন যেনো  খানিকটা সাহসী হয়ে উঠিএগিয়ে গিয়ে শানুকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরি। আমার হাত দুটি তখন তার ভরাট দুটি বুকের উপরই থাকে।

শানু হঠাৎই কঁকিয়ে উঠে। বললো, এ কি করলে?

আমিও সম্ভিত ফিরে পাই। শানুর কাছ থেকে খানিকটা সরে দাঁড়াই। বললাম, স্যরি! আসলে, তোমাকে দেখে আমিও খুব আবেগ আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম।

 

 

শানু তার ডান হাত এর বাহুটা বুকের উপর চেপে ধরে বাম হাতে পড়ার টেবিলটা চেপে ধরে, ঝুকে দাঁড়িয়ে বললো, মস্ত ভুল করেছো খোকা! এজন্যেই আমি বাঙ্গালী কোন ছেলেকে বিশ্বাস করি না। তাই, শুধু বন্ধুই হতে চেয়েছিলাম।

শানুর কথায় আমি হঠাৎই বোকা বনে যাই। মাথার ভেতরটা হঠাৎই কেমন যেনো শূন্য হয়ে যায়। পায়ের তলা থেকেও মাটিগুলো কেমন যেনো সরে সরে যেতে থাকে। আমি বলার মতো আর কোন ভাষা পাই না। অন্যত্র তাকিয়ে থাকি শুধু।

শানু বললো, আমার দিকে তাকাও।

আমি ভয়ে ভয়েই শানুর দিকে তাকাই। শানু আমার দিকে প্রণয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, আসলে, আমিও তোমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি। তোমার উপর খুব বেশী রাগও করতে পারছি না। ভুলটা বুঝতে পারলেই হলো।

আমি বললাম, এমন ভুল আর কখনো হবে না।

শানু বললো, ঠিক তো?

আমি বললাম, সত্যিই, আর এমন ভুল হবে না। আসলে, তোমাকে যখন দেখি, তখন আমার মাথাটা সত্যিই ঠিক থাকে না। আমি কেমন জানি পাগল হয়ে যাই।

শানু বললো, আমারও তাই মনে হয়েছিলো। তুমি আমাকে ভালোবাসোনি, ভালোবাসতে আমাদের পোশাককে।

আমি আহত হয়ে বললাম, না শানু, বিশ্বাস করো, আমি তোমাকেই ভালোবাসি। আর তোমার ওই পোশাক তো তোমার দেহেরই সৌন্দর্য্য!

 

শানু তার ডান হাতটা বুকের উপর থেকে সরিয়ে, টেবিলটার উপরই রাখে। তারপর বললো, এক এক জাতির এক এক রকম রীতী! পোশাকও ঠিক তেমনি। তোমরা বাঙ্গালী ছেলেরা আমাদের কি মনে করো, আমি তা জানি না। আসলে, যেচে পরে তোমার সাথে কথা বলতে গিয়েও আমি ভুল করেছিলাম।

আমি বললাম, না শানু, আমার ব্যাপারটা এমন করে নেবে না। আমি আসলে একটু আবেগ আপ্লুত হয়ে পরেছিলাম।

 

শানু আমার দিকে খানিকক্ষণ মমতার দৃষ্টি নিয়েই তাকিয়ে থাকে। তারপর বললো, এখানেই বাঙ্গালী ছেলেরা ভুল করে। আমাদেরকে দেখলেই ভাবে, আমরা বুঝি সেক্সী! আমাদের কোন মন নেই।

আমি বললাম, না শানু, আমি মন থেকেই সব বলছি। আমি মন থেকেই তোমাকে ভালোবাসি।

 

শানু পড়ার টেবিলের পাশে চেয়ারটাতেই শান্ত হয়ে বসে। তারপর বললো, আমাকে আরো ভাবতে হবে।

আমি বললাম, আমাকে তোমাদের ভাষাগুলো শেখাবে?

শানু মুচকি হেসে বললো, ঠিক আছে, আমি তোমাকে সব শেখাবো। কিন্তু আজকে না। আমার মাথাটা খুব ধরে আছে।

আমি বললাম, তোমার মাথাটা একটু টিপে দিই?

শানু বললো, লাগবে না। বিয়ের আগে আমার কোন চুলও ছুতে পারে না।

আমি হঠাৎই কেমন যেনো বোকা বনে যাই শানুর কথায়। বললাম, তাহলে চলে যেতে বলছো?

শানু মাথা দোলিয়ে বললো, হ্যা, সরাসরি বললে কথাটা এমনই হয়।

আমি বললাম, আবার কখন দেখা হবে?

শানু বললো, তা তোমার ইচ্ছে। তবে, ওই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না। আমার খুব অসহ্য লাগে।

 

আমি কিছুক্ষণ চুপচাপই থাকি। তারপর বললাম, তুমি কি আমার উপর খুব রাগ করে আছো?

শানু বললো, বললাম তো, আমার মাথাটা খুব ঝিম ঝিম করছে। আমার আর কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না।

আমি বললাম, ঠিক আছে, আমি কিন্তু আসবো, আবারো আসবো, আগামী ছুটির দিনে। আমি তোমাকে না দেখে থাকতে পারবো না।

শানু বললো, ঠিক আছে, তাই করো! আজকে আমাকে একটু একা থাকতে দাও।

আমিও আর শানুকে বিরক্ত করি না। ফিরে চলি নিজ পথে।

 

 

পরবর্তী ছুটির দিন
সেদিনও আমি নাস্তাটা শেষ করে তাড়াহুড়া করেই ছুটলাম শানুদের বাড়ীতেদেখলাম বাড়ীটার বারান্দাতেই দাঁড়ানো স্বয়ং শানু। দীর্ঘদিন পরই আবারো দেখি তাকে বেগুনী ছিটের একটা ব্লাউজে, আর নিম্নাঙ্গে বেগুনী রং ছিটের একটা ডোমানগ্ন পেটে গভীর নাভীটা আরো বেশী নজর কাঁড়ে। আমাকে দেখে শানুর চোখ দুটিও উজ্জ্বল হয়ে উঠে। মুচকি হেসেই বললো, জানতাম, আসবে।

আমি বললাম, বলেই তো ছিলাম আসবো। আমি তোমাকে একদিন না দেখেও থাকতে পারি না। একটি সপ্তাহ আমার যে কি কষ্ট হয়েছে, তা যদি তোমাকে বুঝাতে পারতাম!

শানু বললো, বুঝি খোকা, আমিও তো তোমার প্রেমে পরে গেছি।

আমি বললাম, সত্যিই তুমি খুব অসাধারন!

শানু বললো, অসাধারন কিনা জানি না। তবে, আমিও যে মরেছি, তা বুঝতে পারছি।

আমি বললাম, ভেবেছিলাম, আর কখনো কথাই বলবে না।

 

শানু কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলো। তারপর বললো, আসলে, তোমাকে দেখলে কেনো যেনো খুব মায়া হয়।

আমি চোখ গোল গোল করে বললাম, মায়া?

শানু বললো, হ্যা! তোমার চোখে কি আছে জানি না। যখন আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকো, তখন আমার কেমন লাগে, তা তুমি বুঝো?

আমি না বোধক মাথা নাড়লাম শুধু।

শানু বললো, প্রেম ভালোবাসার ব্যাপারগুলো, কখনোই আমার মনে দোলা দিতো না। প্রয়োজনও হতো না। পাহাড়ী মেয়েদের কারো মনেই বোধ হয়, এমন প্রেম ভালোবাসা জাগে না।

আমি বললাম, বাঙ্গালীরা ভালোবাসার মর্যাদা দিতে জানে। বাবাও মাকে খুব ভালোবাসতো।

 

শানু বারান্দার রেলিংটার উপর দু হাত চেপে খানিকটা ঝুকে দাঁড়িয়ে বললো, তাহলে তোমার মা আত্মহত্যা করেছিলো কি জন্যে?

আমি খানিকক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে যাই। বললাম, না মানে, তোমাকে বলা হয়নি। যখন বড় আপু কলেজে পড়তো, তখন হঠাৎই একদিন উধাও হয়ে গেলো। তখন বাবা খুব শক পেয়েছিলো। মাকে অনেক কটু কথা বলেছিলো। বলেছিলো, মা বড় আপুকে ঠিক মতো শাসন করতে পারেনি। মাও সেদিন তর্ক করেছিলো বাবার সাথে। বাবা রাগ সামলাতে না পেরে, মায়ের উপর হাতও তুলেছিলো। মা আর সহ্য করতে না পেরে, আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলো। তারপর বাবাও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলো। আমি আর মৌসুমী উপায় খোঁজে না পেয়ে মামার বাড়ীতে চলে এসেছিলাম।

 

শানু বললো, ও! তুমিও যে কোন একদিন আমাকে কটু কথা বলবে না, তার নিশ্চয়তা কি?

আমি বললাম, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আবারো হউক, তা আমি চাই না। তা ছাড়া, বাবা কখনো এই অঞ্চলে থাকেনি। মাকে ভালোবেসে বিয়ে করে, নিজের এলাকাতেই চলে গিয়েছিলো। মা এর সব কিছুই পছন্দ করতো। কিন্তু পাহাড়ী পোশাক পরে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা, তাতেই খুবই রাগ করতো।

শানু বললো, তুমিও যদি তাই করো?

আমি বললাম, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কি কথা বলবো? ঘরে আসতে বলবে না? তুমি তো বলেছিলে, আমাকে তোমাদের ভাষা শিখাবে।

অগত্যা শানু বললো, এসো।

 

রাজকন্যা, তা যে কোন দেশ কিংবা গোত্রেরই হউক না কেনো, চিন্তা ভাবনা কিংবা ভাব সাব বুঝি অনেক আলাদাই থাকে। শানু বসার ঘরে ঢুকে, কোনার দিকে একটা টুলে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে বললো, বসো।

আমি কোনাকোনি একটা সিংগল সোফাতেই বসি। শানু বললো, প্রতিটা গোত্রেরই কিছু ইতিহাস আছে। তাদের রীতীগুলোরও কিছু অর্থ আছেসাধারন মানুষের চোখে দেখলে মনে হবে ভিন্ন রীতী। আসলে একই কাজ!
আমি বললাম, জানি
শানু বললো, সব সময় সবজান্তার মতো করবে নাআমার তো মনে হয় তুমি অনেক কিছু না জেনেও জানার ভান করোযা বলছি শোনোএই যে তুমি ঐ দিন আমাকে ছুলে, ওটা কি তোমাদের রীতীতে পরে?

আমি বললাম, তার জন্যে তো আমি ক্ষমাই চেয়েছি

শানু বললো, ঠিক আছেআমি তো তোমাকে বলেই ছিলাম, তুমি আমাদের বাড়ীতে আসবে স্রেফ আমার একজন ফ্রেন্ড হিসেবেফ্রেন্ড হয়ে তুমি কক্ষণোই আমাকে ছুতে পারার কথা না।

আমি বললাম, তুমি কি এখনো আমার উপর খুব রেগে আছো?

 

শানু খানিকটা শান্ত হয়। বললো, ঠিক তা নয়। আসলে, আমিও কোন গোত্রকে আলাদা চোখে দেখিনা। আর আমাদের ভাষার কথা বলছো? আমিও ভালো জানিনা। বাংলাটাই ভালো করে শিখি। স্কুলে আমাদের ভাষার উপরও একটা সাবজেক্ট আছে। বলতে পারো, আমি ওটাতে প্রায়ই ফেল করি। টীচাররাও কেনো যেনো আমাকে পাশ করিয়ে দেয়, তাও বুঝি না।

আমি বললাম, শুধু তোমাদের অঞ্চলেই না। সুন্দরী মেয়েরা কখনো ফেল করে, তা আমিও কখনো দেখিনি।

 

শানু সামনের নীচু টেবিলটার উপর পা তুলে বললো, হয়েছে, হয়েছে! তুমি যেমনটি ভাবছো, আমি অত্ত গাধী ছাত্রীও না! বাংলা বিষয়ে আমি কিন্তু হায়েস্ট মার্কই পাই।

আমি হঠাৎই কিছু বলতে পারি না। আমতা আমতা করেই বলি, না, এমনিতেই বললাম। তোমাকে দেখেও মনে হয়, শুধু সুন্দরীই না, অনেক মেধাবীও।

 

শানু মুচকি হাসলো। বললো, আমাকে খুশী করতে চাইছো?

আমি বললাম, না। তোমার তুলনা শুধু তুমি! কেনো যেনো মনে হয়, তোমাকে বিধাতা নিজ হাতে বানিয়েছে, এত অপরূপ করে।

শানু খানিকটা গর্বিত হয়েই বললো, শোন, শোন, প্রেমে পরলে এমন সব ছেলেরাই বলে। বিধাতা নিজ হাতে আমাকে বানিয়েছে কিনা জানি না। আমি নিজেকে খুব সাধারন একটা মেয়েই ভাবি।

এই বলে শানু আমার দিকে প্রনয়ের দৃষ্টিতেই তাকিয়ে থাকে। তারপর আবারো বললো, কাউকে ভালোবেসে সাধারন একটি মেয়ে হিসেবেই বেঁচে থাকতে চাই। তুমি কি পারবে, আমাকে তেমনি একটি জীবন দিতে?

আমি আবেগ আপ্লুত হয়েই বললাম, কেনো পারবো না? তোমার কি এখনো সন্দেহ আছে, আমি তোমাকে ভালোবাসি না!

শানু বললো, ঠিক তা বলছি না। আমাদের রাজ পরিবার। আমার সিদ্ধান্তে কারো কিছু আসে যায় না। রাজ সিদ্ধান্তই বড় সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া, আমি এই রাজ পরিবার এর বড় কন্যা। সবাই ভাবছে, পরবর্তী রানী যেনো আমিই হই।

 

আমি আবারো হতাশ হই। বললাম, তাহলে আজকে আসি।

শানু বললো, কি ব্যাপার? মন খারাপ করলে?

আমি বললাম, নাহ! আমি এক সাধারন ছেলে। রাজকন্যার স্বপ্ন দেখা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না।

শানু খুব সহজ ভাবেই বললো, তাহলে আবার কবে আসছো?

 

আমি আর গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। আমতা আমতা করেই বলি, দেখি, সময় পেলে চলে আসবো।

শানু এগিয়ে এসে আমার বুকের উপর ঝুকে দাঁড়িয়ে বললো, তোমাকে আসতেই হবে!

আমি আমতা আমতা করেই বললাম, আসবো, অবশ্যই আসবো।

শানু সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, এই তো গুড বয়! তাহলে, আগামী ছুটির দিনে।

আমি বললাম, ঠিক আছে।

শানু বললো, তাহলে এখন আসতে পারো।

শানুকে আমি ঠিক বুঝতে পারি না। কখনো মনে হয় সত্যিই সে আমাকে খুব ভালোবাসে। সেই মোহে মোহিত হয়ে, আমিও তাকে নিয়ে স্বপ্নে বিভোর হতে থাকি। দিবা রাত্রি শুধু চোখের তারায় শানুকেই দেখি। তার সেই মিষ্টি শিশু সুলভ চেহারা, আর এক অপরূপ দেহ বল্লরী।

 

 

তারও পরের সপ্তাহের কথা
আমি একটু তাড়াতাড়িই শানুদের বাড়ীতে গিয়েছিলামঅথচ, উঠানে কাউকেই দেখলাম নাআমি উঠানে দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক একবার তাকিয়ে ভয়ে ভয়েই ডাকলাম, শানু! শানু!
কিছুক্ষন পর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো, তেরো চৌদ্দ বছর বয়সের একটি ছেলেবললো, কাকে চান?
আমি বললাম, আমি শানুর বন্ধুশানু আছে?
ছেলেটি বললো, , বড় আপু?বোধ হয় সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে গেছে
আমি আমতা আমতা করেই বললাম, সুইমিং পুল?
ছেলেটি বাম দিকটাই ইশারা করে বললো, ওই তো দেখা যাচ্ছে!

আমি সুইমিং পুলটার দিকে এগিয়ে যাইদেখলাম, একাকীই আনমনে সাঁতার কাটছে শানু পুলটায়আমি আর ডাকলাম নাসুইমিং পুলটার পাশেই চুপ চাপ বসে থাকিআমি দেখলাম, শানু সাঁতার কাটতে কাটতে সুইমিং পুলটার অপর প্রান্ত পর্যন্ত চলে গেছেঠিক ঘুরে ফেরার সময়ই আমাকে চোখে পরলোদূর থেকেই বললো, খোকা, তুমি?কখন এলে?
আমিও উঁচু গলায় বললাম, এই তো, বেশ কিছুক্ষন হলো

 

েজা দেহে মেয়েদের কি আরো বেশী সুন্দর লাগে নাকি? শানুর ভেজা ত্বকে সূর্য্যের কিরন পরে, আরো অপূর্ব এক শোভাই যেনো চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে থাকলো। আমি মুগ্ধ হয়েই তা দেখতে থাকি। শানু বললো, নামবে নাকি? যা গরম পরেছে, ভালোই লাগবে।

 

আমি জানি, আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবো না। শানুর দেহটা সব সময় আমাকে চুম্বকের মতোই টানে। এই পানিতে সাতার কাটতে গিয়ে, আমি হয়তো পুনরায় শানুকে জড়িয়ে ধরে ফেলতে পারি। যার ফলাফল, শানু আবারো রাগ করবে। আমি তা চাইনা। শীতের পাখি কিংবা বনফুল দূর থেকে দেখাই ভালো। শিকার করে কিংবা হাতে তুলে নিয়ে, সৌন্দর্য্য উপভোগ করা ঠিক নয়।

আমি বললাম, না, আজকে না। তুমি সাতার কেটে নাও।

 

শানু খিল খিল করেই হাসলো। খানিকটা মজা করার জন্যেই বললো, কি ব্যাপার? সাতার জানো না?

আমি বললাম, তা ঠিক না। আমি সাগর পারের ছেলে। ধরতে গেলে সমুদ্রের সাথে যুদ্ধই করতে হয়।

শানু বললো, তাহলে ঠিক আছে, ওখানটাতেই বসোআমি আরেকটু সাঁতার কেটে নিই
আমি বললাম, ঠিক আছে

আমি মুগ্ধ নয়নেই শানুর সাঁতার কাটা দেখিকি সুন্দর সাবলীল ভাবে, সাঁতার কেটে যাচ্ছেমনে হলো যেনো এক মৎস্য কুমারীই ভেসে চলেছে সুইমিং পুলটার পানিতেআমি মনে মনেই ভাবি, শানুকে ভালোবেসে আমি ভুল করিনিফারহানা আমার জীবন থেকে যখন হারিয়ে গিয়েছিলো, তখন খুব মন খারাপ করেছিলামএখন মনে হচ্ছে ফারহানাকে হারিয়েছি বলেই, তার পরিপূরক হিসেবে শত গুনে সুন্দরী, বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে পেয়েছিপৃথিবীতে যতই বড় বড় ঝড় তুফান, ভুমিকম্প আসুক, শানুকে আমি হারাতে চাই না

শানু তার সাঁতার কাটা শেষ করে, পুলটার এ পারেই ফিরে আসেবুকটা পুলের পারে চেপে রেখে, মিষ্টি ঠোঁটের মিষ্টি দাঁতে হাসে। আমি মুগ্ধ নয়নেই তাকিয়ে থাকি। তখনো শিশিরের ফোটার মতো টপ টপ করা পানি গড়িয়ে পরছিলো, তার চক চক করা ত্বক থেকে। বললো, তারপর? কেমন কাটলো এই কয়টা দিন?

আমি বললাম, এই তো, তোমার কথা ভেবে ভেবেই কাটিয়ে দিলাম
শানু আহলাদী গলায় বললো, কি ভাবলে?


আমি হঠাৎই বোকা বনে যাইকি বলবো ঠিক গুছিয়ে নিতে পারলাম নাআমতা আমতা করে বললাম, না মানে, এই তো, আবার কখন হবে দেখা! দেখা হলে কি কি আলাপ করবো? তো, তোমার কেমন কাটলো?
শানু বললো, আমারও কেটে গেছেদিনের বেলা সারাদিন স্কুল, রাতের বেলা তিন ভাই বোনে দুষ্টুমি, এই আর কি

শানু খানিক থেমে বললো, আমি যে এখানে আছি, কি করে বুঝলে?
আমি বললাম, বোধ হয় তোমার ছোট ভাই হবেসে দেখিয়ে দিলো
শানু বললো, , সাগর?
আমি বললাম, তুমি বুঝি প্রতিদিনই এমন সাঁতার কাটো?
শানু বললো, ঠিক তা নয়আজকে অনেক দিন পরই ইচ্ছে হলোতা ছাড়া কি গরমটা পরেছে দেখেছো?চৈত্র মাস বলে কথা
আমি বললাম, হ্যা, গত রাতেও খুব গরম পরেছিলো আমিও সারা রাত খুব ছটফট করেছিলাম গরমে।
শানু আবারো তার মিষ্টি দুধে সাদা চক চক করা উপরের পাটির দাঁত গুলো বের করে হাসে। বললো, তাই?

 

আমি খানিকটা অন্যমনস্কই থাকি। বললাম, তোমার দাঁতগুলো সত্যিই খুব সুন্দর। খুব ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।

শানু বললো, সবই হবে, যদি কখনো আমাদের বিয়ে হয়।

আমি বললাম, বিয়ে? কখন কিভাবে হবে, তাই তো বুঝতে পারছি না। মাত্র এইচ এস সি পরীক্ষাটা দিলাম। চেয়েছিলাম, মামার কাছে ব্যাবসাটা শিখতে। অথচ, মামা শিখাতে চাইছে না।

শানু মাথাটা কাৎ করে বললো, কেনো?

আমি বললাম, আসলে মামারও কোন পূত্র সন্তান নেই। আমাকে নিজ পুত্রের মতোই স্নেহ করে। সব সময় বলে, আরো লেখাপড়া করতে। তারপর, বাবার হোটেল ব্যাবসাগুলো বুঝে নিতে।

শানু বললো, তোমার বাবার বুঝি হোটেল ব্যাবসা?

আমি বললাম, হ্যা, দাদার আমলের আবাসিক হোটেল ব্যাবসা। সমুদ্রের পারে তিনটি আবাসিক হোটেল। দাদার আমলে একটিই ছিলো। বাবা বাড়িয়ে তিনটি করেছে।

 

শানু আবারো খিল খিল করে হাসলো। বললো, তাহলে তো ভালোই হবে। তুমি বাড়িয়ে আরো দুটি করবে। আমারো পাহাড়ী অঞ্চল ভালো লাগে না। এখান থেকে বেরিয়ে পুরু পৃথিবীটা খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

আমি বললাম, আমার কিন্তু উল্টু! এই পাহাড়ী অঞ্চল খুব ভালো লাগে। সবাই কেমন যেনো সহজ সরল, হাসি খুশী।

শানু পুলটার পারে উঠার উদ্যোগ করে। বললো, এটাই বুঝি নিয়ম! যে যেটা দেখেনি, তাই দেখতে চায়।

 

শানুর পরনে সিলভার কালারের সুইমিং কস্টিউমআমি লক্ষ্য করি, সেটা চুইয়ে চুইয়েও নীচ দিক থেকে ফোটায় ফোটায় পানি ঝরছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, বুঝি প্রশ্রাবই করছে। আমিও মজা করার জন্যে বললাম, কি ব্যাপার প্রশ্রাব করছো নাকি?

শানু পুলটার উপরই উঠে আসে। বললো, তুমি দেখছি মহা ফাজিল!

আমি বললাম, বন্ধু যখন হয়েছি, দুষ্টুমী তো করতেই পারি। মাইণ্ড করলে?

শানু বললো, না।

তারপর, পুলের পারেই আধ শুয়া হয়ে বললো, একটু বসো, আমি গায়ের পানিটা শুকিয়ে নিই
আমি বললাম, সমস্যা নেই

শানু হঠাৎই বললো, আমিও খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাই না

আমি বললাম, কেনো?

শানু বললো, মানুষের জীবনে তো বিয়ে একবারই হয়। অনেক ভেবে চিন্তেই তা করতে হয়।

আমি খানিকটা হতাশ হয়ে বললাম, তুমি কি আর কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবছো নাকি?

শানু বললো, ঠিক তা নয়। বাবা মা যদি তোমাকে পছন্দ করে, তাহলে তোমার সাথেও হতে পারে। কিন্তু, তুমি তো আবার বাঙ্গালী।

 

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎই ধক ধক করে উঠে। আমি মনে মনেই ভাবি, শানুকে আমি প্রাণের চাইতেও ভালোবাসি। আর সেই শানুকে হারাবো, আমি বাঙ্গালী বলে? না না, আমি শানুকে হারাতে পারবো না।

শানু আমার চোখে চোখেই তাকিয়ে থাকে। বললো, কি ভাবছো?
আমি বললাম, আমার পড়ালেখা ভালো লাগে নাতা ছাড়া বাবাকে ছেড়ে চলে এসেছি চার বছর আগে। ভাবছি, এখানেই টুক টাক কিছু একটা করবো। এইচ এস সি এর ফলাফলটা বেড়োলে ছোট একটা চাকুরী খোঁজ করবো। ব্যাবসায় লাভ যেমন আছে, তেমনি লোকসানও আছেচাকুরীতে কোন লস নাই
শানু বললো, তা বোধ হয় ঠিক। আজকাল এখানেও সবাই চাকুরীর খোঁজে তোমাদের দেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু, তোমাদের বাপ দাদার হোটেল ব্যাবসাওটাও বোধ হয় ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না।

আমি বললাম, ওসব নিয়ে আমি কখনো ভাবি না।

শানু বললো, আমার মনে হয় ভাবা উচিত।

 

শানুর কথায় আমি হঠাৎই কেমন যেনো অপ্রস্তুত হয়ে যাইবাবাকে আমি আর মৌসুমী ত্যাগ করে চলে এসেছিলামসেখানে আর যাই কি করে?
আমি বললাম, দেখা যাকযখন বড় হবো তখন
শানু বললো, এখন কি তুমি বড় না?

আমি বললাম, আমি সেই কথা বলছি নাবলছি, যখন আয় রোজগার করতে পারবো তখনকার কথা
শানু খানিক ক্ষন অন্যত্র তাকিয়ে ভাবলোতারপর বললো, আমাকে বিয়ে করলে কিন্তু, আমাদের বাড়ীতে থেকে যেতে পারবে

 

আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। শানুর চোখে চোখে তাকানোর চেষ্টা করি। শানু মিষ্টি করেই হাসলো। আবারো বলতে থাকলো, এই পুরু অঞ্চলের রাজত্বই তো আমার বাবার! আমাদের আত্মীয় স্বজন সবারও  খুব ইচ্ছা, অঞ্চলের পরবর্তী রানী যেনো আমিই হই! আর তখন কিন্তু তুমি এই অঞ্চলের রাজাও হতে পারবে!


আমি শানুর কথা বুঝতে পারি না। সে কি আমাকে লোভ দেখাচ্ছে? আমি বললাম, না শানু, আমি নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে চাইবাবাকেও ডিংগাতে চাই

শানু বললো, তাও ভালো। কিন্তু কতদিনে তা করতে পারবে? ততদিনে যদি আমার বিয়ে হয়ে যায়?

 

শানুর কথায় আমার বুকটা আবারো ছ্যাৎ করে উঠে। আমি বললাম, ধন সম্পদ, রাজত্ব, এসব কি মানুষের জীবনে খুব জরুরী?

শানু বললো, তা বলতে পারবো না। আমি প্রাচুর্য্যের মাঝে বড় হয়েছি। বাবা মা নিশ্চয়ই চাইবে না, খুব সাধারন একটা ছেলের হাতে আমাকে তুলে দিতে।

 

আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। নুতন করেই মনে হলো, ভুলটা বুঝি আমারই হয়েছে। জেনে শুনেই চাঁদের পানে হাত বাড়িয়েছিলাম। এখন তো জ্বলে পুড়ে ছাড়খাড় হতেই হবে। তারপরও বললাম, এটা কি তোমার মনের কথা?

শানু বললো, আমার মন দিয়ে কি হবে? জানোই তো, আমাদের রাজ পরিবার। সেখান থেকে একটা মেয়ে প্রেমিকের হাত ধরে বেরিয়ে যাওয়া মানে, রাজ কলংক! অঞ্চলের কেউ বাবাকেও ক্ষমা করবে না।

 

আমি উঠে দাঁড়াই। তারপর অন্যত্র তাকিয়ে বললাম, তাহলে তোমাকে পাচ্ছি না!

শানু মমতার ঠোঁটেই হাসলো। বললো, কি ব্যাপার? রাগ করলে?

আমি বললাম, আমার রাগেরও কিইবা দাম? আমি বাঙ্গালী, আমার ভালোবাসার মূল্যই বা কতটুকু আছে।

শানু বললো, অবশ্যই আছে। আমি কিন্তু একবারও বলিনি, আমি তোমাকে ভালোবাসি না। যেটা বার বার বলছি, তা হলো তোমার এই ভালোবাসাকে জয় করে নেবার জন্যে তো কোন না কোন একটা তোমাকে বেছে নিতে হবে।

আমি বললাম, মানে?

শানু আবারো খিল খিল করে হাসলো। বললো, বলেছিই তো! হয় তোমার বাবার কাছে ফিরে গিয়ে, তোমার বাবার অনুমতি নিয়ে আমাদের বিয়ে হবে। অথবা, আমার বাবার মন জয় করে, এই অঞ্চলের রাজত্ব অধিকার করে নিয়ে আমাকে বিয়ে করবে।

 

আমি কেমন যেনো এক প্রকার দ্বিধা দ্বন্দেই ভুগতে থাকি। এত দূর এগিয়ে শানুকেও যেমনি এড়িয়ে যেতে পারছিলাম না, ঠিক তেমনি তার শর্তগুলোকেও মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি বললাম, আমাকে ভাবতে হবে।

শানু সহজভাবেই বললো, ভাবতে তোমাকে নিষেধ করিনি।

 

আমারও হঠাৎই মনে হলো, প্রেম ভালোবাসা গুলো বুঝি সত্যিই এতটা সহজে হয় না। যদি হতোই, প্রেম ভালোবাসা নিয়ে পৃথিবীতে এত গলপো হতো না। যারা জয়ী হয়, তারাই শুধু ইতিহাস হয়ে থাকে। আর যারা ব্যার্থ হয়, তারা সারা জীবন তুষের আগুনের মতো জ্বলে পুড়ে মরে। আমি অগত্যা বললাম, আজকে তাহলে আসি।

শানুও মাথা নেড়ে সহজ ভাবেই বললো, ঠিক আছে।

সেবার আসলে আমি শানুকে ভুলতেই চেয়েছিলাম। মনে হয়েছিলো, জীবনে যদি কোন ভুল করে থাকি, তাহলে বোধ হয় শানুকে ভালোবেসে। এই জীবনে আর ভালোবাসা নয়।

 

পরবর্তী ছুটির দিনে আমি আর শানুদের রাজবাড়ীতে গেলাম না। অথচ, বিকেলে অবাক হয়ে দেখলাম, শানু আমাদের মামার বাড়ীতে। হলদে রং ব্লাউজ, আর নিম্নাঙ্গে সাদা ডোমা। আমি শানুকে দেখে অবাক হয়েই বললাম, তুমি এখানে? এই বাড়ী চিনলে কি করে?

শানু বললো, ভেতরে আসতে বলবে না?

আমি বললাম, সিউর! সিউর!

 

শানুকে নিয়ে, মামার বাড়ীর প্রধান ভবনটার বসার ঘরে গিয়েই ঢুকি। তারপর বললাম, তুমি এখানে আসবে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। বসো শানু।

শানু বললো, আমি বসতে আসিনি। তুমি আজকে গেলে না কেনো?

আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। শুধু আমতা আমতা করি।

 

শানু সোফার ডানাতেই বসে। খানিকটা আহত গলাতেই বললো, তুমি আমাকে কি ভাবো?

আমার হঠাৎই কেনো যেনো মনে হলো, প্রেমে পরলে পৃথিবীর সব মেয়েই বুঝি খুব সাহসী হয়ে উঠেশানুর মতো রাজকন্যারাও। শানুও এতটা সাহসী হয়ে, ইনিয়ে বিনিয়ে তার মনের ভালোবাসার কথাই বুঝি জানাতে এসেছে। আমি আমতা আমতা করেই বললাম, না মানে, আসলে কিছু কাজ ছিলো।

 

শানু আমার চোখে চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর খানিকটা রাগ করা গলাতেই বললো, আমার সাথে মিথ্যে বলবে না। তোমার কোন কাজই ছিলো না। আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছো। কদিন পারবে এমন এড়িয়ে যেতে?

আমি বললাম, না মানে, আসলে তুমি যা শর্ত দিয়েছো, তার কোনটাই আমি পারবো না।

শানু বললো, শোনো! ছেলেরা চাইলেও কোন একটা মেয়েকে ভালোবাসতে পারে না। আমিও যদি তোমাকে ভালো না বাসতাম, তাহলে এত দিনের বন্ধুত্বের সম্পর্কটাও হতো না। কি ভাবো আমাকে?

 

আমি আবারো আমতা আমতা করতে থাকি। বললাম, আসলে, তোমাকে এখনো বুঝতে পারি না।

শানু বললো, কেনো? খুব কঠিন শর্তই কি দিয়েছিলাম? সবাই একটা সমাজ নিয়ে বসবাস করে। তোমার বাবা আছে, অথচ তোমার বাবার অনুমতি ছাড়া আমাদের বিয়ে হবে, তা তোমাদের সমাজ মানতে পারে, কিন্তু আমাদের সমাজ কখনোই মেনে নিতে পারবে না।

আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। আবারো হতবুদ্ধি হয়ে যাই।

 

শানু আমার দিকে প্রণয়ের দৃষ্টিতেই তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বললো, আমার যে কি হয়েছে, তা তোমাকেও কখনো বুঝিয়ে বলতে পারবো না। মনে পরে? তুমি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন আমাকে দেখতে? তখন আমার মনটা কি করতো, তুমি অনুমান করতে পারো? আমার মনে ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে, তুমি পালিয়ে বাঁচতে পারবে?


প্রেম ঘটিত ব্যাপার গুলো বুঝি এমনইসারাক্ষণ ভালোবাসার মানুষটি হৃদয়ের আনাচে কানাচে ঘুর পাক করে, একটু খানি চোখের আঁড়াল হলেই বুঝি শুধু ছট ফট করেআমি বললাম, তুমি শান্ত হয়ে বসো তো! আমি পালাতে চাইনি। কিংবা তোমাকে এড়িয়েও যেতে চাইনি। আমিও এই কয়টা দিন শুধু তোমার কথাই ভেবেছি। কিন্তু নিজ অযোগ্যতার কাছে, বারবার হার মেনেছি।

আমি একটু থেমে বললাম, তুমি বসো, আমি মামানীকে ডাকছি। তোমাকে নাস্তা দিতে বলি।

 

শানু উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আমি নাস্তা খেতে এখানে আসিনি। তুমি তোমার সিদ্ধান্তের কথা জানাও।

আমি বললাম, কিসের সিদ্ধান্ত?

শানু বললো, কিসের আবার? তুমি আর আমাকে এড়িয়ে যেতে পারবে না। কিভাবে কি করা যায়, তা তো আমিও ভাবছি, নাকি?

আমি বললাম, না শানু, তোমাকে এড়িয়ে যাবার মতো মন আমারো নেই। কয়টা দিন তোমাকে দেখিনি, আমিও খুব ছট ফট করেছি।

 

আমি আরো কিছু বলতে চাইছিলাম। হঠাৎই ভেতরের ঘর থেকে মামানী এগিয়ে আসে। বললো, কে এলো খোকা? কার সাথে কথা বলছো?

বসার ঘরে ঢুকে শানুকে দেখে মামানীও খুব থতমত খেয়ে যায়আমতা আমতা করে বললো, রাজকন্যা শানু না! আমাদের বাড়ীতে?আমাদের অপরাধ?
শানু বললো, না মামীজান, অপরাধ হবে কেনো?আপনাদের দেখতে আসতে পারি না?
ামানী বললো, তা তো বটেই! রাজকন্যার প্রজাদের দুখ দুর্দশা দেখতে আসবে, তা তো হতেই পারেআপাতত আমাদের কিন্তু কোন সমস্যা নাই তুমি বসো।

শানু সোফাটায় পুনরায় বসে বললো, আমার আছে
মামানী অবাক হয়ে বললো, কি সমস্যা?
শানু বললো, আস্তে আস্তে সবই বলবো মামীজানআপাতত মাঝে মাঝে বেড়াতে এলে সমস্যা আছে?
ামানী মাথা নেড়ে বললো, মোটেও না! তুমি বসো, আমি নাস্তার আয়োজন করছি। এই বলে ডাকতে থাকে, এই শিখা, কই গেলি?

শানু বললো, না মামীজান, আপনি ব্যাস্ত হবেন না।

 

মামানী শানুর দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বললো, গরীবের বাড়ীতে হাতীর পা, তুমি বললেই হবে নাকি?

শানু বললো, আমি মোটেও হাতী নই মামীজান। যদি নিজেকে হাতীই ভাবতাম, তাহলে কিন্তু কখনোই আসতাম না।

মামানী বললো, বাহ! তুমি তো সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারো!

শানু আমার দিকে আঙ্গুল ইশারা করে বললো, ও শিখিয়েছে।

মামানী হাসলো। বললো, হ্যা, একটা পাগল ছেলে। ওর সাথে আমিও কথায় পারি না। তো কত দিনের পরিচয় খোকার সাথে?

 

শানু উঠে দাঁড়ায়। পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে বললো, সেটা ওকেই জিজ্ঞাসা করবেন।

মামানী আমার দিকেই তাকায়। আমি মাথা নীচু করে রাখি। মামানী বললো, ওকে তো জিজ্ঞাসা করবোই। তুমি বসো মা! তোমাকে আরেকটু দেখি।

শানু বললো, পরিচয় যখন হলো, যখন তখন চলে আসবো। আজকে আসি মামীজান!

মামানী বললো, না মা, খালি মুখে গেলে আমাদের অমঙ্গল হবে। তুমি বসো, একটা কিছু মুখে দিয়ে যাও।

 

মামনীর আদর যত্নের ভাব সাব দেখে, শানুও খুব মুগ্ধ হয়। বললো, ঠিক আছে মামীজান, ঘরে যা আছে তাই দিন। আমি খুব একটা বাইরে খাই না।

মামানী বললো, তা জানি মা, তোমরা রাজ খাবার খাও। আমাদের গরীবের সংসার। তেমন ভালো খাবার পাবো কই? ঘরে গাছের পাকা আম আছে, আম দিই।

শানু বললো, অমন করে বলবেন না। আমার জন্ম রাজ পরিবারে। কিন্তু নিজেকে কখনোই রাজকন্যা বলে মনেই হয় না!

মামানী বললো, বাহ! সুন্দর কথা। জানো, আমিও কিন্তু পাহাড়ী মেয়ে। খোকার মামার প্রেমে পরে গিয়েছিলাম, ঠিক তোমার সমান থাকতেই। খোকার মাও আমার কাছ থেকেই আমাদের সংস্কৃতিগুলো শিখতো খুব শখ করে। আসলে, প্রেম ভালোবাসাগুলো স্বর্গীয় দান! সেখানে সামাজিক উঁচু নীচু, ধর্ম গোত্র কোন কিছুই কাজ করে না।

শানু বললো, ঠিক বলেছেন মামীজান।

মামানী নাস্তার আয়োজনেই চলে যায়। শানুর সাথে টুক টাক আরো কথা হয়। আমারো মনে হতে থাকে, শানুর মতো এমন একটি মেয়েকে এত কাছে পেয়ে, আমার জীবনও ধন্য। নাস্তাটা শেষ হতে, আমি নিজেই শানুকে তাদের বাড়ীতে পৌঁছে দিই।

 

 

সেদিন কোন ছুটির দিন নাশানু ছোট ভাই সাগর হঠাৎই এক রাতে ছুটে এলো আমাদের মামার বাড়ীতেবললো, আপুর শরীর খুব খারাপআপনাকে যেতে বলেছে
সাগরের কথা শুনে আমার মনটাও খুব ঞ্চল হয়ে উঠেবললাম, ডাক্তার দেখিয়েছো?
সাগর বললো, হ্যা, এসেছিলো। বললো জ্বর,ঔষধও দিয়ে গেছে
আমি আর দেরী করতে চাইলাম না। বললাম, ঠিক আছে, চলো

আমি অনেকটা ত্রস্ত ব্যাস্ত হয়েই তাদের বাড়ীতে যাইদেখলাম, শানু তার নিজ শোবার ঘরে চিত হয়ে শুয়ে আছেশানু আমাকে দেখে খানিকটা খুশীতে হাসার চেষ্টা করলো। বললো, খোকা তুমি? এসেছো?

আমি বললাম, না এসে কি পারি? কি হয়েছে শানু?
শানু বললো, না, তেমন কিছু নাএকটু জ্বর
আমি বললাম, কখন থেকে?
শানু বললো, সকাল থেকেইভেবেছিলাম সেরে যাবেশরীরটা এখনো খুব দুর্বল। কেনো যেনো হঠাৎ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করলো তাই সাগরকে পাঠিয়েছিলাম।
আমি বললাম, এই তো আমি এসে গেছি
শানু বললো, খুব ভালো করেছো। কিছুক্ষন থাকবে আমার পাশে?
আমি বললাম, দরকার হলে সারা রাত থাকবোতুমি ঘুমুনোর চেষ্টা করো
শানু বললো, না, সারা দিন ঘুমিয়েছি। এখন তুমি খানিকক্ষন পাশে থাকলেই হবে
আমি শানুর হাতটা চেপে ধরে রাখিবললাম, এই তো, তোমার পাশেই বসে আছি

শানু আমার চোখে চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বললো, তুমি এত্ত ভালো কেনো?

আমি বললাম, ভালো কি মন্দ জানি না। তোমার শরীর খারাপ, আমি কি আর স্থির থাকতে পারি?


শানু উঠে বসার চেষ্টা করেআমি বললাম, আবার উঠছো কেনো?
শানু বললো, তোমাকে দেখে, অর্ধেকটা জ্বর বোধ হয় কমে গেছে একটু বসি।

আমি বললাম, ঠিক আছে।

 

শানু উঠে বসে দেয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে থাকেআমি বললাম, হঠাৎ এমন জ্বর উঠলো কেনো?
শানু বললো,আর বলো না! বড় চাচা অনেক দিন পরই এলোঅনেক কিছু আনলোও। গত রাতে ওই খাবার খাওয়ার পরই কেমন কেমন যেনো লাগছিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি গায়ে প্রচন্ড জ্বর
আমি বললাম, যার তার আনা খাবার খেতে যাও কেনো?


শানু কিছুক্ষণ আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে। তারপর বললো, যাতা বলছো কেনো?আব্বাজান এর আপন বড় ভাই!আমাদের খুব কাছের রক্ত!
আমি বললাম, তা মানলাম তুমি তো বাইরের কারো দেয়া কিছু খাও না।এখন তো কষ্ট পাচ্ছো!
এই বলে আমি অন্যত্রই তাকিয়ে থাকি। শানু হাঁটু ভাজ করেই বসে। তারপর বললো, কি ভাবছো?

 

আমিও আর জটিল কিছু ভাবলাম না। এই মূহুর্তে বোধ হয় আমার শানুর প্রতি সম বেদনা প্রকাশ করা উচিত
আমি বললাম, আমার বিশ্বাস সব ঠিক হয়ে যাবে এমন জ্বর আমারও মাঝে মাঝে হয়। তখন সত্যিই খুব নিসংগ লাগে। মনে হয়, কোন আপনজন যদি কাছে থাকতো!
শানু বললো, আমাদের বিয়ে কবে হবে?

আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। বললাম, আমিও তো চাই, তোমাকে বিয়ে করে সংসার করতেকিন্তু মাত্র তো এইচ এস সি পরীক্ষাটা শেষ হলোকবে রেজাল্ট দিবে কে জানে?রেজাল্টটা হলে, একটা চাকুরী নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতাম
শানু বললো, তুমি আমাদের বাড়ীতে লে এলে কি হয়?
আমি বললাম,তা হয় না শানুআমার নিজেরও কিছু নীতী আছে তা ছাড়া আমিও ভাবছি, বাবার মুখুমুখি হবো। বাবার উপরও আমার অনেক রাগ!

 

আমার কথা শুনে, শানুর চোখ দুটি এক প্রকার উজ্ঝ্বল হয়ে উঠে। মুখটা ঘুরিয়ে আমার দিকে খানিকটা প্রনয়ের দৃষ্টি মেলেই তাকিয়ে থাকে। খানিকটা আহলাদ করেই বললো, আমারও বিশ্বাস! তুমি আমার জন্যে সব কিছু করতে পারবে। তুমি কখনো আমাকে ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যাবে না তো?
আমি বললাম, হঠাৎ এই কথা বলছো কেনো?
শানু বললো, অসুখের সময় সব মানুষের মনই দুর্বল থাকেআমারও খুব ভয় হয়তোমার বাবা আমাকে মেনে নেবে তো?
আমি বললাম, মেনে নিলেই কি আর না মানলেই কি?তাই তো আমি নিজ পায়ের উপর দাঁড়াতে চাইছিমামার কাছে ব্যাবসাটাও শিখতে চেয়েছিলামঅথচ, মামা তাও শেখাচ্ছে নাথাক, এখন এত কিছু ভেবে আর কাজ নেইআগে তুমি সুস্থ হয়ে উঠো

শানু কিছুক্ষণ চুপচাপই থাকলো। তারপর বললো, সত্যিই তুমি খুব ভালো

আমি বললাম, ভালো কি খারাপ, নিজেও বুঝতে পারি না। মানুষের কষ্ট দেখলে, আমারও খুব কষ্ট হয়। আর তোমার কষ্ট দেখলে, আমার আর কিচ্ছু ভালো লাগে না।

শানু বললো, প্রেম ভালোবাসা বলতে কি সত্যিই কিছু আছে?

আমি বললাম, তোমার কি এখনো সন্দেহ হয়?

শানু বললো, এখনো ঠিক বুঝতে পারি না। যখন তোমার চোখ দুটি দেখি, তখন সত্যিই মনে হয়, আছে।

আমি বললাম, তোমার চোখেও কিন্তু অনেক ভালোবাসা। আর কেউ বুঝতে না পারলেও, আমি বুঝি।

শানু বললো, তুমি এত সুন্দর করে কথা বলো কি করে? কার কাছে শিখেছো, এত কথা?

আমি বললাম, কিছু কিছু কথা কারো কাছে শিখতে হয়না। প্রকৃতিই তাকে উদার হয়ে শিখিয়ে দেয়।

 

শানু আমার দিকে মুগ্ধ নয়নেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর বললো, সত্যিই, তুমি আমাকে মেরেছো।

আমি বললাম, না শানু, তোমাকে ভালোবেসে বোধ হয় আমিই মরেছি।

শানু আমার দিকে খানিকক্ষণ প্রণয়ের দৃষ্টি মেলেই তাকিয়ে থাকে। তারপর বললো, আমার মনে হয়, আমার গায়ে আর জ্বর নেই। তুমি বসো, সারাদিন গোসল করা হয়নি। আমি গোসলটা সেরে আসি।

এই বলে শানু বিছানা থেকে নামার উদ্যোগ করে।

আমি বললাম, এই অসুস্থ শরীর নিয়ে গোসল করতে যাবে?

শানু বললো, হ্যা খোকা, গত রাত থেকে এখনো এই বিছানাতে। গা থেকে কেমন জানি গন্ধ বেরোচ্ছে।

 

শানু নিজ শক্তিতেই বাথরুমটার দিকে এগুতে চাইলোঅথচ দু পা এগুতেই কেমন যেনো পরে যাবার উপক্রম করলোআমি ছুটে গিয়েই তাকে জড়িয়ে ধরি। কোন রকমে মেঝেতে বসানোর চেষ্টা করি।

শানুও মেঝেতে হাঁটু চেপে বসার চেষ্টা করে। আমার দিকে কিছুক্ষণ বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে। তারপর, ঘাড়টা কাৎ করে বললো, তুমি আবারো আমাকে ছুলে?

 

আমি খানিকটা দূরে শানুর সামনা সামনিই বসি। তারপর বললাম, তোমার শরীর এখনো দুর্বল তুমি যদি এখন পরে যেতে! তোমার এই দুঃসময়ে তোমাকে ছুতে সমস্যা কোথায়? আমাকে কি তোমার আপন মনে হয় না?

শানু আমার দিকে এক প্রকার অসহায় চেহারা করেই তাকিয়ে থাকে। বললো, আমি বোধ হয় মারা যাবো! তুমি ঐদিনও আমাকে ছুয়েছিলো। তাই বোধ হয় আমার এই শাস্তি!
আমি বললাম, না শানু, তোমার শরীর এখনো দুর্বল!সুস্থ হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে
শানু বললো, না, আমার তো এমন কখনো হয়নি!

আমি বললাম, না শানু, আমি তোমাকে ছুয়েছিলাম বলেই তোমার জ্বর হয়নি। হলে সেদিনই হতো!

 

শানু আমার চোখে চোখেই তাকিয়ে থাকে। বললো, এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে তুমি কথা বলো কি করে?

আমি বললাম, আমিও কখনো পাপ করিনি। তা ছাড়া মানুষের সব দিন সমান যায় না

শানু কিছুক্ষন ভাবলোতারপর বললো, আসলে আমি কিছুই ভাবতে পারছি না। আমার কি হয়েছে নিজেও কিছু বুঝতে পারছি না।

আমি বললাম, হয়েছে হয়েছে। চলো, আমি তোমাকে গোসলটা করিয়ে দিই।

আমি শানুকে ধরে ধরে দাঁড় করাই। তারপর এটাচ্ড বাথরুমটার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাই। তারপর বললাম, এসো।

শানুর মনটা তখনো দুর্বল থাকেসে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো, তুমি আমাকে গোসল করিয়ে দেবে? তা কি করে হয়?

আমি বললাম, একশ বার করিয়ে দেবো! আর একটা বেশী কথা বললে ওটাও করে দেবো! তখন খুশী হবে?

 

শানু আমার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তারপর আহ্লাদ করে বললো, প্লীজ! এমন নিষ্ঠুর এর মতো কথা বলো না। আমার সাথে কেউ এমন করে কথা বলে না।

আমি বললাম, কিন্তু এখন থেকে আমি বলবো। তুমি যতদিন পর্যন্ত সুস্থ না হও, ততদিন তোমার পাশেও থাকবো। কি করবে? নাকি চলে যাবো!

শানু আহত হয়ে বললো, না খোকা, তুমি চলে গেলে আমিও খুব কষ্ট পাবো। ঠিক আছে, আমি আর আপত্তি করবো না। তারপরও অমন করে বলো না।

আমি শানুর ফুলা ফুলা নরোম গাল দুটি চেপে ধরে বললাম, না, এমনিতেই দুষ্টুমী করলাম। বন্ধু হিসেবে কি এতটুকু দুষ্টুমীও করতে পারি না?

শানু আর আমার দিকে আবারো শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

আমি বললাম, আবার কি দেখছো?

শানু অসহায় গলায় বললো, আমার পাপ হবে না তো?

আমি বললাম, হলে হবে! কই, তোমার এত জ্বর! আর কাউকে তো দেখতেছি না।

শানু বললো, আসলে বাবা সারাদিন তার দরবার নিয়েই ব্যাস্ত থাকে। তা ছাড়া এই বাড়ীতে শুধু আমি আর সাগরই থাকি। বাবা মা আর ছোট বোন প্রধান রাজ বাড়ীতে থাকে। বাবা মা দুশ্চিন্তা করবে, তাই কাউকে জানাইনি।

আমি অবাক হয়ে বললাম, বলো কি? তোমাদের আরো একটা বাড়ী আছে?

শানু বললো, ও, তোমাকে বুঝি কখনো বলাই হয়নি। আমাদের প্রত্যেক ভাইবোনদের জন্যে আলাদা আলাদা বাড়ী। এই বাড়ীটা আমার। আমার ছোট ভাই সাগর মাঝে মাঝে আমার সাথে থাকে। প্রধান রাজবাড়ী আরো একটু ভেতরের দিকে। আর, সাগরকে তো তোমার কাছে আমিই পাঠিয়েছিলাম। কেনো যেনো তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হয়েছিলো।

 

আমি কিছুক্ষণ চুপচাপই থাকি। তারপর বললাম, ও! তাহলে কি করবো? নিজে নিজে গোসল করতে পারবে? আবার পরে যাবে না তো?

শানু বললো, না, আমার আর আপত্তি নেই। দেবে আমাকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে? তোমারও পাপ হবে না তো?

আমি বললাম, যদি হয়ও, তাহলে বিধাতাকে বলবো, আমার হবু বউটার জীবন বাঁচানোর জন্যেই সব করছি।

শানু বললো, তাই যেনো হয়। কিন্তু, বিয়ের আগে কিন্তু আমার উপর কোনদিনই লোভ করতে পারবে না।

আমি বললাম, মনে থাকবে সম্রাজ্ঞী!

শানু আর কোন দ্বিধা দ্বন্দ করে না। আমি তাকে ধরে ধরে বাথরুমটার ভেতরই নিয়ে যাই। শানু মেঝেতে হাঁটু বিছিয়ে বসে। তারপর পাশ ফিরে বললো, রাতে আমার পাশে থাকবে?সারা রাত গলপো করবো

আমি বালতির জমানো পানি, একটা মগ দিয়ে শানুর মাথায় ঢেলে বললাম, আমার সমস্যা নেই। মামার বাড়ীতে তো এখন একাই থাকি। কখন কোথায় কেমন থাকি, কেউ ঠিক জানেও না।

শানু বললো, আমি বাবাকে সব জানাবো।

আমি বললাম, কি জানাবে?

শানু বললো, আমাদের কথা। আমি তোমাকে ভালোবাসি

আমি বললাম, যদি রাগ করে?

শানু বললো, আমার নিজেরও তো একজন বডি গার্ড দরকার। আপাততঃ তোমাকে বডি গার্ড করে রেখে দিতে বলবো।

আমি আরেক মগ পানি শানুর গায়ে ঢেলে বললাম, বডি গার্ড?

শানু বললো, আপাততঃ তোমাকে কাছে পাবার মতো, আর কোন বুদ্ধি আমার মাথায় আসছে না।

আমি বললাম, গুড! আমার আপত্তি নেই।

 

আমি শানুর গায়ে সাবান মাখিয়ে দিতে থাকি। শানু আমার চোখে চোখে তাকিয়ে থাকে। বললো, তোমার কি একটুও ফীলীংস হচ্ছে না?

আমি শানুর উরুতেও সাবান মেখে মেখে বলি, কিসের ফীলীংস?

শানু বললো, মেয়েদের গা ছুলে তো, ছেলেদের ফিলীংস হবার কথা, তাই বললাম।

 

আমি শানুর কথা না শুনার ভান করে বললাম, আমি কালকেই বাবার কাছে যাবো।

শানু বললো, সত্যি বলছো?

আমি শানুর গায়ে পানি ঢালতে ঢালতে বলি, আমি মিথ্যে বলি না।

 

শানুর দেহটা চকচকে হয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠে। চেহারাটাও অনেক সতেজ হয়ে উঠে। আমি তোয়ালেটা টেনে নিয়ে, শানুর গাটাও মুছে দিই ভালো করে। শানু আমার দিকে এক প্রকার কৃতজ্ঞতার চোখেই তাকিয়ে থাকে। বললো, তুমি আমাকে এত্ত ভালোবাসো?

আমি বললাম, তোমার কি এতদিন কোন সন্দেহ ছিলো?

শানু বললো, নাহ!

আমি বললাম, চলো, ঘরে চলো। এখন নুতন একটা পোশাক পরে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম করবে। আমি সারা রাত বসে বসে শুধু তোমাকে দেখবো।

 

আমি শানুকে ধরে ধরেই তার শোবার ঘরে নিয়ে যাই। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বললাম, এবার চুপচাপ শুয়ে থাকো।

শানু বললো, আমি কি ন্যাংটু থাকবো?

আমি বললাম, ও, স্যরি! তোমার পোশাক কোথায় রাখো?

শানু বললো, ওই যে, ওই ড্রয়ারে।

আমি এগিয়ে যাই ড্রয়ারটার দিকে। ড্রয়ারটা খুলে নুতন একটা ব্লাউজ আর ডোমা বের করে শানুর কাছে নিয়ে আসি। শানু নিজে নিজেই সেগুলো পরে নেয়। তারপর বিছানায় কাৎ হয়ে শুয়ে বললো, তুমি কি সত্যিই সারা রাত থাকবে?

 

ব্যাক্তিগত ভাবে, আমার কোন ধর্মীয় কিংবা গোত্রীয় রীতীর প্রতি কোন প্রকার বিরোধ নেইকেনো যেনো মনে হয় প্রতিটি ধর্মে কিংবা গোত্রের উদ্ভব হয়েছিলো কিছু পরিস্থিতির কারনেমানুষ বিপদ থেকে মুক্তি পাবার আশায় কিছু অদৃশ্য শক্তি খোঁজেসেই শক্তির কাছে কিছু চেয়ে থাকেপাহাড়ী গোত্রের মানুষরাও তাদের নিজস্ব চিন্তা ভাবনাতেই কোন এক অদৃশ্য শক্তিকে বিশ্বাস করেপাপকে পাপই মনে করে। ধর্মীয় ব্যাপার গুলো যেমনি কিছু বিশ্বাস, ভালোবাসাও বেঁচে থাকে কিছু বিশ্বাস এর উপর

সে রাতে কখন যে আমি শানুর পাশেই ঘুমিয়ে পরেছিলাম, নিজেও টের পাইনি। সকালে হঠাৎই শানুর ঘুম ভাঙ্গে। আমাকে ডেকে তুলে, মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিয়ে বললো, এই, আমার জ্বর তো নেই! খুব ফ্রেশ লাগছে!

 

পরদিন সকালে শানুর জ্বরটা সত্যিই সেরে গিয়েছিলোআমিও রওনা হয়েছিলাম সাগর পারে বাবার কাছে।

বাবার সাথে দেখা দীর্ঘ চার বছর পর। ততদিনে আমার চেহারারও অনেক পরিবর্তন হয়েছিলো। বাবাও আমার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করেই তাকিয়ে থাকে। তারপর বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করেই কাঁদলো কিছুক্ষণ।

 

শানুর ব্যাপারটাও কি করে যে বলি, সেই নিয়েও ভাবছিলাম।

কিছু কিছু ব্যাপার থাকে, মানুষ চাইলেও বুঝি খুব সহজে কারো কাছে হঠাৎ প্রকাশ করে বলতে পারে না। বিয়ের ব্যাপারগুলোও তেমনি। তা ছাড়া বয়সেরও একটা ব্যাপার থাকে। তার উপর বাবার কাছ থেকে চারটি বছর বিচ্ছিন্নও ছিলাম। আমি সপ্তাহ খানেক সময়ই নিলাম। তারপর যখন সাহস করে বাবাকে সব কিছু খুলে বললাম, তখন বাবা কিছুই বললো না।

 

আমি আরো দুদিন সময় নিলাম। মামার বাড়ী ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে বললাম, এখনই যে তোমার সিদ্ধান্ত জানাতে হবে, তা নয়। আমি আবারো আসবো।

বাবা বললো, পান্না আমাকে না জানিয়ে পালিয়ে গেলো, ইলাকেও মেরে ফেললো সবাই মিলে নৃশংস ভাবে। তোমার মাও আমাকে না জানিয়ে চলে গেলো পরপারে, মৌসুমীরও বিয়ে হলো আমাকে না জানিয়ে। তুমি আমার অনুমতি নিতে চাইছো কেনো? তোমার যা খুশী তাই করো। আমার কেউ নেই। যখন তুমিও কোন একদিন বাবা হবে, তখন তুমিও বুঝবে।

 

বাবার কষ্টটা আমিও অনুভব করতে পারি। আমি আরো কয়টা দিন বাবার সাথেই থেকে যাই।

পাহাড়ী অঞ্চলে ফিরে এসেছিলাম দুই সপ্তাহ পর। মামার বাড়ীতে ঢুকে মামানীকে সালাম দিলাম। অথচ, মামানীকে দেখলাম খুব গম্ভীর।

আমি খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বললাম, মামানী, শানুকে একটু দেখে আসি।

মামানী কঠিন গলায় বললো, শানুকে কোথায় দেখতে যাবে?

আমি বললাম, কেনো? ওদের বাড়ীতে।

মামানী বললো, শানু নেই!

আমি চোখ কুচকে বললাম, নেই মানে?

মামানী বললো, তুমি এত দেরী করলে কেনো? একটা মেয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলো। অন্ততঃ তুমি তো জানতে, খুব অভিমানী প্রকৃতির একটা মেয়ে ছিলো। যাবার আগে তোমাকে একটা চিঠি লিখে গিয়েছিলো। সাগর এসে দিয়ে গেছে। তোমার পড়ার টেবিলেই ওটা আছে।

 

আমি আমার পড়ার ঘরেই যাই। ভাঁজ করা কাগজটা হাতে নিই। খুলে পড়তে থাকি।

জানতাম, তুমি আমাকে ফাঁকি দেবে।

তুমি আর কক্ষণো আসবে না।

আমি কি তোমাকে ছাড়া একটি দিনও থাকতে পারি?

আমিও চলে যাচ্ছি।

-       শানু।

 

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎই কেমন ভার ভার হয়ে উঠে নিজেও বুঝতে পারি না। মাথার ভেতরটা এক প্রকার শূন্যতায় ভরে উঠে। আমি শুধু বির বির করি, আমি বিশ্বাস করিনা!

 

দিন যায়, সপ্তাহ খানেকও পার হয়ে যায়। আমার কিছুই ভালো লাগতো না।

অনেকদিন পরই সেদিন ঘর থেকে বের হলাম। রাস্তার মোরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। অনেক ছেলেমেয়েরাই তখন স্কুলে যেতে থাকে। আমার দৃষ্টিটা শুধু হারিয়ে যায় এক শূন্যতার গভীরে।

 

(সমাপ্ত)



সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান