কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
একটি আঞ্চলিক গল্প : হাক্কা- সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
$post->title

বাড়ির উত্তর ধারে এউক্কা গাঙ। গাঙের নামডা অইলো আইড়াল খা। গাঙের মইধ্যে চর পইরা এত্ত বড় গাঙডা ছোড অইয়া গেছেগা। এইপাশে উড়ারচর গেরাম। গেরামের পাশ দিয়া চিকন একটা খালের মতো। আমরা ওইডার নাম দিছি ছোড গাঙ। গাঙডা ছোট অইলেও বাইষ্যাকালে পানি আইয়া বড় গাঙের লগে মিইশ্যা যাইতো। তহন চারিদিকে থৈ থৈ পানি। টলার, নৌকা বেকই চলতো। গাঙডা সচলই আছিল। দুই ধারে বোরো ধানের চাষ অইতো। পাড়ে পাট মেস্তা বুনতো। পানিতে মাছও আছিল। সূর্যমনির টলারগুলা উড়ারচর অইয়া খাসেরহাট যাইতো। কোনো কিছুতেই মন্দ লাগতো না।

তয় ধানের সিজনে একটু ক্ষতি অইতো। টলারের টানে ধানের গোছা উইট্যা যাইতো। গাঙের কিনারে যাগো জমি, হেরা চিল্লাচিল্লি করতো- ‘ওই বেডা, টলার আস্তে চালাইতে পারোস না?’ হেই কথার উপরে টলারও প্যাট প্যাট কইরা খুব আস্তে চলতো। ধান উইট্যা গেলে তো পুরা গাঙ খালিই পইরা থাহে।

কৃষাণের কতা চিন্তা কইরা বছরখানেক অইলো মোল্লাবাড়ির ওইখানে বান দিয়া দিছে চ্যারমান জাকির ঢালি। মানে অইলো গিয়া গেরামের মাইনষের সুবিধা কইরা দিছে। লঞ্চঘাডে যাইতে মোল্লাবাড়ির ওইহানে হাক্কা ছিলো। পেত্তেকবার পানি আহোনের পর ওইহানে একটা কইরা হাক্কা দেওন লাগে। তাতে ম্যালা খরচ। বাঁশ, গুনা, দড়ি, পেরাক কেনো। জনদশেক বদলা আনো। তাও আবার দিন ভইরা কাম করলেও হাক্কার কাম শ্যাষ অইতে চায় না। কয়বছর আর বেডারা মাগনা খাটবো? হেয়ার লেইগ্যাই মোল্লাবাড়ির পাশে চিরতরে বান দিয়া খাল আটকাইয়া দিছে। তয় একটা জিনিস একেবারে হারায়া গেছে। আর কোনোহানে দেখা যাইবো না। হেইডা অইলো, বান দেওয়ার পর হাক্কা বিলুপ্ত অইয়া গেছে।

পুরা উড়ারচরে কোনোহানে এহোন একটা হাক্কাও নাই। যেই গেরামে এক সময় গোডাপাচেক হাক্কা আছিলো, হেই গেরামে এহোন একটাও হাক্কা নাই। কতাডা কী বিশ্বাস করোন যায়? শেষে যেইডা আছিলো হেইডাও গেল। মোল্লাবাড়ির সামনে আরেকটা হাক্কা আছিল- ইদানিং হেইডাও গেছে। হের বদলে লোয়া-কাড দিয়া পোল বানাইছে।

হাক্কা গেছে যাউক, হেয়াতে আমার কী? ভালাই অইছে। তয় গেরামে খাল-বিল থাকলে খারাপ অয় না। আগে চোরেরা মাল চুরি কইরা খাল বা হাক্কার কারণে ধরা খাইয়া যাইতো। এহোন তো সোজা রাস্তা। এক দৌড়ে পগারপাড়। কে আর পায় হেগো? একবার দেওন বাইত্তে কয়েকজন সর্বহারা পাট্টির লোক ধরা পড়লো। দেওন বাড়ির চাইরদিকেই তহন পানি আছিল। কোনোমিন যাইতে পারে নাই। এহোন অইলে এক দৌড়ে জমাদারকান্দি অইয়া স্নানঘাডা দিয়া সূর্যমনি পার অইয়া কইযে যাইবো, কেউ ছুইতেও পারবো না।  

ভাবলে তো কতো কিছুই ভাবোন যায়, ভাইবা কী অইবো? তয় দুঃখের কতা অইলো- হাক্কা গেলো। এই কতার ওপর একটা বাস্তব ঘটনা মনে পইড়া গেল। এই হাক্কার লগে সুখে-দুখের কতো স্মৃতি জড়ায়া রইছে। মনের মানুষডারে হাত ধইরা কতোবার হাক্কা পার কইরা দিছি। হুদাই মিছামিছি ভয় পাইতো। কইতো, ‘হাক্কা পার অইতে ভয় লাগে, আমারে পার কইরা দেওন লাগবো।’ আমিও মনে মনে এমন সুযোগই খোজদাম। পাইলে কেডায় ছাড়ে। আতটা তো ধরতে পারলাম। যাউগ্যা, হেই কতা মনে পড়লে শরম লাগে।

যেইডা কইতে চাইছিলাম, কতাটা অইলো গিয়া- আমাগো দলিল আহনের ছোড মাইয়া তহন ফ্রোক পরে। স্কুলেও যাওয়া শুরু করছে মনে অয়। একবার ওর নানিগো বাইত্তে যাওয়ার সময় হাক্কা পাড় অওয়ার লেইগা হাক্কায় ওডলো। হাক্কার মাঝখানে গিয়া 'হাক্কা গেলো, হাক্কা গেলো' কইয়া চিল্লায়া ওডলো। ওর বাবায় ওরে ধইয়া কইলো, ‘হাক্কা কই যাইবো?’ মাইয়াডা পানির মিন চাইয়া কইলো, ‘আব্বা, ওইযে দেহ, হাক্কা দৌড়াইতাছে।’ ওর বাজানে বুঝলো। খালের পানিতে এতো কাডাল আছিলো যে, পানির দিকে চাইলেই মনে অইতো, হাক্কা মনে অয় দৌড়াইতাছে।

এরকম ঘটনা বহুত আছে। মাঝে মাঝে যখন বাষ্যার পানি হুগায়া যাইতো, তহন খালও হুগায়া যাইতো। হেই হুগনা খালের উপর তহনো হাক্কা থাকতো। কেউ কেউ হাক্কার উপর দিয়া যাইতো, কেউ আবার হাক্কার নিচ দিয়া যাইতো। একবার আমি বাপ্পু ভাই, মিলি- আমরা যাইতাছি হাক্কা দিয়া। পন্ডিতি কইরা নিশি আর অন্তরা যাইতে চাইলো খাল দিয়া। আন্ধারে খালে গভীরতা অরা আন্দাজ করতে পারে নাই। দৌড় দিয়া নামতে গিয়ে দুইডাই দলামোচড়ি অইরা পড়লো খালের মধ্যে। পরে বাপ্পু ভাই লাইট মাইরা অগো উডায়া আনছে। হের লাইগাই তো কই- আগে হাক্কা আছিল, ঘটনাও আছিল। এহোন হাক্কা নাই, ঘটনাও নাই।

  ছোডকালে একবার ইশকুলে যাওনের সময় হাক্কার তোন পইড়া গেলাম। হেয়াতে সমস্যা আছিলো না। সমস্যাডা অইছে, হাক্কার পাশেই আছিল পুগুর। বিশাল পুগুড়। ঠাইল পাওয়া যায় না। আবার আমার আতে বই। তয় বইগুলা ছাড়লাম না। পায়ের তলায় মাটিও পাই না। কহন যে পুগুরে গেছিগা খেয়াল করি নাই। অনেক কষ্টে হেদিন পাড়ে আইছিলাম। অন্য পোলাপান টাইন্যা উডাইছে। কি আর করুম ভেজা কাপড়েই ইশকুলে গেছি।

আরেকবার আমাগো ছোড গাঙের হাক্কা পাড় অইয়া ওপার গেলাম। মাইজ্যা কাকায় তহন কদমতলীর চকে বোরো ধানের ব্লক করে। মেশিনের পাইপ দিয়া কত সুন্দর পানি বাইরায়। হেই পানি পড়া দেইখা বাড়ি যাইতেছিলাম। ভালো কতা, কেউ জানতো না আমি কই গেছিলাম, তয় হাক্কা পাড় অইতে গিয়া টুপ কইরা নিচে পইড়া গেলাম। পড়লাম ভালো কতা। ভাবছি হাতড়ায়া উইট্টা যামু। কই? আউগাইতেই পারতাছি না। গাঙে অনেক কাডাল। ইট্টু আউগাই, কাডালে টাইনা আবার পিছনে লইয়া যায়। তহন ভাইগ্য ভালো যে মাইজ্যা কাকায় খাসেরহাট তোন দোকানের মাল কিন্যা বাড়ি যাইতাছিল। হে মাথার বোঝা মাটিতে রাইক্যা লাফ দিয়া নাইমা আমারে উডাইলো। অনেক পানি খাইছিলাম হেদিন। তারওপর আবার কাকার থাপ্পড়ও খাইলাম। গালডা এক্কারে লাল অইয়া গেছিলো। পিডের এক জায়গায় কাইটাও গেছিল।

আসল কতা অইলো গিয়া, গেরামে থাকতে থাকতে হাক্কার লগে একটা ভীতিকর ও মজাদার সম্পর্ক হইয়া গেল। তহন হাক্কা মানেই পিছলাইয়া পড়নের ভয়। হাক্কা মানেই ‘হাক্কা গেলো, হাক্কা গেলো’ চিল্লাচিল্লি। তবু হাক্কারে ভালোবাসতাম। ভালো না বাইসা উপায় কই? কোনোহানে যাইতে অইলে হাক্কাতো পাড় অইতেই অইবো। তয় হাক্কা পাড় অওনে সেরা আছিলো একলাইছ্যা। একলাছ হাক্কার ধরনি না ধইরাই গড় গড় কইরা পাড় অইয়া যাইতো। দুইডা বাঁশের উপর পাও রাইখা শূন্যে ঝুইল্লা কেমনে পাড় অইয়া যায়? তহন খালি আফসোস করতাম, ‘আমরা দুইজন তো একই বয়সের। ওয় পারে আমি পারি না কেন?’

হেই আফসোস এহনো রইয়া গেছে, কিন্তু কারণডা ভিন্ন। কারণ অইলো গিয়া, দ্যাশ উন্নত অইতাছে। ভালো কতা। দ্যাশ তো উন্নত অইবোই? তাই বইলা গেরাম পাল্টায়া যাইবো? দেহেন দেহি গাঁও- গেরামও দিনদিন কেমন ছিনালের মতো শহরের পিছ পিছ ছোটতাছে। শহরের প্রেমে হাবুডুবু খাইতাছে। ক্রেমে ক্রেমে হারিকেন-বাত্তি গেল, কারেন আইলো। ডাক-হরকরা গেলো, মোবাইল ফোন আইলো। যাত্রাপালা গেলো, টেলিভিশন আইলো। খাল গেল, রাস্তা আইলো। বিল গেল, ভিটা আইলো। পুগুর গেলো, ডিপ টিউবল আইলো। হাক্কা গেলো, ব্রিজ আইলো। এহন আবার মুখের বুলিও পাল্টায়া যাইতাছে। বেবাকটি খালি ইংরাজি-বাংলা মিশাইয়া কি জানি কওয়া শুরু করছে। মায়রে কয় মম, বাপরে কয় ড্যাড। কী আজব কাণ্ড-কারখানা।

কষ্ট লাগে রে মমিন, কষ্ট লাগে। এহন আর বাড়ি গেলে পায়ের তলায় একটাও হাক্কা পড়ে না। বাড়ির পাশের ছোড গাঙডা হুগায়া গেছেগা। নাইতে পারি না। মন ভইরা ডুবাইতে পারি না। মরা খালডা কচুডিতে ভইরা গেছে। খালের মইধ্যে নুরানী মাদ্রাসা উডাইছে গেরামের মানুষ। রাস্তায় ইট গাঁথছে চ্যারমান-মেম্বাররা। হঠাৎ হঠাৎ ভো-ভো কইরা মটরসাইকেলও আহে। হাস-মুরগাগুলা ভয়ে ফ্যাস-ফ্যাস, কক-কক কইরা দৌড় মারে। আগের হেই নিরিবিলি গেরাম আর পাই না। হাক্কা পাড় অইয়া গাঙ পাড়ে যাইতে পারি না।

এহন মনে মনে ভাবি, অ্যাকদিন অয়তো হাক্কা দেখতে জাদুঘরে যাওন লাগবো। বা ছবিতে দেহোন লাগবো। আমার পোলাপাইন হাক্কার গল্প হুইনা আ কইরা তাকায়া থাকবো। আমারে জিগাইবো- ‘ড্যাডি, হট মিনস হাক্কা।’ আমি কী কইমু? কেমনে বুঝামু? খালি কইতে পারমু- ‘হাক্কা মানে হাক্কা। বাঁশে বাঁশে কেচকি দিয়া, আর একটা বাঁশ চিৎ কইরা শোয়ায়া দিয়া, দুই ধারে দুইডা ধরনি দিয়া, খালের দুই পাড়েরে মিলায়া দেওনের নামই হাক্কা।’ আমার বিশ্বাস, আমার এমন কথা অরা অয়তো বুঝবো না। বুঝবো কেমনে? হাক্কা অইলো এমন জিনিস, যা চোখে না দ্যাকলে কহনোই বোঝা যাইবো না।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান