নিউইয়র্কে পালিত হলো সাহিত্য একাডেমির শততম আসর
$post->title

ছবি : নেট থেকে ।

গতকাল ছিলো ২৯ মার্চ। শুক্রবার। জ্যাকসন হাইটসে বেলোজিনো পার্টি হলে গাড়ি নিয়ে ঢোকার পথটা বন্ধ। পার্কিং লট ফুল। গাড়ি বাইরে রেখে পায়ে হেটেই তাই ভেতরে যেতে হচ্ছে আমন্ত্রিত অতিথিদের। হল রুমের ভেতরের অবস্থাও একই। অর্থাৎ হলরুমও ফুল। কবি-সাহিত্যিক আর আমন্ত্রিত অতিথিরা এসেছেন। তবে একা নয়, জীবনসঙ্গীসহ। এতোগুলো পরিবার কিন্তু শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি খুব একটা চোখে পড়লো না। কথা ছিলো সাড়ে সাতটায় উদ্বোধন হবে আসরটি। কিন্তু তা হলোনা। ঘন্টা পেরিয়ে গেলো। অবশেষে মঞ্চে এলেন আবৃত্তি শিল্পী মুমু আনসারি। তিনি তার আবেগঘন অনুভূতি জানানেল সাহিত্য আসর নিয়ে। ১০০তম আসরের দীর্ঘ পথ যে ততোটা সহজ ছিলোনা সেকথা বলতে ভুললেন না। ফেলে আসা সুদিন বা দুর্দিনে যারা একাডেমিকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে রেখেছেন তাদের প্রতি প্রকাশ করলেন কৃতজ্ঞতা। তারপর পড়লেন এক দীর্ঘ কবিতা। কবিতায় প্রেম-দ্রোহ সব-ই ফুটে উঠলো। আমন্ত্রিত অতিথিরা জোরে করতালি দিলেন। এরপর কোন ঘোষনা ছাড়াই মঞ্চে এলেন এই শহরের নান্দনিক সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র বলে পরিচিত বাফার ৯ নারী শিল্পী। জয় বাংলা বাংলার জয় এবং এক নদী রক্ত পেরিয়ে গান দুটির সঙ্গে দারুন এক নৃত্য পরিবেশন করলেন তারা। দর্শকরা রীতিমতো মুগ্ধ। আবেগআপ্লুত। অরুপ কুমার দাশের কোরিওগ্রাফি সত্যিই দারুন, এমন প্রশংসা শোনা গেলো প্রকাশ্যেই।

বিশাল মঞ্চ। মঞ্চের পুরোটা জুড়েই ব্যাকড্রপ। দুটো রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। লাল আর সবুজ। পতাকার রঙ। এ ধরনের ধামাকা অনুষ্ঠানে ব্যাকড্রপ বা ব্যানার হয় বর্ণিল। ব্যবহার করা হয় হরেক রঙ। কিন্তু সাহিত্য এতাডেমির শততম আসরের এই ব্যানারে দুটো রঙ মানে কি বাংলাদেশের পতাকার রঙ ফুটিয়ে তোলা? তা কে জানে। ব্যাকড্রপে লেখার পেছনে একটা জলছাপে চোখ আটকে গেলো। ওমা এ-যে শতাব্দীর মহানায়কের জলছবি! জাতির জনকের মুখায়ববের। কবিরা নাকি সবকিছুতেই আবেগ তাড়িত থাকেন। স্বভাবে হন আত্মভোলা। কিন্তু তাদের বিশেষ দিনটিতে মহাকবি বঙ্গবন্ধুর কথা তারা ভোলেননি। তাকেই উৎসর্গ করেছেন এই অনুষ্ঠান। এমন একাগ্র ভাবনায় ছেদ পড়লো কবি কাজী আতিকের গলার শব্দে। প্রারম্ভিক বক্তৃতা দিতে এসে প্রথমেই বললেন, মহান এই স্বাধীনতার মাসে এই আসর থেকে জানাই জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা। সাহিত্য একাডেমি ছুয়েছে এক অনন্য মাইল ফলক। সাহিত্য একাডেমির যাত্রা যখন শুরু হয়েছিলো তখন খ্যাতিমান কোন কবি সাহিত্যিক আমাদের সঙ্গে ছিলেন না। এখন অনেকেই আছেন। বিখ্যাতরা যেমন আছেন। আছেন নতুনরাও। তাই আমরা এটিকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছি। আর আমাদের যিনি পরিচালক তিনি কোন কবি নন। তিনি কোন লেখালেখিও করেন না। তাই একাডেমি থেকে তার কোন ফায়দা লুটার কিছু ছিলোনা। আমাদের বিশ্বাস এবং পরিচালক মোশারফ হোসেনের নিরলস প্রচেষ্টা আজ আমাদের এখানে এনে দাড় করিয়েছে। কাজী আতিক কবি শহীদ কাদরির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

কাজী আতিকের পর বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা নিয়ে মঞ্চে আসেন সাপ্তাহিক ঠিকানার প্রধান সম্পাদক ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু মানুষকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন। তাই তিনি সেরা নেতা, সেরা যোদ্ধা, সেরা পন্ডিত। মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় তিনি ফাসির মঞ্চকেও ভয় পাননি। তাই তিনি সেরার সেরা। এরপর বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠান আহ্বায়ক ফেরদৌস সাজেদীন। তিনি বলেন, যারা লেখালেখি করেন তারা মানুষের কাছে যান। কারন লেখার প্রধান উপজীব্য হলো মানুষ।
এরপর লেখক আলোচনা পর্বে সাহিত্য একাডেমির পরিচালক মোশারফ হোসেন মঞ্চে ডেকে নেন লেখক-সাংবাদিক হাসান ফেরদৌস, কবি তমিজ উদ্দিন লোদী, প্রাবন্ধিক সোনিয়া কাদের, নিরা কাদরি, প্রাবন্ধিক এবিএম সালাউদ্দিন ও তরুন লেখক পলি শাহিনাকে। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় শততম সাহিত্য আসরের আয়োজন কেমন লাগছে? তারা বলেন, এটা তো শুধু একটা সাহিত্য আসর নয়। সাহিত্য আসরের মাধ্যমে একটা পরিবার গড়ে উঠেছে। এই পরিবারের কেউ একজন আরেকজনের রক্তের কেউ নন। কিন্তু তারপরও তারা পরস্পরের পরম আপনজন। সাহিত্য একাডেমি একটা মোমবাতি জ্বেলে চারদিকে আলো ফেলার চেষ্টা করেছে। সেই আলো আজ শুধু নিউইয়র্কে নয় পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এই আলো সবার ঘরে ঘরে পৌচ্ছে দিতে হবে।

লেখক পর্বের পর সম্পাদক পর্বে একে একে মঞ্চে আসন গ্রহন করেন ঠিকানার প্রধান সম্পাদক ফজলুর রহমান,প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন, সাপ্তাহিক আজকালের সম্পাদক মঞ্জুর আহমেদ, বাংলা পত্রিকার সম্পাদক আবু তাহের এবং ইউএসএ বাংলা নিউজের সম্পাদক আবু সাইদ রতন। উল্লেখিত পত্রিকাগুলোতে শততম সাহিত্য আসর উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সম্পাদকরা বলেন, আসলে প্রতিটি সংবাদপত্রের একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে। একটা কমিটমেন্ট থাকে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো কবি, সাহিত্যিক, লেখক তারা তো আসলে মুক্ত গণমাধ্যমেরই অংশ।
বক্তৃতার ফাকে দর্শকরা উপভোগ করলেন বাফার নৃত্য শিল্পীদের আরও দুটি নান্দনিক পরিবেশনা। নৃত্য শেষে মঞ্চে এসে দর্শকদের অভিবাদন জানালেন বাফার ৯ নৃত্য শিল্পীসহ নৃত্যগুরু অরুপ কুমার দাশ ও প্রেসিডেন্ট ফরিদা ইয়াসমিন।
অনুষ্ঠানের শেষ অংশে আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন চন্দন চৌধুরী এবং তনিমা হাদী।

সূত্র: ভোরের কাগজ


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান