প্রকৃত সন্তান এবং অভিভাবকের দায় ।। মনজুরুল ইসলাম
$post->title

যাপিত জীবনের ক্রিয়াশীলতার পেছনে যে আপেক্ষিক অনুভূতিটি প্রতিনিয়ত প্রণোদনার সৃষ্টি করে থাকে সেটি বোধ করি একজনের প্রতি আরেকজনের নির্মোহ অনুরাগ। সম্পর্কের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে অনুরাগের এই মাত্রাটি স্থিত রয়ে যায় জীবনের শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত। একজন আরেকজনের প্রতি তারকায়িত এই অনুরাগ কিংবা মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে প্রাণিত করে তুলতে চায় জীবনের ণ্ড ণ্ড মুহূর্তগুলোকে। এক অনন্তর অসীম দায়বোধ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রিয় মানুষটিকে বোঝাতে চায়; তার প্রতি তার প্রকৃত অনুরাগের গভীরতাটিকে। অনুরাগের এই মাত্রাটি সর্বোচ্চ মাত্রায় অন্তরিত রয়ে যায় বাবা মায়ের সাথে সন্তানের শাশ্বত সম্পর্কের গভীর অভ্যন্তরেই হয়ত ক্ষেত্রে কারোরই দ্বিমত থাকবার কথা নয়। বাবা মা তাদের জীবনের সর্বোচ্চ সামর্থ্যটুকু অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নিয়ত সচেষ্ট থেকে যান সন্তানের জন্যে একটি সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণের। স্বাভাবিকভাবেই তখন সন্তানের ক্ষেত্রেও একটি পবিত্র দায়বোধের সৃষ্টি হয় তার প্রতি তাঁর বাবা মায়ের অকৃত্রিম অনুরাগের মাধ্যমে গ্রন্থিত বন্ধনকে কেন্দ্র করে। কোনোভাবেই সে তার এই দায়বোধ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে, নিজের ভবিষ্যতকে জলাঞ্জলি দেবার কাজটি করতে পারে না। প্রতিটি মুহূর্তে বাবা মায়ের প্রত্যাশাটিকে স্মরণ করবার মাধ্যমে নিজেকে সমর্পণে ব্যাপৃত রয়ে যায় জীবনযুদ্ধে। প্রচেষ্টার উপান্তে দাঁড়িয়ে যখন সফলতার আলোকরশ্মির মাধ্যমে নিজেকে দীপান্বিত করবার সুযোগ পেয়ে যায়, তখন যতটা না নিজেকে প্রাণিত করে তুলতে পারে, তার চাইতেও অধিক মাত্রায় তারই অবচেতনায় তার বাবা মায়ের আরো অধিক মাত্রায় প্রাণিত হবার স্পষ্ট প্রতিভাসটি ফুটিত হতে থাকে। অর্থাৎ  বাবা, মা এবং সন্তানের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে সৃষ্টি হয়ে থাকে এক ধরনের অকৃত্রিম এবং আয়াসসাধ্য আকাক্সিক্ষত সুখবোধের।

 

এই যে অকৃত্রিম সুখবোধ, এই সুখবোধটিকে একান্ত আপনার করে নিতে চায় সমাজে বসবাসরত প্রত্যেক বাবা মাই। নতুন জামা প্যান্ট আর কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে যেদিন প্রথম তাদের ছোট্ট সন্তান হেলে দুলে স্কুলের পথে রওয়ানা হয়, ঠিক সেদিন থেকেই দুর্মূল্য এই সুখবোধ নামীয় অনুভূতিটিকে প্রাপ্তির যাত্রা শুরু হয়। স্কুলের গেট পেরিয়ে সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে তার সন্তানের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের দৃশ্যটি যখন বাবা অথবা মা প্রত্যক্ষ করেন এবং পর মুহূর্তেই পেছন ফিরে আপন আপন গন্তব্যের দিকে ছুটতে থাকেন, ঠিক সেই মুহূর্তটি থেকে শুরু হয় সন্তানের স্ন্দুর ভবিষ্যৎ নির্মিতির পরিকল্পনা। সন্তান লালনের ক্ষেত্রে তাদের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সেটি তারা উপলব্ধি করে থাকেন তখন থেকেই। এবং সে অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করবার প্রয়াসটি গ্রহণ করতে থাকেন। পাশাপাশি তারা এটিও উপলব্ধি করে থাকেন যে, তাদের সন্তানের সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এটি বলা বোধ করি অসঙ্গত হবে না যে, একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে বেড়ে উঠবার ক্ষেত্রেবাবা মায়ের মানস অভ্যন্তরে ইতিবাচক উপলব্ধির উদগম হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই উদগমিত উপলব্ধির মাধ্যমে বাবা মা যদি শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই তাদের সন্তানদের প্রকৃত পরিচর্যা গ্রহণে সক্ষম হন তবে অবশ্যই তাদের সন্তান প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে বেড়ে উঠতে সক্ষম হবে। এবং যে সুবর্ণ মুহূর্তটির জন্য বাবা মা, সন্তান এবং শিক্ষক অপেক্ষা করতে থাকবেন সেই মুহূর্তটি অবশ্যই দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। কিন্তু, অভিভাবকবৃন্দ যদি তাদের সন্তানের ভবিষ্যত নির্মিতির প্রচেষ্টা হিসেবে সন্তানকে শিক্ষায়তনে পাঠিয়ে দিয়েই নিশ্চিত থাকেন তবে সেই দুর্মূল্য মুহূর্তটিকে জয় করা তো কখনোই সম্ভব নয় বরং সন্তানকে এমন এক অপ্রত্যাশিত অবস্থায় আবিষ্কার করবেন যা তাদের কল্পনাকেও হার মানিয়ে দেবে। 

 

তাছাড়া শিক্ষাগ্রহণের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আচরণগত পরিবর্তন এবং চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন। এই দ্বি-মাত্রিক গুণের সংযোজন যতক্ষণ না শিক্ষার্থীদের উপলব্ধির অন্তর প্রকোষ্ঠে অন্তরিত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত অভিভাবকবৃন্দ স্বস্তির নিশিছদ্র নিরাপত্তায় নিজেদের আবৃত রাখতে পারেন না। উপলব্ধিগত উৎকর্ষ না ঘটলে শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ তাদের সন্তানরা কখনোই পড়াশুনায় ব্যাপৃত থেকে যে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব সেখানে পৌঁছতে পারবে না। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের ফলাফল যদি সন্তোষজনক মাত্রায় উত্তীর্ণ হয় তবুও বাস্তব জীবনে তারা কতটুকু নিজেদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি হবার

মতো অবকাশ থেকে যাবে। সে প্রেক্ষিত বিবেচনায় এই গুণ দুটি সন্তানদের বোধের জাগৃতিতে সংযোজিত করতে বিভিন্ন ভাবে উদ্যোগী হবার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অভিভাবকবৃন্দের ক্ষেত্রে। শুধু তাই নয়, অধ্যয়ন থেকে শুরু করে জীবন চলার প্রতিটি পদক্ষেপ জুড়ে অভিভাবকবৃন্দের শক্তিশালী ভূমিকা পালনের প্রসঙ্গটি সক্রিয় হয়ে ওঠে তাদের সন্তানদের মঙ্গলের জন্যেই।

 

যে বিষয়টি সবসময়ের জন্যেই সত্য হিসেবে স্বীকৃত সেটি হলোÑ অধ্যয়ন নিশ্চিতভাবেই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে যে শিক্ষার্থীটি জীবনের প্রথম প্রহরেই অধ্যয়ন প্রত্যয়টিকে আনন্দদায়ক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে সক্ষম হবে, সেই শিক্ষার্থীটি অবশ্যই সারাজীবন মনের আনন্দে পড়াশুনা চালিয়ে যাবার ক্ষেত্রে আগ্রহান্বিত হবে। কিন্তু যে সমস্যাটি সবসময়ের জন্যেই প্রত্যক্ষ করা যায় সেটি হলো, অভিভাবকবৃন্দই তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অন্তর্লোকে পড়াশুনার প্রত্যয়টিকে একটি কঠিন বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। তাদের পক্ষ থেকে অনবরত চাপটি প্রত্যক্ষ করবার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভেতরে যখন এই ধারণা স্থির হয় যে, অধ্যয়ন প্রকৃতই একটি কষ্টকর কাজ তখন তাদের মনন আর শিক্ষা গ্রহণকে আনন্দদায়ক কাজ হিসেবে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়ে ওঠে না। ফলস্বরূপ পড়ার টেবিলে বসে থাকলেও তাদের মননকে তারা সঠিকভাবে পাঠ্যপুস্তকের অভ্যন্তরে নিবিষ্ট রাখতে পারে না। অথচ যে বিষয়টি অভিভাবক, শিক্ষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, যত কষ্টই হোক শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়েই পড়াশুনা যে নিতান্তই একটি আনন্দদায়ককাজ সেই ধারণাটি তাদের অন্তর্জগতে আজীবনের জন্যে অন্তঃস্থ করা। পাশাপাশি তারা যাতে ছোটোবেলা থেকেই দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হবার মতো প্রেরণাধর্মী কাজের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে পারে সেই প্রচেষ্টাটিও অব্যাহত রাখা।

 

এক্ষেত্রে যা ভেবে দেখা প্রথম শর্তেই জরুরি তা হলো, আমরা আমাদের সন্তানদের বিশেষ কোন উদ্দেশ্য সাধনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করছি। নির্দিষ্ট সেই উদ্দেশ্যটিকে সিদ্ধ করবার নিমিত্তে অনুসন্ধিৎসু তীক্ষè পর্যবেক্ষণ দৃষ্টির প্রক্ষেপণ প্রত্যেক অভিভাবকের জন্যই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিক্ষার্থীরা কি উন্নত চিন্তা কর্মের মাঝে নিজেদের বিরাজিত রাখছে নাকি অপকর্মে অগ্রসর হওয়ার মানসে সমাজগর্হিত কাজে অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে? সম্ভব হলে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই বিশেষত মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শুরুতেই যাতে অপকর্মে নিরত রয়ে তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে জলাঞ্জলি দিতে না পারে সে দিকটির প্রতি লক্ষ রাখা অত্যন্ত জরুরি। এমনো হতে পারে, কোনো শিক্ষার্থী না বুঝে ভুল পথে পা বাড়াতে উদ্যত হয়েছে, সেক্ষেত্রে অভিভাবকবৃন্দ যদি ক্রুদ্ধ আচরণ প্রদর্শনের পরিবর্তে তাকে বোঝানোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারেন, তাকে নিয়ে দর্শনীয় কোনো স্থানে ভ্রমণ করবার মাধ্যমে পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকবার তাড়না তার অন্তর্মনে প্রবিষ্ট করতে পারেন, পৃথিবীর বুকে নিজের বেঁচে থাকবার গুরুত্বটিকে উপলব্ধি করাতে সক্ষম হন তবে অবশ্যই সেই শিক্ষার্থীটি পুনরায় নবোদ্যমে শিক্ষাজীবন শুরু করতে পারবে। অভিভাবকের সমন্বিত ছন্দোবদ্ধ আচরণ প্রত্যক্ষ করবার মাধ্যমে সে তখন তার জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করতে শুরু করবে। তার প্রতি যে তার বাবা মা সহ চারপাশে এত শুভাকাক্সক্ষী রয়েছে তা নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করবার পর প্রচÐভাবে লজ্জিত হতে থাকবে এবং নিজের সর্বশেষ নির্যাসটুকু প্রয়োগ করে হলেও আলোর পথের প্রথম যাত্রী হতে সতত প্রবৃত্ত রয়ে যাবে। কিন্তু সেটি না করে যদি তার ওপর শারীরিক মানসিক নির্যাতন চালানো হয় তবে তার ভেতরে আস্থার সংকট সৃষ্টি হবে। তার নিজের দ্বারা যে ভালো কিছু করা সম্ভব, সেটি ক্রমেই ভুলে গিয়ে পুনরায় সে নেতিবাচক পথে পা বাড়াতে উদ্যোগী  হবে।

 

আমাদের দেশে সহজেই দৃশ্যমান হয় যে, অধিকাংশ অভিভাবকই তাদের সন্তানদের একই সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে থাকেন যা কোনোভাবেই কাক্সক্ষনীয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শারীরিক এবং মানসিক সামর্থ্যরে দিকটির প্রতি গুরুত্ব প্রদান করবার বিষয়টি অবশ্যই অগ্রগণ্য হওয়া বাঞ্ছনীয় সেই সব শিক্ষার্থীদের কল্যাণকর ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রয়োজনেই। অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের ন্যূনতম ভালো লাগা বোধ সৃষ্টির পূর্বেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার ধারণাটি তাদের মননের মর্মমূলে প্রোথিত করবার চেষ্টা করে থাকেন। একবারের জন্যেও যাচাই করবার চেষ্টা করেন না যে, সত্যিই তাদের সন্তান চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী হতে আগ্রহী কিনা?ভালোলাগার বোধ থেকে কোনো বিষয়ে পড়াশুনা করা এবং অব্যাহত চাপ দ্বারা আদিষ্ট হয়ে পড়াশুনা করবার মধ্যে যে কত বিস্তীর্ণ ব্যবধান রয়েছে সেটি তারা বুঝতে চান না।

 

শিক্ষকতা জীবনের শুরুতেই একটি কষ্টকর স্মৃতি এখনও আমাকে তাড়িত করে। আমার কলেজেরই এক শিক্ষার্থী খুলনা প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তার বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল সে ডাক্তার হবে। আমরা পরামর্শ প্রদান করেছিলাম অন্তত খুলনায় ভর্তি হয়ে পরবর্তী বছর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য চেষ্টা করতে। যদি মেডিক্যালে সুযোগ পেয়েই যায় তবে অবশ্যই মেডিক্যালে পড়বে। কিন্তু না পেলে পরবর্তী সময়ে যেন খুলনায় ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে অধ্যয়নের সুযোগটি রয়ে যায়। আর যদি ভর্তি না হয় তাহলে দ্বিতীয়বার যখন সে চেষ্টা করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে তখন আর কোথাও ওর পড়বার সুযোগটুকু অবশিষ্ট থাকবে না। ঠিকানাহীন পথের যাত্রী হিসেবে নিজেকে আবিষ্কারের পর আর

কোনো ঠিকানাকেই একান্ত আপনার বলে মনে করতে পারবে না সে। সীমাহীন দুঃখের চাপ সহ্য করতে না  পেরে এবং তার সম্মুখে বিকল্প কোনো উপায় না থাকবার কারণে সে নিজের ওপর ক্ষোভ, ব্যর্থতা, অভিমানের তাড়নাকে প্রশ্রয় দিয়ে কোনো এক সময়ে চূড়ান্ত জীবনে প্রভাব বিস্তারী নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কিন্তু, বাবা মায়ের ধারণা ছিল খুলনায় ভর্তি হলে তাদের সন্তান পড়াশুনায় মনোযোগ কমিয়ে দেবে যা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবার ক্ষেত্রে ওই সন্তানটির সম্পূর্ণ মননজুড়ে একটি নেতিবাচক প্রবাহের আবহ সৃষ্টি করবে। তাই, বাবা মায়ের আগ্রহের অভাবে সে আর খুলনায় ভর্তি হতে পারে নি। শুধু মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্যেই প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, শিক্ষার্থীটি দ্বিতীয়বারেও মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায় নি এবং আত্মহত্যার মতো নির্মম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

এখন বিষয়টি চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে সত্যের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দৃষ্টিসীমায় যা জ্বলজ্বল করতে থাকে তা হলো, শিক্ষার্থীটির অভিভাবকবৃন্দের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বোধ্যতার চরম অভাব। এই বোধ্যতার অভাবই শেষ মুহূর্তে এসে নিজের ইচ্ছের অবমূল্যায়ন হতে দেখে তার আত্মহননের সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এই আত্মহননে সমাজের কিছুই প্রাপ্তি যোগ ঘটলো না, বাবা মায়ের পাশাপাশি সন্তানের আকাক্সক্ষাও পূরিত হলো না। কিন্তু একটি তীব্র উজ্জ্বল সম্ভাবনার সান্নিধ্য পেতে গোটা সমাজ বঞ্চিত হলো। হয়ত এমন অনেক শিক্ষার্থীই খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা শিক্ষাজীবনে বাবা মায়ের চাহিদাটুকু পূরণ করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে কিংবা অতৃপ্ত মানসে কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করে যাচ্ছে। এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছের বিরুদ্ধে এভাবে অনবরত অধ্যয়নের মাধ্যমে ভীষণভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে তারা। জীবনের চেয়ে কেরিয়ারকে গুরুত্ব প্রদান করে আমরা আজও এই আধুনিক যুগে এমন অমানবিক সিদ্ধান্ত সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিয়ে থাকি। কেরিয়ার নয় বরং সুন্দর জীবনবোধের ভেতরে যে আরো একটি সুন্দর ঐশ্বর্য লুকিয়ে রয়েছে সেটির মোটেও অনুসন্ধান করি না বলেই আজ আমাদের এই দুর্দশা।

 

সুতরাং দ্বিধাহীন চিত্তে ব্যক্ত করা যায় যে, সন্তানকে অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি তার ন্যূনতম স্বাধীনতাটুকু কেড়ে নেওয়াও তার চাইতেও অধিক ক্ষতিকর, সেই সাথে পুরোপুরি অমানবিক। পক্ষান্তরে বাবা মা সন্তানদের প্রচুর পরিমাণে আদর করবেন, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু, আদরের মাত্রাটি যদি নির্দিষ্ট সীমাকে ছাড়িয়ে যায় সেক্ষেত্রে সেই পরিমাণ অপ্রত্যাশিত আদর সে সবার কাছ থেকে প্রত্যাশা করে থাকবে, যে প্রত্যাশাটি পূরণ করা আদৌ কারো পক্ষে কখনোই সম্ভব হয়ে উঠবে না। সে দিক থেকে সবার কাছ থেকে যখন সে সম-পরিমাণ ভালোবাসা পেতে ব্যর্থ হবে তখন থেকেই তার মানসিক গঠনটি নেতিবাচকতার দিকে ধাবিত হতে থাকবে। সেক্ষেত্রে সন্তানকে ছোটোবেলা থেকেই তার মননে এই শিক্ষাটিকে প্রবিষ্ট করবার চেষ্টা করাটাই বোধ করি বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক হবে যে, পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষেরই একটি নিজস্ব ভূমিকা থাকবে, যে ভূমিকাটুকুর ওপর নির্ভর করেই পৃথিবী দিনে দিনে

সুন্দর থেকে সুন্দরতর হয়ে উঠবে। সুতরাং সেই ভূমিকাটুকু পালন করবার প্রয়োজনেই একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃতভাবে বেড়ে উঠবার ক্ষেত্রে ঠিক যে পরিমাণ ভালোবাসার প্রয়োজন তার বেশি প্রত্যাশা করা তার জন্য সমীচীন নয়। এবং অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও মাত্রার অতিরিক্ত আদর প্রদান করা কোনোক্রমেই উচিত হবে না। ধরে নিতে হবে, অধিক আদর সন্তানটিকে বিপথে পরিচালিত করবার একটি উপাদান হিসেবে কাজ করতে থাকে। এক্ষেত্রে এই বিষয়টির প্রকৃত মর্ম সন্তানের অন্তর্বোধে জাগ্রত করতে পারবেন একমাত্র অভিভাবকবৃন্দই তাদের কর্মের মাধ্যমে। যেহেতু একটি শিশুকে সমাজের অন্যান্য শিশুদের মতো করে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভূমিকাটুকু পালন করে থাকেন কেবল বাবা মা-ই। কিন্তু শিশুটি যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে তবে এক সময় তার মানসলোকে নিয়ত অস্বাভাবিক জিদ ক্রিয়াশীল রয়ে যাবে। যে জিদ থেকে তাকে নিবৃত্ত রাখা ভবিষ্যতে ওই অভিভাবকের পক্ষে আর সম্ভব হয়ে উঠবে না। তাই সন্তান কষ্ট পাবে ভেবে তার সকল অন্যায় এবং উচ্চাভিলাষী আবদার পূরণ করবার ক্ষেত্রে একজন অভিভাবক যদি উদ্যোগী হন তবে পক্ষান্তরে ওই অভিভাবক নিজের সর্বনাশকেই আহŸান করবেন। 

 

ধরুন, ১৪-১৫ বৎসরের কোনো কিশোরকে যদি কোনো অভিভাবক মোটরসাইকেল চালনায় অভ্যস্ত করে তোলেন এবং সেই কিশোরটি যদি প্রাত্যহিক সকল কাজ সেই মোটরসাইকেল চালনার মাধ্যমে সম্পন্ন করে তবে তার মধ্যে দুধরনের পরিবর্তন আসবার সম্ভাবনাটি উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। প্রথমত তার সঙ্গে সহপাঠীদের দূরত্ব সৃষ্টি হবে, দ্বিতীয়ত সে তার শিক্ষার্থীদের থেকে নিজেকে ভিন্নভাবে কল্পনা করতে থাকবে। কারণ তার সহপাঠীদের অধিকাংশই সাইকেল, রিকসা, ভ্যান  কিংবা পায়ে হেঁটে তাদের নৈমিত্তিক কাজগুলো সম্পন্ন করবে। আর মোটরসাইকেলের সহজ প্রাপ্যতার কারণে সেই শিক্ষার্থীটি ইচ্ছে করলেই তুলনামূলক বেশি দূরত্বের কোনো স্থানে ঘুরে আসবার সুযোগটি পেয়ে যাবে। এর সাথে যদি একটি এন্ড্রোয়েড সুবিধার মুঠোফোন যোগ হয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। অর্থাৎ কিশোরটিকে গোটা বিষয়টি নেতিবাচকতার দিকে ধাবিত করবে। ধীরে ধীরে এটি যখন অভ্যাসে পরিণত হবে তখন সে আর একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর মতো নিজেকে স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে সক্ষম হবে না। কারণে অকারণে প্রায় প্রতি মুহূর্তে ব্যক্তিগত শোভন অথবা অশোভনÑযাই হোক না কেন তার অর্থের চাহিদা পূরণ করবার জন্যে বাবা মায়ের উপরই অনাকাক্সিক্ষতভাবে আরোপিত হয়ে চাপ প্রয়োগ করতে থাকবে। এতে করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সে অস্বাভাবিক জীবনে জড়িয়ে পড়বে। ফলস্বরূপ অস্বাভাবিক এই জীবনে অভ্যস্ত হবার কারণে নিজের ভেতর যে সম্ভাবনাটুকু অন্তরিত রয়ে যাবে তা ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ হতে থাকবে। পাশাপাশি তার সঙ্গে যদি কোনো দরিদ্র অথবা তার থেকে তুলনামূলক কম অবস্থাসম্পন্ন পরিবার থেকে উঠে আসা বন্ধু অথবা বন্ধুরা বিভিন্ন সময়ে তাকে সঙ্গ প্রদান করে থাকে তাহলে সেই বন্ধুদেরও তারই কারণে অবর্ণনীয় সমস্যার সম্মুখীন হবার সম্ভাবনাই তীব্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ এমনো হতে পারে, নিয়মিত তারা সেই বন্ধুটির মোটরসাইকেলে আরোহণ করে অনর্থক ঘোরাঘুরির সুযোগটি নাও পেতে পারে। এবং এই সুযোগটির অভাব তাদের মধ্যেও ভীষণভাবে ক্রিয়াশীল হতে থাকবে। ফলে পরোক্ষভাবে তাদের ভেতরেও যে প্রতিভা লুকিয়ে থাকবে সেটিরও বিকশিত হবার পথটি রুদ্ধ হবে। এমনকি তাদেরকে কেন্দ্র করে তাদের পারিবারিক জীবনে সৃষ্টি হবে সীমাহীন সমস্যার। অর্থাৎ একই সাথে কয়েকটি সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আস্তে আস্তে ম্রিয়মাণ হতে থাকবে এভাবেই। সুতরাং যে বিষয়টি কোনো সন্তান লালনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো- পরিবেশ যে চাহিদাগুলোকে অধিকতর প্রাধান্য প্রদান করে সেই চাহিদাসীমাকে স্পর্শ করা কিংবা কাছাকাছি পৌঁছানো অভিভাবকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সীমাটিকে অতিক্রম করা সন্তান এবং অভিভাবক উভয়ের মঙ্গলের জন্যে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। একইসাথে অর্থ উপার্জনের কষ্ট কোনো অভিভাবক যদি সন্তানের উপলব্ধির অভ্যন্তরে সঞ্চারিত করতে সক্ষম না হন সেক্ষেত্রে অবশ্যই সন্তানের স্বেচ্ছাচারী হবার সম্ভাবনাটি প্রকট হয়ে উঠবে।

 

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী বিল গেটস এবং তাঁর স্ত্রী ম্যালিন্ডা তাদের সমস্ত সম্পত্তি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করছেন এবং আজীবন করে যাবেন বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের তিন সন্তান জেনিফার, রোরি এবং ফোবির জন্যে একটি ডলারও না রাখবার নেপথ্যে যে কারণের কথা তাঁরা উদ্ধৃত করেছেন তা হলো ÒOur kids will receive a great education and some money so they are never going to be poorly off but they'll go out and have their own career.

এবং সত্যিকার অর্থেই তারা তাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যারা বাবা মায়ের এই সিদ্ধান্তে গর্ববোধ করেছে। পক্ষান্তরে তাঁদের সন্তানরা যে মানুষের মতো মানুষ হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবে সেই আস্থা কিংবা বিশ্বাস তাঁরা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু অভিভাবকবৃন্দ যদি সন্তানের এই চাহিদাসীমাটি অতিক্রমে সহায়তা করেন সেক্ষেত্রে নি¯প্রভ না থেকে উপায় নেই। যে বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিপন্ন সেটি হলো, যখন কোনো শিশু কোনো কিছু প্রাপ্তির আগ্রহ প্রকাশ করবে তখন যদি তাকে যৌক্তিকভাবে প্রথম থেকেই বুঝানো সম্ভব হয় যে, তার দাবিকৃত চাহিদাটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ তখন সে হয়ত স্বল্প সময়ের জন্যে কান্নাকাটি করতে পারে কিংবা মনোক্ষুণœ হতে পারে, আবার এটিও ঠিক- স্বল্প সময়ের মধ্যেই যে সে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসবে সেটি নিশ্চিত করে বলা যায়। আর এভাবে কোনো অভিভাবক যখন তাঁদের সন্তানদের অনবরত সকল বিষয়ে ভালোমন্দের যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে সক্ষম হবেন তখন অবশ্যই তাদের প্রতি সন্তানের আস্থা সৃষ্টি হবে এবং তারা যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে বাবা মায়ের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ফলে সন্তানের সঙ্গে বাবা মায়ের যে ধরনের সম্পর্ক প্রত্যাশা করা হয় সেটি সার্থক মাত্রায় উন্নীত হবে। 

 

সম্পর্কের এই পর্যায়ে এসে একজন অভিভাবক যখন চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রকৌশল অথবা অন্য কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার জন্য সন্তানকে উৎসাহ প্রদান করবেন তখন সন্তানদের কাছে এই উৎসাহটি আর উৎসাহ না থেকে তাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে রূপান্তরিত হবে এবং সেভাবেই তারা ভবিষ্যতের জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করবে। তার বাবা মায়ের চাহিদার সঙ্গে যদি নিজের চাহিদার সামঞ্জস্য না ঘটে তবে অকপটে বাবা মায়ের কাছে বলতে এতটুকুও দ্বিধান্বিত হবে না- কারণেই যে, বাবা মাকেই তারা তাদের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে ভাবতে শিখে ফেলবে। তখন যদি কোনো সন্তান প্রকৌশলী না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবার আগ্রহ প্রকাশ করে তবে অভিভাবকবৃন্দ অবশ্যই সন্তানের সেই মতামতটিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করবেন। এবং সন্তানের চাহিদাটি পূরণে তারাও একটি বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্যে এগিয়ে আসবেন। এমন মুহূর্তে সন্তানদের কাছে তখন বৈষয়িক সকল চাহিদাই তুচ্ছ হিসেবে আবির্ভূত হয়ে প্রধান চাহিদা হয়ে দাঁড়াবে বাবা মায়ের এবং পরোক্ষভাবে নিজের স্বপ্নটিকে বাস্তবে রূপদান করবার। একইভাবে বিপরীত চিত্রটি প্রত্যক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা গাঢ় থেকে অধিকতর গাঢ় হয়ে উঠবে সেসব শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, যাদের চাহিদারেখাটি সবসময়ের জন্যেই ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে। কিন্তু একবার গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন, সকল অভিভাবকই কী তাদের সন্তানদের অতিরিক্ত চাহিদাটুকু পূরণ করবার সক্ষমতা অর্জন করে নিজেদের প্রত্যাশাটুকু পূরণ করে নিতে সক্ষম হয়েছেন? যে প্রত্যাশাটুকু তারা তাদের সন্তানদের কাছে প্রত্যাশা করে থাকেন সবসময়ই। জিদের জগতে প্রভুত্ব বিস্তার করা সম্ভব হয় তখনই যখন সেই জগতের বাসিন্দা হন শুধু বাবা এবং মা। কিন্তু, গৃহ থেকে বেরিয়ে পড়লে সেই রাজত্বের অবসান ঘটেÑএটি শিক্ষার্থীদের মননের মর্মমূলে স্থাপন করা তাদের কল্যাণের জন্যেই জরুরি। সুতরাং, সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকের এই সুমধুর সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষকের সাথেও অভিভাবকের একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন জরুরি। অভিভাবকের সাথে যদি শিক্ষকের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে না ওঠে তবে যে কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য নিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করবার দিকে যাত্রা করা হচ্ছে সেটি পূরণ না হবার সম্ভাবনাই থেকে যায় অধিক মাত্রায়।অভিভাবকবৃন্দের সঙ্গে যখন শিক্ষকবৃন্দের একটি আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে তখন শিক্ষকরা খুব সহজেই শিক্ষার্থীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলোও জানতে সক্ষম হবেন যা ওই শিক্ষার্থীর মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। তাছাড়া এটিও খুব স্বাভাবিক যে, সন্তান তার শিক্ষাজীবনে দুষ্ট অবাধ্য হতে পারে। এবং সেই দুষ্ট সন্তানটিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবার ক্ষেত্রে শিক্ষকই মূল ভূমিকাটি গ্রহণ করতে পারেন। শিক্ষকবৃন্দ সেই ক্ষেত্রে তখন যে কোনো উপায়েই হোক সেই শিক্ষার্থীটির মধ্যে প্রোথিত ভালো ভালো গুণাবলি অনুসন্ধান করে তার অভ্যন্তরের সুপ্ত প্রতিভাটিকে জাগ্রত করে তুলতে পারবেন। এক্ষেত্রে শিক্ষকের সাথে যদি অভিভাবকের সুসম্পর্ক না থাকে তবে সেই অভিভাবক যে ধরনের ইতিবাচক অধিকার নিয়ে শিক্ষকের সামনে দাঁড়ানোর কথা সেটি আর করতে পারবেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েও আব্রাহাম লিংকন একজন স্কুল শিক্ষকের কাছে চিঠি লিখেছেন শুধু তাঁর সন্তানের মঙ্গলের জন্যে নয় বরং তাঁর সন্তানটি যদি কখনো কোনো ধরনের সমস্যায় পড়ে যায় তবে তার সমাধানে যেন একটি ইতিবাচক অধিকার নিয়ে শিক্ষকের সামনে দাঁড়াতে পারেন, পরামর্শ বিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করতে পারেন, সেটিই মূল কারণ। শুধু তাই নয়, এর অভ্যন্তরে যে বিষয়টি আরো স্পষ্টতই অনুভবিত সেটি হলো, শিক্ষকের প্রতি একজন রাষ্ট্রপতি অথবা সে ধরনের কোনো ব্যক্তিত্ব নির্বিশেষে একজন অভিভাবকের অতি উচ্চ মাত্রার শ্রদ্ধা নিবেদন।


এক্ষেত্রে কবি কাজী কাদের নেওয়াজ সৃজিতশিক্ষকের মর্যাদাকবিতাটিও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদশর্নে আমাদের বিশেষভাবে জাগিয়ে তোলে। কবিতাটির মাধ্যমে তিনি শিক্ষক সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নিমিত্তে যে গুরুত্বারোপ করেছেন তা নিশ্চিতভাবেই কাল থেকে কালান্তরে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। তার কবিতাটি সবসময়ের জন্য একটি সত্যকেই ফুটিয়ে তোলে যেন। আর সেটি হলো-যে জাতি শিক্ষক সম্প্রদায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে কার্পণ্য প্রদর্শন করবে সেই জাতির সকল ধরনের উন্নয়ন নিশ্চিত হলেও মানবিক উন্নয়ন যে বাধাগ্রস্থ হবে তা অকপটেই ব্যক্ত করা যায়। তাই আব্রাহাম লিংকন গোটা বিশ্বের একজন প্রভাবশালী নেতা হয়েও তাঁর সন্তানের শিক্ষকের ওপর যে ধরনের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন এবং কাজী কাদের নেওয়াজশিক্ষকের মর্যাদাকবিতায় তার অমর সৃষ্টির মাধ্যমে যে মাত্রায় শ্রদ্ধা নিবেদনের আকুতি তুলে ধরেছেন, সেই উদাহরণ দুটি অনুসরণ করে আমরা যদি কিঞ্চিৎ পরিমাণ নির্যাস গ্রহণ করে শিক্ষকের প্রাপ্য সম্মানটুকু প্রদানে উদ্যত হই তবে সেটি শিক্ষককে অনুপ্রেরণা প্রদান করবার পাশাপাশি সন্তানের জন্য বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে।

এখন সন্তান যদি মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠতে না পারে তবে সেই দায় কি শুধু সেই সন্তানের ওপর গিয়ে বর্তাবে? একতরফাভাবে সন্তানকে দোষারোপ না করে অভিভাবকবৃন্দের জীবনাচরণ পর্যবেক্ষণও একটি বিশেষ দায় হিসেবে প্রতীত হয়ে উঠবে। পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি সখ্য গড়ে না ওঠে এবং সেটি যদি সন্তানের দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে তবে অবশ্যই সন্তানের ক্ষেত্রে সেই বিষয়টি ধীরে ধীরে নেতিবাচক বিষয় হিসেবে তার মনন এবং সমগ্র চিন্তা চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে পরিবারের ওপর সেই সন্তানটি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। স্বামী স্ত্রীর দাম্পত্য কলহের কারণে সন্তানের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করতে পারে সে বিষয়টিই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ÒThe 400 blowsÓ Pjwচলচ্চিত্রটিতে। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কোয়েজ ট্রুফোট কর্তৃক পরিচালিত ফরাসী এই চলচ্চিত্রটিতে যে বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত করা হয়েছে সেটি হলো- স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যখন দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হবে তখন আপনা আপনি তার প্রভাব গিয়ে সন্তানের ওপর পড়বে। চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্র কিশোর এন্টনি ডোনেল যখন তার বাবামায়ের মধ্যে দাম্পত্য কলহের বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে এবং তার প্রতি তাদের চরম অবহেলার শিকার হয় তখন তার মধ্যে পরিবর্তন চলে আসে। মনোযোগ সহকারে পড়াশুনা করবার পরিবর্তে নানা অপরাধমূলক কর্মকাÐে জড়িয়ে পড়তে থাকে সে। এক পর্যায়ে এই অপরাধমূলক কর্মকাÐে জড়িয়ে পড়বার কারণে তাকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়। জেলে অবস্থানকালীন কয়েকবার পালাবার চেষ্টা করে সেই কিশোরটি। অন্তিম মুহূর্তে এসে সে পালাতেও সক্ষম হয়। এবং জেল থেকে বেরিয়ে এসে অনবরত দৌড়–তে থাকে। দৌড়–তে দৌড়–তে এক সময় সমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। দাঁড়ানো অবস্থায়ই অবিরাম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উন্মুক্ত নীলাকাশের বিশালতার দিকে। এক পর্যায়ে ্এসে আর দৌড়ায় না। কোমল হাত দুটি কোমরে রেখে উন্মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়েই অনবরত ভাবতে থাকে। সে কোথায় যাবে কিংবা গেলে কার কাছে যাবে? হয়ত এটিই ছিল কিশোর এন্টনির ভাবনার মূল বিষয়। শেষ দৃশ্যকল্পটি দিয়ে পরিচালক ফ্রাঙ্কোয়েজ ট্রুফোট হয়ত এই বিষয়টিকেই বোঝাতে চেয়েছিলেন - একজন সন্তান যখন বাবামায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয় তখন পৃথিবীর কোনো আশ্রয় তার কাছে আশ্রয় হিসেবে পরিগণিত হয় না, হতে পারে না।


এই প্রেক্ষিতটিকে বিবেচনায় নিয়ে স্বামী স্ত্রী উভয়ই যদি সত্যিকার অর্থে সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন তবে অবশ্যই তাঁদের জীবনাচরণে পরিবর্তন নিয়ে আসবার তাড়না আপনা আপনি সক্রিয় হয়ে উঠবে। সন্তান তার বাবা মা কিংবা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গ প্রত্যাশা করবে যা খুবই স্বাভাবিক। অভিভাবকবৃন্দ যদি সন্তানদের বেশি পরিমাণে সময় প্রদান করতে পারেন তবে তা সন্তানের মানসিক বিকাশের পথটিকে প্রশস্ত করবে। কন্যার প্রতি প্রাণপূর্ণ ভালোবাসার প্রাচুর্যের পাশাপাশি নিজ কন্যাকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবার লক্ষ্যে মুসৌরীর হিমালয় পাহাড়ের ওপর অবস্থানরত মেয়েকে একের পর একচিঠি লিখেছিলেন Ðিত জওহরলাল নেহরু। তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী যাতে করে চারপাশের মানুষ জগৎ সম্পর্কে জানতে পারে, প্রত্যাশা করতে পারে বিশ্বের সব মানুষের স্বাধীনতা, দেশাত্মবোধের চেতনায় ঋদ্ধ হয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তার দেশকে-এটিই ছিল তার মূল লক্ষ্য। মেয়ের প্রতি, মেয়ের ভবিষ্যত জীবনের প্রতি অন্তহীন প্রচেষ্টা এবং অদম্য বাসনা না থাকলে সেটি কখনোই সম্ভব হতো না। অথচ তিনি প্রচÐ ব্যস্ত একজন মানুষ ছিলেন। তবুও এই ব্যস্ততাও সন্তান লালনের ক্ষেত্রে পূর্ণমাত্রার পরিচর্যা থেকে তাকে নিবৃত্ত করতে পারে নি। সুতরাং তার মতো একজন Ðিত ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে অবশ্যই এটি শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে পরিগণিত হবে যে-বাবা মা কিংবা অভিভাবককে অবশ্যই তাদের সন্তানের পেছনে পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করতে হবে।


কিন্তু বাবা মা যদি নিজেদের নিয়ে অধিক মাত্রায় ব্যস্ত থেকে যান তবে তাঁদের সন্তানদের মনোজগতে আড়ষ্টতার ভাবটি ঘনীভূত হবার সম্ভাবনা প্রবল হবে যার প্রভাব গিয়ে পড়বে বাস্তব জীবনে। তাছাড়াসন্তানরা সবসময়ই অনুকরণপ্রিয় যা সম্পর্কে আমরা কম বেশি সকলেই বিশেষভাবে অবগত। বিশেষত বাবা, মা এবং শিক্ষকদের শিক্ষার্থী কিংবা সন্তানরা ভীষণভাবে অনুকরণ করে থাকে। সেক্ষেত্রে ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক যে দিকটিই বাবা মা কিংবা শিক্ষকের চরিত্রে প্রতিফলিত হবে সেটিই ধীরে ধীরে একজন সন্তান অথবা শিক্ষার্থীর মধ্যে বেড়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে নেতিবাচক দিকগুলো যেন কোনোভাবেই সন্তানের দৃষ্টিগোচর না হয় সেই দিকটিকে অবশ্যই বিবেচনায় রাখা অভিভাবকবৃন্দের কল্যাণের জন্যেই জরুরি। কিন্তু বাবা মা যদি মনে করেন প্রচুর অর্থ ব্যয় করলেই সন্তানদের লালন করা সম্ভব হবে তবে সেখানেই ভুলের বীজটির অঙ্কুরোদগম ঘটবে।এবং এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

 

বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে একজন বিখ্যাত কিংবদন্তীর পারিবারিক আবহটি ব্যাখ্যা করলে বিষয়টির মর্মমূলে প্রবেশ করা সহজ হবে। তুন ডা. মাহাথির মোহামাদের বাবা মোহাম্মদ বিন ইস্কান্দার শিক্ষকতাকালীন তাঁর কর্মের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ছিলেন। তাঁর কোনো শিক্ষার্থী রাজপরিবারের সন্তান হলেও তার অনৈতিক কর্মের জন্যে তাকে শাস্তি পেতে হতো। এক্ষেত্রে তিনি বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেন না এবং প্রয়োজনের প্রকৃতি অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। ফলস্বরূপ তাঁর হাতে গড়া শিক্ষার্থী টেংকু আবদুর রহমান হতে পেরেছিলেন স্বাধীন মালয় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। একই আচরণ তিনি বাড়িতেও সমানভাবেই প্রদর্শন করতেন। কারণ তিনি চাইতেন তাঁর সন্তানরা যেন পড়াশুনার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করে। পাশাপাশি তার মা ওয়ান তেম্পাওয়ান সবসময়ই ইতিবাচক মূল্যবোধের দীক্ষায় দীক্ষিত হবার পরামর্শ প্রদান করেছিলেন। বিশেষত তাঁর ছেলে যাতে কোনো ভালো কাজ করে দম্ভ প্রকাশ করতে না পারে কিংবা ঝগড়া বিবাদে জড়িয়ে না পড়ে। এমনকি মাহাথির মোহামাদ যদি কোনো ঝগড়া বিবাদে জড়িয়ে পড়ত কখনোই তাঁর মা তাঁর পক্ষ নিয়ে কথা বলতেন না। এবং স্বাভাবিকভাবেই বাবা মায়ের এই ইতিবাচক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল বালক মাহাথির।

 

তাদের গৃহের পরিবেশটি এতটাই শিক্ষাবান্ধব ছিল যে, আত্মীয় স্বজনরা তাদের সন্তানদের মাহাথিরদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন যাতে তারাও এই মূল্যবোধের দীক্ষাটুকু গ্রহণ করবার সুযোগ পায়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তুন সৈয়দ আহমেদ শাহাবুদ্দিন যিনি পরবর্তীকালে হয়েছিলেন মালাক্কার গভর্নর। এবং মাহাথির মোহামাদের প্রাচুর্যপূর্ণ সাফল্যের ইতিহাস কমবেশি আমাদের সবারই জানা। দেশপ্রেমের গভীরতা তাঁর অন্তর্জগতের সীমানাজুড়ে এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, রাষ্ট্রের প্রধান কর্ণধার হয়েও এনজিও প্লাস্টি সার্জারি করবার জন্যে সিঙ্গাপুরে অবস্থিত মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে যেতে কোনোভাবেই সম্মত হন নি। ভিন্ন দেশে চিকিৎসা গ্রহণ না করবার নেপথ্য কারণ হিসেবে যে বিষয়টিকে তিনি প্রধান বিবেচনা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন সেটি হলো -“একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যখন অন্য কোনো রাষ্ট্রে গিয়ে তাঁর চিকিৎসা সম্পন্ন করবেন তখন তাঁর নিজ দেশের চিকিৎসা পদ্ধতির দুর্বলতার দিকটিই উন্মোচিত হবে এবং যেহেতু তাঁর দেশের সকল সাধারণ জনগণ হার্টের উন্নত চিকিৎসার জন্যে সিঙ্গাপুরে গিয়ে উক্ত সার্জারি অপারেশন করাতে সমর্থ হবেন না সেহেতু তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয় সিঙ্গাপুরে গিয়ে উক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করা। চূড়ান্ত এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করবার পর যখন তাঁর দেশের ঊর্ধŸতন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণের জন্যে তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিল তখন তিনি বলেছিলেন-“ যদি তোমরা উক্ত প্রযুক্তি আমার দেশে নিয়ে আসতে পারো তবেই কেবল আমি চিকিৎসা গ্রহণ করবো পরবর্তীতে সেই উন্নততর প্রযুক্তি ঠিকই মাহাথির মোহামদের দেশে এসেছিল। মহান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মাহাথির মোহামদ দীর্ঘ বাইশটি বছর সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে যেমন উন্নতির শীর্ষ চূড়ায় অধিষ্ঠিত করেছেন তেমনি অর্জন করেছেন মালয়েশিয়াসহ গোটা বিশ্ববাসীর ভালোবাসা।

 

 

মাহাথির মোহামাদের পারিবারিক প্রতিবেশটি বিশ্লেষণ করলে একটি আদর্শ পরিবারে যে ধরনের বিশিষ্টতা থাকা বাঞ্ছনীয় তাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে এটি স্বীকার্য যে, অভিভাবকবৃন্দ যদি সরল এবং শুদ্ধ জীবন যাপনে ব্যাপৃত রয়ে যান শুধু তাদের সন্তানের মঙ্গলের জন্যে তবে তারা নিয়ত বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। এই সরল সত্যটুকু মেনে নেবার মানসিকতা প্রত্যেক অভিভাবকই সহজভাবে গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা করা যেতে পারে। আবার অর্থের প্রাচুর্য থাকলেই যে সন্তান মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠবে এমনটি ভাববার কোনো কারণ নেই, নিশ্চয়তাও নেই। যে মহামূল্য গুণ দুটি বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় সেটি হলো অভিভাবকের সৎ প্রচেষ্টা এবং সীমাহীন আন্তরিকতা। হতে পারেন আর্থিকভাবে তারা অতিমাত্রায় অসচ্ছল কিংবা সচ্ছল। কিন্তু যে অবস্থাতেই অবস্থান করুন না কেন উদ্ধৃত গুণ দুটো যদি ইস্পাতদৃঢ় মানসিকতা নিয়ে কোনো পরিবার অর্জন করতে পারেন তবে সেই পরিবারের সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিকলতাই তাদের সাফল্যের পথে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

 


তথ্যসূত্র:

. জওহরলাল নেহেরু, বাবার চিঠি, অনুবাদক হারুনুর রশিদ খান, ২০১৪, প্রতীতি প্রকাশ, ১৪২ আরামবাগ,ঢাকাÑ১০০০।

.তুন ডা. মাহাথির মোহামাদ, ডক্টর ইন দ্য হাউস, অনুবাদ প্রমিত হোসেন, মনোজিৎকুমার দাস, প্রকাশকাল ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩  বঙ্গাব্দ, অন্যধারা ৩৮/-, বাংলাবাজার, ঢাকাÑ১১০০। পৃষ্ঠা নং ৩৩। 

. বাংলা সাহিত্যের সেরা গল্পভিত্তিক উপদেশমূলক কবিতা/ শিক্ষকের মর্যাদা, কাজী কাদের নওয়াজ, সম্পাদনা আখতার হোসেন, ্র চতুর্থ সংস্করণ, চতুর্থ মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর, ২০১৬,বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা। পৃষ্টা নং ৮৮।

4. Bill Gates explains why he's not leaving his fortune to his children By Amy Graff, San Francisco Chronicle Updated 10:44 am, Thursday, October 27, 2016

5. A letter from Abraham Lincoln to his son's teacher.

6. The 400 blows, release 1960, Director Franquiz Truphoot.


৭. প্রবন্ধে ব্যবহৃত চিত্রগুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান