ফ্রঁসিস্ পোঁজ্ : ইতালো ক্যালভিনো - অনুবাদ প্রবন্ধ
$post->title

ছবি : নেট থেকে

[অনুবাদকের ভূমিকা: ‘সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো‘র অন্যতম স্বাক্ষরকারী ফরাসি কবি ফ্রঁসিস্‌ পোঁজ্‌ (Francis Ponge; ১৮৯৯–১৯৮৮)-কে কি শুধু ‘কবি‘ বললে তাঁর সঠিক পরিচয় দেওয়া হয়? প্রথমত, তিনি গদ্যে লেখেন, এক অদ্ভুত গদ্য, উপমা আর নানাবিধ অলংকারে উপচে পড়া ছোট ছোট অনুচ্ছেদ, যেখানে আলংকারিক উচ্ছ্বাসের সঙ্গে “আসুন, বিবেচনা করা যাক….” দিয়ে শুরু হওয়া সনির্বন্ধ অনুরোধের সহাবস্থান হামেশাই পরিলক্ষিত হয়। কবিতার এ জাতীয় রূপ কে কোথায় দেখেছে? আর কাব্যের বিষয়? একেবারে সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ যে সব বস্তু ও সামগ্রী, তাই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশি। যেমন, কমলালেবুকে যখন ভাবপ্রকাশের পরীক্ষায় উত্তরণের জন্য চটকানো হয়, তখন তা আমাদের মুখে রেখে যায় “অকালে লেবুর বিচির অপসারণজনিত চেতনার তিক্ততা“। আবার ঝিনুক পৃথিবী আর স্বর্গ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে যে “আকাশ” দিয়ে, তা হল সেই খোলক যাতে আমরা হাত কাটি। যদি হেগেল এবং তার অনুগামীদের মতে শিল্পের লক্ষ্য হয় বিশুদ্ধ ধারণার জগতে পৃথিবীর বিমূর্ত রূপের প্রতিফলন, তাহলে সেই পৃথিবী আর ধ্যানধারণার জগতকে তার বহুবিচিত্র, অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বস্তুময় ভিত্তিভূমিতে ফিরিয়ে দেন ফ্রঁসিস্ পোঁজ্‌। তাঁর কাছে বস্তুই হল আসল বাস্তব। এমনকী তাঁর নিজের নাম, সেই নামের প্রতিটি অক্ষর, বস্তুময় জগতের ‘কালিমালিপ্ত‘ হয় যখন তিনি কবিতায় একটি স্পঞ্জের বর্ণনা দেওয়ার সময় অত্যন্ত সচেতনভাবে লক্ষ করেন যে স্পঞ্জের (ফরাসি ভাষায় এপোঁজ্ বা éponge) নামের সঙ্গে তাঁর নিজের নামের আক্ষরিক মিল!

অনূদিত প্রবন্ধটি ইতালীয় সাংবাদিক ও প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও গল্পকার ইতালো ক্যালভিনো‘র (১৯২৩–১৯৮৫) ১৯৭৯ সালের রচনা। এটি ইতালিয়ান ভাষায় লেখা মূল প্রবন্ধের মার্টিন ম্যাকলাফলিন–কৃত ইংরেজি অনুবাদের বঙ্গানুবাদ।

ইংরেজি অনুবাদের সূত্র:

Italo Calvino, ‘Why Read the Classics’, translated from the Italian by Martin Mclaughlin; Vintage Books: New York: December 2000]

“মহারাজেরা দরজা স্পর্শ করেন না। ধীরে ধীরে অথবা দড়াম করে ঠেলে আপনার পরিচিত বড় আয়তক্ষেত্রাকার প্যানেলটি সামনের দিকে খুলে প্রবেশ করা আর পিছনে ফিরে আবার সেটিকে বন্ধ করে স্বস্থানে ফিরিয়ে দেওয়া — দরজাটিকে আলিঙ্গন করার যে আনন্দ — তা তাঁরা জানেন না।”

“…..ঘরে প্রবেশের পথে যে লম্বা বাধাগুলো থাকে তার একটির পেটের সঙ্গে লাগানো পোর্সেলিনের গোল হাতলটি আঁকড়ে ধরার যে সুখ; নতুন পারিপার্শ্বিকের মধ্যে আঁখির উন্মীলন আর তার সঙ্গে আপনার আস্ত শরীরটাকে মানিয়ে নিতে যে এক মুহূর্ত লাগে, যে মুহূর্তে দ্রুত ডুয়েল লড়ার ভঙ্গিতে আপনি আপনার সম্মুখে প্রসারিত পা ফেলতে ফেলতে থমকে যান, সেই মুহূর্তের যে আনন্দ…”

“এরপরেও বন্ধুত্বপূর্ণ করমর্দনের ভঙ্গিতে আপনি হাতলটি ধরে থাকেন, আর তারপরেই নিশ্চিতভাবে দরজা পিছনে ঠেলে বন্ধ করে আপনি নিজেকে আরেকটি কক্ষের বাহুপাশে আবদ্ধ করে ফেলেন। হাতলের শক্তিশালী, তৈলাক্ত, মসৃণ স্প্রিং এর ‘ক্লিক্’ আওয়াজটি আপনার পরিবেষ্টিত হওয়ার অনুভূতিকে আরও প্রগাঢ় করে তোলে।”

এই সংক্ষিপ্ত রচনাটির শিরোনাম দরজার সুখ এবং এটি ফ্রঁসিস্ পোঁ‍জ্ এর কবিতার একটি সুন্দর উদাহরণ: কীভাবে ইন্দ্রিয়চেতনার সব অভ্যাসগুলিকে পরিত্যাগ করে তুচ্ছাতিতুচ্ছ সামগ্রী এবং দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপকে নতুন আলোকে বিবেচনা করা যায় এবং বহুব্যবহারে জীর্ণ হয়নি এমন ভাষায়, কোনো বাচনিক কৌশল ছাড়াই বিষয়-বর্ণনা করা যায়। আর এই সব কিছুই করা হচ্ছে বাস্তব-বিচ্ছিন্ন কোনো কারণে নয় (যেমন ধরুন প্রতীকীবাদ, আদর্শ অথবা নন্দনতত্ত্ব), বরং শুধু বস্তুর সঙ্গে বস্তুর, একটি নির্দিষ্ট বস্তুর সঙ্গে অন্য একটি বস্তুর এবং আমাদের সঙ্গে বাকি সব কিছুর পার্থক্যের কথা মনে রেখে তাদের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টায়। এইভাবে হঠাৎই আমরা আবিষ্কার করি যে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো ভুলো-মন অভ্যাসের বশে অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে আর তার তুলনায় অনেক বেশি তীব্র, আগ্রহব্যঞ্জক এবং অকৃত্রিম অভিজ্ঞতার শরিক আমরা হতে পারি। আমার মনে হয় এই কারণেই ফ্রঁসিস্‌ পোঁজ্‌ সমকালের একজন প্রাজ্ঞ, বহুদর্শী ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন, তিনি সেই গুটিকয়েক ‘মৌলিক’ লেখকদের মধ্যে একজন যাঁদের শরণ আমাদের নিতেই হবে যদি না আমরা একই বৃত্তের চারিদিকে পাক খেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাই।

কীভাবে? যেমন ধরুন ফলবিক্রেতারা যে কাঠের ট্রে-গুলো ব্যবহার করে তার কোনো একটার ওপর আমাদের নজর নিবদ্ধ রেখে। “বড়সড় বাজারগুলোতে যাওয়ার পথে পড়ে এমন প্রতিটি রাস্তার মোড়ে শুধু কাঠের তৈরি ট্রে-গুলো জ্বলজ্বল করে তাদের বিনয়নম্র ঔজ্জ্বল্যে। ঝকমকে নতুন ট্রে যেন নিজেকে এমন বেমানান পারিপার্শ্বিকে আবিষ্কার করে সামান্য অপ্রস্তুত। আবর্জনার সঙ্গে ঝাঁটিয়ে ফেলে দেওয়ার পরে এই ট্রে-গুলো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু বাস্তবিকই আশপাশের নানা সামগ্রীর মধ্যে এগুলোই সবচেয়ে মনোহারি — যদিও এদের ভাগ্যে কী আছে তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ দুশ্চিন্তা করা নিরর্থক।” শেষোক্ত শর্তটি অবশ্যই পোঁজ্‌ এর অনন্য ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য; সবচেয়ে তুচ্ছ ও হালকা সামগ্রীগুলোর প্রতি যদি একবার আমাদের মনে সহানুভূতির উদ্রেক হয় এবং তারপরে আমরা সহানুভূতি প্রকাশের ওপর জোর দিতে থাকি, তাহলে তা হতাশাব্যঞ্জক হবে। এটা করলে সব প্রচেষ্টা বিফলে যাবে, আমরা এইমাত্র যে এক কণা সত্যের ফসল তুলেছি তা তৎক্ষণাৎ হারিয়ে যাবে।

ফ্রঁসিস্‌ পোঁজ্‌ একই কাজ করেন একটি মোমবাতি, একটি সিগারেট, একটি কমলালেবু, একটি ঝিনুক, একখণ্ড সিদ্ধ মাংস এবং রুটি নিয়ে: ‘জিনিসের’ এই তালিকাটি, যা উদ্ভিদ, প্রাণী এবং খনিজ দ্রব্যের পৃথিবী পর্যন্ত সম্প্রসারিত, একটি সরু বইয়ের (ল্য পার্তি প্রি দে শোজ্[1]  বা দি ভয়েস অব থিংস্) অন্তর্ভুক্ত যা প্রথমে ফ্রান্সে ফ্রঁসিস্‌ পোঁজ্‌-কে বিখ্যাত করেছিল। ইতালীয় প্রকাশক Einaudi এখন মূল ফরাসির বিপরীত পৃষ্ঠায় ইতালীয় অনুবাদ এবং জাকলিন রিসেট্‌ রচিত দক্ষ এবং নিখুঁত ভূমিকাসহ গ্রন্থটি  (Il partito preso della cose) প্রকাশ করেছে। (কোনো কবির কবিতার অনুবাদ প্রকাশের সময় যদি মূল কবিতা এবং তার অনুবাদ মুখোমুখি রাখা হয়, তাহলে তা পাঠককে মনে মনে নিজস্ব অনুবাদ সৃষ্টির প্রেরণা দিতে পারে।) এটি একটি ছোট পুস্তিকা যা সহজেই আপনি পকেটে পুরে নিতে পারেন অথবা যাকে আপনার শয্যাপার্শ্বস্থ টেবিল ঘড়িটির ঠিক পাশেই রাখা যায় (যেহেতু বইটি পোঁজ্ এর রচনা, তাই বইয়ের শারীরিক উপস্থিতি এমনই আচরণ দাবি করে)। এর ফলে এই নিঃশব্দচারী, নির্জনতাপ্রিয় কবি ইতালিতে নতুন গুণমুগ্ধ পেতে পারেন। বইটি ব্যবহারের নির্দেশিকা হবে এই রকম: প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ম করে কয়েক পৃষ্ঠা পাঠ করলে তা পোঁজ্‌ এর কাব্যরচনা পদ্ধতির অনুসারী হবে যেখানে তিনি শব্দগুলিকে রন্ধ্রময়, বহুবর্ণরঞ্জিত পৃথিবীর ওপর দিয়ে শুঁড়ের মত ছড়িয়ে দেন।

ফ্রান্সে (যেখানে অনেক বছর ধরে তাঁর অনুগামীদের মধ্যে তাঁর বিপরীত না হোক বহু অর্থে তাঁর থেকে ভিন্ন চরিত্রেরা স্থান পেয়েছেন, সার্ত্র থেকে তেল কেল (Tel Quel) গোষ্ঠীর যুবসদস্যরাও যার অন্তর্ভুক্ত) এবং ইতালিতে (যেখানে তাঁর অনুবাদকদের মধ্যে আছেন উংগারেত্তি এবং পিয়েরো বিগনগিয়ারি; শেষোক্তজন ছিলেন বহু বছর ধরে তাঁর সর্বাধিক কুশলী ও আগ্রহী প্রবক্তা, যিনি মন্দোদারি স্পেচ্চিও সিরিজ্‌-এ Vita Del Testo শিরোনামে ১৯৭১ সালেই তাঁর নির্বাচিত কবিতার একটি বড়সড় সংস্করণ সম্পাদনা করেছিলেন) তিনি যে নিঃশর্ত এবং একনিষ্ঠ অনুরাগপূর্ণ সমর্থন এখনও পেয়ে আসছেন, তা বোঝানোর জন্যই আমি গুণমুগ্ধ শব্দটি ব্যবহার করেছি।

এসব সত্ত্বেও আমি নিশ্চিত যে ফ্রান্স এবং ইতালিতে (কবি সবে আশি বছরে পদার্পণ করেছেন, তাঁর জন্ম মঁপেলিয়র-এ ২৭ মার্চ, ১৮৯৯) যখন ফ্রঁসিস্‌ পোঁজ্‌ খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান করবেন, আর যেহেতু আমার এই আবেদনটি পোঁজ্ এর সেই সব সম্ভাব্য পাঠকদের উদ্দেশে যাঁরা এখনও পর্যন্ত তাঁর সম্বন্ধে কিছুই জানেন না, তাই অবিলম্বে সেই কথাটি বলা উচিত যা সূচনায় বলা উচিত ছিল: এই কবি সবটাই গদ্যে লেখেন। কবি-জীবনের প্রথম দিকে অর্ধেক পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে ছ’সাত পাতার ছোট ছোট রচনা; অবশ্য সম্প্রতি ক্রমশ সত্যের কাছাকাছি পৌঁছোনোর প্রক্রিয়ার, যেহেতু কবির কাছে রচনার অর্থই হল তাই, প্রতিফলন ঘটানোর জন্য তাঁর রচনা দৈর্ঘ্যে আরও বিস্তার লাভ করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে এক টুকরো সাবান অথবা একটি শুকনো ডুমুর ফলের বর্ণনা সম্প্রসারিত হয়ে নিজ অধিকারে পুস্তকের আকার ধারণ করেছে। আর একটি তৃণভূমির বর্ণনা হয়ে উঠেছে লা ফাবরিক দ্যু প্রে অর্থাৎ তৃণভূমির সৃষ্টি।

জাকলিন রিসেট সঠিকভাবেই পোঁজ্‌ এর কাব্যকৃতির সঙ্গে ‘বস্তু’-কে বর্ণনা করে সাম্প্রতিক ফরাসি সাহিত্যের অনুরূপ দুটি ধারার তুলনা করেছেন: সার্ত্র (‘লা নোসে’র কয়েকটি অনুচ্ছেদে) যেখানে গাছে একটি শিকড় অথবা আয়নায় একটি মুখ এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন  যেন সেগুলো মানবজাতির সঙ্গে সম্পর্করহিত অথবা তাৎপর্যরহিত এবং যেন তারা বিক্ষুব্ধ অথবা উন্মত্ত কল্পচিত্রগুলিকে আহ্বান জানায়; আর আল্যাঁ রব-গ্রিয়ে যিনি এক ধরনের ‘নররূপারোপ পরিপন্থী” রচনার ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পৃথিবীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, শীতল, নৈর্ব্যক্তিক পরিভাষায় বর্ণনা করেছেন।

পোঁজ্‌ (যিনি সময়ের দিক থেকে এঁদের দুজনের পূর্ববর্তী) এই অর্থে ‘নররূপী’ যে তিনি বস্তুর সঙ্গে এমনভাবে একাত্ম হতে চান যেন মনে হয় বস্তু হয়ে জন্মালে কেমন লাগে সেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য মানুষ তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। এর ফলে ভাষার সঙ্গে এক ধরনের লড়াই চালাতে হয়, ভাষাকে অনবরত টেনে ধরতে হয়, তারপরে আবার কাগজের পৃষ্ঠার মত ভাঁজ করতে হয় কারণ ভাষা কোথাও কোথাও স্বল্পদৈর্ঘ্য, কোথাও দীর্ঘ, তা কখনও কখনও খুব কম বলে আবার কখনও অত্যধিক বেশি বলে। এই রচনা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির লেখাকে স্মরণ করায়: তিনি কঠোর অধ্যবসায়ের সঙ্গে লেখা এবং পুনরায় লেখা তাঁর সংক্ষিপ্ত রচনার মাধ্যমে আগুনের লেলিহান শিখার বিস্তার আর উকোর ঘসামাজাকে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন।

পারস্পরিক সুসামঞ্জস্য এবং বিচক্ষণতা সম্পর্কে পোঁজ্‌ এর ধারণা — যা একই সঙ্গে তাঁর বাস্তবধর্মিতার লক্ষণ — এই ঘটনার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় যে সমুদ্র বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি উপকূল, তটভূমি বা বেলাভূমিকে তাঁর বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন। অসীমের ধারণা কখনও তাঁর রচনায় প্রবেশ করে না অথবা বলা যায় যে নিজের সীমারেখার সম্মুখীন হলেই তা তাঁর রচনায় প্রবিষ্ট হয় এবং শুধু সেইখানে বাস্তবিকই সে অস্তিত্ব লাভ করে (সমুদ্রোপকূল): “সমুদ্র অথবা আঁকাবাঁকা খাঁড়ি ব্যতীত নিজেদের মধ্যে যে পারস্পরিক দূরত্ব তটভূমিকে একে অন্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন থেকে বিরত রাখে তা থেকে লাভবান হয়ে সমুদ্র প্রতিটি বেলাভূমিকে এমন ভাবতে শেখায় যে বিশেষত সেই বুঝি সমুদ্রের দিকে ধাবমান, অন্য কেউ নয়। বাস্তবে সমুদ্র তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে সুভদ্র আচরণ করে, অথবা আসলে তা সুভদ্র আচরণের থেকেও বেশি কিছু; সে তার প্রতিটি বেলাভূমির জন্য সর্বাধিক উৎসাহ আর নিরবচ্ছিন্ন আবেগ প্রদর্শন করতে পারে আর সেই সঙ্গে তার প্রতিটি অববাহিকায় অসীম স্রোতের উৎসকে সংরক্ষণ করতে পারে। সে খুব বিরল ক্ষেত্রেই তার সীমাকে সামান্য অতিক্রম করে যায়, তার তরঙ্গগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ জারি করে এবং সমুদ্র জেলিফিশকে তার নিজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আত্মপ্রতিকৃতি বা নমুনার মত জেলেদের কাছে ফেলে রেখে যায়, তারই মত নিজেকে তার সমগ্র বেলাভূমির সামনে পরমানন্দে, আপন ভাবোচ্ছ্বাসে উপুড় করে শুইয়ে রাখে।”

কবির সৃষ্টির মূল রহস্যটি হল প্রতিটি বস্তু অথবা উপাদানের চূড়ান্ত অভিব্যক্তির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা আর তাকে কেন্দ্র করে স্বকীয় ভাষ্য গড়ে তোলা। এটি সেই অভিব্যক্তি যা প্রায়ই আমাদের নজর এড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, জলের সংজ্ঞা নির্দেশ করার সময় পোঁজ্‌ জলের সেই দুর্নিবার আকর্ষণীয় ‘পাপ’ এর কথা বলছেন যা হল তার নিচের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, যাকে আমরা মাধ্যাকর্ষণ বলি। কিন্তু অন্য সব বস্তু, যেমন জামাকাপড় ঝুলিয়ে রাখার আলমারি কি মাধ্যাকর্ষণ বল অনুসরণ করে চলে না? এইখানে ওয়ার্ডরোব যে কত ভিন্নভাবে মাটির সঙ্গে লেগে থাকে তা দেখিয়ে, বস্তুর অভ্যন্তরে প্রায় প্রবেশ করে, পোঁজ্‌ বোঝার চেষ্টা করছেন যে তরল হওয়ার অর্থ কী, যেখানে যে কোনো আকৃতি, যে কোনো আকার প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে কারণ তরলকে মেনে চলতে হবে মাধ্যাকর্ষণের সেই আবেশসঞ্চারী ধারণা।

বস্তুবৈচিত্র্যের তালিকাকার এই কবি (এই নতুন সংযত লুক্রেশিয়াস এর রচনাকে De Varietate Rerum বলে অভিহিত করা হয়েছে) তাঁর প্রথম কাব্যসংগ্রহে কয়েকটি বিষয়ে বারবার ফিরে এসেছেন, একগুচ্ছ চিত্রকল্প এবং ধারণার পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর মধ্যে একটি হল উদ্ভিদজগৎ যেখানে গাছপালার আকার-আকৃতির ওপর বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে; অন্যটি হল শম্বুকজাতীয় জীব, বিশেষত শামুক, ঝিনুক এবং অন্যান্য খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী।

পোঁজ্‌ এর রচনায় মানুষের সঙ্গে গাছের তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ বারংবার পরিলক্ষিত হয়। “গাছপালার কোনো অঙ্গভঙ্গি নেই; তারা শুধু বুদ্ধের মত তাদের বাহু, হাত, আঙুলের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে। আর এইভাবে, কিছুই না করে, তারা তাদের চিন্তার গভীরে পৌঁছে যায়। তারা নিজেদের কাছ থেকে কিছুই লুকিয়ে রাখে না, তারা কোনো গোপন কথা মনে মনে পোষণ করে না, তারা সম্পূর্ণভাবে, সৎভাবে এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নিজেদের মেলে ধরে। আর কিছু না করে তারা তাদের সবটা সময় নিজেদের আকৃতিকে, নিজেদের গড়নকে আরও সূক্ষ্ম, আরও জটিল করে তুলতে ব্যয় করে যাতে তাদের নিজেদের শরীরগুলো যে কোনো বিশ্লেষণের পক্ষে অধিক জটিল আর নিখুঁত হয়……….. গাছপালা ছাড়া অন্যান্য সজীব, প্রাণচঞ্চল সত্তাগুলো মৌখিকভাবে নিজেদের প্রকাশ করে অথবা শুধু অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব ব্যক্ত করে, যা পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু উদ্ভিদজগৎ নিজেকে সেই লিখিত রূপে প্রকাশ করে যা অনপনেয়। তার ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, মত পরিবর্তন তার কাছে অসম্ভব, কোনো ত্রুটি সংশোধন করতে হলে তার একমাত্র উপায় অতিরিক্ত সংযোজন। এ যেন ইতিমধ্যেই রচিত এবং প্রকাশিত নিবন্ধের সঙ্গে একসারি পরিশিষ্ট জুড়ে তার সংশোধনের চেষ্টা করা। কিন্তু এটাও বলতে হবে যে গাছপালার বৃদ্ধি অনন্ত নয়। তাদের প্রত্যেকের সীমাবদ্ধতা আছে।”

আমরা কি তবে এই উপসংহারে পৌঁছোব যে পোঁজ্‌ এর কাব্য শেষ পর্যন্ত সেই উক্ত বা লিখিত ব্যাখ্যানে, অর্থাৎ শব্দে ফিরে আসে? প্রতিটি রচনার মধ্যে রচনা প্রক্রিয়ার একটি পরোক্ষ উপমা খুঁজতে যাওয়া, যা সমালোচনামূলক ক্রিয়াকর্মের মধ্যে অধিক পরিমাণে প্রত্যক্ষগোচর হয়, এখানে আর কোনো কাজে আসবে না। আমরা বলতে পারি যে পোঁজ্ এর ক্ষেত্রে ভাষা সেই অপরিহার্য মাধ্যম যা বিষয়ের সঙ্গে বস্তুর সংযোগ ঘটায়, সর্বদা তুলনীয় বস্তু ভাষার বাইরে যা প্রকাশ করতে চায় তার সঙ্গে এবং এই তুলনামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাষার পুনর্বিশ্লেষণ হয়, তার নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয় এবং প্রায়শই পুনর্মূল্যায়ন হয়। যদি পাতা হয় গাছের শব্দ, তাহলে তারা শুধু জানে কীভাবে একই শব্দের পুনরাবৃত্তি করতে হয়। “বসন্তে যখন তারা মনে করে যে অন্য একটি গান গেয়ে নিজেদের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, সমগ্র প্রকৃতির মধ্যে নিজেদের সম্প্রসারিত করতে পারে এবং প্রকৃতিকে আলিঙ্গন করতে পারে, তখনও তারা একই সুর, একই শব্দ, একই পল্লবের বহু সহস্র নকল নমুনা সঞ্চারিত করে চলেছে। গাছের থেকে শুধু গেছো উপায়ে পালানো সম্ভব নয়।”

(পোঁজ্‌ এর বিশ্বে যদি নেতিবাচক অথবা অভিশপ্ত কিছু থাকে, যেখানে মনে হতে পারে যে সবকিছুই সুরক্ষিত, তা হল পুনরাবৃত্তি: যে সমুদ্র তরঙ্গ তটভূমির ওপরে ভেঙে পড়ছে তাদের সকলেই একই বিশেষ্যপদে নিঃশেষিত: ” একই নামধারী সহস্র গুরুত্বপূর্ণ সম্ভ্রান্ত নারীপুরুষ, সকলকেই একই দিনে প্রবেশাধিকার দিয়ে বাক্‌বহুল এবং বহুফলপ্রসূ সমুদ্রের সামনে উপস্থাপিত করা হল।” কিন্তু বহুলতা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে মণ্ডিত করা, অসংখ্য বৈচিত্র্য প্রকাশ করার নীতিও বটে। নুড়িপাথর হল “প্রস্তরের সেই পর্যায় যখন তার কাছে ব্যক্তির, ব্যক্তিবিশেষের পর্যায় অর্থাৎ শব্দের যুগের সূচনা হচ্ছে।”)

শামুক ও শঙ্খ নিয়ে রচনায় বেশ অনেকবার ভাষা (এবং সাহিত্যকর্ম)-কে ব্যক্তির ক্ষরণ হিসেবে চিন্তা করে রূপালংকার তৈরি হয়েছে। কিন্তু যা অধিক তাৎপর্যপূর্ণ, (শামুকের জন্য কয়েকটি কথা-তে), তা হল খোলসের সঙ্গে তার শম্বুক অধিবাসীর আনুপাতিক আয়তনের সামঞ্জস্যের গুণকীর্তন। মানুষের স্মৃতিসৌধ ও প্রাসাদের সঙ্গে মানুষের আয়তনের আনুপাতিক অসামঞ্জস্য এর সঙ্গে তুলনীয়। নিজের খোলস তৈরি করে শামুক আমাদের সামনে এই উদাহরণ রাখে: “তাদের কাজকর্মের মধ্যে এমন কিছু নেই যা তাদের প্রয়োজন ও চাহিদার নিরিখে অপ্রাসঙ্গিক বা বাড়তি। এমন কিছুই নেই যা তাদের শারীরিক অস্তিত্বের সঙ্গে বেমানান। এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই যা তাদের কাছে প্রয়োজনীয় এবং অত্যাবশ্যকীয় নয়।”

এই কারণে ফ্রঁসিস্‌ পোঁজ্‌  শামুককে ঋষিতুল্য বলেছেন। “কিন্তু ঋষিতুল্য কীসে? তাদের নিজস্ব প্রকৃতির প্রতি অনুপুঙ্খ আনুগত্যে। তাহলে, সবার আগে নিজেকে জানো। তুমি যেমন, সেই ভাবে নিজেকে গ্রহণ কর। নিজের দোষগুণ নিয়ে, নিজের পরিমাপের সঙ্গে আনুপাতিক সামঞ্জস্য রেখে।”

গত মাসে আমি আরেকজন — সম্পূর্ণ ভিন্ন — ঋষির (কার্লো লেভি’র) ঘোষণাপত্র সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখা শেষ করেছি। শামুক সম্পর্কে লেভি’র স্তুতির উদ্ধৃতি দিয়ে। আর এখানে আমি এই প্রবন্ধের উপসংহারে উল্লেখ করলাম শামুক সম্পর্কে ফ্রঁসিস্‌ পোঁজ্‌ এর গুণকীর্তন। তাহলে শামুকই কি হতে পারে সন্তোষের চূড়ান্ত প্রতিভাস?

— অনুবাদ: শুভময় রায়


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান