গল্প : সুখী রাজপুত্র আর একটা পরী
$post->title

লেখক : তৃষ্ণা বসাক

 

তাদের দেখা হল। বইয়ের পাতায় প্রথমে। সেখানে তো আরও অনেক চরিত্র। সুখী রাজপুত্রের অসহ্য লাগল সেটা। সে পরীর হাত ধরে টানল – ‘চলো বাইরে বেরোই। এই দুপুরে কেউ আটকে থাকে নাকি?

পরী বলল ‘অত জোরে টেনো না। আমার ডানা ছিঁড়ে যাবে’

‘ যাক, ছিঁড়ে যাক। আমি তোমাকে নতুন ডানা বানিয়ে দেব’

নতুন ডানা! শিহরিত হল শুনে পরী। তারা বেরিয়ে পড়ল অমনি। পরী উড়ে যেতে পারত রাস্তাটা, কিন্তু রাজপুত্রের কথা ভেবে সে হাঁতবে ঠিক করল। যে কখনো হাঁটেনি, যাকে হাঁটতেই হয় না, উড়ে উড়ে চলাই যাদের স্বভাব, তারা যখন হাঁটে, কেমন হয় সেই হাঁটাটা? খুব অদ্ভুত, অনেকটা দারুণ জোরে ঘোরা কোন লাট্টুকে যদি বলা হয় ধীরে সুস্থে পা ফেলে পাড়ার দোকান থেকে একটু তেজপাতা কিনে আনতে – অনেকটা সেইরকম। পরী কেমন বেখাপ্পাভাবে , যেন ঠোক্কর খেতে খেতে হাঁটছিল। সুখী রাজপুত্রর মজা লাগল দেখে, একটু কষ্টও হলভাবল ওকে কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু চারদিকে এত ভিড়, লোকজন, দোকানপাট যে ইচ্ছেটাকে সুগন্ধি চাপাতার মতো মনের কৌটোর মধ্যে রেখে দিল সে।

 

তার হাঁটাটাও কম অদ্ভুত ছিল না। কারণ, এর আগে সে কোনদিন এইরকম রাস্তায় হাঁটেনি। হেঁটেছে, সে তাদের প্রাসাদের বাগানে।  ক্লান্ত হলে সেখানে বৃক্ষতলে বাঁধানো বেদী আছে, সামনেই সরোবর, পাখা, পানীয় নিয়ে প্রস্তুত থাকে পরিচারকরা।

 

আর এই রাস্তাটা। কি ভিড়। এত গাড়ি, এত মানুষ, ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি। এখানে হাঁটা যায় নাকি? এটা যদি তার প্রাসাদ হত, এতক্ষণে সে যে কতজনের গর্দান নিয়ে নিত তার ইয়ত্তা নেই। কি আশ্চর্জ এখন তার একটুও রাগ হচ্ছে নাবরঞ্চ,  খুব ভালো লাগছে। তার পাশে যে পরীটা হেঁটে চলেছে, তার ডানা দুটো কেমন তিরতির করে কাঁপছে, সেই কাঁপনটা তার ভারি ভালো লাগছে। সে ভেবে দেখল, প্রজাপতির চেয়ে এই পরীর ডানার সঙ্গে ফড়িঙের বেশি মিল। ফড়িঙের ডানা কেমন স্বচ্ছ, সবুজ-সবুজ, নির্ভার, মনে হয় আগে থেকে তৈরি হওয়া ভাবনার ভার বহন করতে হয় না ওকে। কাঁপনটা একটু একটু করে চারদিকে ঢেউ তুলে ছড়িয়ে যায়।

এই প্রথম রাজপুত্রের মনে হল, তাদের প্রাসাদটা যাচ্ছেতাই, রাজ্যটাও বিচ্ছিরি। সেখানে এমন একটাও পরী নেই। ডানাওলা, ডানাছাড়া কোন পরীই নেই সেখানে। প্রাসাদে, বাগানে, বিচারভবনের পাশে, হাতিশালে, ঘোড়াশালে, গাড়িশালে, মোবাইলশপে, রুক্মিনীদেবীর মন্দিরে, সুপারডুপার হাটে কোথথাও নেই। তার বদলে গিজগিজ  গিজগিজ করছে ডাকবালিকা। এলাডিং বেলাডিং রিং করলেই সই লো সেন্টার থেকে ডাক বালিকা এসে হাজির। সে রাজামশাই একটি বালিকা চান বা রাজপুত্তুর চান, ডাকলেই ডাকবালিকারা আসে। তাদের সব কিছু আছে, কিন্তু ডানা নেই।

ডানা শব্দটা শুনলেই রাজপুত্রের উদ্দীপন হয়। তার মনে হয় ডানাওলা মেয়ে, মিলনের চরম মুহূর্তে হঠাত উড়তে শুরু করবে। আর সেই সময়, সংলগ্ন সে, তাকেও তো উড়তে হবে, নয়তো সে পড়ে থাকবে বিছানায়, দেখবে পরী, গায়ে একটা সুতো পর্জন্ত নেই, উড়তে উড়তে জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল। দুটোই সমান থ্রিলিং। একে থাকছে উড়তে উড়তে মিলিত হবার একটা তূরীয় আনন্দ। দুয়ে চরম কিছু হারিয়ে ফেলার রক্তোচ্ছবাস। দুটোই সমান ঝুঁকির। আর সে তো রাজপুত্র, ঝুঁকি না নিয়ে সে বাঁচতে পারে না।

পরী যেতে যেতে ফিরে তাকাল তার দিকে । বলল ‘তুমি এখানে একটু দাঁড়াবে প্লিজ? আমি যাব আর আসব’ রাজপুত্র বিরক্ত হল ‘ঠিক কতক্ষণ? পরীর যাওয়া আসার মধ্যে তো অনেক ফাঁক’

‘এখন আমি পরী নই, তুমিও তেমনি রাজপুত্র নও। আমি যেমন এক্ষুনি চলে আসব, তেমনি দেরি হলে তোমাকেও হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, রাগ করতে পারবে না।‘

বলার সঙ্গে সঙ্গেই পরী হাওয়া। যেন সে ছিলই না এতক্ষণ। রাজপুত্র একটুখানি সেই হাওয়াটার গায়ে হাত বুলোল। তারপর মুড়িমাখা খেল, পেয়ারা খেল। তারপর বলল ‘দুত্তোর। ও আবার পরী হয়ে গেছে। আমিও তাহলে।’

সেও চলে গেল কোথায় যেন। খানিক বাদে পরী ফিরে এল হাঁপাতে হাঁপাতে। তার দু হাতে দু ব্যাগ বই, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সে ভাবতে ভাবতে আসছিল, সে এলেই রাজপুত্র তার সুগন্ধি রুমাল দিয়ে তার ঘাম মুছিয়ে দেবে। আর হাত থেকে ব্যাগ টেনে নেবে। কিন্তু কোথায় কী?

রাজপুত্রকে যেখানে দাঁড় করিয়ে গেছিল, ফুটপাথের  একটা ছড়া ছবির বইয়ের দোকানের সামনে সেখানে সে নেই। পরী অস্থিরভাবে ডানদিকে বাঁদিকে দেখল। বইয়ের দোকানীটি তার হাতে বইয়ের ব্যাগ দেখে উৎসাহিত হয়ে বলল

‘দেখুন না দিদি, আঁকার বইও আছে। বাড়ির বাচ্চাদের জন্যে নিয়ে যান’

‘বর্ণ পরিচয় আছে?’

বলার সময় নিশিচত ছিল, থাকবে না। কিন্তু লোকটা তাকে অবাক করে দিল। সেই অবিকল এক রকম বই, গোলাপি ফিনফিনে কাগজের মলাট।

দাম মেটাতে মেটাতে পরী বলল ‘ এটা রাজপুত্রকে দেব’

দোকানী অবাক হয়ে বলল ‘রাজপুত্র?’

‘হ্যাঁ। দেখেননি? এই তো আপনার দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল।’

‘কেমন দেখতে বলুন তো?’ ‘

‘কেমন দেখতে আবার? রাজপুত্রেরা যেমন দেখতে হয়’

লোকটাকে চিন্তান্বিত দেখাল। রাজপুত্রেরা কি বর্নপরিচয় পড়ে? তাছাড়া বয়স কত?

‘সে তো পরীরাও বর্ণপরিচয় পড়ে না। বয়স ? তা কে জিগেস করেছে? জন্মেছে এটুকু বলতে পারি।’

পরী, রাজপুত্র – এসব আলুকঝালুক কথা শুনে লোকটা ধাঁ করে চটের তলা থেকে দুতিনটে চটি চটি বই বার করে ফেলল।

‘দেখুন দিদি। দেখাশোনা আপনার নিজস্ব ব্যাপার। তার সঙ্গে কেনাকাটার কোন সম্বন্ধ নেই।’

‘এসব কী বই?’ লাল হলুদ  দগদগে মলাট দেখে ভুরু কুঁচকে গেল পরীর। লোকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে বলল ‘মারণ উচাটন বশীকরণ। এখন দেশে এইসব বইয়ের খুব কাটতি। সুটেড বুটেড লোকেরা এসে নিয়ে যাচ্ছে বইগুলো। ’

‘তাই?’ পরী আলগোছে নেড়েচেড়ে দেখছিল বইগুলো

‘আপনি এইসব বই রাখেন?’

‘আরো ইয়ে, মানে অন্য রকম বই আছে। সন্ধের দিকে বার করি’

 

 

 

‘সন্ধে!’

অন্যমনস্ক হয়ে গেল পরী। সন্ধের আগেই তাকে পরীস্থানে ফিরে যেতে হবে। তাদের গুনে গেঁথে ঘরে তোলা হবে। নামেই ঘর, আসলে  আকাশের একটা টুকরো। চারদিকে অদৃশ্য লাইন টেনে আলাদা করা। ফেয়ারি জোন। সেখানে গেলে আবার কবে সে আসতে পারবে ঠিক নেই।   পরীদের মন খারাপ করতে নেই, কিন্তু সে টের পাচ্ছিল তার শরীরে মন খারাপ নামছে। দুপুরের ওপর যেমন বিকেল নামে। সে লোকটাকে বলল

‘এই বই দিয়ে রাজপুত্রকে বশ করা যাবে? ’

লোকটা এর উত্তর দেবার আগেই পিঠে কার হাতের স্পর্শ পেল পরী। সে পেছন ফিরে দেখল রাজপুত্র। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শসা খাচ্ছে।

‘কোথায় গেছিলে তুমি?’ আচমকা সেই ব্যস্ত ফুটপাথে রাজপুত্রের বুকে আছড়ে পড়ল পরী। তার লুকিয়ে রাখা ডানাদুটো উশখুশ করে উঠল। যেন এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিল তারা। ফুটপাথে মানুষ, রাস্তায় চলন্ত গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল।

রাজপুত্র, বুঝতে পারছিল এখনি সেটা ঘটবে, সেই উড়ান আর উত্থান। কিন্তু কীভাবে? চারদিকে থইথই করছে লোক, পেয়ারা, শসা, গরম ডিম, ঠাণ্ডা লেবুর জল।

ছড়া ছবি ও আরও অনেক কিছু বিক্রি করা লোকটা হঠাত খুব সহৃদয় হয়ে উঠল, বলল ‘আসুন স্যার, এর মধ্যে ঢুকে পড়ুন’

মারণ উচাটন বশীকরণের বইটাকে সে সিগন্যালের সবুজ পতাকার মতো নাড়ছিল। রাজপুত্র আর একটু হলেই ঢুকে পড়ছিল সেখানে। পরী তার হাত ধরে টানল। বলল ‘না, ওখানে নয়। এসো, প্রথম থেকে শুরু করি’

তার হাতে বর্ণপরিচয়। রাজপুত্র আর কথা না বাড়িয়ে  পরীর হাত ধরে ছুটতে ছুটতে বর্ণপরিচয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল। আর তার পর  থেকেই তাদের ঐক্য, বাক্য, মাণিক্য এবং যাবতীয় অখ্যাতির শুরু।

 



সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান