কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
আমার মা মিথ্যুক ছিল - অরণ্য আপন
$post->title

চার বছরের ফুটফুটে বাচ্চা তোহা, এ বয়সেই সে মাকে হারিয়েছে। ওর বাবা আরেকটা বিয়ে করে নিয়েছে। মা মরলে বাবা বিয়ে করবে, কথাটা সহজে এবং সাবলীলভাবে বলা যায়, কিন্তু বাবা মরলে মা আরেকটা বিয়ের পিঁড়িতে বসবে, কথাটা বলতে আমাদের বাধো বাধো ঠেকে, এটা আমাদের ছোটোলোকি মানসিকতা।

তোহার একটা মা লাগবে, এমন কথার মধু লাগিয়েই তোহার বাপ আয়কর বাবু নতুন একটা বউ ঘরে নিয়ে আসল। তোহার মা ছিল না, মা হল, আয়কর বাবু বউ ছিল না, বউ হল। বিয়ের পর আয়কর বাবুর তেলতেলে চেহারা লক্ষ্য করা যায়, নতুন বিয়ের পানি পেয়ে চেহারায় নতুন রূপ খুলেছে। মুখ থেকে পান সিগারেট সরে না, সারাদিন একটা না একটা মুখে দিয়েই থাকে, মেজাজটাও ফুরফুরে। সবার সাথে হলকচলকও খুব ভালো। কিন্তু বেচারা তোহা! শুকে পাটকাঠি হয়ে গেছে, মা হারা চেহারা হয়ে গেছে। গ্রামের যার চোখেই পড়ে, বুকে টেনে নেয়, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়,বলে মা মরা ছোল, ইংকে হয়ে যাচ্ছু ক্যা তোয়া? তোর নতুন মা তোক দেকপের পায় না তাই লয়? তোর সাতে খালি খ্যাঁচখেঁচ করে, তাই লয় কো? তোহা কথা বলে না, চুপ করে টুলটুল করে চেয়ে থাকে। তার চোখ শুকনো কিন্তু দেখে মনে হয় জলের সমুদ্র, দুঃখের সমুদ্র।

আয়কর বাবু যে ছেলেকে ভালোবাসে না, তাও কিন্তু না। বাড়িতেই এসে গায়ের কাপড় খুলতে খুলতে বলে, হামার ছোলডাক কমান দেকিচ্চিনে? ছোলডা কুন্টি গো?
তোমার ছোল কি বাড়িত থাকে? দেকো কুন্টি যাইয়ে বেন খেলিচ্চে, হামি এত করে মানা করি! কিন্তু হামার কতা এনাও শুনে না। খেলেধুলে আসবিহিনি, তোমার ভাত বাড়িচ্চি, খাও। হামার মেলা কাম পড়ে আছে, করা লাগবি।
আয়কর বাবু খেতে বসে, খেয়েদেয়ে বাইরে পাতান মাচানে বসে, মুখে পান লাগিয়ে নতুন বউয়ের সাথে ফুসুরফাসুর গল্প করে। তোহার কথা আর কারো মনে থাকে না। এভাবেই দিন চলছিল। একদিন আয়করবাবু ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আগের মা আর নতুন মা কি একি লাগে? নাকি পার্থক্য আছে?


ছোটো বাচ্চা, বাচ্চাসুলভ ভাবে বলল, আগের মা মিথ্যুক ছিল, নতুন মা সত্যবাদী। আয়করবাবু ছেলের কথা শুনে কিছু বুঝে উঠতে পারে না, কপালে ভাঁজ পড়ে, কৌতূহলী হয়ে চোখের নাটা বড় করে জিজ্ঞেস কর, ক্যাংকা করে বাবা?
আগে যখন আমি খেলাধুলা করতাম, মা বলত, এত খেলাধুলা করলে খেতে দেব না, তবু আমি খেলতে যেতাম, মা আমাকে সারা গ্রাম থেকে খুঁজে এনে খেতে দিত, কিন্তু এখন যখন আমি খেলাধুলা করি, মা বলে, এত খেল্লে তোমাক হামি ভাত দিমু না, সারা গায়ত থেকে ধরে এনে তোমাক খিলেবের হামি পামু না।
এবং আমি দুদিন ধরে কিছু খাইনি।


ছেলের কথা শুনে আয়করবাবুর চোখে জল আসে, সে ছেলেকে বুকের মধ্যে নিয়ে আদর করতে থাকে।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান