মেহেদী ইকবাল এর ৯টি কবিতা
$post->title

কবি : মেহেদী ইকবাল


গুহা

পর্বতে গুহা থাকে, ছোট বড় নানা ধরণের গুহা
প্রতিটি গুহারই থাকে ইতিহাস, কিছু তার আবিষ্কৃত
এখনও রয়েছে বহু অনাবিষ্কৃত গুহা!
গুহায় পড়ে থাকা হাড়, খুলির ফসিল আর নানা চিত্র দেখে
আমরা ডারউইনের তত্ত্ব নিয়ে ভাবি। আবার
শিহরিত হই হেরা পর্বতের গুহায় জিবরাইলের আগমনে !

গুহা নিয়ে কত কল্প কথা! কিয়েভের কবরস্থানে
গুহার ভেতরে দেখা মমীগুলোর কথা মনে পড়ে
মনে পড়ে ক্রিমিয়ার পর্বতে অসাধারণ সেইসব গুহা!

কোনো গুহামুখে এলে আমি ভাবতে থাকি অন্ধকারের কথা
আলো ছাড়া কোনো গুহায় প্রবেশ করা

মোটেও কাজ নয় বুদ্ধিমানের!

ঋণ


কেউ ঋণ করে ঘি খায়, কেউ আবার পাওনাদারকে দেখে
পালায় সভয়ে। কেউ ঋণ দিয়ে বসে যায় ক্যালকুলেটার নিয়ে।
কেউ হাঁস -মুরগী বা ছাগল পালনে করে উৎসাহিত
কেউ উৎসাহিত করে ভ্যানগাড়ি কিংবা অটো চালনায়।

ওরা ঋণ ভারে জর্জরিত করে রাখে, ভুলিয়ে দ্যায় বাপ -দাদার নাম
বাপ -দাদার নাম, মানে ইতিহাস, ভুলিয়ে দ্যায় কার্যকারণ
ভুলিয়ে দ্যায় অনুসন্ধান শেকড়ের, সূক্ষ্মভাবে ভুলিয়ে দ্যায় শ্রেনী সংগ্রাম।

কিছু ঋণ অপরিশো ধ্য জানি, এক জীবনে কত মানুষের
স্নেহ আর ভালোবাসার ঋণ! অপরিশো ধ্য প্রকৃতি মাতা, জনক আর জননীর ঋণ।
বুকের তাজা রক্ত ঢেলে এনেছে যারা মুক্তি এবং নতুন উষার দিন
হিসেবের খাতা বন্ধ হবে না, থাকবে অটুট শত শহীদের ঋণ।।

কথা


কথায় কথা বাড়ে, বাড়তে বাড়তে ছড়িয়ে পড়ে কথা
কথা ছড়িয়ে পড়ে ইথারে ইথারে, মহাকালের গহ্বরে
লুকিয়ে থাকে অজস্র কথা। কিছু কথা ছবি হয়, ছবি দেখে
পাওয়া যায় হাজার বছরের কথা। কথা লুকিয়ে থাকে নক্ষত্রপুঞ্জে
ফসিলের অবয়বে লুকিয়ে থাকে হাজার কোটি বছরের পুরনো কথা।

কথা মানে অঙ্গীকার, আশ্বাস, ভালোবাসা
কথা মানে দেশপ্রেম, সভ্যতার প্রতি পদে ছড়ানো ছিটানো কথা।

কথারও আছে রঙ, আছে গন্ধ, কথায় তিতা মিঠা আছে স্বাদ
কথায় বিনয় -ভক্তি, কথায় লুকানো শক্তি, কথায় গোটানো লেজ, তীব্রতা প্রতিবাদ।

কথা মানে মাতৃভাষা, ইতিহাস, 'যে জন বঙ্গে তে জন্মি ',রক্তঝরা ফাল্গুন
কথা মানে বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, লাখো শহীদের কান্না -ঘাম, আর খুন।।

ইঞ্জিন


ফাইভ ইন, নাকি বলবো তাকে সিক্স ইন ওয়ান ?
বিকল্প বটে লাঙলের, নৌকায় জুড়ে দিলে হয়ে যায় ট্রলার!
পথে পথে ভটভটি, নসিমন করিমন
পাম্পের পানি তুলে বাড়ি বাড়ি নিয়ে যায় মোবাইল ধানভাঙ্গা কল!

কী যাদু অঙ্গে একী! জেনারেটরের নামে
অন্ধকারে বাতি জ্বলে দেখি!
জ্বলে বাতি ঘোরে ফ্যান
বলিহারি প্রযুক্তি বাঙালীর জ্ঞান!

ফাইভ ইন, নাকি বলবো তাকে সিক্স ইন ওয়ান
গ্রামীণ সবুজ চিরে রকমারী শুনি তার গান!

কি দরকার


অনেকদিন পর এক বন্ধুর বাসায় গেলাম
অনেকদিন দেখা হয়না তার সাথে!
মনটা কেমন জানি করে উঠলো। ভাবলাম, যাই
দেখে আসি কেমন আছে বন্ধুটি আমার!

বন্ধু আমার সামাজিক অবস্থানে বড়
দড় বটে প্রভাব প্রতিপত্তিতেও! কী যে তার ব্যস্ততা
আমাকে দেখে চিনতে পারে কি পারে না!
আরে কি খবর? কি দরকার? ব্যস্, এটুকুই!
আমার মতো অতি সাধারণকে
আছে কি তার বসতে বলার কোনো প্রয়োজন?
কি দরকার? ভেবেছে হয়তো ধার দেনা কিংবা তদবির!

কত জরুরী বিষয় নিয়ে ব্যস্ত সে! কত জরুরী কথা, টেলিফোন
রকমারী বাণিজ্য আর রাজনীতি, টেন্ডার নিয়ে কথা!

কি দরকার?
আছে কি আমার দরকার কোনো?
হায়! বন্ধু আমার
আমার দরকারের কথা তুমি কি আর বুঝবে এখন?

ফিরে আসি বন্ধুর বাসা থেকে মনে মনে করে এই দোয়া
হে খোদা, বন্ধুকে আমার ভালো রেখো

রেখো সহি সালামতে!

গজলের রাত


লাল ঝুঁটি পরা এক‌টি মোরগের সাথে দেখা হয় রোজ
মোরগটি শুনিয়ে যায় তার বেদনার কাহিনী সকল
শিশিরে ঘুমিয়ে থাকে মৃত গানের পংক্তিগুলো। সেই পাখিটিকে আর দেখছি না
আশ্চর্য ডানা মেলে যে পাখিটি উড়েছিলো অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে!

একটি ফড়িং তবু খুঁজে ফেরে আদিগন্ত সরিষা ক্ষেত
খাদের কিনার ঘেঁষে দেখি হার না মানা হলুদ ঘাসেদের বেড়ে উঠা!

মাথার উপরে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে আধখানা চাঁদ
দূরে

গজল গাইতে গাইতে হেঁটে যায় নিবিড় অন্ধকার!

চিঠি


চিঠিতো লিখে রেখেছি অনেকদিন
নীল খামে খুব যত্নে রেখে দিয়েছি তাকে
অথচ সেই চিঠি আজো পোষ্ট করা হলো না!
পোষ্ট করতে করতে কেটে গেল কতটি বছর
গলির পোষ্ট বক্সটি মরচে ধরে ধরে এখন পরিত্যক্ত
সকাল বিকাল কেউ এসে আর বাক্স খুলে না!

এখন কেউ কি আর চিঠি লিখে কাগজের পাতায়?
হাতে হাতে মুঠোফোন, ইমু, হোয়াটস্ আপ, ম্যাসেঞ্জার!
এখন কি আর চিঠি পড়ে
কারো 'সকাল দুপুর আর রাত্রি কেটে যায় '?

ওহে ডাকঘর, ওহে প্রিয় ডাক বিভাগ
আহা! নীল খামে আসা সেইসব চিঠি
অশ্রুতে ভেজা আর রক্ত দিয়ে লেখা 'ভুলোনা আমায় '
ঠিকানা খুঁজে খুঁজে হয়রাণ, আছে কি তোমার কাছে দু 'একটি নমুনা তার?

যদি থাকে রেখে দিও আমার চিঠিটি সহ

কালের যাদুঘরে স্মারক ভালোবাসার!

দেখা হবে


বিদায়, বলো না বন্ধু
বলো, দেখা হবে!
জানিনা কোথায়, কখন, কবে? হয়তোবা
কুয়াশার পর্দা সরিয়ে কোনো এক শীতের প্রভাতে
কিংবা তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দেখা হবে আবার!
হয়তোবা চারপাশ যখন লালে লাল কৃষ্ণচূড়া, শিমূল আর পলাশে
দেখা হবে সেই ফাল্গুনে, কিংবা জৈষ্ঠ্যের খরতাপে
ঘামতে ঘামতে দেখা হবে আবার! হয়তোবা
দেখা হবে শরতের কাশবনে ব্রহ্মপুত্র পাড়ে কোনো এক অপরাহ্নে!

হয়তোবা কোনোদিন নেমে যাবো ট্রেন থেকে, হেঁটে যাবো অচেনা কোনো গাঁয়ে
শুনবো জানা অজানা পাখিদের গান, দেখবো দু 'চোখ ভরে
বেড়ে উঠা পুঁইয়ের ডগা, ধান ক্ষেতে একাকী সারস আর
মুখে কাপড় দিয়ে লাজুক বধূটির দ্রুত সরে যাওয়া
হয়তো গাঁয়ের আলপথে বিস্মিত দাঁড়িয়ে থাকা তোমাকে দেখবো আবার!

আবার দেখা হবে
হয়তো দেখা হবে মেঘের রেঁস্তোরায়, সাগরের তলদেশে
কিংবা ভিন্ন কোনো অচেনা জগতে দেখা হবে, দেখা হবে আবার!

বিদায়, বলো না বন্ধু
বলো দেখা হবে, দেখা হবে

দেখা হবে!

মুদ্রা


মুদ্রা, মুর্দাকেও বাঁচিয়ে রাখে। অবিকৃত
রাখে জানি প্রানহীন নিথর দেহ।
সভ্যতাই বলি, আর বলি ঐতিহ্য
উৎসবে, উপদ্রবে, অনিবার্য উপস্থিতি মুদ্রার।

যখন মুদ্রা এলো, সাথে করে নিয়ে এলো
না না অনুষঙ্গ। সেই থেকে সংঘর্ষের হলো সূত্রপাত
গোত্রে গোত্রে, জাতিতে জাতিতে হানাহানি, রক্তপাত
পতন আর পচনের শুরু হলো সেই থেকে।

তেল বলি আর স্বর্ন, শস্য, মুদ্রা ছাড়া
যায় কি নেওয়া প্রোটিনের স্বাদ?

মুদ্রার প্রয়োজনে মারণাস্ত্র, দেশে দেশে হেরোইন, আফিমের চাষ
নেটে নেটে পর্ণো আর নারীদের খাটো বস্ত্র --

সে ও জানি সর্বনাশা মুদ্রার প্রয়োজনে আজ!


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান