আড্ডা / ভাস্কর চৌধুরী
$post->title


আমাদের নিশিমপুর গাঁয়ে সন্ধ্যার পর তিনটে জমাট আসর বসে। একটা মদের। মদ বলতে দিশি ঈশ্বরদীর বোতল, বা তালরস। এরা কৃষক ছোট ব্যবসায়ী। এদের ভেতর খুব দুঃখী এক বাউল বসে গান করে। সে গাঁজা টানে। ওদিকে ননিগোপাল তার দোকানে শুয়ে তক্কে তক্কে থাকে। শালার যাবে কখন? তার আবার যেতে হবে রক্ষিতার কাছে। দু ঘন্টা থেকে ফিরে আসবে ঠিক। আবার দোকানের ঝাঁপি খুলে শোবে।

 আরেকটি দল লুঙ্গি পেতে ঊনত্রিশ তাসের খেলা খেলে। ছেলে বুড়ো মিলে চার জনের তিনটে দল বাঁশ তলায় বসে। বাড়ির মেয়েদের নিকেশের বেলা যায়। হারামীদের মা বোন নেই নাকি?বৌগুলো তো আছে। আর একটা আড্ডা হয় শিবুর চারচালার উঠোনে। শিবু দোকান করেছিলো বহু আগে। বেশ জমিয়েছিলো। লাভ দিয়ে এই ঘরবাড়ি। তিন ছেলে তার। তারাও দোকানি। দুই ছেলে আছে। বছর দশেক আগে তার মেজো ছেলেকে দোকানেই কে বা কারা খুন করেছিলো।খুনির হদিস করা যায় নি। সে দোকান তার নাতি চালায়। ভালো আয় করে। আড্ডায় প্রায় রোজ একই রকম লোক আসে। সে তারিণী খুড়ো। পাড়ার জামসেদ আর  এক কোনে অল্প বয়সেই কাঁপা অসুখে ধরেছে, সেই লোকটা আসে নাম লক্ষণ। তার বাড়ি নিশিমপুরের দুই গাঁ পাশের গ্রাম শফি পুর।

 তার বাড়ির পথের অপাশেই সাঁওতালদের গাঁ। লক্ষণের কেউ নেই। নিশিমপুরে শিবুর মেজো ছেলের বিধবা স্ত্রী ওদের গ্রামের মেয়ে।

  ফলে সে শিবুর কাছে একটা আদর পেয়ে যাচ্ছে। তাদের আড্ডা আসলে দেশ ভাগ নিয়ে বেশি বসে। পদ্মার এপারে গোদাগাড়ী আর ঐপারে লালগোলা। জামসেদ লালগোলা থেকে এসেছে। বাকি সকলেই এখানকার আদি বাসিন্দা। জামসেদ বলে, দেশ ভাগ করে লাভ টা হলো কি বলো?আমরা চর পার হলেই নিত্য লালগোলা যাই। তোমাদের অনেকে নিয়মিত এখানে আসে। শুধু জমি জমা আর মায়াগুলো জীবনে আর যাবে না দাদা। এখানে আড্ডায় আমরা কে কোন যাইত, কেউ কি বলি?

  তখন মেজো বউ এর চুড়ির শব্দ আসে। শিবুবাবু বলে, থুয়ে যাও মা। আমরা লিচ্চি।

এগুলো দোকানের চা আর একবাটি মুড়ি। প্রতিদিন। লক্ষণ কাঁপতে কাঁপতে উঠে গিয়ে চা আর মুড়ি খুড় খুড় করে নিয়ে কোনায় বসে। সে যেনো রোজ শিবু বাবুকে ডাকে, বাবু কি হইলো বলেন? শিবু বলে, তো বলেন। লক্ষণ থেমে চুপ করে যায়। তারপর বিড়বিড় করে।

 এই এক ব্যায়াম।

 জামসেদ বলে, তিন আড্ডায় ম্যালা ব্যায়াম বাবু। ননিবাবু আর বাড়ির বৌগুলো কি কষ্টে আছে। আমরা যে গেলে তো ওরা কাজ সারতে পারে না।

 দেখবেন একদিন ওই মদের নইলে জুয়ার আড্ডা থেকে একটা সর্বনাশ হবে।

শিবু বাবু বলে আর সর্বনাশ। যা হবার হয়ে যায়। বলে কয়ে কিছু তো আসে না। আমার মেজোটা গেছে। টের তো পাই নি।

 টের শেষে আসে। জুয়ার আড্ডায় কেউ বউ বসিয়ে হেরে দিয়ে একজনের মাথার ঘিলু বের করে দেয় সকলে চিৎকার শুনে উঠে দাঁড়ায়। আর তখন জুয়ার হেরে যাওয়া লোকটা পালাতে গিয়ে মদ খোরের আড্ডায় খুন হয়। শিবুবাবুর দল শান্তিপ্রিয়। কিন্তু লক্ষণ উঠে এসে শিবুর পা ধরে বলে, খ্যামা দ্যান। আপনার বৌমাকে পছন্দ করতাম বলে, আমি আপনার ছেলেকে খুন করেছি। সেই থেকে আমার হাত আর শরীর কাঁপে। তাই দোষ স্বীকার করতে আসি। আজ বাঁচলাম।

  কথা বলার পর দ্যাখ্যা গেলো, লক্ষণের গায়ের কাঁপুনি থেমে গেছে।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান