আমাদের যৌনযন্ত্র - তৈমুর খান
$post->title

প্রবন্ধকার : তৈমুর খান

আজ শুধু লিঙ্গেরই গান গাহিব। লিঙ্গই ধর্ম । লিঙ্গই জীবন। লিঙ্গ ছাড়া ইহকালে আমাদের আর কিছু নাই। কোনও কোনও ধর্মে পরকালেও নাকি লিঙ্গসুখই বড়ো সুখ বলিয়া ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। কিন্তু তাহার নাগাল পাইবার ক্ষমতা আমাদের নাই। আমরা শুধু ইহকালেরই কথা বলিয়া ক্ষান্ত হইব।

“লিঙ্গ” শব্দটা শুধু যৌন-ইন্দ্রিয় বা যৌনযন্ত্র হিসাবেই ব্যবহার করিতেছি। এই যন্ত্রটিই আমাদের সামাজিক ও অসামাজিক জীবন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। ইহার কারণেই রাষ্ট্র ও পুলিশের উদ্ভব ঘটিয়াছে। বিচার, সংবিধান, আইন রচিত হইয়াছে। ধর্মগ্রন্থ বা শাস্ত্রগ্রন্থ, নীতিসংহিতাও ইহার কারণেই মনীষীগণ রচনা করিয়াছেন। আবার বাৎস্যায়নও ইহার কারণেই আমাদের কাছে পূজিত হইয়া আসিতেছেন ।

লিঙ্গ না থাকিলে আমরা বাঁচিয়া থাকিব কেন ? ঘর বাঁধিব কেন ? সুন্দরী রমণীকে অথবা সুন্দর পুরুষকে বিবাহ করিব কেন ? কাপড় পরিব কেন ? চুল আঁচড়াইব কেন ? সবই তো লিঙ্গের কারণেই করিতেছি। যন্ত্রটির ব্যবহার শিখিয়া তাহাকে ব্যবহার করিতে পারিলে আমরা নিজেকে ধন্য মনে করি। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হইল, ইহার ব্যবহারে কখনও ক্লান্তি অনুভব করিতে পারি না। সুযোগ পাইলেই কাজে লাগাইয়া দিই। কোনও সতর্কবাণীই গ্রাহ্য করিবার মতো ধৈর্য আমাদের নাই । বাড়ির ঝি-চাকর হইতে বিলাসবহুল মঞ্জিলের কুমার-কুমারী পর্যন্ত আমরা সবাই সমান। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী হইতে সাধু-সন্ত পর্যন্ত আমরা লিঙ্গের গর্জনকে অগ্রাহ্য করিতে পারি না।

মানবজীবনে ধর্ম আসিয়াছে, কিন্তু ধর্মের আগে আসিয়াছে লিঙ্গ। বহু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঈশ্বর বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকিতে পারে, কিন্তু লিঙ্গ-বিশ্বাসে ভিন্নতা নাই। তাই ধর্মকথা প্রচার করিতে গিয়াও লিঙ্গের ব্যবহারে কোনও ব্যত্যয় ঘটে নাই। যুদ্ধ করিতে গিয়াও সৈনিকগণ লিঙ্গের ব্যবহারের ভূরি ভূরি উদাহরণ স্থাপন করিয়াছেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়া গেলে লিঙ্গ আপন মহিমায় অটল থাকে। বধ করিবার পূর্বে একবার ভোগের স্বাদ লইতে কাহারও দ্বিধা হয় নাই। বর্তমানে মোবাইল নামক একটি প্রযুক্তিবিদ্যার দৌলতে কিশোর-কিশোরীরা পর্ন সাইট খুলিয়া তাহাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করিতেছে। আসলে নিজেদের তৈরি করিতেছে। পর্ন সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো তাহারাও হইতে চাহে। তাহাদের মোক্ষম যন্ত্রটির ব্যবহার করিতে চাহে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হইলে হউক। ইহাতে যে স্বর্গসুখ লাভ হয় তাহা তাহারা কাঁচা বয়সেই প্রত্যক্ষ করিতেছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ধর্ষণ ইহারই প্রতিফলন মাত্র। সুতরাং এই যুগ লিঙ্গ আস্ফালনের যুগে পরিণতি পাইতেছে।

বড়ো বড়ো মানুষেরা যাহাই বলুক প্রতিটি জীবই এই লিঙ্গকেন্দ্রিক জীবন অতিবাহিত করিয়া থাকে। পোশাক, আহার ও বাসস্থানের মতো মৈথুনও মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু মৈথুন পাইলেও মানুষ কখনও তৃপ্তি লাভ করিতে পারে নাই। ইহার অসীম ও অনন্ত চাহিদার কারণেই সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এই জীবন বড়ো জটিল জীবন। অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা, ধ্বংস ও মৃত্যু ইহার কারণেই ঘটিয়া থাকে। সংসার ভাঙিয়া যায়। সম্পর্ক পাল্টাইয়া যায়। এমনকী আত্মহত্যার ঘটনাও ইহার কারণেই সাধিত হয়। প্রচণ্ড যৌন উত্তাপ বা যৌনাকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তির পথ বন্ধ হইলে মানুষ আত্মহত্যা করে। সমাজে ইহাকেই “প্রেমের মৃত্যু” নামে অভিহিত করা হয়। ভিন্ন সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ভালবাসার নামে ঘর ছাড়িলে সেইখানেও থাকে এই যৌন উত্তাপের শরীরী আশ্লেষ। যৌন উত্তাপ না থাকিলে প্রেমের শিল্পও সৃষ্টি হয় না। নান্দনিক কোনও সৃষ্টিরই জন্ম হইতে পারে না। সাহিত্য রচনা হইতে ছবি আঁকা, তাজমহল নির্মাণ হইতে “বনলতা সেন” রচনা সবেতেই ছড়াইয়া আছে যৌন উত্তাপ। হাসি-কান্নার মধ্যে, স্তব্ধতা ও হাহাকারের মধ্যেও এই উত্তাপের আলো-আঁধারকে উপলব্ধি করা যায়। সুতরাং আমাদের জীবনের উচ্চারণ কখনও লিঙ্গ ব্যতীত হইতে পারে না। এই বার্তা অনুধাবন করিয়াই সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলিয়াছেন : “A person who feels pleasure in producing pain in someone else in a sexual relationship in also capable of enjoying as pleasure any pain which he may himself derive from sexual relations. A sadist is always at the same time a masochist.” … (Three Essays on the Theory of sexuality).

আমাদের জীবনের আনন্দ বেদনা সবকিছুকেই ঘিরিয়া আছে এই যৌন সম্পর্ক। বাঁচিয়া থাকার যাবতীয় রসদ এই যৌনতা হইতেই আসে। ধর্ম—ঈশ্বর, সামাজিকতা, সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র—আইন ও দণ্ডের ভয় না থাকিলে হয়তো যৌন জীবনের আরও নগ্ন রূপ প্রকাশ হইয়া পড়িত। কিন্তু দণ্ডভয় সকলেরই রহিয়াছে। ধর্মভয়ও জাগরিত করিবার প্রচেষ্টার অন্ত নাই। তবু আমরা কি নিয়ন্ত্রিত হইতে পারিতেছি ?

ইহাকে নিয়ন্ত্রণ করিবার সাধ্য কাহারও নাই। যে আদিম প্রবৃত্তি লইয়া মানুষ জন্মগ্রহণ করিয়াছে সেই প্রবৃত্তির দ্বারা তাহার সমস্ত জীবনই চালিত হইবে। চরমভাবে ইহাকে বহন করিয়া যাইবে। মানুষ যে একটি প্রাণী, আদিম প্রাণী — তাহাকে কোনও রাষ্ট্রীয় শাসনেই শাসন করিবার ক্ষমতা কাহারও নাই। লিঙ্গ লইয়া সে বিশৃঙ্খল করিবে। সুযোগ পাইলে প্রয়োগ করিবে। অজাচারেও তাহার আপত্তি নাই। বয়সের চোখরাঙানি সে পরোয়া করিবে কেন? আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার কারণে সে হাতের নাগালে বিশ্বের নারী-পুরুষের উন্মুক্ত যৌনযন্ত্রসহ দেহসৌষ্ঠব চাক্ষুষ করিবার সুযোগ পাইতেছে । যে বয়সটিতে জ্ঞান অর্জন করিবার কথা, সেই বয়সটিতে লিঙ্গ আপন গৌরব লইয়া প্রকাশিত হইতে চাহিতেছে। সুতরাং কর্মক্ষমতার নানান রাস্তায় উহারা নিজেদের চালিত করিতেছে। মধুচক্রের আসর বসাইতেছে। বান্ধবীকে সুযোগ বুঝিয়া আড়ালে লইয়া যাইতেছে । বৃদ্ধ হইতে বালক, বালিকা হইতে গৃহিণী সকলেই লিঙ্গের শিকার। শিকারি ঘরে ঘরে বাস করিতেছে। শিকারও। “সাধু” ও “সতী” শব্দদুটি কাটিয়া দিয়া এখন যৌন নিবৃত্ত নারী-পুরুষ লিখিলে ক্ষতি হইবে না। উহারা আইন ও দণ্ডের ভয়ে সাধু ও সতী হইয়াছে। মানুষ কখনও সাধু ও সতী হইতে পারে না। যৌনযন্ত্রের মহিমা এমনই যে তাহা ব্যবহৃত হইবার জন্য সর্বদা উন্মুখ। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রতিটি স্তরেই যৌনতার বিপুল ঐশ্বর্য ছড়াইয়া আছে। ইহার ব্যাপ্তির সর্বাত্মক উপস্থিতি লক্ষ করিয়াই অস্কার ওয়াইল্ড বলিয়াছেন : “ Everything in the world is about sex except sex. Sex is about power.” এই শক্তি লইয়াই মানুষ বাঁচিতে চাহে। আদিম প্রবৃত্তিতে নিজেকে প্রযুক্ত করে। ফাঁসির মতো কঠোর কঠিন শাস্তিও তাহার কাছে পরাজিত হইয়া থাকে।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান