কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
২৪৪১১৩৮ - আবুল কালাম আজাদ
$post->title

                                                                                                                         

 

সাইনোপসিসঃ
আমাদের মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত, বা নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষদের অনেকেরই সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের স্বপ দেখার সাহসটুকুও অনেক সময় থাকে নাএরকম একটি পরিবারের ছেলে রিন্টুউচ্চ শিক্ষিতএ দেশের মধ্যবিত্তনিম্নমধ্যবিত্ত, বা নিম্নবিত্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত সন্তানের প্রথম স্বপ্ন-একটা চাকরিরিন্টুর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল নাপ্রেমের স্বপ্নও জেগে উঠে হৃদয়ে, যেহেতু একটা হৃদয়ের অধিকারী সেকখনো কখনো কারও স্বপ্ন সম্পূর্ণ না হলেও কিছু কিছু পুরণ হয়, কেউ কেউ আবার স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু পেয়ে যায়রিন্টুর ক্ষেত্রে অনেক রকম কিছুই হতে পারতোচাকরি, প্রেম, স্বচ্ছল জীবনকিন্তু শেষ দেখার আগেই নিয়তির নির্মম পরিহাসে তাকে সব খেলা সাঙ্গ করে চলে যেতে হয়পাঠকের জন্য রিন্টু রেখে যায় দুফোটা অশ্রু, অথবা একটা দীর্ঘশ্বাসএ ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল নাতবে তার সাথে জড়িয়ে যাওয়া চরিত্রগুলোরও অনেকটা গুরুত্ব রয়ে গেছে   
 

এক

মাকে বললাম-মা, কিছু টাকা দাও

মা বলল-কত?’

-‘দুয়েক হলেই চলবে

-‘কেন?’

মা এমনভাবে প্রশ্ন করল আমি যেন ছোট শিশুটাকা নিয়ে চকলেট, ট্রফি খেয়ে দাঁত নষ্ট করবোআইসক্রিম খেয়ে নিউমোনিয়া বাঁধাবোবললাম-একটা ইন্টারভিউ দিতে যাব

-‘কী চাকরি?’

-‘সরকারের একটা মন্ত্রণালয়ে কো-অর্ডিনেটর পদে

-‘পদ কয়টি?’

-‘তিনটি

-‘যাবার দরকার নেই

-‘কেন?’

-‘ঐ তিনটি পদের কোনোটিই তোর জন্য শূন্য পড়ে রয়নি

-‘কী বলছো?’

-‘ঠিকই বলছি, ইন্টারভিউটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র

আমি চাকরি পাচ্ছি না বলে সবসময় নিজেকেই দোষ দিয়ে এসেছিদেখলাম মা সেভাবে আমাকে দোষ দেয় নাএদেশের চাকরিদাতাদের (বিশেষ করে সরকারি চাকরি দাতাদের) সম্পর্কে আমার মায়ের ইতিবাচক ধারণা নেই

আর কোনো কথা না বলে আমি চলে এলাম নিজের ঘরেদরজা ভিজিয়ে দিলামফুল স্পীডে পাখা ছেড়ে খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লামকী একটা গল্পে পড়েছিলাম, বেকার নায়ক শুয়ে শুয়ে ভাবে-বড় একটা তুলি পেলে সে ছাদে ছবি আঁকতে পারতোসেরকম ইচ্ছে আমার হলো না, কারন ছবি আঁকার দক্ষতা আমার নেইআমি ক্যাসেট প্লেয়ারে গান ছেড়ে দিলামআমার প্রিয় একটি গানওপারের শিল্পী অঞ্জন দত্তের-হ্যালো, এটা কি ২৪৪১১৩৯

যুবকটি একটা চাকরির জন্য ভালবাসার মানুষটিকে নিয়ে লাল-নীল সংসার সাজাতে পারছিল নাযখন চাকরি হল তখন দেখে ভালবাসার মানুষটি নেইসত্যিই দু:খজনক ব্যাপারআমি বেকার তা ঠিক; কিন্তু আমার তো কোনো ভালবাসার মানুষ নেইকাউকে নিয়ে লাল-নীল সংসার সাজানোর স্বপ্ন আমার বুকে বাসা বাঁধেনি কখনোতাহলে গানটি আমার এত প্রিয় হয়ে উঠলো কেন?

গানের এই যুবক অনেক দেরিতে হলেও-প্রিয় প্রেমিকাকে হারানোর পরে হলেও, শেষ পর্যন্ত একটা চাকরি পেয়েছিলআমার কপালে বোধহয় কোনোদিনই চাকরি জুটবে নাআমার এলোমেলো ভাবনার স্রোতে বাঁধা ফেলে আমার ছোট বোন ছয় বছরের নুপুর দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলোওর হাতে সেলফোনওটা ওর নিত্য সঙ্গীযেন ওর খেলার পুতুলএই ডিজিটাল বাংলাদেশে বর্তমানে একেক জনের তিন/চারটি মোবাইল সেট এবং কুড়ি/পঁচিশটা সীমাকার্ড থাকলেও আমাদের বাসার সবার জন্য এই একটি মাত্র মোবাইল সেট এবং একটি মাত্র সীমকার্ডল্যান্ডফোন যেমন বাসার সবার জন্য একটি থাকে তেমনএবং এই সেটটি থাকে নুপুরের কাছেবাসায় যত ফোন আসে-বিশেষ করে নুপুরের জেগে থাকার মুহূর্তে তার সবগুলো ওর রিসিভ করা চাইবলবে-হ্যালো, কাকে চাচ্ছেন? তারপর যাকে চাইবে মোবাইলটা নিয়ে ছুটে যাবে তার কাছেকখনো আমার কাছে, কখনো মার কাছে, কখনো বাবার কাছেভালই লাগে ওর এই ছুটোছুটিআবার কোনো নাম্বার পেলে নুপুর সে নাম্বারে ফোন করে বসেএখনো সে মেমোরিতে সেভ করা নাম্বার বের করতে শেখেনিএকাজটা শিখলে কী হবে তা ভাবলে আমার শরীর দিয়ে ঘাম ছুটে যায়তখন মেমোরির সব নাম্বার মুছে ফেলতে হবে নিশ্চয় 

নুপুর এসে বলল-দাদা, ফোন যাচ্ছে না কেন? মেয়েটা বলছে সরি, রঙ নাম্বার

আমি নাম্বারটা এক পলকে দেখে বললাম-এটা তো টিএন্ডটি নাম্বার সামনে ০২ দিতে হবেনুপুর বলল-দিয়ে দাওবললাম-কার কাছে ফোন করেছিস তুই?’

-‘বেলা বোসের কাছে

-‘বেলা বোস!

 বিস্ময়ের ঘোর কাটলে হেসে উঠলাম হো হো করেবললাম-বেলা বোসের কাছে ফোন করে লাভ নেইসে ধরবে না

-‘কেন ধরবে না?’

-‘কারণ সে বাসায় নেই

-‘কোথায় গেছে?’

-‘শ্বশুর বাড়ি

-‘কে বললো তোমাকে?’

-‘কেউ বলেনি

-‘তাহলে জানলে কেমন করে?’

-‘আমি বুঝে নিলাম

-‘বুঝে নিলে কেন?’

সমুদ্রের অগণিত ঢেউয়ের মতো একের পর এক প্রশ্ননুপুরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে দিতে ওর কৌতুহলের নিবৃত্তি না ঘটানো পর্যন্ত প্রশ্নবাণ থেকে মুক্তি নেইবললাম-সে যদি থাকতো তাহলে ঐ ছেলেটার ফোন ধরতো নিশ্চয়

-‘তবু তুমি একবার তাকে ফোন কর

-‘যে নেই তার কাছে ফোন করে কী লাভ?’

-‘না কর

নুপুর যখন বলেছে তখন আমাকে বেলা বোসের কাছে ফোন করতেই হবেকী করে ওকে বোঝাব যে, এই সাবকন্টিনেন্টে বেলা বোস বলে হয়তো একাধিক মেয়ে আছে, কিন্তু তাদের কারোরই ২৪৪১১৩৯ ফোন নাম্বার নেইঅগত্যা নাম্বরটির সামনে ০২ দিয়ে কল করলাম

অদ্ভূত কান্ড! কল ঢুকে গেছেরিং হচ্ছেকিন্তু তা কী কররে সম্ভব? আমি মোবাইলটি কান থেকে সরিয়ে মাথাটা ডানে-বামে ঝাঁকালামনিজের মধ্যে কোনো সমস্যা থাকলে চলে যাবে এই ভেবেতারপর মোবাইলটা আবার কানের কাছে নিলামনা, কোনো ভুল নয়ঠিক ঠিক রিং হচ্ছেএকটু পর ওপার থেকে মিষ্টি একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এল-হ্যালো

আমি মোবাইলটা ছুড়ে ফেলতে যাচ্ছিলাম প্রায়ভৌতিক কোনো ব্যাপার-স্যাপার হয়তোকন্ঠটা আবার বলল-হ্যালো, কাকে চাচ্ছিলেন?’ আমি বললাম-আমি বেলা......

-‘হ্যাঁ, আমি বেলা বলছিবলুন কী বলতে চান?’

আমি নিশ্চিত হলাম যে, আমার মাথায় কোনো গোলমাল বেঁধে গেছে২৪৪১১৩৯ নম্বরে ফোন ঢুকেছে তাও ধরেছে স্বয়ং বেলা বোসমাথায় গোলমাল যখন বেঁধেছেই তখন এর শেষ দেখে নিতে চাইলামবললাম-আপনার সঙ্গে আমার বিশেষ আলাপ আছে, তার আগে আমার ছোট বোন ছয় বছরের নুপুরের সঙ্গে একটু কথা বলুন

নুপুর মোবাইলটা কানে নিয়ে বলল-হ্যালো, তুমি কে?’ 

পরক্ষণেই নুপুর উচ্ছসিত কন্ঠে চিৎকার করে বলল-দাদা, তুমি বলেছিলে বেলা বোস শ্বশুর বাড়ি চলে গেছেকই, এইতো বেলা বোস কথা বলছে

আমি ভীষণ ঘোরের মধ্যে চলে গেলামআমি বেকার মানুষচাকরির ইন্টারভিউ দিতে না গিয়ে হতাশা নিয়ে শুয়েছি নিজের ঘরেহতাশার গান ছেড়েছিআমার মাথায় গোন্ডগোল হতেও পারেকিন্তু নুপুর তো ছোট মানুষওর মধ্যে তো কোনো হতাশা নেইওর তো কোনো হ্যালুসিনেশনের মতো ব্যাপার হবার কথা নয়এরই মাঝে মা নুপুরকে খাওয়াতে নিয়ে গেলআমি মোবাইলটা আবার আমার কানে নিয়ে খাটের ওপর শুয়ে পড়লামবললাম-আমি কিন্তু ২৪৪১১৩৯ এ ফোন করেছিলাম

-‘জ্বি না, আপনি ফোন করেছেন ২৪৪১১৩৮ এ

-‘বলেন কী! আমার ছোট বোন নুপুর বেলা বোসের কাছে ফোন করতে চেয়েছিল.........

-‘একটা নাম্বার ভুল টেপার কারণে ফোনটা চলে এসেছে বেলা মল্লিকের কাছে

আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলামবললাম-দুঃখিত, আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত

-‘এতে দুঃখিত হবার কিছু নেইমানুষ মাত্রই ভুল আছে-ম্যান ইজ মর্টাল

-‘কী ইংরেজি বললেন!

-কেন, ভুল বলেছি?’

-‘হ্যাঁ......

-‘হি-হি-হি

তার আচানক হাসিতে আমি একটু নার্ভাস হলামবুঝলাম, ভুলটা তার ইচ্ছাকৃতআমি বললাম-রাখি তাহলে

-‘রাখবেন কেন? একটু কথা বলিআপনার হাতে কি এখন কোনো জরুরি কাজ আছে?’

-‘জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো জরুরি কাজ কেউ আমাকে দেয়নিশুয়ে শুয়ে ছাদ দেখা আমার সবচেয়ে জরুরি কাজ

-‘তার মানে আপিন বেকার যুবক?’

বুঝলাম, সে বুদ্ধিমতি মেয়েঅনুমান ক্ষমতা তীক্ষèবললাম-ঠিক ধরেছেন

-‘তাহলে ভালই হল-গল্প-টল্প করা যাবে

-‘গল্প-টল্প যাবে! কী গল্প করবেন আমার সঙ্গে?’

-‘খুঁজে পাওয়া যাবে

-‘ফোনে বর্তমানে অনেক ধরনের ক্রাইম হচ্ছেআমি কোনো বখাটে ছেলে কিনা.....

-‘না, আপনি তা হবেন না

-‘কেমন করে বুঝলেন?’

-‘বখাটেরা কোনো মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে আহলাদে গদগদ হয়েআর আপনার মধ্যে যথেষ্ট নার্ভাসনেস কাজ করছে

-‘তাই? না না, তা হবে কেন? নার্ভাসনেসের কী আছে?’

-‘হ-হি-হি

আমি কন্ঠের নার্ভাসনেস দূর করতে চাইলামবেশ সাবলিলভাবে বললাম-আপনার বাসায় এখন কেউ নেই?’

-‘না, বাবা কলেজে-মা স্কুলেআর মামা বেরিয়েছেন উত্তর মুগদায় ঢাকনা খোলা ম্যানহোল গুনতে

-‘ব্যাপারটা বুঝলাম নাঢাকনা খোলা ম্যানহোল গুনবেন কেন? উনি কি সিটি কর্পেরেশনের কেউ?’

-‘না, সব বুঝিয়ে বলবোএবার বলুন আপনার নামটা কী?’

-‘রিন্টু

-‘আপনি কি কোনো টিনএজ বয়?’

-‘টিনএজ বয়রা কি বেকার যুবক হয়? আমি চার বছর আগে মাস্টার্স শেষ করেছি

-‘মানে রিন্টু নামটা টিনএজদের ভাল মানায়আমার বান্ধবীর ছোট ভাইয়ের নাম রিন্টুও ক্লাশ নাইনে পড়েও খুব অদ্ভূত কেসিমের ছেলেআজ পনেরো দিন হল একই টি-শার্ট পরে আছেঘামের গন্ধে ওর আশেপাশে যাওয়া যায় না

-‘একই টি-শার্ট পনেরো দিন ধরে পরে আছে কেন?’

-‘ওর টি-শার্টের পেছেনে দেশের একজন মধ্যম মানের কবি অটোগ্রাফ দিয়েছেনআজিজ সুপার মার্কেটে তাঁর সঙ্গে ওর দেখা হয়েছিল

-‘, তবে ওই রিন্টুও তো একদিন আমার বয়সী হবে-একদিন বৃদ্ধ হবেনাকি হবে না?’

-‘তা হবেআচ্ছা, আপনি মূলত করেন কী?’

-‘আশ্চার্য! বেকার মানুষরা কী করে তা অনুমান করতে পারেন না?’

-‘না, বেকার মানুষদের কাজ অনুমান করা কঠিনকারণ তাদের একেক জনের কাজের ধরণ একেক রকমকেউ সন্ধ্যা বেলা ফুটপাথে হাঁটে, কেউ হাঁটে রাত দুপুরে, কেউবা সারা রাত ছাদে বসে থাকে আর দিনের বেলা ঘুমায়কেউ হাতে নেয় একটার পর একটা প্রজেক্ট

-‘আমি বেশির ভাগ সময় ঘরে শুয়ে শুয়ে ছাদ দেখি-দেয়ালে নানা রকম ছায়া দেখিআমি খাঁটে শোয়ামাত্র একটা টিকটিকি আমার সামনের দেয়ালে চলে আসেআমার ধারণা ও আমাকে ভালবাসেআমাকে সঙ্গ দিতে চায় অথবা আমার সঙ্গ পছন্দ করে

-‘আচ্ছা, আপনার চাকরি-বাকরি হচ্ছে না কেন?’

-‘এ কারণটা খুঁজে দেখিনি

-‘আপনি কি হাঁদা টাইপের মানুষ?’

-‘হাঁদা টাইপ মানে কী?’

-‘মানে ভেতরে কোনো প্যাঁচ নেইসবাইকে বিশ্বাস করেনকোনো ব্যাপারে কাউকে দোষ দেন নাছল-চাতুরী করেনও না, বোঝেনও না

-‘নিজের কথা নিজে বলি কেমন করে?’

-‘অন্যেরা কী বলে?’

-‘অন্যেরা আমাকে এরকমই ভাবে

-‘এরকম কী রকম?’

-‘আপনি যেমন বললেন

-‘তাহলেই সেরেছেআপনাকেও অদূর ভবিষ্যতে মামার মতো কোনো আয়হীন মানব কল্যানমুখী কাজে নামতে হবে

-‘বুঝলাম না কিছু

-‘সব বুঝিয়ে দেবএবার আমার মোবাইল নাম্বারটা লিখে নিন, আর আপনার নাম্বারটা বলুন

-‘আবার নাম্বার বিনিময় কেন?’

-‘পরে যোগাযোগ করবো

-‘আবার যোগাযোগ কেন?’

-‘হাঁদা টাইপের মানুষের সাথে কথা বলতে আমার ভাল লাগে তাই

আমি কিছুটা লজ্জা পেলামবুঝলাম, মেয়েটার মুখে কিছু আটকায় নাআবার মনে রাগও হলো মনেসে আমাকে বোকা ভাবছে

দুই

রাতে নুপুরকে ছোট হাতে ইংরেজি লেটার শিখাচ্ছিলামকিন্তু শেখাতে পারছিলাম নাসে ছোট হাতের বলতে ছোট করে লেখাকে বোঝেতাই সে অ কে ছোট করে অ লিখতে চাচ্ছেকিন্তু অ কে ধ লিখতে চাচ্ছে নাওর কথা-এটা তো অন্য রকম হয়ে গেল!

টানা পয়তাল্লিশ মিনিট চেষ্টার পরও যখন কিছু হল না, তখন আমি ক্ষান্ত দিলামপাখাটা বাড়িয়ে শুয়ে পড়লামনুপুরকে বললাম-আমার চুল টেনে দেনুপুর একাজটা খুব মনোযোগে করে

ঘুমের মতো এসে গিয়েছিলনুপুর মাথায় হাত দিলে আমার ঘুম এসে যায়এ অবস্থায় মোবাইল বেজে উঠলধরার ইচ্ছে ছিল নামোবাইল বাজাটা বেশিরভাগ মানুষের কাছে আনন্দেরকিন্তু আমার কাছে তা নয়মোবাইলে কেউ আমাকে কখনো বলবে না-তোমার একটা চাকরি হয়েছেভাল চাকরিবেতন......অথবা বলবে না কেউ কোনো ভালবাসার কথাআতœীয়-স্বজনের ফোন তো ধরাই ছেড়ে দিয়েছিসবারই প্রথম প্রশ্ন-কিরে, চাকরি-বাকরি কিছ হল?

আমি সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি বোধ করি ছোট খালা ফোন করলেসে আমার উত্তর-প্রতিউত্তরের ধার ধারে নাবলে যায় তার মতো-কিরে, আর কত দিন এভাবে থাকবি? তোর বয়সি ছেলেরা বিয়ে থা করে ছেলেপুলে নিয়ে সংসার করছেআচ্ছা, তোর সমস্যা কি বলতো? তুই কি আন্টারভিউতে কোনো প্রশ্নের উত্তরই দিতে পারিস না? তোর খালু নাকি জীবনের প্রথম ইন্টারভিউতে গিয়ে ভীষণ পেচ্ছাবের চাপে পড়েছিলতোর কি এরকম কিছু হয়? কাপড়-টাপড় ভিজিয়েছিস কখনো?’

নুপুর উঠে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করলোএক দমে বলে চললো-হ্যালো, কে? ও বেলা বোস? কেমন আছো? আমি খুব ভাল আছিআমি দাদার কাছে ছোট হাতের ইংরেজি লেখা শিখছিদাদা শেখাতে পারছে নাদাদা যেটা বলে সেটা ছোট হাতের হয় না, অন্য রকম হয়আমি এখন দাদার চুল টেনে দিচ্ছিদাদাকে দেব? আচ্ছা দিচ্ছি

বেলা যে আবার ফোন করবে আমি তা ভাবিনিআমার হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে নুপুর দৌড়ে চলে গেলঅনেকক্ষণ লেখাপড়া নিয়ে থেকে হাফিয়ে উঠেছিল কি-নাএখন বাবার সঙ্গে গল্প করবেডালিম কুমার আর কঙ্কাবতীর গল্পডালিম কুমার ভ্রমরাকে এক কোপে কেটে ফেলেছিলএটা তার কাছে মহাবিস্ময়তার ধারণা এরকম কাজ আর কেউ পারবে নাআমাকে সে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে-দাদা, তুমি কি এক কোপে ভ্রমরাকে কেটে ফেলতে পারবে? যদি বলি পারবো সে তা বিশ্বাস করে না

আমি মোবাইল কানে ধরে বললাম-হ্যালো, এত রাতে......?’

-‘ডিসটার্ব করলাম বুঝি?’

-‘না না, ডিসটার্ব হবে কেন? আমি তো আর কিছু করছিলাম না

-‘বেকার মানুষের ব্যাপারে এই একটা সুবিধা যে, কোনো কিছুতে তাদের ডিসটার্ব হয় নাআমার মাঝে মাঝে মনে হয়, কোনো বেকার ছেলেকে বিয়ে করিসব সময় কাছে কাছে থাকবে

-‘আর আপনি প্রতি মুহূর্তে বেকার বেকার বলে খোটা দিতে পারবেন

-‘হি-হি-হি

মনে হলো নিজের বেকারত্বের কথা বলে ভাল ধরা খেয়ে গেছিবেলা বলল-নুপুরের ছোট হাতের এ বি সি শেখানো কতদূর?’

 

-‘মাটি থেকে আকাশ যতদূর

-‘হি-হি-হিছোট হাতের লেখা ছোট করে লিখবেনঅন্য রকম লিখলে হবে কেন? হি-হি-হি

আমি ইতোপূর্বে মোবাইলে কোনো মেয়ের হাসি শুনিনিমেয়েদের হাসি শুনবো কিভাবে? ছোট খালা ছাড়া আর কোন মেয়ের সাথে আমার ফোনে কথা হয়েছে?

বেলার হাসি আমার কাছে খুব মধুময় লাগলোসব মেয়ের হাসিই কি এমন মধুময়, নাকি বেলার......? আমি বললাম-আপনার মামা উত্তর মুগদায় কতগুলো ঢাকনা খোলা ম্যানহোল পেলেন?’

-‘চৌদ্দটাতারপমধ্যে নয়টার ঢাকনা একেবারেই নেই, পাঁচটার দূরে সরানোদুএকদিনের মধ্যে সেগুলোও হাওয়া হয়ে যাবেআচ্ছা, ঢাকানাগুলো চুরি হয় কেমন করে? এগুলো দিয়ে চোররা করেই বা কী?’

-‘সরি, এসব ব্যাপারে আমি কখনো ভাবিনিকাল আবার আপনার মামা কোন দিকে যাবেন?’

-‘বোধহয় দক্ষিণ মুগদায়

-‘এই ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল গণনার রহস্যটা কিন্তু বলছেন না?’

-‘বলবো, সব বুঝিয়ে বলবো-একটু অপেক্ষা করুন

তিন

পরদিন সকাল নয়টাকোনো ইন্টারভিউ নেইচাকরিজীবীরা যেমন টাইম দেখে অফিসে যায়, আমি তেমন যাই ইন্টারভিউ দিতেচাকরিজীবীদের অফিস বন্ধ থাকলে যেমন সময় কাটতে চায় না, ইন্টারভিউ না থাকলে আমারও তেমনআমি নাস্তা সেরে আবার বিছানায় গেলামহাতে বুদ্ধদেব বসুর কালো গোলাপদুপাতা পড়ার পর আর পড়তে ইচ্ছে হল নাঅন্য কিছু করতে মন চাইলঅন্য কী করবো? আমি আর কী পারি? ছবি আঁকতে পারি নাগান গাইতে পারি নাবেকার থাকলে সবাই নিজের হতভাগ্য নিয়ে দুএকটি কবিতা লেখেআমি সে কাজও পারি নাহঠাৎ ইচ্ছে হল বেলাকে ফোন করতেইচ্ছেটা মনে জেগে ওঠা মাত্র লজ্জায় লাল হয়ে গেলামমনের ভেতর থেকে কে যেন বলল-আশ্চার্য! তুমি তাকে ফোন করবে কেন? আবার আরেকজন উত্তর দিল-করলে ক্ষতি কি? সেও তো একবার এমনি এমনি ফোন করেছিল

শেষে জয়ি হল মনের ভেতর বসত করা দ্বিতীয় জনআমি মোবাইল নিয়ে বেলার নাম্বার টিপলামরিং বাজতেই আমি কিছুটা ঘাবড়ে গেলামমনে হল ফোন কেটে দেইকিন্তু কাটতে পারলাম নাবেলা ভাববে, আমি মিস কল দিচ্ছিযে মুখ পাতলা মেয়েফোন করে বলবে-ব্যাপার কি, টিনএজ ছেলের মতো মিস কল দিচ্ছেন কেন? 

কল রিসিভ হলওপার থেকে খুব ভরাট, গম্ভীর ও ঘুম জরানো কন্ঠ ভেসে এল-হ্যালো, কে? কাকে চাই?’

আমি ঘাবড়ে গেলাম ভীষণভাবেবেলার মোবাইলে এরকম কন্ঠ! বললাম-বেলা বোস কে চাই

-‘বেলা বোস!

-‘সরি, বেলা মল্লিককে চাই

-ও তো বাসায় নেই, ইউনিভার্সিটিতে গেছেভুল করে মোবাইল ফেলে গেছেখুব ভুলো মনের মেয়েভাত খেতে বসে চা খেয়ে উঠে যায়

-‘ঠিক আছে, রাখি তাহলে

-‘আপনার পরিচয় তো দিলেন না?’

-‘আমি রিন্টু

-‘রিন্টু......! ওর এ নামের কোনো বন্ধু আছে বলে তো শুনিনি

-‘আমি ওর সেরকম কোনো বন্ধু নইআমি মাস্টার্স শেষ করেছি চার বছর আগে

-‘ও তাই বলুনকখনো কি ওর হাউজ টিউটর ছিলেন?’

-‘না না, আমি জীবনে কোনোদিন টিউশনি করিনি

-‘আপনি করেন কী?’

-‘আমি কিছু করি না

-‘করি না মানে?’

-‘করি না মানে করি না

-‘বেলার সাথে আপনার পরিচয় কেমন করে?’

-‘সেটা না হয় বেলার কাছ থেকেই জেনে নেবেনআমি তবে রা.......

-‘এত রাখি রাখি করছেন কেন? বেলা হলে নিশ্চয় এক ঘন্টায় থামতেন না? এক ধরনের পাবলিক আছে মোবাইল ব্যবহারই করে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার জন্য 

মনে হল, আমার মুখে কেউ চড় মারলোকথা হারিয়ে ফেললামসেই গম্ভির কন্ঠ আবার বলল-চুপ করে আছেন যে? আমার কাছে আপনার পরিচয় দিলে কোনো সমস্যা আছে?’

-‘না, সমস্যা কিছু নেইমানে আমি এখন খুব ঘামছি কিনা

-‘ঘামছেন কেন, আপনাদের ওখানে ওলাডশোডিং চলছে?’

-‘না বিদ্যুৎ আছে, মানে এত গম্ভীর ও ভরাট কন্ঠ আগে কখনো শুনিনিবঙ্গোবন্ধুর কন্ঠের মতো ভরাট

-‘ও সেই কথাএতে ঘাবড়াবার কিছু নেইকন্ঠ মোটা হলেও আমার মনটা খুবই চিকন

-‘মন চিকন!

-‘মানে নরম মনকাউকে ধমক দিতে পারি নাআপনি যদি বেলাকে অহেতুক বিরক্ত করেন এবং বেলা যদি সে ব্যাপারে আমার কাছে নালিশ করে, তবু আমি আপনাকে ধমক দিয়ে কিছু বলতে পারব নাদয়া করে আপনার পরিচয় বলুন

-‘আমার নাম রিন্টুগতকালই বেলার সাথে প্রথম কথা

-‘ও মিস কলের মাধ্যমে.....

-‘না না সেরকম নয়, ল্যান্ডফোনে রং নাম্বার হয়েছিল

-‘ঠিক আছে, আমি বেলার কাছ থেকে সব শুনে নেবআমি বেলার মামা

-‘আপনি তাহলে কাল উত্তর মুগদায়.........

-‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, বেলা তাহলে আপনাকে বলেছে? প্রথম পরিচয়েই আমার প্রজেক্ট নিয়ে কথা! আমি জানতাম, আমার কাজ ওর ভাল লাগেআরে কি বলবো-ছোট্ট একটা এলাকাগিজগিজে মানুষসেখানে চৌদ্দটা ম্যানহোলের ঢাকনা নেইব্যাপারটা বুঝুনপ্রতিদিন হাজারে যদি একজন করে এসব ম্যানহোলে পড়ে তাহলে মাসে কতগুলো হয়এই ঢাকা শহরে ম্যানহোলে পড়ে আহতদের জন্য একটা বিশেষায়িত হাসপাতাল বানাতে হবে

-‘আপনি কি সিটি কর্পোরেশনের সাথে জড়িত....?’

 

-‘আরে না, পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথেই আমি জড়িত নইআমি শুধু আমার সাথেই জড়িত

-‘তাহলে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল জরিপ করছেন যে?’

-‘বেলার সঙ্গে যেহেতু আপনার আলাপ হয়েছে তখন সব জানতে পারবেনঅপেক্ষা করুন

ঢাকা শহরের ঢাকনা খোলা ম্যানহোল জরিপ করছেন, অথচ বলছেন পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথে জড়িত ননরহস্যজনক মানুষকোনো প্রয়োজনীয় রহস্য জানার জন্য মনটা এমন উতালা হয়নি কখনোকিন্তু এই রহস্যটা জানার জন্য খুবই আগ্রহ জাগলো মনেসে আগ্রহ দমিয়ে অপেক্ষায় রইলামকঠিন অপেক্ষা

বেলার ফোন এল বিকেলেবেলা বলল-আমি জানতাম আপনি ফোন করবেন

-‘কেমন করে জানলেন?’

-‘অনেক কিছুই আমি আগে থেকে জানতে পারিকী করে যে পারি তা জানি নামামার বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে, বিয়ে করার কথা তিনি ভাবতেও পারেন না, অথচ কদিন ধরে আমার মন বলছে, মামার খুব বড়লোকের এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হবেমামার সঙ্গে আপনার কথা হয়েছিল? মামা আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাইলযেমন-আপনি দেখতে কেমন, কোন সাবজেক্টে লেখাপড়া করেছেন, রেজাল্ট কেমন, হবি কীআরও অনেক কিছুআমি তো তেমন কিছু জানি নাশুধু বললাম-বেকার মানুষচাকরি-টাকরি বোধহয় কোনোদিন হবে-টবে না

-‘এভাবে বলাটা কি ঠিক হল? হতেও তো পারে

-‘আরে না, হলে এতদিনে হয়ে যেতোনয় দিনে যা হয় না, নয় বছরেও তা হয় নাশুনুন, মামা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছেন

-‘আমার সঙ্গে! কেন?’

-‘শুনেছে আপনার কোনোদিন চাকরি-টাকরি হবে নাএরকম মানুষ পেলে মামার খুব সুবিধা হয়হয়তো আপনাকে তার কোনো প্রজেক্টের কাজে লাগিয়ে দেবেন

-‘প্রজেক্ট!

-হ্যাঁ, তার অনেক রকম প্রজেক্ট আছেঢাকনা বিহীন ম্যানহোল গোনার প্রজেক্ট, বেওয়ারিশ কুকুর গোণার প্রজেক্ট, ভ্রাম্যমান পাগল গণনার প্রজেক্ট, আরও...

-‘আমি কি তার সঙ্গে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল গুণবো?’

-‘গুণবেনবাসায় শুয়ে থাকার চেয়ে একাজ ভাল নয় কি?’

-‘কি যে বলেন

-‘শুনুন, কাল বিকাল চারটার মধ্যে টিএসসিতে চলে আসুনআমি আর মামা আপনার জন্য অপেক্ষা করবো

আমি কী বলবো বুঝতে পারছিলাম নাকখনো যে বেলার সাথে দেখা করার আমন্ত্রণ পাবো তা ভাবতে পারিনিসে ইচ্ছাও জাগেনি মনেবুঝতে পারলাম অনেক কিছুই নিজের অজান্তেই হয়ে যাবেআমি বললাম-আসবো, কিন্তু কেউ কাউকে দেখিনি কখনোপরস্পরকে চিনবো কীভাবে?’

-‘না, সিনেমাটিক স্টাইলের কোনো সাইন আমি দিতে চাই নাযেমন আপনি পরে আসবেন হলুদ টি-শার্ট, আমি পড়ে আসবো নীল শাড়িআমরা এমনিই পরস্পরকে খুঁজে পাবআর যদি না পাই তাহলে সম্পর্ক কাটআর হ্যাঁ, আমার সঙ্গে কিন্তু মামা থাকবেআমার মামা একটু মোটা-সোটা, নাদুস-নুদুস টাইপের

সারা রাত নানারকম ভাবনার মধ্যে আবিষ্ট হয়ে রইলামআমার মনে কিছুটা আনন্দ জাগছিলএকটা মেয়ে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেমেয়েটা নিশ্চয় খুব সুন্দর হবেকি মধুময় কন্ঠ! কথাবার্তায় কেমন চটপটে! জীবনে কখনো প্রেমটেম আসেনিবিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের দেখেছি গভীর প্রেমে হাবুডুবু খেতেকলাভবনের ঘাসে ঢাকা মাঠে, টিএসসির বারান্দায়, পাবলিক লাইব্রেরীর সিঁড়িতে জোড়ায় জোড়ায় বসে থাকতে দেখেছিচোখে চোখ, হাতে হাত, কখনো বা ঠোঁটে ঠোঁটআমারও যে কখনো ওসবের তৃষ্ণা জাগেনি তা নয়কিন্তু তৃষ্ণা নিবারণের উপায় ছিল নাআমার ছিল শুধু ক্লাশ টু বাসা, বাসা টু ক্লাশএই বেকার জীবনে আর হয়তো প্রেমের ফুল ফুটবে নাফোটানোর ইচ্ছেও নেইতবু বেলার আমন্ত্রণ পেয়ে ভাল লাগছিল

আবার মনের মধ্যে একটা ভয়ও কাজ করছিলকেমন আশ্চার্য মেয়ে! কোনো সাইন-টাইন লাগবে নাসে এমনিই চিনে নেবে আমাকেহয়তো সে ক্ষমতা তার মধ্যে আছেকিন্তু আমি তাকে চিনবো কেমন করে? টিএসসিতে কি মেয়ের অভাব আছে? আমি কি জনে জনে জিজ্ঞেস করবো-এক্সউইজ মি, আপনি কি বেলা মল্লিক?’ তাহলে যে লোকে পাগল ভাববেআবার আমার মধ্যে কিছুটা নার্ভাসনেসও কাজ করছিলসে যেভাবে ডাইরেক্ট কথা বলেশেষে কথায় কথায় আমাকে না বিবৃত করে ফেলেচিন্তা করতে করতে হালে পানি পেলামবেলার মামা থাকবে ওর সাথেওর মামা যে মোটা-সোটা মানুষ তা জেনেছিসুন্দর কোনো তন্বী মেয়ের সঙ্গে মোটা-সোটা কোনো মানুষ দেখলে বুঝবো সেটা বেলাআর না হলে ফোন করে বলবো-আমি এখানে আছি, চলে আসুনকিন্তু তা বলবো কেমন করে? আমি তো সাথে সেলফোন রাখি নাআমার পার্সোনাল কোনো সেলফোন নেই

চার

বেলা বিকেল চারটার মধ্যে পৌছুতে বলেছেনিশ্চিন্তভাবে চারটায় পৌছুতে হলে অবশ্যই আমাকে আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে বাসা থেকে বের হতে হবেঢাকার শহরের সুবিখ্যাত ট্রাফিক জ্যামের কথা সব সময়ই আমার মাথায় থাকেঅনেক চেষ্টা করেও আড়াইটার মধ্যে বের হতে পারলাম নাকোন জামাটা গায়ে দেব, কোন প্যান্টটা পড়বো এমন ভাবতে ভাবতে সময় গেল কিছুটাঅথচ আমার জামা মাত্র দুইটা, প্যান্টও দুইটাচুল আঁচড়াতে সময় লাগলো পনেরো মিনিটঅথচ সাধারণত চুল না আঁচড়ালেও আমার চলে যায়পারফিউম ব্যাবহার করতে গিয়ে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলামপারফিউমের ব্যাপারে সব আধুনিক মেয়েরই কিছু চয়েজ থাকেবেলা কেমন পারফিউম পছন্দ করে? হালকা না তীব্র গন্ধের পারফিউম? শেষে যদি বলে বসে-কী পারফিউম মেখে এসেছেন? একেবারে বমি এসে যাচ্ছেআপনার দেখছি এ ব্যাপারে কোনো রুচিই নেইবেকার মানুষদের যা হয় আর কি

চারটা বাজার দশ মিনিট পরে পৌছুলাম টিএসসিতেরিকশা থেকে নেমেই খুঁজতে লাগলাম একটি সুন্দর মেয়ের সঙ্গে একজন মোটা-সোটা লোকএকজন মোটা লোক পেলামতার সঙ্গে একটি অল্প বয়স্ক মেয়েও ছিলতাদের দুজনকে দেখে আমি খুবই হতাশ হলামলোকটাকে দেখে আমার মনে পড়লো বাংলা সিনেমার একজন এন্টি হিরোর কথালোকটি বোধহয় তার চেয়েও কিছুটা বেশি মোটা ও লম্বাগায়ের রঙ তেলকুচে কালোসে টিএসসির ক্যাফেটারিয়ার সামনে বসে গপাগপ ফুস্কা গিলছিলসে এত বড় হাঁ করছিল যেন তার হাঁয়ের মধ্যে আমার মাথাটা অনায়াসে ঢুকে যাবেআর তার পাশে বসা মেয়েটিও যথেষ্ট মোটানাকটা থ্যাবড়ানোগায়ের রং কালোমুখ ভর্তি চিকেন পক্সের দাগআমি তখন ভাবছিলাম পালিয়ে আসবো কিনাআবার মনে মনে সান্ত¡না খুঁজলাম-রূপে নয়, গুণে পরিচয়বেলার কি সুন্দর কন্ঠ! কথাবার্তায় কি স্মার্ট!

কাছে গিয়ে বললাম-স্লমালিকুম মামা

লোকটা চোখ তুলে তাকালো আমার দিকেচোখ নয়, যেন দুটি আগুনের গোল্লাসে ফুসকার প্লেটটি পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালোহাতির পায়ের মতো দুটি পা থপথপ করে কয়েক ধাপ বাড়িয়ে এসে দাঁড়ালো আমার সামনেআমার তখন আত্মারাম খাঁচা ছাড়দৌড় দেয়ার শক্তিও পায়ে নেইসে পাঁতি হাঁসের মতো ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে বলল-মতলব কী তোর?’

-‘মতলব? কিসের মতলব?’

-‘আমি তোর কোন জনমের মামা?’

-‘আমি রি....!

-‘চোপ...আজ তোর খবর আছেআমার সাথে ইয়ার্কি?’

লোকটা খপ করে আমার জামা ধরে আমাকে শূন্যে তুলে ফেললোআমার মুখের কাছে মুখ এনে বলল-মতলব কী বল? নইলে মারবো এত থাপ্পর

তার একটা থাপ্পর খেলে আমার ভবলিলা সাঙ্গ হবে তা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম

ইতোমধ্যে অনেক লোক জমে গেছেঅস্বাভাবিক কিছু দেখলে এই ঢাকা শহরে লোক জমতে সময় লাগে নাএ শহরে লোক আগায় না শুধু কেউ দুর্ঘটনায় পড়লে অথবা ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেলোকগুলো বোধহয় আমাকে চোর-ছ্যাচ্চর ভাবছিলএকজন বলল-কী করছে ভাই, কী করছে? হালারে প্যাঁদানী দেন

ঠিক তখন ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকলো এক লোকআগন্তুকও মোটাতবে আমি যার হাতের মধ্যে ঝুলে ছিলাম তার মতো নাআগন্তুকের গায়ের রঙ সম্পূর্ণ ফর্সাচেহারাটা মায়াময়সে এসে বলল-কী হয়েছে ভাই? একে এমন বাদুর ঝোলা করে রেখেছেন কেন?’

-‘কী আর হবে? ঢাকা শহর চোর-ছ্যাচ্চরে ভরে গেছে

-‘ব্যাপারটা আমি জানিএ নিয়ে আমার একটা প্রজেক্টও আছেএবার বলুন সে কী করেছে?’

-‘ব্যাটা চরম মতলববাজআমাকে মফিজ পেয়েছে

-‘কী করেছে তাই বলুন না

-‘চেনা নেই জানা নেই আমাকে বলে, স্মালামালিকুম মামাওর মতলববাজি আমি ছুটিয়ে দেব

এ কথা শুনে আগন্তুক হেসে উঠলো উচ্চ কন্ঠেতার হাসি দেখে দানবটা রেগে উঠল-এভাবে হাসছেন কেন?’

-‘ভাইরে, হাসছি মনের দুঃখেআমি মনে করেছিলাম, ও না জানি কী করে ফেলেছেএখন দেখছি কিছুই করেনি

-‘কিছুই করেনি মানে? স্লামালিকুম মামা.........

-‘ও আমার ভাগ্নেবছর কয়েক আগে ওর মাথায় একটা সমস্যা বেঁধে যায়এমনিতে সব ঠিকশুধু মোটা মানুষ দেখলে কাছে গিয়ে বলে-স্লামালিকুম মামা

এ কথা শুনে দানবটা আমার জামার কলার ছেড়ে দিলআমি ধপ করে মাটিতে পড়লামতারপর সে মুখ বিকৃতি করে বলল-দুনিয়ায় কত কিসিমের পাগল যে দেখলাম!

-‘ভাই সাহেব, এটা নিয়েও আমার একটা প্রজেক্ট আছে

-‘রাখেন আপনার প্রজেক্টএদেশের প্রজেক্ট মানেই টাকা খাওয়ার মওকাএনজিওগুলো......

-‘আমার প্রজেক্ট সেরকম কিছু না

-‘ফাও কথা বাদ দিয়ে রাস্তা মাপেন

আগন্তুক আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে বেরিয়ে এল ভীরের ভেতর থেকেটিএসসির লবিতে এসে নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে খানিকটা জায়গা পরিস্কার করলোতারপর বলল-বসুন

 বলা মাত্র আমি ধপ করে বসে পড়লামআমি দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি পাচ্ছিলাম না যেনচোখেও ঝাপসা দেখিছিলামলোকটি বলল-নাম কী আপনার?’

-‘রিন্টু

-‘ঐ মটু মিয়াকে বেলার মামা মনে করেছিলেন নিশ্চয়?’

-‘জি

-‘আর ঐ কালো মেয়েটাকে বেলা?’

-‘জি

-‘ভুল অনুমান করেছিলেনএই এটা হলো বেলা, আর আমি অধম হলাম বেলার মামা

তার ডান পাশে ছায়া শরীরের ছিপছিপে একটি মেয়ে বসে আছে আমি তা খেয়ালই করিনিআসলে আমি তখনো একটা ঘোরের মধ্যে ছিলামআমি তাকালাম বেলার দিকেবেলা মাথা নিচু করলোএক কথায় সে সুন্দর-ভীষণ সুন্দর

আমি বললাম-কেমন আছেন আপনি?’

সে এ প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে বলল-ডেকে এনে আপনাকে কী বিপদেই না ফেলেছিলাম

-‘না না, বিপদ নয়-এ একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা

তারপরই আমার মাথা নিচু হলোঅবশ্যই লজ্জায়বেলা নিশ্চয় আমাকে দানবটার হাতের মুঠোয় ঝুলে থাকতে দেখেছেদেখতে অবশ্যই ভাল দেখায়নিমামা বলল-আমি দেখে না ফেললে আজ আপনার খবর ছিল

আমি একটু হাসার চেষ্টা করলামমামা বলল-তারপর বলুন, আপনাদের পরিচয় কিভাবে?’

 আমি আদ্য-প্রান্ত বললামমামা বলল-আপানি মাস্টার্স শেষ করেছেন চার বছর, আর আমি চৌদ্দ বছরআমার মনে হয় আপনাকে আমার তুমি করে বলা উচিত

-‘সিওর সিওর

-‘আর বেলাকে তুমি অনায়াসে তুমি বলতে পার

-‘আমি বেলাকে.......

-‘চলো ফুসকা খাব

ফুসকার কথা মনে হতেই আমার মনে পড়লো সেই লোকটাকেআমি শিউরে উঠলামবললাম-এখন আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না

-‘কেন, খেতে ইচ্ছে করছে না কেন?’ 

আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললাম-আপনার ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল গোণনার খবর বলুন

-‘বলবো, সব বলবো

হঠাৎ মামা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো-সর্বনাশ! পাঁচটা বেজে গেছেআমি আর থাকতে পারছি না

আমি বললাম -জরুরি কোনো কাজ আছে?’

-‘আমাকে এখনই বিমানবন্দর যেতে হবে

-‘বিমানবন্দর কেন?’

-‘আমার এক বন্ধু আসছে কিউবা থেকে, তাকে রিসিভ করতে

-‘তিনি কিউবা থাকেন?’

-‘না, বেড়াতে গিয়েছিল

-‘পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে কিউবায়.......

-‘সে এক গোড়া সমাজতান্ত্রিকবলা যায়, সে গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদের শত্রুগণতন্ত্রকে বলে ধোকাবাজ পদ্ধতিজনগণের কথা বলে বলে জনগণকে শোষন করেগুটিকতক ব্যাক্তি সম্পদ চুষে খায়আমেরিকার নাকের ডগায় বসে কেষ্ট্ররা বহাল তবিয়তে সমাজতন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন এটা তার কাছে যেমন বিস্ময় তেমন অহংকারতার মতে কিউবা হলো-সাম্রাজ্যে বাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে বেঁচে থাকার ও এগিয়ে চলার অনন্য দৃষ্টান্ত-বলিভিয়া থেকে ইকুয়েডর পর্যন্ত সমগ্র লাটিন আমেরিকান জনগণের কাছে কিউবা মার্কিন আধিপত্যেবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রতিরোধের এক মূর্ত প্রতীকতাই স্বচক্ষে দেখতে গিয়েছিল কেষ্ট্রর কিউবাকেএখন কতদিন ধরে যে আমাকে কিউবার গল্প শুনতে হবে কে জানে

-‘আপনি কি পুঁজিবাদের পক্ষে?’

-‘পুঁজি ছাড়া মেরুদন্ড থাকে? বর্তমানে আমেরিকার চাইতে শক্ত মেরুদন্ড কার আছে?’

-‘আমেরিকা যে শোষক রাষ্ট্র এটা সবাই মানে

-‘পুঁজি তাদের হাতে তারা তো মাতুব্বরিগিরি করবেই

-‘পুঁজির পক্ষে হয়ে আপনি আয়হীন কাজে সময় ব্যয় করছেন কেন?’

-‘হয়তো নিরুপায় হয়েএ বিষয়ে পরে কথা হবেআমি চললাম-তোমরা থাক-গল্প করআর হ্যাঁ, তুমি একটু কষ্ট করে বেলাকে বাসায় পৌছে দিও

-‘তা দেব

মামা চলে গেলএখন আমি আর বেলামুখোমখি বসেতবু আমি বেলার মুখ দেখতে পারছিলাম নাআমার দৃষ্টি সামনের দিকে যেতেই পারছিল নাকিছু বলারও পাচ্ছিলাম নাতবু কিছু বলতে তো হবেবললাম-আপনার মামাটা চমৎকার একজন মানুষ

-‘মামা না আমাকে তুমিবলতে বললো

-‘ঠিক আছে বলবোআপনার মামাটা না চমৎকার একজন মানুষ

-‘আবারও তো আপনি করেই বলছেন

-‘এত তাড়াতাড়ি আমার মুখে তুমিআসবে না

-‘কখনোই আসবে না

-‘হয়তো তাই

-‘থাক, ‘তুমিলাগবে নাআমাকে আপনিকরেই বলবেন

-‘ধন্যবাদআপনার মামাটা না চমৎকার মানুষ

-‘বেকাররা চমৎকারই হয়

-‘কেন, বেকাররা চমৎকার হয় কেন?’

-‘বেকাররা যে বোকা থাকেবোকারা সে সহজ-সরল-নির্ভেজাল হয় তাই

-‘আপনার কি মনে হয় আমি বোকা?’

-‘এখানে তো মনে হওয়ার কিছু নেইযা সত্যি তাতে মনে হওয়ার কী আছে?’

আমার মুখ কিছুটা লাল হললজ্জায় নয়, রাগেএতটা স্পষ্টভাষী হওয়া ঠিক নয়কথায় আছে-অপ্রিয় সত্যও বলতে হয় নাআর সে.....যে আমি চার বছর আগে মাস্টার্স শেষ করেছি, সেই আমাকে ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ে যদি বোকা বলে রাগ হবে না মনে? বেকার হলেই মানুষ বোকা হয়কি অদ্ভূত যুক্তি! দেশটা যেন আমার বাপ কিনে রেখেছেচারদিকে কত চাকরিআমি সে সব করতে পারছি নাইচ্ছে হয়েছিল বলি-আছো তো ফার্স্ট ইয়ারে, চাকরির বাজার সম্পর্কে কী বুঝবে? লেখাপড়া শেষ কর-যাও চাকরির বাজারে তখন ঠিক ঠিক বুঝবে কত আটায় কত রুটিচেহারার এই ঝিলিক আর থাকবে নাতামাটে হয়ে যাবে গায়ের রঙ

কিন্তু আমি তা বলতে পারি নাকারো কথার জড়ালো প্রতিবাদ করা আমার স্বভাবে নেইতর্ক করে কাউকে হারাতেও আমার ভাল লাগে নাবেলা বলল-চলুন কিছু খাই

-‘কী খাবেন?’

-‘আইসক্রিম

-‘ঠিক আছে চলুন

ক্যাফেতে আমি টোকেন কিনতে গেলেই বেলা বলল-আপনি টোকেন কিনতে এসেছেন কেন?’

-‘তাতে সমস্যা কী?’

-‘আপনার কাছে কি টাকা আছে?’

-‘অবশ্যই আছেএখন আমার কাছে পাঁচশটাকা আছেপাঁচশত্রিশ টাকা ছিলত্রিশ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়েছি

-‘আপনি টাকা কোথায় পেলেন?’

-‘মায়ের কাছ থেকে নিয়েছিদরকার হলে আমি মার কাছ থেকে চেয়ে নেই

-‘আমার মামাও তাইতার তো মা নেইবোনই তার মাতার টাকার দরকার হলেই বোনের কাছে হাত পাতেবোনের আদর-আহলাদেই তো সে এমন কর্মবিমূখ হয়েছেছেলেরা বেশি আদর-আহলাদ পেলে অকর্মা হয়ে যায়ভবিষ্যতে আমি যখন মা হনো, আমার ছেকে চরম টাইট দিয়ে রাখবোআপনার মা বুঝি আপনাকে........?’

-‘সব মা-ই তার সন্তানকে আদর-আহলাদে রাখেএবং বোনও তার ভাইকে......

হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলাম-এই মেয়ের সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখবো নাকথায় কথায় যে বেকারত্বের খোটা দেয় তার সাথে যোগাযোগ চলে নাআমাদের ক্লাশের মেহেদিওর এক পা খোড়াতারপরও শাওন নামের ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটা তার প্রেমে মোজলোসে কি প্রেম! মধুর ক্যান্টিনে বসে সবার সামনে সে মেহেদির মুখে খাবার তুলে খাওয়াতোসে কি কখনো মেহেদিকে ল্যাংড়া বলে খোটা দিয়েছে?

পাঁচ

দুদিন কোনো যোগাযোগ হয়নিবেলাও ফোন করেনি, আমিও নাদুদিন পরই মনে হতে লাগলো-না, এরকম অভিমানের কোনো মানে হয় নাতার বয়স কমমুখ পাতলা মেয়েকখন কী বলে তা নিয়ে অভিমান করে থাকা ঠিক নয়মনে হতে লাগলো, বেলাকে ফোন করিকত সুন্দর করে কথা বলে! আবার ফোন করতে সাহস পাই নাসে যদি বলে-আবার ফোন করেছেন কেন? আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল, একটু দেখা হল ব্যাসতাই বলে জনম ভরে আপনার সাথে যোগাযোগ রাখব নাকি? আমার আর কোনো কাজ নেই? আপনার সাথে কি আমার প্রেম হয়েছে?’

কেটে গেল আরও কয়েকটা দিনআমার ভেতরে খুব তোলপাড় শুরু হলনিজেকে কিছুতেই বোঝাতে পারি না যে, সে আমার কেউ নয়তার সাথে সারা জীবন যোগাযোগ রাখা যাবে নানিজে থেকে তার সাথে যোগাযোগ করা নিতান্তই ছেলে মানুষিআমার এখন সেই বয়স নেই

ছয় দিন পর বেলার ফোন এলমনটা মুহূর্তে আনন্দে ভরে উঠলভাল একটা চাকরি পেলেও বোধহয় আমি এতটা আনন্দিত হতাম নাআচ্ছা, এরকম আনন্দের কোনো মানে আছে কি? আমি কল রিসিভ করলামনা, যা ভেবেছিলাম তা নয়বেলা ফোন করেনিফোন করেছে মামাবলল-রিন্টু, আজ বিকেলে একটু বাসায় এসো তো

-‘কেন মামা?’

-‘এলেই বলবোভুল করো না, ঠিক ঠিক চলে এসো

-‘মামা, বলেন না কী দরকার?’

-‘আহ! এসেই শুনবে

মামা-ভাগ্নী দুজনই রহস্য রেখে কথা বলতে ভালবাসেকোনো কথাই খোলসা করে বলতে চায় নাবেলা ফোন না করলেও বাসায় যাবার প্রস্তাব পেয়ে খুশি হলামবাসায় গেলে বেলার সাথে দেখা হবে নিশ্চয়, কথাও হবেআমি বললাম-ঠিক আছে মামা, আমি চারটার মধ্যেই চলে আসবো

-‘ধন্যবাদ, বেলার সঙ্গে কথা বলবে?’

-‘ও এখন বাসায় আছে? ওর কোনো ক্লাশ নেই আজ?’

-‘ক্লাশ আছে কিন্তু যায়নিসকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছেতাই ...........

-‘ঠিক আছে, দিন ওকে

-‘একটু অপেক্ষা করো, গোসল করছে

-‘ম্যাজম্যাজে শরীর নিয়ে গোসল!

-হ্যাঁ, হালকা গরম জলে গোসল দিলে শরীরের ম্যাজম্যাজে ভাব কেটে যায়

বেলা বলল-হ্যালো

বেলা একবার বলেছিল, সে অনেক কিছুই আগে থেকে জেনে ফেলেসেই সূত্র ধরেই আমি বললাম-আমি জানতাম আপনি আজ ক্লাশে যাবেন নাআপনার শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে

-‘মামা বলেছে নিশ্চয়?’

-‘না, মামার সাথে আপনার ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি

-‘তাহলে আপনি কেমন করে জানলেন যে, আমার শরীর ম্যাজম্যাজ করছে?’

-‘কেমন করে জানলাম জানি নাআমি মাঝে মাঝে কেমন করে যেন বিশেষ কোনো ব্যাপার বুঝে ফেলিআমি গত পরশু বললাম-মা, নুপুরকে একটু সাবধানে রেখ, ওর কোনো অসুখ বাঁধতে পারেআজ সকালে দেখি নুপুরের চোখ উঠেছে

বেলা বলল-আপনি কি মেডিটেশন করেন? মেডিটেশন যারা করে তারা নাকি মনছবিতে অনেক কিছু দেখতে পায়

-‘না, সেভাবে কখনো বসিনি

-‘বসে যান, বড় কিছু অর্জন করতে পারেন

-‘অহী-টহী পাওয়ার সম্ভাবনা আছে?’

-‘ধর্মান্ধরা শুনলে আপনাকে কোপাবেচাপাতি চেনেন?’

-‘আর বলবেন নাভয় পাচ্ছি খুব

আমি সাধারণত মিথ্যা কথা বলি না, এমনকি বলতেও পারি নাঅথচ বেলার সঙ্গে কত সহজভাবে একটা মিথ্যে কথা বলে ফেললামএ মিথ্যাটা ধরা পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশিবেলা মামাকে জিজ্ঞেস করলেই সব বের হয়ে আসবেতবু আমার মধ্যে কোনো চিন্তার উদ্বেগ হল নাআসলে কখনো কখনো কোনো কোনো মানুষের সাথে বোধহয় রসিকতাচ্ছলে মিথ্যা সবাই বলেএসব মিথ্যায় ধরা পড়লে ক্ষতি হয় না, বরং বিশেষ সহানুভূতি পাওয়া যায়

ঠিক চারটায়ই বেলাদের বাসায় গিয়ে হাজির হলামবেল টিপতেই বেলা দরজা খুললোচমকে উঠে বলল-আপনি!

বুঝলাম, মামা যে আমাকে আসতে বলেছেন বেলা তা জানে নাআমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম-মামা কোথায়?’

-‘আপনি কি মামার কাছে এসেছেন?’

-‘না, তা আসবো কেন?’

-‘তাহলে এসেই মামার খোঁজ করছেন?’

-‘দুজনই বেকার মানুষআলাদা একটা টান আছে না?’

-‘হয়তো নিচে গেছে-এসে পরবে এখনই

আমি সোফায় বসলামপ্রথমবারের মতো কারো ড্রইংরুমে ঢুকলে আমি রুমের চারিপাশে তাকাতে থাকিএটা আমার অভ্যাস বলা যায়ব্যাপারটা ভাল কি মন্দ তা বুঝি নাতাকিয়ে তাকিয়ে রুমের খুঁটিনাটি দেখিসব ড্রইং রুমেরই একটা বিশেষত থাকেপুরোপুরি মেলে না কোনোটাইকোনো ড্রইংরুমে আসবাবপত্রের আধিক্য, কোনোটায় আবার ফাঁকাকোনো কোনো ড্রইং রুমে ফুলের ছড়াছড়ি, কোনোটায় আবার সো-পিচ বেশিআমাদের বাসায় দুটি মাত্র রুমএকটা আমার, একটা বাবা-মাআলাদা করে ড্রইংরুম নেইবাইরের কেউ এলে আমার রুমে বসেআমার রুমটাই ড্রইং রুম হিসাবে চালিয়ে দেইসাজানো-গোছানো একটা ড্রইং রুমের খুব সখ আমারএকটা চাকরি না হলে এ সখ পূরণ হবার নয়

আমি যখন দেয়ালে বেলার একটা ছবির দিকে তাকিয়ে আছি তখন বেলা বলল-নুপুরকে নিয়ে আসলে তো পারতেন

-‘আরেকদিন আনা যাবে

-‘ফোনে এত সুন্দর করে কথা বলে! আচ্ছা, চা খাবেন না কফি?’

-‘এ দুটোর মধ্যে আমি বিশেষ প্রার্থক্য বুঝি নাদুটোই আমার কাছে গরম লাগেপ্রথম বার মুখের কাছে নেবার পর একটা ছ্যাঁকা খাই

-‘হি হি হি

-‘হাসছেন! সত্যি বলছি

-‘ছ্যাঁকা শব্দটার কারণে হাসছিপ্রেমে ব্যর্থ হওয়াকে টিনএজরা ছ্যঁকা বলে

-‘হা হা হা

-‘হি-হি-হিআপনি বোধহয় প্রেমে পড়েছেন?’

-‘মানে? হঠাৎ......?’

-‘প্রেমে পড়লে ছেলেরা অহেতুক রসিকতা করেরসিকতার জন্য ছোটখাট মিথ্যা বলতেও দ্বিধা করে না

-‘আমি কোনোদিন ঐ সাগরে ডুবিনি-ডোবার কোনো সম্ভাবনাও নেই

-‘আবারও রস করে কথা বললেনআমি নিশ্চিত......

তার মানে, আমি বেলার কাছে মিথ্যা কথা বলেছিলাম সেটা বেলা ধরে ফেলেছেবুদ্ধিমতি মেয়ে    

কিছুক্ষণ পর চা এললাল চাচায়ে একটা লেবুর টুকরো ভাসছেরঙটা খুব সুন্দর হয়েছেদেখে খুব ভাল লাগলসত্যিই বেলা গুণবতীচায়ের সঙ্গে অনেক রকমের টাআমি শুধু চা-টাই তুলে নিলামচুমুক দিতেই আমার চোখ বন্ধ হয়ে গেলগিলতে পারলাম না এক ফোটাওফেলার জায়গাও পাচ্ছিলাম না

বেলা বলল-কোনোদিন ভেবেছিলেন যে, বেলা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয় হবে-তার বাসায় যাবেন-সে আপনাকে লেবুর টুকরো ভাসিয়ে লাল চা খাওয়াবে?’

আমি মাথা নেড়ে না বোঁধক উত্তর করলামসে বলল-একটা ভুল নাম্বারে চাপ পরে এমনটি হলএর জন্য ধন্যবাদ নুপুরকেটেলিফোন নিয়ে এরকম ব্যাপার নাটক-সিনেমায় দেখা যায়

-‘হু

-‘আমাদের ব্যাপারটা সিনেমা-নাটকের মতো হবে কিনা কে জানেমানে ট্র্যাজিক অথবা হাস্যাকর কিছুআমার মতো একটা মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হতে পেরে আপনি কি খুশি?’

-‘হু

-‘আমি মেয়েটা খুব ভাল এবং বুদ্ধিমতিসমস্যা একটু বেশি কথা বলিনিজের তারিফ নিজে করলাম বলে মনে কিছু করলেন?’

-‘উ-হু

-‘কখন থেকে হু-হা করছেন, সমস্যা কী? মুখের ভেতর কী আটকে রেখেছেন?’

আমি আঙুল দিয়ে চায়ের কাপ দেখালামসে বলল-চা না গিলে মুখের মধ্যে আটকে রেখেছেন কেন?’ এ কথার জবাব হু-হা করে দেয়া সম্ভব ছিল নাবেলা প্রায় চিৎকার করে বলল-সমস্যাটা কী বলবেন তো?’

এমন সময় মামা ঘরে ঢুকলোবলল-এভাবে চিৎকার করছিস কেন?’ বেলা বলল-দেখতো মামা, উনি কখন থেকে চা মুখের ভেতর রেখে বসে আছেকিছু জিজ্ঞেস করলে হু-হা করে জবাব দিচ্ছে

মামা ঝট করে চায়ে একটা আঙুল ঢুকিয়ে চা-টা টেস্ট করলতারপর আমাকে বলল-ঐ জানালা দিয়ে কুলি করে এসো

কুলি করে এসে আমি স্বস্তি নিয়ে বসলামতবে বেলার রাগ আরও বেড়ে গেলবলল-এত যতœ করে চা বানালাম, সে চা আপনি কুলি করে ফেলে দিলেন কেন?’

আমি কিছু বলতে পারছিলাম নামামা বলল-চায়ে কয় চামচ চিনি দিয়েছিলি?’

-‘দেড় চামচ

-‘সেটা তো লবন ছিলতারপর..?’

-‘আ! লবন দিয়েছি তাহলে?’

আমি মৃদু হাসলামমামা হাসল শব্দ করেবেলা দুঃখিত হয়ে বলল-জীবনের প্রথম বাসায় এলেন আর আমি আপনাকে লবন দিয়ে চা করে খাওয়ালামছিঃ!

আমি বললাম-ভুল হতেই পারে

মামা বলল-এটা আর তেমন কী ভুলআরেক দিন আমার জন্য চা করতে গিয়ে লিকারের পরিবর্তে চায়ে দিয়েছিল ইঁদুর মারার ওষুধআর তো চায়ে রঙ হয় নাআপা না দেখে ফেললে সেদিনই এই মায়াময়-ছায়াময় ধরনী থেকে আমাকে বিদায় নিতে হতো

বেলার মুখটা অতিশয় রক্তিম হয়ে গেলআমি বুঝলাম প্রসঙ্গ পাল্টানো উচিতবললাম-মামা, ডেকেছেন কেন?’

এ কথা বলা মাত্র বেলার কাছে ধরা খেয়ে গেলামবেলা ঝন্ করে উঠল-তখন যে বললেন মামার কাছে আসেননি? আমি নিশ্চিত আপনি প্রেমে পড়েছেনপ্রেমে না পড়লে আপনার মতো হাঁদা টাইপের মানুষ এরকম মিথ্যে বলতে পারে না

আমার বলার কিছুই ছিল নাধরা খেয়ে গেলে কারো বলার কিছু থাকেও নাবেলা যেন অহেতুক ঝগড়া বাঁধাতে চাচ্ছে এরকম একটা ভাব দেখিয়ে মামা বলল-তুই থামতোযা, চিনি দিয়ে আরেক কাপ চা করে আনএই ফাঁকে আমি রিন্টুর সাথে জরুরি কথাটা সেরে নেই

বেলা চা করতে গেলআমি বললাম-কী প্রয়োজনে ডেকেছেন মামা?’

-‘আজ রাতে তোমাকে নিয়ে একটু বেরুবো

-‘কোথায়?’

-‘তেজগাঁও ইন্ড্রাসট্রিয়াল এরিয়ার ম্যানহোল গোণনার কাজটা শেষ হলেই আমার এই প্রজেক্টের কাজ প্রায় শেষ হয়ে যায়তারপর আমি প্রতিবেদন লিখতে বসতে পারি

-‘ম্যানহোল গুণবেন রাতের বেলা!

-‘তাতে সমস্যা আছে কোনো?’

-‘অবশ্যই আছে?’

-‘কী সমস্যা?’

-‘অনেক সমস্যা

-‘কী অনেক সমস্যা?’

-‘রাত দুপুরে ঢাকানাবিহীন ম্যানহোল খুঁজতে গিয়ে নিজেরাই যে ম্যানহোলে তলিয়ে যেতে পারি

-‘কেন, রাস্তায় লাইট পোষ্টের আলো আছে না?’

-‘এ দেশের লাইটপোষ্ট সম্পর্কে দেখি আপনার কিছু ধারণা নেইসব লাইট জ্বলে? তার ওপর আছে লোডশোডিং-এর ব্যাপার

-‘আজ তো পূর্ণিমার রাত

-‘ঢাকা শহরের সব গলি-ঘিঞ্জিতে বুঝি পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঢোকে? সূর্যের আলোই তো পৌছায় না অনেক গলিতে

-‘তাতেও কোনো সমস্য নেইদুজন দুটো তিন ব্যাটারীর টর্চ লাইট নেব

-‘তাতেও সমস্যা আছে

-‘এরপর আবার সমস্যা কী?’

-‘রাত দুপুরে জবরদস্ত দুজন লোককে টর্চলাইট হাতে অলি-গলি ঘুরতে দেখলে টহল পুলিশ কি ছেড়ে কথা বলবে? ধরে ইয়াবা ব্যবসায়ী সাজিয়ে মাল আদায় করে ছাড়ছেপুলিশ চেনেন?

-‘থানায় জানিয়ে রেখেছি সব

-‘কী জানিয়েছেন?’

-‘তারা জানে যে, ঢাকা শহরের সমস্যাগুলোর ওপর আমি রিসার্স করছিএ কথা শুনে তারা খুব খুশি হয়েছেপুলিশের বড়কর্তা আমার খুব প্রশংসা করলোবললো-ম্যানহোল রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের অথচ.....খুব খুশি হলামতবে পত্রিকায় রিপোর্ট করে পলিশকে ফাঁসিয়ে দিয়েন না আবার

-‘আপনি কি রিপোর্টে পুলিশকে বাঁচিয়ে কথা বলবেন? তাহলে তো বলবো আপনার উদ্দেশ্য ফেয়ার নয়

-‘হানড্রেট পার্সেন্ট ফেয়ারআমি পুলিশের বাপকেও ছাড়বো না

-‘অলি-গলিতে ঢোকার পর চোর-টোর ভেবে যদি গণপিটুনি........

-‘আরে ধ্যৎ! তুমি দেখছি নেগেটিভ চিন্তার মানুষকোনো বড় কাজ করতে গেলে এত নেগেটিভ চিন্তা করলে চলে? অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদও তো জানতেন যে, প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে লিখতে গেলে আঘাত আসতে পারে, তাই বলে তিনি কি লেখা বন্ধ করে বসে ছিলেন?’

ছয়

পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনটা আনন্দে ভরে উঠলজন্মাবধি পড়ে আছি এই ঢাকা শহরেচাঁদের আলো কী জিনিস তেমন করে বোঝা হয়নিএই ছল-চাতুরীর জটিল-কুটিল শহরে চাঁদ যে এমনভাবে পবিত্র আলো ঢালে তা জানাই ছিল না যেনমামা তা জানার সুযোগ করে দিল বলে মনে মনে মামাকে ধন্যবাদ দিলামএকটু ফাঁকা জায়গায় বের হলেই আমি তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকেমামা বলল-তুমি বোধহয় জীবনের প্রথম চাঁদ দেখলে?’

আমি মামার প্রশ্নটাকে গুরুত্ব না দিয়ে বললাম-মামা, দেখুন হালকা মেঘগুলো একের পর এক চাঁদটাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, অথচ মনে হচ্ছে চাঁদটাই পিছু ফেলে যাচ্ছে ওদের, আর ওরা স্থির

-‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি-কথাটা যেন কে বলেছে?’

-‘সুকান্ত ভট্টাচার্য

-‘এত অল্প বয়সে ব্যাটা এমন এক উপমা পেল কেমন করে? অসময়ে না মরলে রবীন্দ্র-নজরুলের খবর ছিল

-‘মামা, সাহিত্যটা এমন জিনিস যে, কেউ কারও খবর করে নাযে যার জায়গায় থেকে কাজ করে যায়সুকান্ত এক হাজার বছর বেঁচে থাকলে রবীন্দ্র-নজরুল যেগুলো লিখেছেন সেগুলো লিখতেন নাতিনি তারটাই লিখতেন

-‘সুন্দর বলেছোসাহিত্য সম্পর্কে তোমার ভালো ধারণা বোঝা গেল

-‘মামা, চলুন একটা খোলা জায়গায় কিছুক্ষণ বসিবসে বসে চাঁদ দেখি

-‘ঠিক আছে তাই হবে

ঘাসে ঢাকা একটা মাঠ পেলামচারিদিকে প্রাচীর দেয়াএকটা মাত্র গেটবোধহয় কোনো ক্লাব অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠআশেপাশে কোনো বিদ্যুতের বাতি নেইসেখানে অকৃত্রিম চাঁদের আলো লুটিয়ে আছেআগ-পাছ না ভেবে সেই গেট দিয়ে আমরা ঢুকে পড়লামমাঠের মাঝখানে সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়লামবলা যায় পূর্ণিমার চাঁদ দেখার মতো সবুজ ঘাসের মাদুরে বসার অভিজ্ঞতাও আমার সেই প্রথমস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি সবুজ ঘাসের মাঠ পেয়েছিলামকিন্তু সেখানে বসা হয়নি বা তেমন করে যাওয়া হয়নিকেননা, আমি ছাত্র জীবনে কখনো কোনোরকম খেলাধুলা করিনিখেলাধুলা না করলে বিশেষভাবে স্কুল ও কলেজে মাঠে নামা হয় নাতবে খেলাধুলা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সবুজ ঘাসে হাঁটা হয়, বসা হয়সে হল প্রেম অথবা আড্ডা দিতে গিয়েবিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এ দুটোর একটাও আমার হয়নিতাই সেভাবে সবুজ ঘাসে ঢাকা খোলা মাঠকে জানা হয়নি

একটু পর আমি একেবার শুয়েই পড়লামশুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখতে লাগলামমামা আমার পাশে বসে বোতল থেকে পানি পান করলতারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে কয়েকটা টান দিয়ে বলল-রিন্টু, তুমি কি চাঁদ বিষয়ক কোনো গান জানো?’

-‘চাঁদ বিষয়ক তো একটা গানই বিখ্যাত-চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে উথলে ওঠে আলো....

-‘গানটা কে লিখেছে?’

-‘রবি ঠাকুর

-‘আর কোনোটা জানো না?’

-‘আরেকটা আছে-আজ জ্যোস্না রাতে সবাই গেছে বনে

-‘এটা কে লিখেছে?’

-‘ঐ একজনই

-‘আচ্ছা, এমন কোনো বিষয় আছে যা নিয়ে ঐ গ্রান্ডফা-টা কিছু লেখেন নি?’

-‘এটা আপনার গবেষণার বিষয় হতে পারেএ বিষয়ে একটা প্রজেক্ট হাতে হাতে নিন

-‘না, তা পারে নাআমি শুধু এই ঢাকা শহরের সমস্যাগুলো নিয়েই মাথা ঘামাতে চাইযাকগে, তুমি প্রথম গানটাই গাও

-‘কোনটা?’

-‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে....

-‘আমি যে কোনোদিন গান গাইনিসুর ঠিক হবে কিনা জানি না

-‘এখানে তো আর কেউ নেইআর সুর ঠিক হল কি বেঠিক হল তা ধরার ক্ষমতাও আমার নেইবেলা থাকলে সেটা ধরতে পারতোভুল সুরে গাইলে হাসিতে লুটিয়ে পড়তোগাওতো...ওয়েট, আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে নেই

গানটা আমি অনেকবার শুনেছিকথা মুখস্থ ছিলগাইলামগেয়ে আত্মতৃপ্তি পেলামমনে হল, সুরটা মোটমোটি হয়েছেকাউকে গান শোনানো-এটাও আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতামনে হল, মামার সাথে বেরিয়ে অজস্র নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘরে ফিরবো

তারপর আবার আমি জ্যোস্নার সুধা পান করতে লাগলাম আর মামা সিগারেটের সুধাআমি তো আর কবি না যে, সুধা পান করতে করতে কবিতার লাইন বানাবো মনে মনেচুপচাপ সুধা পান করতে ভাল লাগছিল নামামার সঙ্গে টুকটাক গল্প করতে লাগলামবললাম-মামা, আপনার প্রজেক্টের আওতায় কোন কোন বিষয় আছে?’

-‘এই শহরের ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল, ভাসমান মানুষ, অবৈধ দোকানপাট, পাগল এসবের যথাযথ তালিকা প্রস্তুত করে এসব সমস্যা সমাধানের একটা সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দেশবাসীর কাছে তুলে ধরবো বলে আশা করছি

-‘আপনার কাজগুলো কিন্তু জটিল হবে

-‘জীবনে সহজ একটা চাকরি পেলাম না বলেই জটিল কাজ বেছে নিলাম

-‘বোনের ঘাড়ে বসে এসব করতে খারাপ লাগে না?’

-‘আমি আমার বোনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছি, যদি কখনো সে আমার ওপর বিরক্ত হয়-আমাকে বোঝা মানে করে-ঝামেলা মনে করে, তাহলে যেন তা আমাকে জানিয়ে দেয়তাতে আমি এতটুকু দুঃখিত হব নাআমি তাদেরকে মুক্তি দেব

-‘কীভাবে মক্তি দেবেন?’

-‘যেদিকে চোখ যায় চলে যাব

-‘তা শুনে আপনার বোন কী করলেন?’

-‘কাঁদতে লাগলো, আর আমার একমাত্র ভাগ্নি তিন দিন দানা-পানি কিছু স্পর্শই করলো না

-‘আমার তো কোনো বড় বোন নেইআমার বোনটা আমার চেয়ে অনেক ছোটএকদিন আমিও কি তার ওপর এভাবে চেপে বসবো?’

-‘বোন বড় কি ছোট সেটা কোনো বিষয় নাতার যখন সামর্থ্য হবে তখন সে-ই তোমাকে মায়ের মতো আগলে রাখবেভাইয়ের ব্যাপারে সব বোনই একআমার বোনের কথাই বলিসে ধরনীর মতোই সর্বসংহাকিন্তু আমার ব্যাপারে ঠাট্টাচ্ছলেও দুলাভাই যদি একটা কথা বলেছেন তো আর রক্ষা নেইরাত বেড়ে যাচ্ছেচঁদের আলোয় এভাবে শুয়ে-বসে গল্প করলে কাজের কাজ কিছুই হবে নাচলো, এক কাপ চা খেয়ে কাজে লেগে পড়ি

চায়ের দোকানে গিয়ে বসলামদুই কাপ চায়ের অর্ডার দিলামদোকানদার চা বানিয়ে বলল-দয়া করে একটু আগায়া নেনমামা চাওয়ালার এ কথা সংগত মনে করল নাবলল-তুমি হলে চা বিক্রেতা, আমরা হলাম ভদ্র-শিক্ষিত (হতে পারি বেকার) কাস্টমারতোমার উচিত আমাদের হাতে চা তুলে দেয়া

-‘এতদিন তো তাই দিছি এহন এক সমস্যার জন্যিই তো......

-‘সমস্যা কী?’

-‘আছেলোকটা লাজুক হাসি হেসে মুখ ফেরালোমামা বলল-তোমার সমস্যাটা জানতে চাচ্ছি

-‘কোন সমস্যাটা জানতে চান? গরিব মাইনষের তো সমস্যার অন্ত নাই

-‘কথা এত পেঁচাও কেন? যে সমস্যাটার কারণে তুমি আমাদের হাতে চা তুলে দিতে পারছো না সেটা জানতে চাচ্ছি

-‘সেটা কইতে শরম লাগে?’

-‘পাছায় ফোঁড়া-টোড়া..?’

-‘সেরকম কিছু না

-‘তাহলে শরম লাগে কেন?’

লোকটা বুঝলো তার সমস্যা বলতেই হবেসে ডান পা দেখিয়ে বলল-সমস্যা এইটা

-‘কী হয়েছে ওটার?’

-‘মচকে গেছে

-‘কেমনে?’

-‘ম্যানহোলে ঢুইকা গেছিল

মামা কথাটা শুনে খুব দুঃখিত হলতারপর গর্বিত চাহনিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল-দেখলে রিন্টু, আমি মানুষকে কতবড় বিপদ থেকে মুক্ত করার মিশনে নেমেছি?’

আমরা হাঁটছিলাম আর ঢাকনা খোলা ম্যাহোলের সন্ধান করছিলামমামার এক হাতে ডায়েরি আরেক হাতে জলন্ত সিগারেট আর পকেটে কলমকোনো ঢাকনা খোলা ম্যানহোল দেখলেই সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে ধরে সেটার নম্বর দিচ্ছে এবং পজিশন লিখে নিচ্ছেএ পর্যন্ত চারটা পেয়েছে

আমাদের দুজনের দৃষ্টিই নিচের দিকেহঠাৎ সামনে কে যেন পথ আগলে আচানক বলল-ফায়ার!

 আমরা দু জন একযোগে চমকে উঠলামসরাসরি ফায়ার করে দিতে চাচ্ছেতারপর যে ফায়ার বললো তার দিকে তাকিয়ে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ লংজাম্পটি দিলামচট পরিহিত মাথায় জটাওয়ালা এক লোকতার হাতে একটা সিগারেটপরে বুঝলাম, সে মামার কাছে আগুন চেয়েছেমামা হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা তাকে দিয়ে দিলসে বলল-থ্যাঙ্ক ইউ

 মামা বলল- হোয়াই আর ইউ ইন সাস কন্ডিশন?’

মামা ইংরেজিতে প্রশ্ন করল বোধহয় এটা যাচাই করতে যে, সে আরও কোনো ইংরেজি জানে কিনা বা বোঝে কিনাসে বলল-ওমেন-এ্যা ওমেন হ্যাভ বিট্রেট উইথ মি এ্যান্ড মেড মি ম্যাড

তার মানে লোকটা শিক্ষিতকিছু কিছু পাগল ইংরেজি বলেসেটা তাদের নিজের মতোঅন্যের ইংরেজি বুঝে তার নির্ভুল উত্তর কোনো পাগলকে আজ পর্যন্ত করতে দেখিনিমামা বললেন-প্লিজ, টেল আস ব্রিফলি

-‘মাই ওয়াইফ ওয়েন্ট এ্যাওয়ে উইথ হার লাভসি হ্যাড টেকেন অল মাই প্রপাটিজ এ্যান্ড মাই লাভিং ডটার-মাই হার্টআই কুড লিভ উইদাউট অল মাই প্রপার্টিজ বাট ক্যান্ট মাই ডটারহো ক্যান লিভ উইদাউট হিজ হার্ট?’

লোকটা তার পাগল হবার কারণ সংক্ষেপে বলে চলে গেল সিগারেট টানতে টানতেআমরা দুঃখিত হলামস্ত্রী সব সম্পদ নিয়ে চলে গেছে আরেক জনের সাথেসেটা তার পাগল হবার কারণ নয়পাগল হয়েছে মেয়েটার জন্যবাবা জিনিসটা সত্যিই অন্যরকম

মামা বলল-ওর বেঁচে থাকার এখন আর কোনো স্বার্থকতা আছে?’

-‘না, ও বিধাতার সঙ্গে সাপলুডু খেলেই বাকী জীবন পাড় করবে

-‘তোমার কি বিধাতায় বিশ্বাস আছে?’

-‘আছে অথবা নাই এই দুটোর মাঝামাঝি আছি

-‘তাহলে ওকে দিয়ে বিধাতার সাথে সাপলুডু খেলাতে যাচ্ছো কেন?’

-‘শিল্পী সুমন চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে কবীর সুমন তার এক গানে এ কথা বলেছেনগানটা আমার খুব প্রিয়

-‘, তুমি বোধহয় খুব গান শোনো?’

-‘কী করবো? আমার তো আপনার মতো কোনো প্রজেক্ট নেইআচ্ছা মামা, ওর জীবনের স্বার্থকতার কথা বলছেনআমাদের দুজনের কথা একবার ভেবে দেখেছেনআপনি আজ বড় বোনের ঘাড়ে বসে ঢাকনা খোলা ম্যানহোল গুণছেন, আর আমি ভবিষ্যতে ছোট বোনের ঘারে বসে হয়তো অন্য কিছু গুণবোআমাদের জীবনের কী স্বার্থকতা?’

-‘তুমি কথাটা ঠিক বললে নাতাই বলে আমরা ওর পর্যায়ে পড়ি নাআমরা কিছু একটা করার চেষ্টা করছিও তো সব চেষ্টা বাদ দিয়ে হাত-পা ধুয়ে আছে

আমি তর্ক করতে পারি না, ব্যাপারটা আমার ভালোও লাগে নাতাই মামার সঙ্গে তর্ক বাড়ালাম নাহাঁটতে লাগলাম আগের মতোকিছুক্ষণ পর মামা ডাকল-রিন্টু

-‘জি মামা

-‘তোমার কি মনে হয় না, জীবনে বিয়ে না করে ভুল করেছি?’

-‘হু

-‘কেন?’

-‘সুন্দর ও স্বার্থক জীবনের সাথে বিয়ে, ঘর-সংসার ইত্যাদির সম্পর্ক আছে

-‘ভাব ঐ লোকটার কথামেয়েটার বিচ্ছেদ ব্যাথায় সে.....অমনটি তো আমারও হতে পারতোমেয়ে মানুষকে কি বিশ্বাস করা যায়?’

-‘একজনকে দিয়ে সবাইকে বিচার করা ঠিক নাঅনেকেই তো সুখে-শান্তিতে সংসার করছেআমার মায়ের কথা ভাবুন, আপনার বোনের কথা ভাবুনতারা কি সেই রকমের মেয়ে? বেলাও তো সেই রকমের নাবেলাকে যে ছেলে বিয়ে করবে সে সুখের মহাসমুদ্রে ভাসবে আজীবনতার জীবন ধন্য হবে

মামা কিছু বললো নাবোধহয় আমার যুক্তির কাছে কুপোকাত হল

আমরা হাঁটতে লাগলাম চুপচাপহাঁটতে হাঁটতে টের পেলাম আমার মাথার পুরনো ব্যাথাটা সামান্য জেগে উঠেছেরাত জাগলে সাধারণত হয়আমি বাম হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে এগুতে লাগলামহঠাৎ একটি মেয়ে আমাদের গায়ে প্রায় ছোঁয়া দিয়ে চলে গেলতার শাড়ীর আঁচল বোধহয় উড়ে এসে মামার মুখে পড়েছিলমামা থমকে দাঁড়াল পেছন ফিরেমেয়েটি সামান্য একটু দূরে গিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলহাত দিয়ে আমাদেরকে ইশারা করলবাবা বলল-এর মাথায়ও কি কোনো.....?’

-‘না মামা, এর মাথায় কোনো সমস্যা নেই

-‘তাহলে এমন করছে কেন?’

-‘সে আমাদেরকে খদ্দের মনে করেছে

-‘খদ্দের! কিসের খদ্দের?’

দেখলাম মামা এ ব্যাপারে অজ্ঞআমি বললাম-মামা, এরা ভাসমান দেহপ্রসারিনী

-‘বলো কী! কি বাজে একটা ব্যাপারএ ব্যাপারেও আমি একটা প্রজেক্ট হাতে নেব

-‘এদের ব্যাপারে কী কাজ করবেন?’

-‘এদের সংখ্যা কত, কী হারে বাড়ে, কেন এরা এ পথে আসে, কেমন এদের জীবন জীবিকা, কারা এদের খদ্দের সব বের করবো

-‘মামা, ভীষণ জটিল কাজ, পারবেন না 

-‘কেন, পারবো না কেন?’

-‘ভাসমান পতিতাদের মোটামোটি একটা তালিকা করতে পারলেও তাদের খদ্দেরদের তালিকা করতে পারবেন নাআপনার চোখে যে নিস্পাপ কলেজ পড়য়া কিশোর সেও এদের খদ্দেরধনী ব্যাবসায়ী, জনদরদী রাজনীতিক তারাও এদের খদ্দেরসে সব দিনমজুরের কষ্ট দেখে আপনার চোখে জল নেমে আসে, তারাও তাদের কষ্টার্জিত উপার্যন দিয়ে জৈবিক ক্ষুধা মেটাতে এদের কাছে আসেআপনি তাদের সবার পরিচয় কেমন করে বের করবেন? আপনি কি করে বুঝতে পারবেন নিশাচর রূপসীদের শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে কতটা বেদনা?’

চাঁদের আলোতেও টের পেলাম মামার মুখটা বিমর্ষ হলসে কিছু না বলে হাঁটতে লাগলো তার মতোআমার মাথার ব্যাথাটা বেড়ে গেল আরওআমি ঠিক মামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পা ফেলে হাঁটতে পারছিলাম নাপিছিয়ে পড়ছিলামমামার সেদিকে খেয়াল ছিল নামামা হাঁটতে হাঁতে হয়তো কিছু একটা বলেছিলআমি অনেকটা পিছিয়ে পড়ায় তা শুনতে পাইনিসে পেছনে তাকিয়ে দেখে আমি অনেকটা পেছনেআমি ততক্ষণে মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়েছিমামা ছুটে এল আমার কাছেবলল-সমস্যা কী রিন্টু?’

-‘প্রচন্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে

-‘হঠাৎ মাথা ব্যাথা কেন?’

-‘হঠাৎ নয়, বেশ পুরনো-যখন হয় তখন সহ্য করা কঠিনবিশেষভাবে রাত জাগলে বেশি হয়

-‘সেটা তুমি আমাকে বলবে না? তাহলে কি আমি তোমাকে সঙ্গে আনতাম? এখন কী করবো? তোমাকে হাসপাতালে নেব?’

-‘না, আপাদতঃ বাসায় নিলেই চলবেএকটু শুয়ে থাকলে চলে যাবে

-‘যদি না যায়?’

-‘যাবে, সব সময় যায়

সাত

পরদিন সকালে মামা বাসায় এলসাথে বেলামা পারে তো বেলাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলেএত সুন্দর মেয়ে সে না-কি সারা জীবনে দেখেনিআসলে কি স্কুল, কি কলেজ, কি বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও আমার কোনো মেয়ে বন্ধু ছিল নাএ বয়সী কোনো মেয়ে কোনোদিন আমাদের বাসায় পা রাখেনি, তাই বোধহয় মার এই আবেগবেলা বলল-ব্যথাটা কত দিন ধরে?’

আমি জবাব দেবার আগেই মা বলল-অনেক দিন ধরে

-‘ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয়নি?’

-‘কত করে বলছি, যাব যাব করে যাচ্ছে নাএত বড় ছেলে-আমি কি ধরে নিয়ে যেতে পারি?’

-‘রোগ নিয়ে অবহেলা করা ঠিক না

-‘তা কি ও বোঝে?’

মা নাস্তা আনতে চলে গেলবেলা বলল-অমন চুপ করে আছেন যে? কিছুই তো বলছেন না?’

-‘আমি কিছু বলার সুযোগ পেলাম কোথায়? মা-ই তো সব বলে দিলেন

-‘অসুস্থ মানুষকে দেখতে এসেছি অথচ কিছুই নিয়ে আসিনি ব্যাপারটা অদ্ভূত না?’

-‘না, এটা আমার কাছে কোনো অদ্ভূত ব্যাপার না

-‘আসলে আপনি কী ফল পছন্দ করেন অনুমান করতে পারছিলাম নাআমি একটা ফলের দোকানের সাথে কথা বলে এসছিআপনি কী কী ফল পছন্দ করেন বলুন, ওদের মোবাইলে ফোন করলেই পাঠিয়ে দেবে

-‘তার কোনো দরকার নেই

-‘দরকার নেই বললে তো হবে নাআমি দুই হাজার টাকা রেখে এসেছি

-‘যাবার সময় ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন

-‘কী বলছেন? ফল কেনার জন্য টাকা দিয়ে সে টাকা ফেরত নিয়ে যাব? অদ্ভূত মানুষ আপনি

-‘আপনি আমার চেয়েও অদ্ভূত

বেলার সঙ্গে তর্ক করলে তর্কের শেষ পাওয়া যাবে নামামা বসে ছিল চুপচাপআমি মামার সাথে কথা বললামবললাম-আমার কারণে কাল আপনার প্রজেক্টের কাজে ডিসটার্ব হল

মামা বলল-সেটা আমার জন্য বিশেষ কোনো ক্ষতির কারণ নয়আমার সময়ের অভাব নেই, বিশেষ কোনো তাড়াও নেইআমার কাজ আজ না হলে কাল, কাল না হলে পরশু, পরশু না হলে দশ বছর পরে হবে

মা নাস্তা নিয়ে এলবেলার মাথায় হাত রেখে বলল-খাও মা

আমি বললাম-এত বড় মেয়ের সাথে এমন আহলাদ দিয়ে কথা বলো না মা

বেলা ফস করে উঠল-আপনার হিংসা হচ্ছে?’

-‘কিছুটা তো হচ্ছেই

-‘হিংসুটে!

আট

তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন বেলার সঙ্গে দেখাদেখা কোনোদিন না হলেও কথা প্রতিদিনই হয়মামার সঙ্গে প্রায়ই তার বিভিন্ন প্রজেক্টের কাজে বের হইওদের সঙ্গে থাকতে থাকতে ভুলে যাই আমার একটা চাকরির প্রয়োজনআমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে বাবা-মা, ছোট একটা বোন

মা-ই আমার ভেতর ব্যাপারটা জাগিয়ে দিলএকদিন মা বলল-এভাবে এলোমেলো চললে হয়? চাকরি-বাকরির একটা ব্যবস্থা করতে হবে না? বেলা মেয়েটা যেন ফুলের মতোকি সুন্দর কথা-বার্তা! কি সুন্দর আচার-আচরণ! একটা চাকরি হলে........

আমি মাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বললাম-আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখ না তো মাচাকরি হলেই কত বড় চাকরি হবে? ওরা অনেক সচ্ছল পরিবারঅমন সুন্দর মেয়ের জন্য অনেক দামি দামি ছেলে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে

অথচ কদিনের মধ্যে আমিই আটকে গেলাম সেই আকাশ-কুসুম স্বপ্নের জালেমনকে যতই বোঝাই-এ সম্ভব নয়আমার অভুজ মন ততই বলে-কেন সম্ভব নয়? পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেইতুমি মিছেমিছি ভয় পাচ্ছোসাহস যোগাও দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছেছেলে হিসাবে তুমি কম কিসে?

শুরু হল আমার স্বপ্ন নিয়ে পথ চলাবেলাকে জড়িয়ে স্বপ্নস্বপ্ন ঘরের-সংসারেরস্বপ্ন দেখতে দোষ নেইকোনো মূল্য দিতে হয় না স্বপ্নের জন্যকেউ বাঁধাও দেয় না এতেহাজারটা বাঁধা এসে পথ আগলায় স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গেলেখুব করে ভেবে দেখলাম স্বপ্নের বাস্তবায়ন তো অনেক দূরের কথা, আমি কোনোদিন বেলাকে আমার স্বপ্নের কথা জানাতে পারবো কি-না সেটাই সন্দেহকয়েকটি দিন, কয়েকটি রাত বিরতিহীনভাবে ভেবে দেখলাম যে, আমি কোনোদিনও বেলার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পরব না-আমি তোমাকে ভালবাসিতুমিই পারো আমার প্রশস্থ জীবনটাকে সুশৃঙ্খল নিয়মের সূতোয় বেঁধে দিতে

নয়

এক সকালে বেলার ফোন এলকন্ঠে বেশ উত্তেজনা-আপনি ঝটপট তৈরী হয়ে নিন, আমি আসছি

-‘কোথাও বেরুবেন না-কি?’

-‘হ্যাঁ, একটু বেরুবো

-‘কোথায়?’

-‘এসেই বলবো

সেই পুরণো রহস্যকোথায় যাবে, কেন যাবে তা ফোনে বললে যেন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে

সারে দশটায় বেলা এলচঞ্চল হরিণীর মতো সে ছটফট করছেমা এক গ্লাস লেবুর শরবত খাওয়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারল নাতার হাতে নাকি এতটুকু সময় নেইবেলা বলল-আপনি রেডি?’

-‘রেডি

-‘বের হোন তাহলে

-‘শুধু সেভটা করবো

-‘তাহলে রেডি বলছেন কেন? বেকার মানুষরা যে ঢিলে হয় তা আমার জানা আছেকখনো কোনো দায়িত্ব কাঁধে পড়ে না তো তাই.....

বেলার কথাগুলো মা শুনে ফেললোআমি কোনো জবাব খুঁজে পাচ্ছিলাম নাখুব লজ্জা হলমা কষ্ট পেল কি-না কে জানেবেলা আমাকে সেভ করার সময় দিল নাবলল-এমনিই চলুন

-‘কিন্তু......

-‘আমরা এমন কোথাও যাচ্ছি না যে সেভ করতেই হবে

আমার রুমে বেলা বসে থাকায় আমি বাবা-মার রুমে পোশাক পড়তে গেলামফিরে আসতেই বেলা লাফ দিয়ে উঠে বলল-এতক্ষণ পোশাক পড়তে লাগে? নাকি মার কাছে টাকা চেয়ে পীড়াপীড়ি করছিলেন? আমার সঙ্গে যাবেন তো আপনার টাকার দরকার কী?’

আমি বরাবর নির্বাককি অদ্ভূত মেয়ে! কোন কথায় মানুষ বিব্রত হতে পারে তাও বোঝে নামুখে যা আসে বলে ফেলেএটা মানুষের কোনো গুণ হতে পারে নাঅবশ্যই এটা বড় রকমের একটা দোষঅথচ বেলার চরিত্রের এই দোষটাই আমার কাছে গুণের চেয়েও ভাল লাগলোমনে হল, এরকম একটা দোষ ওর মধ্যে না থাকলে ও এত সুন্দর হতো নাও যদি সুন্দর ছবি আঁকতে পারতো, কবিতা লিখতে পারতো, আবৃত্তি করতে পারতো সে গুণগুলো ওর এই দোষটার চেয়ে ভাল লাগতো না আমার

রাস্তায় নেমে বেলা বলল-কিসে উঠবেন ট্যাক্সিতে না অটোরিকশায়?’

আমি বললাম-কতদূরে যাবেন? কাছে হলে তো রিকশায়ও যাওয়া যায়

-‘আমি তো কোনো লক্ষ্য ঠিক করে বের হইনি

-‘মানে?’

-‘মানে লেখাপড়ায় মন বসছিল নাকোনো কিছু করতেও ইচ্ছে করছিল নাতাই মনে করলাম একটু বেরিয়ে পড়িমাঝে মাঝে আমার এমন হয়তখন বান্ধবী কাউকে ডেকে বেরিয়ে পড়িআজ কেন যেন মনে হল, কোনো বান্ধবী নয়, আপনাকে নিয়ে বের হবো

-‘ধ্যাত্তারি! আমি ভেবেছি, দরকারি কোনো কাজে কোথাও যাচ্ছেনবসে বসে টিভি দেখলেই তো পারতেন

-‘বললামই তো কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারছিলাম নাযান একটা ট্যাক্সিই ডেকে আনুন

ট্যাক্সি ডেকে আনতে হলো নাএকটা ট্যাক্সি আমাদের গা ঘেষে দাঁড়ালোড্রাইভার জানালা দিয়ে মুখ বের করে বলল-কই যাইবেন ছার?’

কোথায় যাব আমি তা বলতে পারছিলাম নাআমি তাকালাম বেলার মুখেবেলা বলল-বুঝতে পারছি না কোথায় গেলে ভাল হয়

ড্রাইভার বলল-চন্দ্রিমায় যাইবেন? প্রেসিডেন্টের কব্বরের পাশে বইসা প্রেম করা মানে খানদানি প্রেমআইচ্ছা, সেই প্রেসিডেন্টের শাসন নাকি অবৈধ হইয়া গেছে?’

বেলা ড্রাইভারের কথায় কোনো কান দিলো নাসে বোধহয় ভাবছিল কোথায় গেলে ভাল হয়ড্রাইভার বলল-তায়লে বোটানিক্যাল গার্ডেনে যানসেখানে আবার ছিনতাইকারী আর বখাটেদের উৎপাত খুব বেশিদুইদিন আগে একটা মার্ডার হইয়া গেছেএক বখাটে নায়িকারে কটু কথা কইছিলনায়ক তার প্রতিবাদ করায় তার পেটের মধ্যে ছুরি ঢুকায়া দিছে

আমি বুঝলাম, ড্রাইভার ব্যাটা বেশি কথা বলেএকে ছেড়ে দেয়া ভালবেলা বলল-সাভার চলুন

আমি বলালাম-সাভার কোথায়?’

-‘স্মৃতি সৌধে

সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার বলল-এইটা একটা ভাল কথা কইছেনপ্রেম করার জন্য খুবই ভাল জায়গাঝামেলা খুব একটা হয় নাদারুন একটা জিনিস বানাইছেবছরে একবার দেশের গণ্যমান্যরা হুরোহুরি করে ফুল দেয়, আর সারা বছর সেখানে হয় প্রেমের মেলা

আমি ড্রাইভারকে ধমক না দিয়ে পারলাম নাবললাম-আপনি চুপ করেন তোএত প্রেম প্রেম করছেন কেন? আমরা প্রেম করতে যাচ্ছি না

আমার ধমকে ড্রাইভার মোটেও বিচলিত হলো নাপ্রেম করতে যাচ্ছি না-এ কথাটা বিশ্বাসও করলো না যেনসে মিটিমিটি হাসতে লাগলোব্যাদবচরম ব্যাদব

বেলার পাশে বসে আমার ড্রাইভারের কথাই বেশি করে মনে হতে লাগলোসত্যিই যদি কোনোদিন এভাবে বেলার সাথে প্রেম করতে যেতে পারতামব্যাপারটা মনে হতে আমি যেন লজ্জাও পেলাম একটুমনে হল, বেলা যেন আমার মনের কথা বুঝে ফেলেছেমেয়েদের না-কি পুরুষের মন বোঝার ক্ষমতা খুব বেশিহঠাৎ বেলা ধমক দিয়ে উঠলো-অমন ফ্যাকাশে হয়ে বসে আছেন কেন?’

-‘কই, ঠিকই তো আছি

-‘কিসের ঠিক, আপনার মুখ কেমন সাদা, রক্ত-শূন্যঅমন জড়োসরো হয়ে বসেছেন যে? কোনোদিন কোনো মেয়ের পাশে বসেননি?’

-‘বসেছি, অনেকবার বসেছি

-‘কে সেই মেয়ে?’

-‘আমার মায়ের পাশে বসেছিসেদিনও তো মায়ের পাশে বসে মামার বাসায় গেলাম

-‘আবুল!

বেলা ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললোড্রাইভার গাড়ি থামালে আমাকে বলল-যান, ড্রাইভারের পাশে গিয়ে আরাম করে বসুন

আমি গিয়ে ড্রাইভারের পাশে বসলামড্রাইভার মিটিমিটি হাসতে লাগলোচরম ফাজিল

আমি আর বেলা পাশাপাশি হেঁটে স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করছিলামনা, ঠিক পাশাপাশি হেঁটে নয়আমি বেলার চেয়ে একটু পিছিয়ে ছিলামবেলা দাঁড়িয়ে বলল-আমার পাশে হাঁটতে আপনার লজ্জা করে?’

খুবই স্পস্ট প্রশ্নএত স্পস্ট প্রশ্নের জবাব দেয়া যায় নাআমি বেলার পাশে চলে গেলামবেলা বলল-আচ্ছা, সবচেয়ে বড় স্তম্ভটার উচ্চতা কত?’ ভাগ্যিস উত্তরটা আমার জানা ছিলবললাম-একশপঞ্চাশ ফিট

-‘একেক জন শহীদের আত্মার উচ্চতা এর চেয়ে অনেক বেশি

আমি কোনো মন্তব্য করলাম নাসে এমন কোনো জ্ঞানগর্ভ কথা বলেনি যে, মন্তব্য করতেই হবেএরকম কথা নাইন/টেন-এর ইংরেজি বইয়ের একটা প্যাসেজে আছেসে হয়তো সেখান থেকেই কথাটা জেনেছেআর যদি নিজে থেকেই কথাটা বলে তাহলে সেটা নাইন/টেন-এর বলিকা সুলভ কথা হয়েছেবেলা বলল-এখানে মাঝে-মধ্যে আসেন?’

-‘আসি

-‘একা?’

-‘না, বাবার সাথে

-‘বাবার সাথে!

-‘হ্যাঁবাবার মনটা যখন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়, কিংবা তাঁর কোনো সহযোদ্ধার কথা মনে পড়ে তখন তিনি এখানে আসেনআমাকেও আসতে হয় তাঁর সঙ্গে

-‘কেন, আপনাকে আসতে হয় কেন?’

-‘বাবার হুইলচেয়ার ঠেলার জন্য

-‘বাবা হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন?’

-‘হ্যাঁ, যুদ্ধে তাঁর দুটি পা-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেতিনি হাঁটতে পারেন না

-‘তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা! তিনি কি বেঁচে আছেন?’

-‘হু

-‘কই দেখলাম না যে?’

-‘হুইলচেয়ার ঠেলে সবার সামনে যেতে চান না, তাই....

-‘যুদ্ধের সময় আপনার বাবার বয়স কত ছিলো?’

-‘বলা যায় বাবা কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন

-‘আপনার মা পঙ্গুত্ব দেখেই .......?’

-‘হ্যাঁ, মা বড়লোক বাবার মেয়েকি এক ঘটনাক্রমে বাবার সঙ্গে তার পরিচয়প্রথম পরিচয়েই মা বাবাকে ভালবেসে ফেললেননানাভাই মার ভালবাসার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াননিপয়ত্রিশ বছর ধরে মা বাবার হুইল চেয়ার ঠেলছেনএই কাজটায় তাঁর সবচেয়ে বেশি সুখকাজটা আমিও করছি অনেকদিন ধরেস্কুলে পড়ার সময় থেকেইএই দেখুন, আমার দুই হাতে কেমন দাগ বসে গেছেএই দাগগুলো আমার খুব প্রিয়যখন বাবা থাকবে না তখন এই দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি বাবাকে দেখবোআমার দেশপ্রেমিক বাবাআমার প্রিয় মানুষ

তাকিয়ে দেখি বেলার চোখে পানিকথাগুলো বলার সময় আমার কন্ঠে বোধহয় আবেগ চলে এসেছিলসেই আবেগ যে বেলার চোখে পানি নিয়ে আসবে তা বুঝতে পারিনিআর বেলার মতো চটপটে একটি মেয়ের চোখে যে এত সহজে পানি নেমে আসতে পারে তাও আমার কল্পনায় ছিল নামনে তৃপ্তি পেলামস্মৃতি সৌধে আসাটাই ভাল হয়েছে, না হলে কখনোই বেলাকে জানানো হতো না যে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানহয়তো এরপর থেকে বেলা আমার প্রতি বিশেষ সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাবেকথায় কথায় ওভাবে অপমানও করবে নাআমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই সুযোগে বেলাকে আমার ভালবাসার কথা জানাবোডাইরেক্টলি কিছু বলতে পারবো নাবেলা যেরকম বুদ্ধিমতি তাতে ইনডাইরেক্টলি বললেই সে বুঝে ফেলবেতারপর তার প্রতিক্রিয়া সে জানিয়ে দেবে

একটা গাছের ছায়ায় সবুজ ঘাসের মাদুরে আমরা বসলাম মুখোমুখিবেলা বলল-কিছু ভাবছেন?’

-‘হু

-‘কী ভাবছেন?’

-‘না, কিছু না

-‘কী অদ্ভূত! এই বললেন ভাবছেন আবার বলছেন কিছু নাবলেন কী ভাছিলেন

-‘আমি একটা মেয়েকে ভালবাসি

এ কথা শুনে বেলা হাসিতে লুটিয়ে পড়লোএটা কি হাসিতে লুটিয়ে পড়ার মতো কোনো কথা? ভেবেছিলাম, বেলা জিজ্ঞেস করবে-মেয়েটি কে? কোথায় থাকে? কী করে? তখন আমি ইঙ্গিতে তাকে নির্দেশ করবোঅথচ সে কোনো প্রশ্নে না গিয়ে হাসতে লাগলো পাগলের মতোহাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি বের করে ফেললতার হাসি দেখে আমার মুখটা লাল হয়ে গেলবললাম-ওভাবে হাসছেন কেন? কোনো হাসির কথা বলেছি কি?’

-‘না, তা বলেন নিহি হি হি

-‘তাহলে?’

-‘মানে আপনার মতো........

-‘আমার মতো কী?’

-‘আপনার মতো ল্যাভেন্ডিস যে কি-না একটা মেয়ের পাশে বসতে........আপনি কেমন করে কোনো মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলবেন-আমি তোমাকে ভাল........হি-হি-হি

বেলার হাসি থামেই নাআমার খুব রাগ হলোশুরু থেকেই সে আমাকে নানারকম অবহেলামূলক কথা বলছেএখন আবার বলছে ল্যাভেন্ডিসসিদ্ধান্ত নিলাম তখনই বলবো তাকে ভালবাসার কথাইনডাইরেন্ট নয়, ডাইরেক্টএ্যাকশন এ্যাকশন ডাইরেক্ট এ্যাকশন

ডাইরেক্ট এ্যাকশনে যাবার আগেই বেলা বলল-আমাকে ফুসকা খাওয়ান

ফুসকার কথা উঠলেই আমার চোখে ভেসে উঠে টিএসসিতে দেখা সেই লোকটার চেহারাতখন আমি কিছু সময়ের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে যাইযাহোক, বেলার জন্য ফুসকা আনতে উঠে দাঁড়ালামবেলা বলল-টাকা নিয়ে যান

-‘টাকা আমার কাছে আছে

-‘মার কাছ থেকে কয়টা টাকা চেয়ে এনেছেন তা আমাকে ফুসকা খাইয়ে শেষ করবেন? ওটা রেখে দেন আপনার কাছে

-‘মা আমাকে টাকা দেয় খরচ করার জন্যআমি বেকার বলে আমার কোনো দুঃখ নেই, আমার বাবা-মায়েরও নাএদেশে এমন ভাগ্য অনেক ছেলের

-‘বাহ! যুক্তি দিয়ে কথা বলতে শিখেছেন দেখছিআপনার কিছু একটা হবেআপনি আমার কাছ থেকেই টাকা নিয়ে যানআপনার কাছ থেকে না হয় পরে একসময় খাব

-‘না, আজই আমার টাকায় ফুসকা খাওয়াবোআমার কাছে পাঁচশটাকার একটা নোট আছে

ফুসকার অর্ডার দিতেই ফুসকাওয়ালা বলল-ভাঙতি দিতে অইবো

-‘আমার কাছে ভাঙতি নেইপাঁচশটাকার নোট

-‘তায়লে ফুসকা দিতে পারতেছি না

-‘তোমার কাছে তো ভাঙতি আছে

-‘পাঁচশটাকার ভাঙতি দিয়া এক পেলেট ফুসকা আমি বেচি না

-‘তাহলে দুই প্লেট দাও

-‘ছয় পেলেট নিলে দিতে পারি

-‘ছয় প্লেট ফুসকা কে খাবে? আমরা মানুষ দুই জন

-‘তাহলে অইবো না

-‘দিনে দিনে এদেশের মানুষ খারাপ হয়ে যাচ্ছেরিকশাওয়ালা, ট্যাক্সিওয়ালা, ফুসকাওয়ালা এই শ্রেণির মানুষ আগে এভাবে কথা বলতো না

-‘আরও খারাপ অইবোসামান্য ব্যবসা করতে আইসা দিনে ট্যাক্স দিতে অয় হাজার ট্যাকামাথা ঠিক থাকে?’

-‘কাকে ট্যাক্স দিতে অয়?’

-‘তা আমারে জিগ্যান ক্যান? যারা দ্যাশ চালায় তাগো জিগ্যান

আমি ফুসকার দোকান থেকে ফিরে আসছিলামকে যেন পেছন থেকে আমার জামা টেনে ধরলোতাকিয়ে দেখি মামাখুবই বিস্মিত হলামবললাম-মামা, আপনি?’ মামা আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল-তুমি কোথায় যাচ্ছো?’

-‘যাচ্ছি না কোথাও, এখানেই এসেছিআপনি কোথা থেকে?’

-‘সাভার ব্যাংক টাউনে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে এসেছিলামফেরার পথে মনে করলাম মুক্তিযুদ্ধের শহীদের উদ্দেশ্যে একটা লাল সালাম জানিয়ে যাইও তোমার কাছে পাঁচশটাকার ভাঙতি হবে?’

-‘আরে আমি-ই তো আছি সেই ঝামেলায়চলুন বেলার কাছে আছে

-‘বেলা এসছে? আশ্চার্য! চলো তো

মামাকে দেখে বেলা অবাক হল আবার উৎফুল্লও হলো খুবউৎফুল্ল হয়ে ভুলে গেল ফুসকার কথাভুলে যাওয়াটা আমার জন্য ভাল হলনা হলে আমাকে আবার কিছু কথা শুনতে হতোমামা বলল-মা জননী, পাঁচশটাকার ভাঙতি হবে?’

-‘ভাঙতি দিয়ে কী হবে?’

-‘একজন অভাবী মানুষকে বিশ/পঁচিশটা টাকা দিতে চাইবেচারা সাতদিন ধরে না খেয়ে আছে

-‘সাতদিন ধরে না খেয়ে আছে! বেঁচে আছে এখনো?’

-‘আছে খুব কষ্টেওঠার ক্ষমতা নেই বোধহয়শুয়ে আছে

-‘চলো তো দেখি

গিয়ে দেখি মাঝ বয়সী একজন শক্ত-সামর্থ্য লোক ঝাউগাছের ছায়ায় শুয়ে আছে টান টান হয়েআমাদের দিকে পিটপিট করে একটু তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করলোআমি বললাম-সমস্যা কী আপনার?’

লোকটা বোধহয় একটু ঘাবড়ালোজীবনে এই প্রধম আমার কথায় কেউ ঘাবড়ে গেলআমি একটু বীরত্বের ভাব নিয়ে তাকালাম বেলার দিকেলোকটা কিছু বললো নাআমি আবার বললাম-সমস্যা কী আপনার?’ সে বলল-কুনু সমস্যা নাই তো

-‘আপনি নাকি সাতদিন ধরে না খেয়ে আছেন?’

-‘, সাতদিন ধইরা এক ফোটা পানিও খাইনাই

-‘পানি খাননি কেন? পানি তো বিনা পয়সায় পাওয়া যায়

-‘ভাতই যহন খাইতে পাই না তহন পানি খাইয়া কী অইবো? পানিতে কি প্যাট ভরে?’

-‘সাত দিন পানি না খেয়ে কেউ বাঁচতে পারে না

-‘এইডা কী কন? এই কতা তো আগে জানতাম না

ততক্ষণে বেলা রেগে গেছে ভীষণতার মুখ লাল হয়ে গেছেএকেতো রোদের তাপে লাল, তার ওপর রাগে লালদুই লাল মিলে লালে লালমনে হচ্ছে মুখে একটু ছোঁয়া দিলেই রক্ত লেগে আসবে আঙুলেআমার একটু ছোঁয়া দিতে ইচ্ছে করছিলোকিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়মাঝ থেকে এই ইচ্ছের কথা ভেবে আমি লজ্জা পেলামভয়ও হলো একটুবেলা আবার আমার ইচ্ছের কথা বুঝে ফেলে কি-নাযে বুদ্ধিমতি মেয়েআচানক ধমকে উঠতে পারে-আপনি মনে মনে আমার মুখ ছুঁইতে চাইছেন কেন?’

না, বেলা আমাকে তা বললো নালোকটাকে বলল-করেন কি আপনি?’ প্রশ্নটা ঝাঁঝালো ছিল নাতবু লোকটা ঘাবড়ে গেল বেশমনে হল, তাকে কোনো পুলিশ প্রশ্ন করেছেলোকটা বলল-কুলির কাম করিরাইতে ট্রাক থিক্যা মাল নামাই

-‘আর দিনে ভিক্ষা করেন?’

-‘তওবা তওবাভিক্ষা করুম ক্যান? পত্যেক রাইতে আমার ইনকাম তিন/চাইরশট্যাহা

-‘তাহলে তাকে বলছেন কেন যে সাত দিন ধরে না খেয়ে আছেন?’

-‘মা জননী, মাপ কইরা দেনআমি একটু আগে টাকি মাছের লাবড়া আর মাসকালাইর ডাইল দিয়া দুই পেলেট ভাত খাইছিসত্যি কথা অইল ওনারে দেইখ্যা আমার মনে অইলো লোকটা সাদা-সিদা, ব্যাক্কল কিসিমেরযদি কিছু পাই তো মন্দ কী?’

-‘একজন এম.এ. পাস মানুষের সাথে আপনি চিটারি করেছেনআপনাকে পুলিশে দেব

পুলিশকে এদেশের সবশ্রেণির মানুষই সব সময় ভয় পায়ন্যায়-অন্যায় যাই হোক পুলিশের হাতে পড়লে মহাবিপদ এরকমটিই এদেশের বেশির ভাগ মানুষের ধারনাপ্রবাদ আছে-বাঘে ছুঁলে এক ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে দশ ঘাপুলিশের কথা শুনে লোকটা কাহিল হয়ে গেলবেলার সামনে হাত জোর করে বলল-মা জননী, এইবার মাফ কইরা দ্যানআর কুনুদিন এম.এ পাসের সাথে টিচারী করুমা নাআমি বললাম-টিচারী না, চিটারী

মামা বেলাকে প্রায়ই মা জননী বলেবোধহয় এই জন্যই বেলার মনটা একটু গললোকিছুটা কোমল কন্ঠে বলল-না, ক্ষমা নেইআপনাকে শাস্তি পেতেই হবেআমি পুলিশ ডাকছি

আমিও একটু ঘাবড়ে গেলামবেলা সত্যিই কি পুলিশি ঝামেলায় যাবে? এসবের আদৌ দরকার আছে কি? মামা বলল-মা জননী, তুই পাগলামো করছিসও যা করেছে তাকে চিটারী না ভেবে পজিটিভভাবে নিতে পারিসওর অভিনয় ক্ষমতা......

-‘তুমি চুপ করো মামাতুমি কোনো কথা বলবে না

-‘কেন, চুপ করবো কেন?’

-‘একটা অশিক্ষিত মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে তোমাকে বোকা ভাবেতোমার জন্য আমার কষ্ট হয় মামাতোমার বোনটা মরে গেলে তোমাকে কে আগলে রাখবে বলো?’

বেলার চোখে আবার পানি চলে এলআমি বুঝতে পারলাম, মেয়েরা যত কঠিন আচরণই করুক না কেন তাদের সবার মনই একই রকম নরমমামা বলল-কেন তুই আছিস না? মা থাকতে কোনো সন্তানের কষ্ট হয়?’

-‘মা কারো চিরকাল বেঁচে তাকে না

-‘তুই এমন কথা বলিস নাআমি শৈশবে একটা মাকে হারিয়েছিএই মা না থাকলে আমার পৃথিবীতে আর কিছু যে থাকে না

পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠলোআমার চোখেও বোধহয় পানি এসে যাচ্ছিলোতখন নাটের গুরু লোকটা একটা সুন্দর কথা বলে ভারাক্রান্ত পরিবেশটাকে অন্যদিকে নিয়ে গেললোকটা বলল-মা জননী, আপনি খামোখা কষ্ট পাইয়েন নাওনার মতো দুই/চাইরজন ভাল মানুষ দুনিয়ায় আছে বইলাই দুনিয়াডা এহনো টিকা আছেনইলে....

মামা বলল-চলো, আমরা সবাই মিলে ফুসকা খাবএ্যাই তুমিও চলো আমাদের সাথে

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের ফুসকা খাওয়া হল নাকারণ আমার মাথার ব্যাথাটা ভীষণভাবে চাড়া দিয়ে উঠলোএবং সেই প্রথম মাথার ব্যথায় আমি জ্ঞান হারালাম

দশ

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলাম, আমি এক ডাক্তারের চেম্বারে শুয়ে আছিচারিদিকে তাকিয়ে বুঝলাম, যে ডাক্তারের চেম্বারে শুয়ে আছি তিনি অবশ্যই খুব বড় ডাক্তারআমার মাথার কাছে বসে আছে মামাএকটু দূরে একটা চেয়ারে বসে আছে বেলাতার মুখটা বিষন্ন

মামা বলল-ডাঃ সারোয়ারুল ইসলামখুব বড় নিউরো সার্জনএতদিন ছিলো আমেরিকায়সম্প্রতি দেশে ফিরেছেও আমার ক্লাশমেট ছিলোস্কুল আর কলেজে আমরা এক সঙ্গে পড়েছিঅসাধারণ ব্রিলিয়ান্ট ছিলো স্টুডেন্ট হিসেবেআমাদের স্কুলের অংকের স্যার ক্ষিতিশ বাবু কোনো জটিল অংকের প্যাঁচে পড়ে গেলে সারোয়ার প্যাঁচ খুলে দিতোসবাই ওকে ডাকতো স্ক্রুডাইভারপ্যাঁচ খোলার স্ক্রুডাইভারসবাই ওকে  বলেছিলো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেকিন্তু ও এইচ.এস.সি শেষ করে ভর্তি হলো ঢাকা মেডিকেলেতারপর গ্লাসকোতারপর আরও অনেক কিছুসে তোমাকে দেখেছেখুব ভাল করে দেখেছেনিজের প্যাসেন্ট হিসাবে নয়-দেখেছে বন্ধুর ভাগ্নে হিসেবেসিটি স্ক্যানসহ অনেকগুলো টেস্ট দিয়েছেটেস্টের রেজাল্ট হাতে পেলেই শুরু হবে ট্রিটমেন্টআশাকরি সুস্থ হয়ে যাবেতবে সে এখন তোমার সাথে কথা বলবে

মামা হরবর করে অনেক কথা বলে গেল এক সঙ্গেআমি কিছু বলতে পারছিলাম নামামার মুখে তাকিয়ে ছিলাম বোকার মতোমামা বলল-তুমি কিছু খাওতারপর ডা. সারওয়ার তোমার সাথে কথা বলবে

-আমি কিছু খাবো না মামা

-দূর্বল হয়ে গেছো তো

-কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না

-ফলের জুস খাও একটুবেলা........

বেলা ব্যাগ থেকে একটা জুসের বোতল বের করলোবুঝলাম, খেতে হবেতাই একটু খেলাম

একটু পর এক যুবক এসে বলল-স্যার ডাকছেন

পাশের কক্ষেই ডা. সারোয়ারুল ইসলাম বসেনমামা বলল-চলো যাই

আমরা তিনজনই এক সঙ্গে ডা. সারোয়ারুল ইসলামের কক্ষে প্রবেশ করলামডা. সারোয়ারুল ইসলাম আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেনডাক্তাররা সাধারণত এরকমটি করে নামামা তো আগেই বলেছেন, তিনি আমাকে আর সব রোগীর মতো দেখেননি, দেখেছেন বন্ধুর ভাগ্নে হিসেবেডাক্তার সারোয়াউল ইসলাম আমাকে বসতে বললেন

তরপর বললেন-এখন কেমন বোধ করছেন?

-এখন খারাপ লাগছে না

-আপনি কী করছেন?

-কিছু করছি নাকরার চেষ্টা করছি

-, পড়াশোনা?

-ইংরজি সাহিত্যে মাস্টার্স

-ভালো তো

আমার ভয় হচ্ছিল, বেলা আবার ফস করে বলে না বসে যে, তার কিছু হবে নাসে মামার মত আজীবন বেকার থাকবেহাঁদা টাইপের মানুষ তো

কিন্তু নাডাক্তারের সামনে বেলা আমাকে বিব্রত করলো নাডাক্তার বললেন-আচ্ছা, আপনার মাথা ব্যথার সমস্যাটা কতদিন ধরে?

-প্রায় ছয় মাস

-অনেক দিনএতদিনে কোনো ডাক্তারের কাছে যাননি?

-যাই যাই করে......

-এখানেই তো অনেকে ভুল করেআচ্ছা, মাথা ব্যথার সাথে কি কখনো বমি.....

-জি, হয়েছে কয়েক বারএমনকি বমির ভাব না হয়েই বমি হয়েছে

আমি তাকালাম ডাক্তারের মুখেদেখলাম, কপালটা যেন একটু কুঁচকে গেলতিনি বললেন-আচ্ছা, কখনো খিচুনি....?

-জি, মাথা ব্যথার সাথে খিচুনিও হয়েছে অনেক বার

ডাক্তারের কপালের ভাঁজ বেড়ে গেলতিনি একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে মুখের চেয়ারা স্বাভাবিক করতে চাচ্ছিলেন হয়তোতার তৃতীয় প্রশ্ন হলো-আপনার কি মনে হয় যে, আপনার ঘ্রাণশক্তি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে?

-জি সেরকমই মনে হয় মাঝে মাঝে

প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচকসে হিসেবে ডাক্তারের রোগ নির্ণয় হয়ে যাবার কথা

-চোখে ঝাপসা.....

-হ্যাঁ, মাথা ব্যথা হলে চোখে ঝাপসা দেখি

-ব্যথায় জ্ঞান হারালেন কবার?

-তিন/চার বার

হয়তো তার আর কোনো প্রশ্ন নেইতিনি গ্লাস থেকে একটু পানি খেলেনদেয়ালে টাঙানো একটা ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণতারপর বললেন-ঠিক আছে, আসলে টেস্ট না করে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে নাটেস্টগুলো নিয়ে আসুন তারপর......

ডাক্তার আমার দিকে হাত বাড়ালেনবিদায়ী করমর্দনআমি তার সাথে করমর্দন করে উঠে দাঁড়াতেই লক্ষ্য করলাম, তিনি চোখ ইশারায় মামাকে বসতে বললেনআমি আর বেলা বাইরে এলামমামা বসে রইল

মামা ডাক্তার সারোয়ারুল ইসলামের কক্ষ থেকে বের হয়ে এলেন প্রায় আধা ঘন্টা পরতার মুখে হাসিকিছু লুকানোর হাসি হয়তোবেলা বলল-ডাক্তার বিশেষ কিছু বললেন?

মামা যেন এ প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিল নাচমকে উঠে বলল-না না, বিশেষ কী বলবে? টেস্টের রেজাল্ট না দেখে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাবে না তোআমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ করলোআমরা বন্ধু না?

আমি বললাম-তিনি কী অনুমান করছেন?

-অনুমান? এই যুগে অনুমান করে কোনো চিকিৎসা হয় নাটেস্ট করে নিশ্চিত হয়ে তারপর চিকিৎসা চলেতাই সে কিছু অনুমান করছে নাচলো টেস্ট করাতে যাই

টেস্টগুলো করাতে যে অনেক টাকা লাগবে তা আমার জানা ছিলোআমার কাছে তখন মাত্র পাঁচশটাকাতাই বললাম-আজই যে টেস্ট করাতে হবে তার কোনো মানে নেইআগে বাসায় যাই

এ কথায় মামা রেগে গেলবলল-চুপ করোতোমাকে টাকার বিষয়ে কিছু ভাবতে হবে নাটেস্টের জন্য যে টাকা লাগবে আমার কাছে তা আছেতোমার চিকিৎসার ব্যাপারেও বাবা-মাকে কিছু বলতে হবে নাতারা দুঃচিন্তা করবেনচিকিৎসার জন্য যত টাকা লাগে তার ব্যবস্থা আমি করবো

-‘মামা, আমার চিকিৎসাটা ব্যয় বহুল হবে নিশ্চয়

-‘হোক, আমার স্থায়ী কোনো ইনকাম নেই তা ঠিক, তবে আমার স্থায়ী কিছু সম্পত্তি আছেহ্যাঁ, গ্রামে একটা বাড়ি, কিছু জমি-জমা আছে যা আমি পৈত্রিকসুত্রে পেয়েছিআমার একমাত্র বোন তার ভাগ নেয়নিআমি গ্রামে কখনো যাই নাসেগুলো পড়ে আছে অহেতুকতোমার জন্য আমি সে সব বিক্রি করে দেবতারপরও যদি লাগে সেটাও যোগার হবেআর বেলাও তো আছেবেলা মা জননী আমার, তুই কি রিন্টুর জন্য কিছু করবি না?’

বেলা আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল-অনেক দেরি হয়ে গেছেআর এক মুহূর্তও নষ্ট করা ঠিক হবে না

আমার খুব খারাপ লাগছিলমেয়েটা থেকে থেকে শুধু কাঁদছেআবার ভালও লাগছিলআমার জন্য কোনোদিন কোনো মেয়ে চোখের পানি ফেলবে তা ভাবনায় আসেনি কখনো 

এগারো

সবগুলো রিপোর্ট হাতে পেতে সপ্তাহ খানেকের মতো সময় লাগবেমামা বলেছিল রিপোর্টগুলো নিয়ে সে আমার কাছে আসবেতারপর আমাকে নিয়ে যাবে তার বন্ধু বিখ্যাত নিউরো সার্জন সারোয়ারুল ইসলামের কাছেকিন্তু পনেরো দিন চলে গেলেও মামার কোনো দেখা মিললো নাএর মধ্যে মাথার ব্যাথাটা কন্টিনিউ হয়ে গেছেশেষে আমি মামাকে ফোন করলামমামা জানালো আসছে খুব শীঘ্রই

বেলাও কোনো খোঁজ করলো নাএকবার মনে করেছিলাম, নিজেই রিপোর্টগুলো নিয়ে আসি এবং ডাক্তারের কাছে যাইশেষ পর্যন্ত সেটাও পারলাম না

শেষে মনকে সান্ত¡না দিলাম-এত উতালা হবার কিছু নেইহয়তো রিপোর্টে সেরকম জটিল কিছু ধরা পরেনি তাই মামা আসছে নাআবার বিপরীতমুখি চিন্তাও মনে এল-হয়তো এমন কিছু ধরা পরেছে যার জন্য অনেক টাকার দরকারমামা গ্রামে গেছে তার পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করতেমনে প্রশ্ন ভেসে উঠল- কী হচ্ছে তা ফোনে জানালে ক্ষতি আছে কোনো? আর বেলাই বা এভাবে.......? নিজেই আবার উত্তর খুঁজে নিলাম-প্রথম থেকেই তো দেখছি এরা একটু রহস্য রাখতে পছন্দ করে

বেলাকে ফোন করতে কেন জানি সঙ্কোচ হচ্ছিলোশেষে বেলার মোবাইলে ফোন না করে ল্যান্ড ফোনে ফোন করলামসেই নাম্বার ২৪৪১১৩৮রিং হয় কিন্তু কেউ ধরে নাফোন কানে নিয়ে বসে থাকলামকিন্তু কেউ ধরলো নাআবার করলামএকই অবস্থাবাসায় কি কেউ নেই? তৃতীয় বারে কেন যেন বলল-হ্যালো

কন্ঠ শুনে চমকে উঠলামআবার রং নাম্বারে চলে গেল নাকিতাড়াতাড়ি ফোন কেটে দিয়ে আবার ভাল করে দেখে ডায়াল করলামসেই মেয়েলি কন্ঠকেমন গেঁয়ো টানবললাম-আমি বেলাকে চাচ্ছি

-‘কাউরে দেওন যাইবো না

-‘খুব জরুরি দরকার

-‘কইলাম তো দেওন যাইবো না

-‘প্লিজ

-‘পিলিজ কী এ্যা পিলিজ কী?’

খট করে ফোন না রেখে দিলোআমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না 

মামার ফোন এল আঠাশ দিন পরবলল-রিন্টু, কেমন আছো?’

-‘আছি কোনোরকম

-‘ব্যথাটা কি বেশি?’

-‘হ্যাঁ, পেইন কিলার খেতে খেতে গ্যাস্ট্রিকে ইফেক্ট করেছে

-‘তুমি একটা ক্যাব নিয়ে টিএসসি-তে চলে এসো

গেলাম টিএসসি-তেমামাকে খুব বিপর্যস্ত লাগছিলোখুব সংকুচিত লাগছিলোমামা আমার কাঁধের উপর হাত রেখে অন্য দিকে চেয়ে রইলোঠোঁট কামড়াতে লাগলোআমি বললাম-মামা, বুঝতে পেরেছি আপনি কোনো জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলেন

মামা এ কথার প্রসঙ্গে কিছু না বলে নিয়ে এল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা প্রসঙ্গবলল-রিন্টু, আমার মাস্টার্স পরীক্ষার ঠিক আগে একটা মেয়েকে আমার ভাল লাগলোখুব ভাল লাগলোআমি কথাটা জানালাম তাকেসে কিছু বললো নাআমি বারবার তাকে কথাটা বলতে লাগলামসে নির্বিকারদিন পর তার বিয়ে হয়ে গেলসে আমাকে তার বিয়ের কার্ডও দিয়েছিল

এ কথার পরে আমি কিছু বলার জন্য পেলাম নাআর এরকম একটা প্রসঙ্গ হঠাৎ এল কেন তাও বুঝলাম নাবেলাকে যে আমার ভাল লাগে মামা কি তা বুঝে ফেলেছে? কিন্তু বোঝার তো কথা নয়বেলা নিজেই তো বোঝেনিআবার বুঝতেও পারেমেয়েরা না-কি অনেক কিছুই বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকেতাদের বোঝার ক্ষমতাও না-কি অনেক বেশিমামা ডাকলো-রিন্টু

-‘জি মামা

-‘তুমি কি বুঝতে পার ভালবাসার ব্যাপারে মেয়েদের মানসিকতা কেমন?’

-‘না, পারি না

-‘আমিও পারি নাভেবেছিলাম, এ ব্যাপারে একটা প্রজেক্ট হাতে নেবপ্রজেক্টটার নামও ঠিক করে ফেলেছিলামনারী ও ভালবাসা অথবা ভালবাসা ও নারীপরে বাদ করে দিয়েছি

-‘কেন?’

-‘বুঝেছি, এটা এমন কোনো বিষয় না যে, প্রজেক্ট হিসাবে এর পেছনে সময় ব্যায় করতে হবেনিঃস্বার্থ ভালবাসা নারীরা বোঝে নানিজেরাও নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে পারে নানারীর ভালবাসার সাথে সুক্ষ্ম একটা স্বার্থ জড়িত থাকেরিন্টু..

-‘জি মামা

-‘তুমি বেলাকে খুব ভালবাস, তাই না?’

আমি চমকে উঠলামকি আশ্চার্য ক্ষমতা এদের! ঠিক ঠিক বুঝে ফেলেছেমামা বলল-হার্ট ইজ ফরম্ড ফর লাভআর এ কারনেই অনেকে অকারণে হৃদয়ে চোট খায়

-‘মামা......

-‘হঠাৎ বেলার বিয়ে হয়ে গেলওর স্বামী একজন ফ্লাইং ইঞ্জিনিয়ারহাভার্টে লেখাপড়া করেছেস্বামীর সঙ্গে ও এখন অষ্ট্রেলিয়ায় হানিমুন করছে

নিজের অজান্তের আমার ভেতর থেকে খুব বড় একটা প্রশ্বাস বের হয়ে গেলকিছু বলতে পারলাম নামামা বলল-একেবারে হঠাৎ করেই হয়ে গেল সবমাকে নিয়ে ছেলেটা বেলাকে দেখতে এলএক পলক দেখেই সে দিশেহারাপারলে তখনই বিয়ে করে নিয়ে যায়

-‘সেটাই স্বাভাবিকবেলা সত্যিই খুব সুন্দরএরকম সুন্দর মেয়ে আমি আর একটাও দেখিনি

-‘বেলা অবশ্য তোমাকে জানাতে চেয়েছিলআমিই জানাতে দেইনি

-‘কেন?’

-‘কী লাভ? এই অসুস্থ শরীরে তার সুখের খবর জেনে তোমার কী লাভ? রিন্টু...

-‘জি মামা

-‘তুমি কি কষ্ট পাচ্ছো?’

-‘না

-‘না বলো কেন? কষ্ট অন্যের কাছে প্রকাশ করলে হালকা হয়ে যায়আর চেপে রাখলে কষ্টটা বাড়তে থাকেহৃদয়ে কষ্টের নদী, নদী থেকে সাগর, সাগর থেকে মহাসাগর হয়ে যায়

-‘মামা, আমার রিপোর্টগুলো কি এনেছেন?’

-‘এনেছি

-‘ডাক্তারকে দেখানোর কথা না?’

-‘অবশ্যই দেখিয়েছি

-‘ডাক্তার কী বললেন, সে ব্যাপারে আমাকে জানাবেন না?’

-‘অবশ্যই জানাবোজানাবার জন্যই তো এত ছুটোছুটি

-‘ছুটোছুটি! আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না 

-‘রিন্টু.....

-‘বলেন

-‘ব্রেন টিউমার দুই রকমেরএক হলো প্রাইমারি টিউমার, আরেক হলো সেকেন্ডারি টিউমারপ্রাইমারি ব্রেন ক্যান্সারের চিকিৎসা হলো, সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপিসব মিলিয়ে রোগি ১০-১২ মাস বাঁচতে পারেআর সেকেন্ডারি ব্রেন ক্যান্সারে সঠিক চিকিৎসা চললে বাঁচার সম্ভাবনা ৬-১০ মাসসেকেন্ডারি ব্রেন ক্যান্সারের চিকিৎসা সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও গামা নাইফ সার্জারিডাক্তারই ভালো বোঝেন, রোগিকে কোন ধরণের চিকিৎসা দিতে হবেসারোয়ার আমাকে যেভাবে বুঝিয়েছে তোমাকে সেটা বললাম

আমি তাকিয়ে ছিলাম মামার মুখেআমার দৃষ্টিতে কিছুটা অধৈর্য্য ভাব ছিলআমি জানতে চাইছিলাম, আমার ক্যান্সারটা কী ধরণেরপ্রাইমারি না সেকেন্ডোরি?

মামা আমার অধৈর্য্যভাব বুঝে নিয়ে বলল-তোমার সেকেন্ডোরি ব্রেন ক্যান্সার

আমি মামার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে তাকালাম নিচের দিকেএকটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়েছিল কিনা তা জানি নাভাবছিলাম, আমার তো তাহলে সময় একেবারেই নেই

মামা বলল-তুমি ইতোমধ্যে ছয়/সাত মাস কাটিয়ে ফেলেছো একদম বিনা চিকিৎসায়সেকেন্ডারি ব্রেন ক্যান্সারের বিনা চিকিৎসায় এতদিন বেঁচে থাকাটা বিস্ময়েরযাহোক, আমার বন্ধু সারোয়ার তোমার সার্জারি করবেও এরই মধ্যে চাকির নিয়ে চলে গেছে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালেযাবার সময় ও বলে গেছে, তোমাকে যেন আমি খুব তাড়াতাড়ি সেখানে নিয়ে যাই

আমি বলার মত কিছু পাচ্ছিলাম নামামা ডাকল-রিন্টু.....

আমি চোখ তুলে তাকালাম মামার মুখেতাকালাম মামার মুখেদৃষ্টিতে শূন্যতামামা বলল-রিন্টু, আমি হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নইআমি সব কিছুর শেষ দেখে নেবার মানুষআর তাইতো তোমাকে কোনো খবর না দিয়ে ছুটে গেলাম আমার গ্রামেআমার স্থাবর-অস্থাবর সব বিক্রি করে সতেরো লাখ টাকা নিয়ে এসেছিকালই আমরা ভিসার জন্য আবেদন করবোইমার্জেন্সি ভিসার ব্যবস্থা করবোতোমার কি পাসপোর্ট করা আছে?  

আমি কিছু বললাম নামামা বলল-পাসপোর্ট করা না থাকলে সেটাও করে ফেলবোপসপোর্ট করতে আর কত সময় লাগবে

-‘বেলাকে কিছু বলেছেন?’

-‘তোমার কি মনে হয়, বলা উচিত ছিলো?’

-‘উচিত ছিল না?’

-‘কী হতো বলে? হয়তো একটু দুঃখিত হতোফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার স্বামীকে ফেলে তোমার জন্য কিছুটা সময় বের করার সময় সে পেতো নারিন্টু......

-‘জি মামা

-‘তোমার কি মনে হয় না যে, বেলার সামনে দাঁড়িয়ে ভালবাসা না জানিয়ে তুমি ভাল করেছো?’

-‘কিছু বুঝি না মামা

-‘আমি বুঝিবেলা, আমি তোমাকে খুব ভালবাসি-বেলার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাটি না বলে তুমি খুব ভাল করেছোহাত পেতে প্রত্যাখ্যাত নেয়ার কোনো মানে হয় না

-‘প্রত্যাখাত নাও হতে পারতামজ্ঞান ফিরে পাবার পর আমি বেলাকে কাঁদতে দেখেছিলাম

-‘আর তাতেই তুমি বুঝে গেলে, সে তোমাকে ফেরাতো না? অন্যের দুঃখে মেয়েরা যত সহজে চোখের পানি ফেলে, তত সহজে সে দুঃখের সহযাত্রী হয় না

-‘আপনি মেয়েদের ছোট করে কথা বলছেন

-‘হয়তো তাই

-‘এটা ঠিক না

-‘তুমি কি মনে কর, তোমার বুকের ভাষা সে বোঝেনি? সে না বুঝলে আমি পেলাম কোথা থেকে?’

-‘আপনাকে বেলা বলেছে যে, আমি তাকে....?’

-‘হ্যাঁ

আর কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম নাহয়তো মামার কথাও ফুরিয়ে গিয়েছিলদুজনে চুপ করে রইলামঅনেকক্ষণ পর মামা ডাকলো-রিন্টু......

-‘জি মামা

-‘তোমার কি খুব বাঁচতে ইচ্ছে করছে?’

-‘হু

-‘মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছো বলে তোমার আজ বাঁচতে ইচ্ছে করছে, না হলে মনে হতো মরে যাওয়াই ভালভালবাসার জন্য অনেকেই কি জীবনকে তুচ্ছ মনে করেনি? বেলার মতো অপরূপ সুন্দর একটি মেয়ে......! তবে যাই বলো, বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারমৃত্যুর মতো অচেনা-অজানা একটা অন্ধকার পথ কারোরই কাম্য হতে পারে না

-‘ঠিক তাই

-‘এখন তোমার চোখে শুধু ভেসে উঠবে মা-বাবা, আর ছোট বোনটার মুখএই তো জীবনপ্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না, ঘৃনা-ভালবাসা, উদারতা-স্বার্থপরতাএই জন্যই বোধহয় জীবনের প্রতি আকর্ষণ এতটা

-‘হু

-‘রিন্টু, ডাক্তার যাই বলুক, তারপরও তুমি যে বাঁচবেই না এমন বলা যায় নাআমার এক দুঃসম্পর্কের খালুর কন্ঠে ক্যান্সার ধরা পড়লোভেতরে আর কোনো খাবার ঢোকে নাসিঙ্গাপুর থেকেও ফিরিয়ে দিলদেশে এসে সে এক হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের কাছে গেলএখনও সে বেঁচে আছেচমৎকারভাবে বেঁচে আছেসারোয়ার যেটা বলেছে সেটা জাস্ট ডাক্তারির থিওরির কথা বলেছেথিওরির বাইরেও পৃথিবীতে অনেক কিছু হয়রিন্টু.....

-‘জি মামা

-‘তুমি কি তোমার জীবনের জন্য, মানে পৃথিবীতে আর একটু সময় চেয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবে?’

-‘না

-‘কেন?’

-‘ঈম্বরের কাছে প্রার্থনা ব্যাপারটা আমার কাছে অহেতুক কিছু মনে হয়

-‘অহেতুক....!

-‘আমি মনে করি, মানুষের প্রার্থনার কোনো উপযোগিতা ঈশ্বরের কাছে নেইঈশ্বর সেটা চায়ও নাসে চায় মানুষের কর্ম-ভালো কর্ম-সুন্দর কর্মতাই প্রার্থনার ইচ্ছা আমার কোনোদিন হয়নি, এখনো হচ্ছে নাআমি বেঁচে থাকতে চাই আরও কিছু সময়আমার বেঁচে থাকাটা আমার পঙ্গু বাবা, অসহায় মা, শিশুবোন, সর্বোপরি আমার জন্য খুব দরকারঈশ্বর নিশ্বয় এটা জানেজেনেও সে যদি আমার প্রতি সহানুভূতি না দেখায়, তো প্রার্থনা করলে সহানুভূতি দেখাবে এটা আমি মনে করি না 

-‘একটা কবিতা শুনবে?’

-‘শুনতে পারিপ্রার্থনার চেয়ে কবিতা শোনা আমার কাছে অধিক ভালো লাগার

-‘তবে আমি কবিতার অর্থ আমি ভাল বুঝি না

-‘কবিতার অর্থ বোঝা খুব একটা জরুরি কিছু নাকবিতা মনের মধ্যে একটা ঢেউ সৃষ্টি করাটাই আসল

-‘এখন যে কবিতাটা শোনাবো সেটা আমার খুব প্রিয় একটা কবিতাকবিতায়টায় মনে হয় পৃথিবীর প্রেম-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, আশা-নিরাশা এইসবের কথাই বলা হয়েছেচলো, একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসিআয়েশ করে দুজনে দুই কাপ এলাচ-দারুচিনি দেয়া চা খাইতারপর আমি তোমাকে কবিতাটা শোনাবো

-‘সে দোকানে যদি এলাচ-দারুচিনি দিয়ে চা না করে?’

-‘আমার পকেটে এলাচ-দারুচিনি আছেআমাদের চায়ে আমরা দিয়ে নেব

আশ্চার্য মানুষ! পকেটে এলাচ-দারুচিনি নিয়ে ঘুরছে

চা খেতে খেতে মামা বলল-রিন্টু চোখ বন্ধ কর

-‘কেন মামা?’

-‘কোনো প্রশ্ন করো নাযা বলি তাই কর

-‘চোখ বন্ধ করেছি

-‘এবার বলো-মৃত্যু তুমি এখনো আমার থেকে অনেক দূরেআমার ভাল একটা চাকরি হবেআমি একটা মেয়েকে বিয়ে করবোমেয়েটা হবে চটপটে-অভিমানী-প্রতিবাদীঅল্পতে তার চোখে জল এসে যাবেখুব সুন্দর একটা সংসার হবে আমারআমার ছোট বোন নুপুর বড় হবেওকে শান্ত-সুবোধ একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবরিন্টু, তুমি এরকম কল্পনার মধ্যে থাক আর আমি কবিতাটা আবৃত্তি করি-

বাঁশি থেমে যায় ঠিকই, কিন্তু বাজে রাধার অন্তর

এই যে দুফোটা অশ্রু এইখানে মানুষ অমর,

এইখানে ক্রিসমাস, এইখানে নতুন অঘ্রান

এখানে বিরহ শেষ, পুনরায় মাঠে পাকা ধান;

এখানে কৃষ্ণপক্ষে চাঁদ ওঠে অনন্ত পূর্ণিমা

এখানে নতুন কাব্য, এইখানে গানের মহিমা,

এইখানে পদাবলী এইখানে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন

রুমির মসনবি আর এইখানে মীরার ভজন

সব বাঁশি থেমে যায়, কিন্তু বাজে রাধার অন্তর

এইখানে ভালোবেসে মানুষ বেঁধেছে তার ঘর

এইখানে মানুষের জন্য কাঁদে মানুষীর মন

এখানে প্রেমের সত্য, এইখানে যুগলমিলন;

সব বাঁশি থেমে যায় রাধার অন্তরে বাজে রাধা

এইখানে অমরতা এইখানে সপ্ত সুর বাঁধা।।

উপসংহার

শেষ পর্যন্ত রিন্টু সিংগাপুর যেতে পারেনিমামা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলকিন্তু ভিসা পেতে দেরি হয়ে যায়কেন দেরি হয় তা আপনারাও জানেনশেষে মামা তার নীতির বিপক্ষে গিয়ে ঘুষ দিয়েছিলোকিন্তু যেদিন ভিসা হাতে পেলো তার আগের রাতে রিন্টু মরে গেলসেটা ছিলো ভরা পূর্নিমার রাতবারান্দা থেকে চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছিলোঅনেক রাত পর্যন্ত রিন্টু বারান্দায় বসেছিল চাঁদের দিকে তাকিয়েশেষ রাতের দিকে সে ঘুমোতে যায়ভোরে নুপুর তাকে ডাকতে গিয়ে দেখে.........থাক সে সব কথা 

আর ঘটেছে সুন্দর একটা ব্যাপারবেলা যে একদিন বলেছিল-তার মনে হচ্ছে, মামার খুব বড় লোকের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হবেবেলার সেই মনে হওয়াটা সত্যি হয়েছেমামা রূপা কসমেটিক কোম্পানীর মালিক ফরহাদ খানের একমাত্র বিধবা মেয়ে রূপাকে বিয়ে করে এখন সেই কোম্পানীর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হয়েছেতার এখন একজন প্রাইভেট সেক্রেটারী আছেনীল রঙের একটা প্রাডো গাড়ি আছেসে এখন সেই কর্মহীন বাউন্ডেলে মানুষ নয়সে এখন সমাজে সু-প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত মানুষ

মামা পূর্বের সব প্রজেক্ট বাদ করে দিয়েছে

** গল্পে ব্যবহৃত কবিতাটির রচয়িতা মহাদেব সাহা

 



সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান