ল্যাটিন সাহিত্যে বিচরণ – আর্জেন্টিনার সেজার আইরা
$post->title

সেজার আইরা সমকালীন ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যে এক পরিচিত নাম। আর্জেন্টিনার এই লেখক ১৯৪৯ সালে করোনেল প্রিংগেল্স নামে এক ছোট্ট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। লেখালেখি করছেন ষাটের দশক থেকে। আইরা মূলত নাম কুড়িয়েছেন তার অসংখ্য উপন্যাসিকা বা নভেলা’র জন্যে। প্রতি বছরই অন্তত দু-তিনটে করে বই প্রকাশ করেন তিনি, অধিকাংশের দৈর্ঘ্য হয় শ’খানেক পাতা বা তার কম। এমনি করে গত চার দশকে প্রায় ৮০-৯০টি বই তিনি ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছেন। তার উদ্ভাবনী শক্তি যেমন উর্বর, পশ্চিমা সাহিত্যিকদের মানদন্ডে তার গোটা সাহিত্যকর্মও তেমনই ব্যাপক।

আইরার সাহিত্য মূলত নিরীক্ষাধর্মী, আরেক আর্জেন্টাইন মহীরুহ বোর্হেস-এর প্রভাব তার লেখায় সুস্পষ্ট। এক সমালোচক তার লেখার বিবরণ দিয়েছেন নিম্নরূপ – “dense, unpredictable confections delivered in a plain, stealthily lyrical style capable of accommodating Aira’s fondness for mixing metaphysics, realism, pulp fiction, and Dadaist incongruities.” বোর্হেস-এর মতই গদ্যে সুরিয়ালিজমের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছেন আইরা, বোর্হেস-এর অবর্তমানে হালের দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম সেরা মেটা-ফিকশন লেখকদের অন্যতম তিনি। গল্পের মাঝখানে নির্দ্বিধায় দর্শন বা তত্ত্বগত আলাপচারিতা জুড়ে দিতে আইরা পিছপা হন না। একারণে তার লেখায় ইচ্ছাকৃত ছন্দপতনের একটা ব্যাপার থাকে প্রায়শ, আর সাধারণ পাঠকের কাছেও এইসব দার্শনিক জল্পনা-কল্পনা দুর্বোধ্য ঠেকার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। অন্তত আইরার প্রথম বই পড়ে আমার তেমনই ধারণা হলো। গদ্যের এই ঘনত্ব, এই জটিলতার কারণে আইরার বই একবার নয়, বরং একাধিকবার পড়েই পরিপূর্ণ পাঠোদ্ধার করা সম্ভব।

মূল বইগুলো লেখা হয়েছে স্প্যানিশ ভাষায়, তবে অনেক কটা বই লেখা স্বত্ত্বেও আইরাকে আবিষ্কার করতে বাকি বিশ্বের কিছু সময় লেগেছে। ইংরেজী ভাষায় যেমন আইরার লেখা এখনো ততটা সহজলভ্য হয়নি। সব মিলিয়ে ডজনখানেক বই অনুবাদ হয়েছে হয়তো। এর মধ্যে অনুবাদক ক্রিস অ্যান্ড্রুজ আইরার বেশ কয়েকটি বইয়ের তর্জমা করেছেন, এবং সম্প্রতি পেংগুইন পাবলিশার্স আইরার লেখা তিনটি উপন্যাসিকা একত্র করে আকর্ষনীয় বক্স সেট হিসেবে ছাপিয়েছে। অন্তর্ভুক্ত গল্প তিনটি হলো Ghosts, An Episode in the Life of a Landscape Painter এবং The Literary Conference। সেই বক্স সেটই গত সপ্তাহে হাতে এলো, এবং সেখান থেকে An Episode বইটা টানা দুইদিনে পড়ে ফেললাম।

উনিশ শতকের এক জার্মান চিত্রশিল্পী ইয়োহান মরিত্স রুগেন্দাস এই গল্পের মূল চরিত্র। বাস্তব চরিত্র হলেও বইয়ে বর্ণিত ঘটনা খুব সম্ভবত কাল্পনিক। রুগেন্দাস মূলত নৈসর্গিক দৃশ্য বা ল্যান্ডস্কেপ ছবি আঁকতেন – ফটোগ্রাফি উদ্ভাবনের আগে বিভিন্ন ভৌগলিক/বৈজ্ঞানিক অভিযানের সাথে একজন দুইজন চিত্রশিল্পী সাথে নেয়াটা মোটামুটি রুটিন ছিল, ডকুমেন্টেশন বা প্রামান্য নথি গ্রহনের কারণে। অভিযানে দেখা বিভিন্ন দৃশ্যপট, ভৌগলিক নিদর্শন, প্রাণীকুল, মানুষ পশুপাখি আর গাছগাছালির ছবি, এইসব আঁকার উদ্দেশ্যে এই শিল্পীরা অভিযাত্রীদের দলে সামিল হতেন। রুগেন্দাস তেমনই এক মিশনে যাত্রা করেন দক্ষিন আমেরিকায় ১৮৩১ সালে। দীর্ঘ ১৭ বছরের ভ্রমনে ব্রাজিল, মেক্সিকো, চিলি, পেরু, আর্জেন্টিনা সবই তিনি মাড়িয়ে দেখেছিলেন। An Episode-এর কাহিনী সাজানো হয়েছে এই সফরে ঘটে যাওয়া এক বিশেষ ঘটনাকে ঘিরে, যা কিনা রুগেন্দাসের জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

১৮৩৪ সালের ডিসেম্বর মাসে চিলির সান্তিয়াগো শহর ছেড়ে যাত্রা করেন রুগেন্দাস। গন্তব্য আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেস, ১০০০ মাইল পূবে, মহাদেশের অন্য প্রান্তে। মাঝখানে পাড়ি দিতে হবে সুউচ্চ আন্দেস পর্বতমালা। রুগেন্দাসের সাথে আছেন তার অনুজপ্রতিম আরেক জার্মান শিল্পী রবার্ট ক্রাউস। ঘোড়া, খচ্চর আর গাইড সহযোগে আন্দেস আরোহণ, ল্যাটিন আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বতমালার ক্রমপরিবর্তনশীল দৃশ্যপটের মনোমুগ্ধকর বিবরণ দিয়ে বইয়ের প্রথমাংশ সাজানো।

ঝামেলা বাঁধে সমতলে নেমে। চিলির সীমানা পেরিয়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছে আইরা এবং ক্রাউস যাত্রাবিরতি করেন মেন্দোজা শহরে। সেখান থেকে বুয়েনোস আইরেস যেতে হলে অভিযাত্রীদের অতিক্রম করতে হবে সীমাহীন পাম্পাস – কয়েক লক্ষ বর্গমাইল জুড়ে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত সমতল তৃণভূমি, সে দেশের প্রসিদ্ধ বীফ বা গরুর মাংস উৎপাদনের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি। অসাধারণ বর্ণনায় এই পাম্পাসের প্রকৃত চরিত্র তুলে ধরেছেন আইরা। “Were the “pampas,” perhaps, flatter than the land they were crossing? He doubted it; what could be flatter than a horizontal plane?” সমান্তরালের থেকেও অধিক চ্যাপ্টা, অধিক মসৃণ আর কি হতে পারে?

পাম্পাস পারাপারের মাঝপথে এসে ঘটে অঘটন। রুগেন্দাস এবং ক্রাউসের গাইড পথ হারিয়ে ফেললে হঠাৎ দিশেহারা হয়ে পরেন রুগেন্দাস। আদিগন্ত অসীম এই সমতল থেকে নিষ্ক্রান্তি খোঁজেন, বেরুবার একটা পথের জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেন তিনি। সহযাত্রীদের অনুনয়-বিনয় উপেক্ষা করে একাই রওনা হয়ে যান ঘোড়ায় চেপে। কিন্তু তার এই দু:সাহসের পরিনাম শুভ হয় না। আচমকা বৈদ্যুতিক ঝড়ের কবলে পড়ে যান, বারংবার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় ঘোড়া এবং সওয়ার দুই-ই, চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানি, মুষল বৃষ্টি, প্রকান্ড শব্দে বিজলীর বিস্ফোরণ, তড়িতাঘাতে মুহ্যমান ভয়ে-শকে উন্মাদগ্রস্ত ঘোড়া তাকে অগ্রাহ্য করেই দেয় দুদ্দাড় দৌড়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রুগেন্দাস ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান — কিন্তু তাতেও তার মুক্তি মেলে না, এক পা তার আটকে যায় রেকাবে, ঝড়ের মধ্যেই এবড়ো খেবড়ো মাটি-ঘাস-পাথরের উপর দিয়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় পাগলা ঘোড়া, মাইলের পর মাইল পর মাইল।

পরদিন তার সঙ্গীরা তাকে খুঁজে পায় – অজ্ঞান, মৃতপ্রায়, এক পা তখনও ঘোড়ার সাথে বাঁধা। অলৌকিকভাবেই বেঁচে আছেন কোনরকমে। চেহারা তার টুকরো-টুকরো, চৌচির হয়ে গেছে। শিগগির তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কাছের লোকালয়ে। প্রাণান্ত চিকিৎসায় তার প্রাণরক্ষা পায়, ক্রাউসের নিরবচ্ছিন্ন তত্ত্বাবধানে তার সেবা-শুশ্রুষা দিনরাত চলতে থাকে। ধীরে ধীরে তার দেহ সুস্থ হয়ে উঠে — কিন্তু তার মুখমন্ডল, তার মস্তিষ্কের যে ক্ষতি, তা স্থায়ী প্রমাণিত হয়। ক্ষত-বিক্ষত চেহারা তাকে রূপ দেয় দানবের। পথের মানুষ তাকে দেখে শিউরে ওঠে, বাচ্চারা দিন-দুপুরে জ্যান্ত ভূত দেখছে ভেবে তার পিছু পিছু যায়। মস্তিষ্কের ছিন্ন স্নায়ুগুলো সঠিকভাবে জোরা লাগে না, ক্ষণে ক্ষণে প্রচন্ড মাথা-ব্যথার সৃষ্টি হয়, এত ভয়ংকর যে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, কাতরাতে কাতরাতে শয্যাশায়ী হন।

প্রথম অংশ এতটুকুই, এবং আগাগোড়া অসাধারণ।

কিন্তু চমৎকার একটা সেটাপ করলেও উপন্যাসের দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে আইরা শিল্পী-স্বত্ত্বা, শিল্প-সৃষ্টির রহস্য, ইত্যাদি বিষয়ে দর্শনধর্মী গদ্যের আশ্রয় নিয়েছেন ঘনঘন। তাতে গল্পের খেই কিছুটা হলেও হারিয়ে যায়। শিল্পীর দেখার চোখ, তার চূড়ান্ত একাকীত্ব, এইসব নিয়ে লম্বা আলোচনায় প্রচুর তাত্ত্বিক স্বগোতক্তি তিনি জুড়ে দেন। শ্বেতাঙ্গ ফার্মে আদিবাসীদের আক্রমন বইয়ের শেষাংশের ঘটনা, আমাদের রুগেন্দাস তখন এদিক থেকে সেদিক দৌড়ে রেইড আর পাল্টা রেইডের ছবি আঁকতে তৎপর। এরই মাঝে আইরা বারবার গল্পের ফ্লো থামিয়ে দেন। সীমিত মাত্রায় এহেন আলাপ কেন্দ্রীয় চরিত্রকে উদ্ভাসিত করতে পারে, কিন্তু শেষে এসে আমার মনে হয়েছে যে গল্পের অবয়ব বেশ খানিকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণ আমার ভুল হতে পারে, কারণ অনেক পাঠক আছেন যারা এই সুরিয়ালিস্ট আলাপগুলোই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছেন।

একটা উদাহরণে ব্যাপারটা পরিষ্কার হতে পারে – “But everything was documentation! That was where it all began and where it ended too. Where it began especially (because the end was far off down the misty ways of science and art history). Nature itself, pre-formed by the procedure, was already documentation. There were no pure, isolated data. An order was implicit in the phenomenal revelation of the world; the order of discourse shaped things themselves. And since his current mental state was part of that order, he would have to examine it and find rational explanations for what seemed to be visionary or maniacal chaos.”

বাহিরে-অন্তরে চরম একাকীত্বই যে দানবরূপী শিল্পী রুগেন্দাসের নির্মম পরিনতি, দুর্ঘটনার পরে এই সত্যটুকু আইরা তুলে আনেন সুনিপুনভাবে। কিন্তু বোর্হেসীয় ফিলোসোফিকাল গদ্য পরিমিত পরিমানের বেশি হলে সহজে হজম হতে চায় না, সেই বিধায় আইরার এই উপন্যাসিকাকে পূর্ণাঙ্গ সফল বলতে আমার কিছু সংকোচ আছে। তার কাহিনী বিন্যাস আর গল্প বলার যে শক্তি তিনি দেখান বইয়ের প্রথম ভাগে, সেটার প্রতি সম্পূর্ণ সুবিচার তিনি দ্বিতীয়ার্ধে করতে পারেননি, যেটা অল্প কথায় দর্শন আউড়িয়েও করা বোধ হয় সম্ভব ছিল।

তবুও ল্যাটিন আমেরিকার একজন গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্দীপনা-সৃষ্টি করা লেখক হিসেবে আইরার আরো বই পড়ার আগ্রহে থাকলাম।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান