অর্বাচীনের পাঁচালী -৪৫ । অমূল্য রতন পাল।
$post->title


ভরবর্ষায় প্রতিবার চোখ রাঙায় নদ,নদী।

আমরা নদীকে মেরে ফেলেছি,নদী আমাদের মারছে,তলদেশ ভরাট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। খনন করা হচ্ছেনা।উজান থেকে বন্যার জল কমবেশি আসবেই।ভুলে যাওয়া যাবেনা,গত বৎসর ব্রহ্মপুত্র যমুনার প্লাবন অতীতকে ছাড়িয়ে গেছে।

শুকনো মওসুমে ব্রহ্মপুত্রের মৃতপ্রায় অবস্থা দেখাযায়।কাকচক্ষু জল,শুকনো বালিতে নগ্ন পায়ে হাঁটা,বিশ গজের মতো প্রশস্ত নদে নৌকোয় ওপারে যাওয়া,আসা-এসব পুরনো কথন।এখন নৌচলাচল বন্ধ,ব্রহ্মপুত্র বক্ষে সেতু হয়েছে।বর্ষায় নদীর খেলা ভাঙার খেলা চলে।

ব্রহ্মপুত্রের জন্ম মানস সরোবরের উত্তরে তিব্বতের শিমায়াঙ-দাঙ হিমবাহ থেকে। মানস সরোবর থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের পুর্বে প্রায়শই গতিপথ পরিবর্তন করে, অনুপ্রস্থভাবে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে একপাশে মেঘালয় অন্যপাশে আসাম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। চিলমারি প্রবেশের পুর্বে কুড়িগ্রাম ঘেঁষে আসা ধরলা নদ যুক্ত হয়েছে।এরপরে লালমনিরহাট হয়ে আসা তিস্তা নদীর মিলনে আরো প্রমত্ত হয়ে ওঠে। ১৭৮৭ সালের তীব্র ভূমিকম্প ও প্রলয়ংকর বন্যার ফলে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানি ইউনিয়নের খোলাবাড়ী চরে যমুনার জন্ম হয়। যমুনা প্রবল তান্ডপে বিস্তির্ণ দু'পারের অসংখ্য মানুষের জায়গা-জমি,লোকালয় ভেঙে,বাস্তুহারা করে,সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতুর নীচ দিয়ে গোয়ালন্দে পদ্মানদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।(গুগল ম্যাপে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র দেখা যায়) উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে মধুপুর গড়ের ভূগাঠনিক আলোরনের কারনে ব্রহ্মপুত্রের তলদেশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এনদ অপেক্ষাকৃত দুর্বল হয়ে ইসলামপুর,জামালপুর,ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে র পাশ দিয়ে নারায়নগঞ্জ জেলার লাঙলবন্ধে মেঘনা নদীর সঙ্গে আত্মসর্পণ করে।১৯৩৮ সালে বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়ি রেলফেরী চালু হয়।বর্তমানে নদীভরাটের কারনে ফেরী বন্ধ করে দেয়ায় কয়েক জেলার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করছেন। দুটো নদীই জালের মতে ছড়ানো নদীখাতের সৃস্টি করেছে।শীত মওশুমে কিছুটা শান্ত থাকলেও বর্ষাকালে টালমাটাল হয়ে ওঠে।এদের অসংখ্য দ্বীপ রয়েছে,যা স্থানীয়ভাবে চর নামে পরিচিত।অধূনা কিছু চরে মানুষ বসতি করে চাষাবাদ করেন।

একসময় ইসলামপুরে ব্রহ্মপুত্র উন্মত্ত হয়ে পশ্চিম দিকে আড়াআড়িভাবে ভাঙন শুরু করে চরগাঁওকুড়া মৌজার রেল লাইনের কাছে চলে যায়।রেল কতৃপক্ষ বিশাল আকারের অসংখ্য পাথর ফেলে ভাঙন রোধে সমর্থ হয়।

জায়গাটার নাম হয় পাথরঘাটা।মহান মুক্তিযুদ্ধে বর্বর পাকবাহিনীর সঙ্গে পাথরঘাটায় মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তাক্ত যুদ্ধ হয়,যা বিবিসি বাংলায় প্রচারিত হয়েছে।পাথরঘাটা ছোট খাটো নৌবন্দরের রুপ নেয়,বর্তমানে অর্ধমৃত।নগরায়নের জন্যে রাস্তা হওয়ায় বিশাল পাথরগুলো মাটির নিচে চাপা পরে আছে,চাপা পরে যায় ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি পার্ক নির্মানের স্বপ্ন।বিদেশে ঐতিহাসিক বা পুরাকীর্তি নষ্ট করে নগরায়ন করা হয়না।

১৯৯৮ সালে দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় এক ছটাক শষ্যও উৎপাদন করা যায়নি।ব্রহ্মপুত্রে রুদ্রমূর্তি ধারন করে।চারিয়া ও হাতিজা মৌজায় হঠাৎ তীব্রভাবে ভাঙ্গনে অনেক বাড়ী-ঘর,জমি নদীগর্ভে চলে যায়। মাননীয় মন্ত্রী হাজী রাশেদ মোশারফ এর তৎপরতায় তৎকালীন মাননীয় পানিসম্পদ মন্ত্রী প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পানি উন্নয়নবোর্ড কতৃক ব্রহ্মপুত্র নদের প্রথম তীররক্ষা বাঁধ নির্মানের ফলে ভাঙন রোধ হয়। বর্তমান সরকার নদীভাঙন রোধে বরাদ্দ বৃদ্ধি করার ফলে দু'টো নদ-নদীর ভাঙনে রক্ষাবাঁধ নির্মান,নদীশাসন অব্যাহত থাকলেও তা প্রয়োজনের কম হওয়ায় অনেক স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।নদীর তলদেশ খনন করে বাহাদুরাবাদ - বালাশীঘাট নৌপথ চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিন্তু অনেক দেড়ী হয়ে গেছে।

প্রতিবছর নদী খনন না করায় বন্যার জল উপচে ক্ষতি ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাবে।পাথরঘাটার সেতু দিয়ে উল্টো স্রোত বইছে-যা ভয়াবহ বিপর্যয়ের লক্ষণ। নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে,পরিবেশ রক্ষা পাবে।পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং নদীবিশেষজ্ঞগণ নদী খননের উপর বেশি জোর দিচ্ছেন। বন্যার সময় বন্যার্তদের জন্যে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ,প্রশাসন,বিভিন্ন সংস্থা এবং বিশেষ করে সর্বস্তরের জনগনের ত্রান কার্যের মানবিক মূল্যবোধ প্রশংসনীয়।বন্যার্তরা ত্রান চাননা,নদীভাঙনের চিরস্থায়ী ব্যবস্থা চান। শুধুমাত্র যমুনা নদী গড়ে প্রতি সেকেন্ডে ছয়শ টন পলি বহন করে,যা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।ব্রহ্মপুত্র অপেক্ষাকৃত কম।কথায় আছে,শাসন করা তারই সাজে,সোহাগ করে যে।নদীকে শুধুই শাসন করলে নদী মানবে কেন?সোহাগ করে নদীকে পলিমুক্ত করলেই নদী শান্ত হবে।আলোচিত নদীসমূহের প্রবল বন্যা,ভয়াবহ ভাঙনের কারনে কুড়িগ্রাম,জামালপুর জেলাকে দরিদ্রতম এবং লালমনিরহাট জেলাকে মঙ্গা এলাকা বলাহয়।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান