কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
আবৃত্তি শিল্পের বরপুত্র ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় - সুদীপ দে
$post->title

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় শব্দের প্রেমে পড়েছিলেন একেবারে শৈশবেই। বাবা প্রয়াত লোহিত কান্তি বন্দোপাধ্যায় ঘরে আবৃত্তি করতেন এবং নাট্যনির্দেশনার পাশাপাশি কলকাতায় অ্যামেচার থিয়েটারে অভিনয়ও করতেন। কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর খুলনায়ও তিনি অভিনয় করেছিলেন। মূলত, সবাইকে সংগঠিত করে নাটক শেখাতেন তিনি। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা প্রয়াত দেবী বন্দোপাধ্যায়ও ছিলেন সংস্কৃতি-সচেতন। বাবা-মায়ের এই ধারার ছাপ বা প্রভাব কাজ করেছে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যেও। ১৯৫২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরে জন্মগ্রহন করেন বিদগ্ধ এই বাকশিল্পী।

খুলনা শহরের সেই ছেলেটিই আজকের আবৃত্তির বরপুত্র। তাঁর ভরাট কণ্ঠ ভিড়ের মধ্যেও শ্রোতার কানে বিশেষভাবে বাজে। শুধু আবৃত্তি নয়, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় একাধারে একজন অভিনেতা, স্বর ও বাচন প্রশিক্ষক, গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্র প্রশিক্ষক, নাট্য প্রশিক্ষক এবং নাট্য বিষয়ক লেখক।

জন্মের সময়টি বাঙালির জাতীয় চেতনার এক উত্তুঙ্গ সময়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের বাঙালিরা তখন জাতীয়তাবোধে দারুণ উজ্জীবিত। এই উজ্জীবনী শক্তি ও চেতনায় নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে এই অঞ্চলের সংস্কৃতি। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শৈশবজুড়েই চলেছে নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিন্যাসের কাজ।

নিজের শৈশব ও বাবার প্রভাব সম্পর্কে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বাবার কণ্ঠে আবৃত্তি শুনতে শুনতে নিজেও কিছু আবৃত্তি করতাম। ছোটবেলায় স্কুলে সমাপনী অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করতাম। ঘরোয়া অনুষ্ঠান, পাড়ার অনুষ্ঠানেও আবৃত্তি করতাম। কেমন করতাম জানি না, তবে লোকজন উৎসাহিত করতেন। তারপর আকাশবাণী কলকাতায় আবৃত্তি শুনতাম; সৌম মিত্র, দেব দুলাল, পার্থ ঘোষ, প্রদীপ ঘোষ, গৌরী মজুমদার, কাজী সব্যসাচী প্রমুখের আবৃত্তি শুনতাম। তাদের আবৃত্তি শুনে সাংঘাতিক আপ্লুত হতাম। ঢাকায়ও তখন আবৃত্তি হত। তবে খুলনা থেকে ঢাকার বেতারের চেয়ে কলকাতার বেতার পরিষ্কার শোনা যেত। এটা ষাটের দশকের কথা। তখন ঢাকায় টেলিভিশন চালু হলেও খুলনায় আমরা দেখতে পেতাম না। সঙ্গতকারণেই ঢাকার আবৃত্তি সম্পর্কে জানা ছিল না। আসলে এই শিল্পের প্রতি আমার ভালবাসা তৈরি হয়েছে- প্রথমত আমার বাবার কাছ থেকে এবং আকাশবাণী কলকাতার আবৃত্তি শুনে।’

বাবার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ছোটবেলায় স্কুলে সমাপনী, ঘরোয়া অনুষ্ঠান এবং পাড়ার অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করতেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন থেকেই সবার প্রশংসা ও হাততালি পাওয়া শুরু করেন তিনি। ডাক পেতে থাকেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। ছোটবেলায় এই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেও তিনি ছিলেন আত্ম-সচেতন। বুঝতেন যে সতর্ক হয়ে, শিখে, মহড়া দিয়ে এবং আরো চর্চা করে আবৃত্তি করতে হবে। এই আত্মসচেতনা থেকেই কবিতাকে আরো কতটা হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপন করা যায় সেই চেষ্টা শুরু করেন তিনি। ততদিনে অবশ্য তিনি কলেজ পর্যায়ে পড়াশোনা করে দিয়েছেন। শুরু হয়ে গেছে জীবনের উদ্দাম তারুণ্যের সময়। আর বাংলাদেশের সময়টি তখন স্বাধীনতা লাভের আগের। তখন খুলনা বেতারকেন্দ্র চালু হয়েছে। আবৃত্তি ও অভিনয় শৈশবের এই প্রচেষ্টা ও অধ্যাবশায় প্রথম তারুণ্যেই খুব কাজে লেগে যায়। ১৯৭০ সাল থেকে খুলনা বেতারে কাজ শুরু করেন তিনি অভিনয় শিল্পী হিসেবে। পাঁচ-ছয় বছর কাজ  করেন সেখানে। নিজের সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘সংবাদলেখা, অনুবাদ ও পড়া, আবৃত্তিসহ নানা অডিশন দিয়ে ওখানে কাজের সুযোগ পেলাম। সব শিল্পীই প্রথম দিকে অনুকরণ করে। অনুকরণ না করলে শেখাও যায় না। চর্চা করতে করতে একটা নিজস্বতা তৈরি হয়।’ পরবর্তী জীবনে সেই নিজস্বতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আরাধ্য নিজস্বতাই তাঁকে করে তুলে শিল্পী।

স্বাধীনতার পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। সেই সময়ে সাংবাদিকতায়ও পরিবর্তন আসে। তখন সাংবাদিকতায় যুক্ত হন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্ষেত্রে খুলনা বেতারের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তাঁর খুব কাজে লাগে। বেতারের বাইরে সাংবাদিকতা শুরু করেন খুলনায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একটা পত্রিকায় নিউজ এডিটর। সেখানে কাজ করতে করতে ঢাকার দৈনিক বঙ্গবার্তা পত্রিকার খুলনা প্রতিনিধি হন। তখন তাঁর অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টগুলো ওই পত্রিকায় প্রথম পাতায় ছাপা হতে থাকে। সাংবাদিকতায় তাঁর আগ্রহ দেখে পরিবারের পক্ষ থেকেও বলায় হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা পড়ার জন্য। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে সাংবাদিকতা বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। ঢাকায় এসেই আবৃত্তি, অভিনয় ও সাংবাদিকতা নিয়ে কাজ করতে থাকেন ঢাকা বেতার, পত্রপত্রিকা, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তখন যুক্ত হন থিয়েটারের সঙ্গেও। থিয়েটারে কাজ করতে গিয়ে আরো শেখার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। ভারত সরকারের বৃত্তি দিয়ে ‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’তে নাটক দিয়ে পড়তে চলে যান দিল্লিতে। তিন বছরের পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করেন এবং প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত হন। এই সময় ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে থিয়েটার টেকনিকস, নাট্য রচনা, আলোক পরিকল্পনা, মঞ্চসজ্জা, রূপসজ্জা ও পোশাক পরিকল্পনা, নাট্য পরিকল্পনা, নাট্যনির্দেশনা ও অভিনয় বিষয়ে বিশেষভাবে জানেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে শেষ করেন সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পড়াশোনাও। নাট্যকলায় পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

দিল্লি থেকে ফিরে কলকাতায় নাটক নিয়ে এক বছর গবেষণা করেন। কলকাতায় ১৯৮১-৮২ সালে ক্রেসিডা/নান্দিকার যুব প্রকল্পে (অ্যা ড্রামাটিক অ্যাপ্রিসিয়েশন অমংসট দ্য ইয়ুথ অ্যান্ড দ্যা ওয়ার্কিং ক্লাস) এক বছর কাজ করেন তিনি। ওই সময়ে কলকাতার প্রখ্যাত নাট্য দল নান্দিকারে তিনটি প্রযোজনায় অভিনয় করা ছাড়াও দলের তরুণ নাট্য কর্মীদের নাট্যবিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়েছেন (১৯৮১-৮২)। এই সময়কালে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চের সহায়তায় ‘সোশিও ইকনোমিক কনটেক্সট অন সিগনিফিক্যান্স অব গ্রুপ থিয়েটার মুভমেন্ট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ প্রকল্পে এক বছর গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা আর কলকাতায় থাকার সময়েও যোগাযোগ ছিল ঢাকার সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে। ওই সময়েই ঢাকার সংস্কৃতি অঙ্গনে আবৃত্তিচর্চার একটা জোয়ার আসে। আশির দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি কেন্দ্রিক সাংগঠনগুলো আবৃত্তিচর্চায় জমজমাট হয়ে ওঠে। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়রা তখন গড়ে তোলেন আবৃত্তি ফেডারেশন। সেটা বেশি দিন কাজ করেনি। এরপর গড়ে তোলেন আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি।  এ সময় সারাদেশে বিভিন্ন আবৃত্তি দল ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতা থেকে বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী প্রদীপ ঘোষ ও কাজী সব্যসাচী আসেন। নানা স্থানে আবৃত্তি অনুষ্ঠান হতে থাকে। ডাকসুতে আবৃত্তি বিভাগ চালু হয়। এর বাইরেও বিভিন্ন সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগে প্রথম জাতীয় আবৃত্তি উৎসব হয়। আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ, গান ও অভিনয়ের পাশাপাশি আবৃত্তি হত। আবৃত্তিকে বড় আড়ম্বরের সঙ্গে আলাদাভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া তখন থেকেই শুরু। আবৃত্তি নিয়ে উৎসব, দলগত আবৃত্তি, একক আবৃত্তি—এই ধরনের নানা ফর্মে তখন ব্যাপকভাবে আবৃত্তিচর্চা শুরু হয়।

আবৃত্তির এই জোয়ার ১৯৯০ এর স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এত লোক সামিল হয়েছে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। তখন প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। স্বৈরাচার বিরোধী কবিতা। আমরা ট্রাকে করে আবৃত্তি করেছি তখন। ফুটপাতে, শহীদ মিনারে, মিছিল নিয়ে আবৃত্তি করতে করতে রাজপথে থেকেছি। সে আন্দোলনে কবিতা ও আবৃত্তির যে ভূমিকা, তা বিশাল। সংগঠিত দলগুলো পুলিশের গুলির মুখে দাঁড়িয়েই আবৃত্তি করেত।’

শুধু আবৃত্তিশিল্প নয়, টিভি, চলচ্চিত্র ও থিয়েটারেও উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের।বেশ কিছু মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা  দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ‘আন্তিগোনে’, ‘রাজা ইডিপাস’, ‘রক্তকরবী’, ‘রাজা’, ‘বিষ বিরিক্ষের বীজ’, ‘অভিশপ্ত নগরী’, ‘প্রথম পার্থ’, ‘অলীক বাবু’, ‘য্যায়সা কা ত্যায়সা’, ‘সধবার একাদশী’, ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক প্রযোজনা । এছাড়া তিনি পোশাক ও রূপসজ্জা পরিকল্পনা এবং মঞ্চসজ্জা ও আলোক পরিকল্পনার কাজ করে থাকেন।

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়মিত অভিনয় স্বর ও বাচন উৎকর্ষ এবং আবৃত্তি বিষয়ক কর্মশালা পরিচালনা করে থাকেন। সংবাদ উপস্থাপনা ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা বিষয়েও নিয়মিত প্রশিক্ষণ করেন তিনি।নাটকের দলগুলোতে নিয়মিত অভিনয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন।তিনি দেশের বাইরে লন্ডন, মস্কো এবং  পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, শ্রীরামপুর, বহরমপুর, দূর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমান এবং শিলিগুড়িতে বিভিন্ন সময়ে অভিনয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন। সংবাদ উপস্থাপক ও অনুবাদক হিসেবে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে একসময় নিয়মিত কাজ করেছেন।

প্রায় ৩০ বছর ধরে বেতার ও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান সংবাদ ও গণযোগাযোগ প্রশিক্ষণ পাঠ্যধারা তৈরি এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করে এসেছেন। এর মধ্যে ইলেক্ট্রনিক ফিল্ম প্রডাকশন (ইএফপি), টিভি প্রডাকশন ম্যানেজমেন্ট, এডুকেশনাল ব্রডকাস্টিং, ইনোভেটিভ রেডিও প্রোগ্রাম প্রোডাকশন এবং ট্রেনারস ট্রেনিং ইত্যাদি পাঠ্যধারায় রয়েছে।

তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্য প্রশিক্ষক রজার ক্রাউচার, রজার উইলিয়াম, ক্রিস্টোফার স্যান্ডফোর্ড, ডেবোরা ওয়ার্নার, সিসিলি বেরি, পিটার ব্রুক, ক্লাইভ বার্কার, রতন থিয়াম, কানহাইলাল, কে এন পানিক্কর, ও বি.ভি করন্থ-এর কাছে নাট্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। ডেবোরা ওয়ার্নার নির্দেশিত ‘টেম্পেস্ট’ নাটকে অংশগ্রহণ করেছেন এবং অভিনয় করেছেন।

আব্দুল্লাহ আল-মামুন থিয়েটার স্কুল, কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব জার্নালিজম এন্ড ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। তিনি ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন এবং বহিঃস্থ পরিক্ষক হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিপূর্বে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-কলকাতার, নাট্যকলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন।

তিনি কুয়ালালামপুরে বেতার ও টিভি বিষয়ে চার সপ্তাহব্যাপী ট্রেনিং ‘মেথডলজি’ বিষয়ে একটি কোর্স ও মস্কোতে ‘টিভি ও চলচ্চিত্র স্ক্রিপ্ট রচনা’ বিষয়ে ইউনেস্কোর অধীনে (আ.ই.পি.ডি.সি) চার সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষন লাভ করেন সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসাবে।

তিনি জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটে ‘চলচ্চিত্র নির্মান পাঠ্যধারা’ পরিচালনা করেছেন এবং বর্তমানে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফিল্ম এন্ড মিডিয়া’ বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন। তিনি ‘নদীর নাম মধুমতি’, লালন, রাবেয়া, বাংলা মায়ের দামাল ছেলে্‌ ছিটকিনি, রাজপুত্তুর, সুচনা রেখার দিকে, মনের মানুষ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে অভিনয় ও করেছেন।

ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়রা বাংলাদেশে যখন আবৃত্তিচর্চা শুরু করেন তখন তাঁদের একটা তাগিদ ছিল আবৃত্তিকে আলাদা শিল্পের মর্যাদায় দাঁড় করানোর। আবৃত্তির তত্ব, দর্শন, প্রয়োগ ও নন্দনের জায়গা নিয়ে তারা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। আবৃত্তিকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। তাদের সেই অবদানের সূত্রেই আজকের আবৃত্তিশিল্পীদের একটা পেশাদারি জায়গা তৈরি হয়েছে। নাটক, নাচ, গান, অভিনয়সহ শিল্পকলার সব শাখায় এখন যেমন শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে তেমনই প্রশিক্ষক হিসেবে অবস্থান তৈরি হয়েছে আবৃত্তি শিল্পীদেরও।

সারাদেশেই এখন আবৃত্তির সংগঠন ও সাংগঠনিক কর্মী রয়েছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে যে আবৃত্তি চর্চার ধারা সেটিরই সম্প্রসারণ আজকের এই অবস্থা। দেশব্যাপী আবৃত্তির এই বিস্তার এবং সংস্কৃতিচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠার পরও আবৃত্তিশিল্পীদের ব্যাপারে কিছু আক্ষেপ আছে নান্দনিকবোধসম্পন্ন এই আবৃত্তিশিল্পীর। তিনি বলেন, ‘আবৃত্তি চর্চা হচ্ছে, সাংগঠনিক কর্মী তৈরি হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থাকে এত সংগঠন, প্রশিক্ষনের পরও ভাল আবৃত্তি শিল্পী তৈরি হচ্ছে কি না। আসলে যেকোনো শিল্পের প্রতি যদি নিবেদন না থাকে, ভক্তি না থাকে, তাহলে বড় শিল্পী হওয়া যায় না। শিল্প নিয়ে নিরন্তর প্রচেষ্টা না করলে প্রকৃত শিল্পী তৈরি হয় না। এখন যারা কাজ করছেন, সবাই খুব তাড়াতাড়ি বড় হতে চান। অল্প কিছু লিখেই তারা বিরাট কবি হতে চান। অল্প কিছু পড়েই তারা টেলিভিশনে সুযোগ খোঁজেন। আবৃত্তি শিল্পী হতে চান, অভিনয় শিল্পী হতে চান। অথচ ভিতরে তেমন চর্চা নেই। সবাই দৌড়োচ্ছে। কিন্তু সাধনা ছাড়া কখনই শিল্পী হওয়া যায় না। আসলে সময় সব সময় এক রকম যায় না। কোনো বিষয় সাংঘাতিক গতিতে সব সময় এগুবে এটা হয় না। এটা শিল্পের ক্ষেত্রেও। পরিবর্তনটা থাকবে। হয়তো সময়ই তাকে আবার সাংঘাতিক করে তুলবে। তবে যে শিল্পী, তার সময়টা বুঝে নিতে হবে।’

আবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ব্যাপারে ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় বলেন, ‘আবৃত্তিশিল্প পূর্নাঙ্গ পেশা না। সব পেশার পেছনেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার দরকার আছে। আমাদের দেশে কিছু পৃষ্ঠপোষকতা, কিছু অনুদান পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ হয় না। তবে শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি বিভাগ চালু হওয়াতে আবৃত্তিশিল্প পেশা হিসেবে উঠে আসার একটা দারুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখনই হবে না, তবে আস্তে আস্তে বিস্তার হবে।’

আবৃত্তি ও অভিনয়ের জন্য বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পুরস্কৃত করেছে। জানিয়েছে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। সর্বোপরি মানুষের ভালবাসায় অভিষিক্ত হয়েছেন তিনি। পেয়েছেন কন্ঠশীলন পদক, কবি মাহবুবুল আলম স্মৃতি পদকসহ অনেক রকম সম্মাননা। দেশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গ থেকেও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি তথা সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে অবাদানের জন্য রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক এবং  স্বাধীনতা পদক।

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় কলেজে পড়ার বয়স থেকেই যুক্ত ছিলেন লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে। লেখালেখির ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ ‘নাট্য: স্বর ও সংলাপ’ এবং ‘অভিজ্ঞান নাট্যকথা’ নামে দুটি নাট্যবিষয়ক গ্রন্থ। এছাড়া তিনি হিন্দি থেকে অনুবাদ করেছেন দুটি নাটক ‘আষাঢ় কা একদিন’ ও ‘আকেলি আওরাত’।

শৈশবে যেমন শব্দের সৌকর্যের মায়ার পড়েছিলেন, সে মায়া এখনও রয়ে গেছে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি বলেন, ‘কতটুকু নিবেদিত হতে পেরেছি, এটা তো নিজে বলতে পারি না। তবে ভালোলাগার একটা বিষয় ঘটেছিল। দেখতাম প্রশংসা পাচ্ছি। আবৃত্তির একটা চাহিদা আছে। আর ভাল আবৃত্তি মানুষ শুনতে চায়। অন্যদের ভালো লাগা আর নিজের প্যাশন থেকেই আবৃত্তি করা। ছোটবেলা থেকে করছি। এর মাঝে যদি নিবেদনের বিষয়টি ঘটে থাকে, তা আমি জানি না। কবিতার শব্দ, কবিতার আবেগ, কবিতার চিত্রকল্প, রূপকল্প-- এগুলো ভীষণভাবে টানে এবং এটাকে প্রকাশ করার জন্য ভিতর থেকে প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করি। তাই আবৃত্তি করি।’

সংক্ষিপ্ত জীবনী

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা উচ্চারণ বিশেষজ্ঞ, আবৃত্তি শিল্পী, নাট্যাভিনেতা ও লেখক।

তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন বেতার ও টেলিভিশনে। নির্দেশনা দিয়েছেন অনেক বিখ্যাআত মঞ্চ নাটকে। বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে করছেন নাট্যকলায় পিএইচডি। তিনি বেশ কিছু মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। বাংলাদেশ বেতারে ১৯৭০ সাল থেকে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৭৬ সাল থেকে তালিকাভুক্ত অভিনয় শিল্পী হিসেবে অভিনয় করে যাচ্ছেন অদ্যাবধি। জন্ম ও পরিচয়: বাংলা উচ্চারণ বিশেষজ্ঞ, আবৃত্তি শিল্পী, নাট্যাভিনেতা ও লেখক ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৫২ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরে। বাবা প্রয়াত লোহিত কান্তি বন্দোপাধ্যায়। মা প্রয়াত দেবী বন্দোপাধ্যায়।

শিক্ষা: ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে তিন বছর মেয়াদি পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন এবং প্রথম শ্রেণি প্রাপ্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যকলায় পি.এইচ.ডি করেন।

পেশা: শিক্ষক ও প্রশিক্ষক। অভিনয় ও আবৃত্তি বিষয়ে কর্মশালা পরিচালনা করে থাকেন। সংবাদ উপস্থাপনা ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা বিষয়েও নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত অভিনয় শিল্পী। তিনি বেশ কিছু মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা প্রদান করেছেন। জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটে ‘চলচ্চিত্র নির্মান পাঠ্যধারা’ পরিচালনা করেছেন ।


বর্তমানে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফিল্ম এন্ড মিডিয়া’ বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

অভিনয়:

বাংলাদেশ বেতারে ১৯৭০ সাল থেকে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৭৬ সাল থেকে তালিকাভুক্ত অভিনয় শিল্পী হিসেবে অভিনয় করে যাচ্ছেন। তিনি ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘লালন’, ‘রাবেয়া’, ‘বাংলা মায়ের দামাল ছেলে’, ‘ছিটকিনি’, ‘ রাজপুত্তুর’, ‘সূচনা রেখার দিকে’, ‘মনের মানুষ’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। গ্রন্থ: ‘নাট্য: স্বর ও সংলাপ’ এবং ‘অভিজ্ঞান নাট্যকথা’ নামে দুটি নাট্যবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছেন।হিন্দি থেকে অনুবাদ করেছেন ‘আষাঢ় কা একদিন’ ও ‘আকেলি আওরাত’ নাটক। অ্যালবাম: আবৃত্তি শিল্পের একনিষ্ঠ মানুষটি হাতেগোনা চার থেকে পাঁচটি আবৃত্তির একক অ্যালবাম করেছেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা:

আবৃত্তি ও অভিনয়ের জন্য বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থা বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পুরস্কৃত করেছে। পেয়েছেন কন্ঠশীলন পদক, কবি মাহবুবুল আলম স্মৃতি পদকসহ অনেক রকম সম্মাননা। দেশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গ থেকেও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। নাটক, অভিনয়, আবৃত্তি তথা সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে অবাদানের জন্য রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক এবং  স্বাধীনতা পদক। তথ্যসূত্র: http://www.kothaabritti.com/ সাক্ষাৎকার, মে, ২০১৭।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান