কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
গোলাপের বিবর্তন - তারিক সামিন
$post->title

ছবি: তারিক সামিন

আমি একটা গোলাপ ফুল গাছআমি জানি আপনারা সবাই আমাকে ভালবাসেনসেজন্য আজ  আপনাদের কিছু কথা বলতে চাইকথা গুলো নিতান্তই আমার নিজের সম্বন্ধেআপনাদের ভাল না  মন্দ লাগবে বুঝিনেতবুও বলছি, শুনুন, আমার লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাস

এই পৃথিবীতে মহান স্রষ্টা আমাদের প্রথম পাঠান আজ থেকে সত্তর লক্ষ বছর পূর্বেএরপর হতে আমাদের অনেক বিবর্তন হয়েছেঅর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে ইভুলেশন হয়েছে 

প্রথমে আমরা ছিলাম শুধু কাঁটায় ভরা, ঝোপঝাড় আর জংলী প্রজাতির বৃক্ষএকদিন এক বিজ্ঞজন  আমাদের দেখে খুব মুগ্ধ হলেনতিনি ছিলেন একজন ভাবুক ও দয়ালু প্রকৃতির মানুষপৃথিবীর ভাল সব কিছুই তার কাছে ছিল সুন্দর আর মহান স্রষ্টার অনুগ্রহতখন আর সব বৃক্ষের মতো আমারাও মানুষের ভাষা বুঝতামএমনকি তারাও আমাদের কথা বুঝতোসর্বাঙ্গে কাঁটা, অদ্ভুত বিদঘুটে ছিলাম আমরা; আমাদের ফুল হতো নাশুধু পাতা আর কাটাঁ

মনীষী বললেন,  বাহ বেশ সুন্দর তো তোমাদের পাতাতোমাদের ফুল গুলো না জানি কত সুন্দর  হবে?’

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমরা বললাম, ‘হে মনীষী, আমারা জংলী গাছ, ঝোপ-ঝাড়ে জন্মাইকোন ফুল হয়না আমাদেরসর্বাঙ্গে এত কাঁটা দেখে কেউ ফিরেও তাকায় না আমাদের দিকে

অতপর সেই মনীষী বললেন, ‘এত কাটাঁর কি দরকার তোমাদের বাপু?’  

সে তো কখনো ভেবে দেখিনিতবে এত কাটাঁ বলেই হয়তো অনেক বংশ বৃদ্ধি হয় আমাদের পশু-পাখি সহজে কেউ ঘাটে না আমাদের

মনীষী বললেন, ‘যাই বলো তোমাদের পাতাগুলো বেশ সুন্দরফুল ফুটলে তোমাদের আরো সুন্দর লাগবে

সেই মনীষীর কথা শুনে হঠাৎ আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল আমাদের মনে

সহসা দুই লক্ষ বছরের ধ্যান-ধারণা ত্যাগ করে, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলামশুধু বংশ বৃদ্ধির জন্য নয়, শুধু নিজ স্বার্থের জন্য নয়এবার বাচঁবো সবাইকে নিয়ে, সবার কাছে প্রিয় হবার জন্য, সবাইকে  কিছু দেবার জন্যঅন্যের চোখে সুন্দর হয়েতাদের সুবাস ও সৌন্দর্যে বিমোহিত করে উচু নৈতিকার  জীবন যাপন করবো

সেদিন থেকেই আমরা শুধু নিজেকে বাঁচানোর জীবন ছেড়ে দিয়ে, অন্যকে খুশি করার জন্য ফুল ফোটানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলামপ্রথম প্রথম ফুল খুব ছোট হতোতেমন একটা সুন্দরও ছিল  নাএমন কি গন্ধ ও ছিল না আমাদের ফুলে

সেই মনীষী মাঝে মাঝে আসতেন এদিকে বলতেন, ‘ অপূর্বচেষ্টা করে যাওশুনে খুব ভালো লাগতো

অনবরত চেষ্টায় সতের হাজার বছর ধরে শুধু অন্যের জন্য আনন্দ ও ভাল  লাগার চেষ্টা করে করে আমাদের এমন অপরুপ সৌন্দর্য হলোসেই সৌন্দর্য, সেই ঘ্রাণ এর বর্ণনা  বলে বোঝাতে পারবো আপনাদেরসেই সময়কার গোলাপের একটিও কাটাঁ ছিল নাবড় বড় অজস্র ফুল ফুটতো আমাদেরসুন্দর সুন্দর পেলব পাপড়ি, তার নিচে সুন্দর সবুজ পাতাতার একটি পাপড়ি  সাথে থাকলে সবচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত ঘামের মানুষের মনের আনন্দে প্রফুল্ল হয়ে থাকতোএকটি ফুল  ফুটলে শত মাইল দূর থেকেও তার সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে উঠতো প্রাণীকুল

সে সময় আমাদের উপর কীট-পতঙ্গের উৎপাত ছিল খুব বেশি, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী ফুল সহ  ডালপালা ভেঙে নিয়ে যেত যখন তখনতবুও মনে কোন দুঃখ ছিল নাবরং ছিল অপার আনন্দ  সবাইকে সৌন্দর্য ও সৌরভের বিমোহিত করার গর্ব ছিলঅন্যের জন্য মহৎ কিছু করার মধ্যে যে  কত আনন্দ! অন্যকে খুশি করা, তাদের আনন্দ দেয়ার মধ্যে জীবনের সে কি পূর্ণতা! তার সব পেয়েছিলাম তখনসবাই আমাদের এত ভালবাসতো, এত প্রশংসা করতো, জীবন ধন্য মনে হতো আমাদেরদিকে দিকে  আমাদের গুনের কথা ছড়িয়ে পড়ছিলবিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ আসতো আমাদের পাপড়ি সংগ্রহের  জন্যঅবশেষে পৃথিবীর সব গৃহ, সব বাগান, সব রাজা-রাজন্যদের প্রাসাদ ভরে গেল গোলাপের  বাগানে ও সুবাসে

তারপর একদিন, এক কুমন্ত্রণা দানকারী শয়তান আমাদের কাছে এসে বলল, ‘হে বোকা গোলাপের দলনিজেদের সৌন্দর্য ও সৌরভ দিয়ে তোমরা সবাইকে খুশি করোঅথচ তোমরা কি  পেয়েছো বিনিময়ে? সবাই তোমাদের ফুল ছিড়ে ফেলে, পাপড়ি পায়ের তলায় পিষ্ট করেএত অত্যাচারিত হয়েও তোমরা কেন প্রতিরোধ করোনা? কেন পাল্টা আঘাত করো না? তোমাদের কি কোন আত্মসম্মান নাই? তোমরা দুর্বল! তোমরা নির্বোধ! তোমরা কাপুরুষ!  শুনে সবাই এতটা ক্ষুব্ধ হলাম, এতটা রুষ্ট হলাম যে ভাষায় বোঝাতে পারবো নাক্রোধ, ক্ষোভ ও হতাশায় সব ফুল ঝরে গেল রাতারাতিতারপর গৃহ, বাগান, রাজা রাজন্যদের প্রাসাদ সব স্থান থেকে  বের করে দেওয়া হলো আমাদেরসেজন্য আমরা সবাইকে আরো বেশি ঘৃণা করতে শুরু করলামঘৃণার যে কি শক্তি টের পেলাম এবারখুব দ্রুত বড় বড় কাঁটা জন্মে গেল আমাদের শরীরেসে  কাঁটা খেজুরের কাটাঁর চাইতেও বড়ফনিমনসার কাটাঁর চাইতে বিষাক্তকেউ কাছে আসলেই ফুটিয়ে  দিতাম সে কাঁটাতখন ব্যাথা ও তীব্র চিৎকার দিয়ে পালাতো সেতা সে মানুষই হোক বা হোক অতিকায় ডাইনোসর!

এবার দিকে দিকে ছড়িয়ে পরলো আমাদের কুখ্যাতিতবে আমরা সেসব  পরোয়া করিনিকারণ সে সময় খুব দ্রুত বৃদ্ধি  হচ্ছিল আমাদের প্রজাতির

এমন সময়! হঠাৎ করেই অন্যান্য সব প্রাণীকুল একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিলপৃথিবীকে বসবাসযোগ্য  রাখতে হলে সমূলে ধ্বংস করে দিতে হবে আমাদেরসেই শুনে আমরা আরো ক্ষিপ্ত হলামআরো বিষাক্ত গ্রন্থি ও বড় বড় কাঁটা তৈরি করে, পাতাহীন ক্যাকটাসের মত বড় গাছে পরিণত  হলাম আমরাচললো, পৃথিবীর সব প্রজাতির সাথে আমাদের লড়াইভয় পেয়ে গেল বাকি সব প্রাণীকুলতারপর হঠাৎ একদিন সবাই মিলে আক্রমণ করে বসলো আমাদেরবড়-ছোট, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা থেকে শুরু করে একেবারে শিশু গোলাপ গাছ  গুলোকে পর্যন্ত আক্রমন করল তারাকেটে ফেলে, উপড়ে ফেলে, নির্মম ভাবে আঘাত করে, তারপর আগুন ধরিয়ে দিল সব গোলাপ গাছেএক কথায় জাতিগত হত্যাআমাদের কান্না, আমাদের আর্তনাদ, আমাদের বেঁচে থাকার আকুতি শুনলো না কেউপৃথিবী থেকে গোলাপের জাত নিশ্চিহ্ন না  করে থামলো না তারাহায়! আমরা তো তখন বুঝতে পারিনি, ঘৃণা এমনই এক বিষ, যা ধ্বংস করে  এর পোষণকারী কেই! আমরা তো বুঝিনি যখন কোন সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ঘৃণা করেতখন সে, নিজের কবর নিজেই খুঁড়ে

আমাদের সামান্য কয়েকটি গোলাপ গাছ একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে হিমালয় পাহাড়ের উপর বেঁচে ছিল  আস্তে আস্তে  আমাদের বোধোদয় হলোবুঝলাম হারানো সৌন্দর্য ও সৌরভ ফিরিয়ে আনতে না  পারলে, এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকা হবে না আমাদেরকিন্তু হায়! বিষ কাঁটা তৈরী করা যত সহজ, ফুল  ফোটানো তত সহজ নয়তাই এবার চললো নিরবে, নিভৃতে ফুল ফোটানোর আয়োজনপ্রায় দশ লক্ষ  বছরের চেষ্টায়; কাঁটা, ফুল আর পাতা নিয়ে হারানো সম্মান ও সৌন্দর্য ফিরে পেলাম আমরাএবার  মানুষ সহ সব প্রাণী আমাদের বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিলআজ আমরা আবার সবার ভালবাসায় সিক্তপ্রত্যাশা করি, আবার স্বর্গীয় ফুল হব আমরা

 

 


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান