কবি আরিফুল ইসলাম এর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন
মোরাকাবা, হুসনা জাহান ও একজন আলোকুমার - আহমদ আজিজ
$post->title

গ্রন্থের প্রচ্ছদ

 

একটি উপন্যাস নিয়ে এই আলোচনাউপন্যাসটির লেখক আকিমুন রহমানউপন্যাসের নাম 'অচিনআলোকুমার ও নগণ্য মানবীএবছর ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় উপন্যাসটি প্রকাশিতহয়েছেপ্রকাশ করেছে গ্রন্থ কুটিরউপন্যাসটির প্রধান আকর্ষক বিষয় প্রেমতবে আর পাঁচটা উপন্যাসের মতো মানব-মানবীর প্রেমকাহিনি এতে নেইলেখক এক অদ্ভুতপ্রণয় ঘটনার অবতারণা করেছেন এ উপন্যাসেএকে বলা যেতে পারে একটি অপার্থিব প্রণয়োপখ্যানকিংবা বলা যেতে পারে, কল্পবিজ্ঞানের ছায়াতলে একটি মানবিক প্রণয় কাহিনিযদিও প্রণয় অংশটুকুর বাইরে এর পারিপার্শ্বিক কাঠামো নির্মিত হয়েছে স্বাভাবিক বাস্তবতার উপাদানে

উপন্যাসটির নামকরণের মধ্যে যে নগণ্য মানবীর উল্লেখ আছে,তার নাম মরিয়ম হুসনা জাহান ডাক নাম হেনাতাকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসটি রচিত হয়েছেকিংবাবলা চলে,হুসনা জাহানের আত্মকথনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি বিবৃত হয়েছেসে আত্মকথন আবার লেখা হয়ে উঠেছে তার পুরনো খাতাকে বানিয়ে তোলা ডায়রিতে

উপন্যাসটির মধ্যে একদিকে যেমন পাওয়া যাবে খুব সাধারণ বিশেষত্বহীন একটি পরিবারের খুটিনাটি চালচিত্রের পরিচয়, তেমনি এর মধ্যে পাওয়া যাবে খুব সাধারণ, মাথা নীচু,কষ্ট সয়ে যাওয়া, প্রতিবাদহীন একটি মেয়ের জীবনে ঘটে যাওয়া আকস্মিক ও বিস্ময়কর ঘটনাবলির বিবরণআর আমরা তার মধ্যে দেখতে পাব একজন লেখকের অসম্ভব কল্পনাশক্তির প্রকাশএ উপন্যাসের ভাষাবৈশিষ্ট্যও লেখকের অন্যান্য উপন্যাসের বিবেচনায় ভিন্নতরঅবশ্য, উপন্যাসটি যেহেতু একটি মেয়ের আত্মকথনের মধ্য দিয়ে বিবৃত হয়েছে,ফলে স্বাভাবিকভাবেই উপন্যাসের ভাষারীতি আলাদা রূপ পরিগ্রহ করেছে

২.

মরিয়ম হুসনা জাহান ঢাকার কদমতলা নামক এলাকায় থাকেসেখানে আড়াইকাঠা জমির উপর তার বাবার অনেক কষ্টে নির্মিত চারতলা বাড়ির একটি ফ্লোরের একটি কামরায় তার বসবাসবাবা মারা গেছেতার তিনবছর আগে মা মারা গেছেছোট বোন রিনার বিয়ে হয়ে গেছে আগেইজামাই ইটালিতে থাকেরিনা শ্বশুর বাড়িতেচারতলা বাড়িটিতে যমজ সন্তান নিয়ে ভাই -ভাবীও থাকেতবে হুসনা জাহানের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা তার নিজেকেই করতে হয়

সে ইডেন কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স, মাস্টার্স পাশ করেছেএম ফিলও করেছেসে চাকরি করেআজিমপুর গোরস্থানের পাশে এক গলির ভেতরে অবস্থিত আয়াতুন্নেছা গার্লস স্কুলএন্ড কলেজে সে শিক্ষকতা করেকলেজটি গভমেন্ট এফিলিয়েশন এখনও পায়নিএকটা বাঁধা রুটিনের মধ্যে হুসনা জাহানের জীবন চলেকলেজ থেকে ফিরে আসার পর প্রতিদিনই শেষ বিকেল থেকে রাত আটটা সাড়ে আটটা পর্যন্ত তাকে নানা কাজেব্যস্ত থাকতে হয়পরের দিন কলেজে যাবার জন্য ব্লাউজ শাড়ি ইস্তিরি করা,খাতা দেখার থাকলে খাতা দেখা, ছাত্রীদের নোট দেখা,কারেকশন করা,বাংলা ব্যাকরণের এটা-সেটার দিকে নজর দেয়া,কলম খাতা ব্যাগে ঢোকানো ইত্যকার কাজরান্নাবান্নার কাজ তো রয়েছেইএই বাঁধাধরা জীবনের মধ্যে কোনো বিশেষ কিছু পাবার ইচ্ছা তার হয় নাসে ফুলকে ফুলই দেখে,মেঘকে মেঘফুলে ফুলে কোনোদিনই সে কারো হাসির আভাস দেখতে পায় নাতার কখনো নিজেকে ক্রমে ক্ষয়ে আসা বাংলা সাবানের মতো মনেহয়

 

হুসনা জাহানের জীবনে প্রথম ছন্দপতনের ঘটনা ঘটে তার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পরতার অনেক ইচ্ছা ভার্সিটিতে পড়ারসে কথা বাবাকে বলেছেওতিনি আপত্তি করেননিকিন্তু মা চিরকাল মেয়েদের বেশি লেখাপড়ার বিপক্ষেসে মেয়ের বিয়ে দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেএকদিন সন্ধ্যায় বাবার আপত্তির মুখেই হুসনাজাহান আর তার দাদাভাই মোতাহার আলীর বিয়ে একসাথে পাকা হয়ে যায়বড়ো খালার মেয়ে বকুলের সাথে মোতাহার আলীর আর বড়ো ছেলে নূর হোসেনের সাথে হুসনাজাহানেরমেট্রিক ফেল নূর হোসেন আবুধাবিতে চাকরি করেসে দেশে এসেছিল বিয়ে করার জন্যএখন ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে যাওয়ায়, তাড়াহুড়া করে সরা-কাবিন সারা হয়'কথা থাকে, একবছর পরে নূর হোসেন ছুটি নিয়ে দেশে আসবে যখন, তখনই দুইবাড়ির মেয়ে তুলে আনার বড়ো কাজটা করা হবে' নূর হোসেন আবুধাবি ফিরে যায়

হুসনা জাহানের রেজাল্ট হয়ভার্সিটিতে ভর্তির সময় আসেআবুধাবি থেকে আপত্তি আসে আর পড়া যাবে নাপড়লেও মেয়েদের কলেজে পড়তে হবেমা-খালা বলে,'আর পড়োনের কী কাম!' বাবা গোপনে মেয়েকে ইডেন কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ায়হুসনা জাহানের বাংলায় অনার্স পড়া শুরু হয়বাবা মেয়েকে শিখিয়ে দেয়, 'লোকে জিজ্ঞেস করলে কইস, তুই ডিগ্রি পড়স'

বছর যায়,দুই বছর যায়, নূর হোসেন ছুটি ম্যানেজ করে দেশে আসতে পারে নাদাদা ভাইয়ের বউকে তুলে আনা হয়মা ছেলে বউয়ের মানে বোন-ঝির যতœ-খেয়াল করতে থাকেএরই মধ্যে হঠাৎ হার্ট ফেল করে মামারা যায়সংসারের দখল বুঝে নেয় ভাবীতার যমজসন্তান হয়হুসনা জাহানের অনার্স হয়মাস্টার্সও শেষ হয়ে যায়নূর হোসেন আসে নাবাসায় খালা-খালু আসেতারা বলে,জামাই না আসুক,বউ স্বামীর সংসারে গিয়ে শ্বশুর-শ্বাশুরীর সেবাকরুকবাবা রাজী হয় নাতারা রাগারাগি করে ফিরে যায়বাবা মেয়েকে এমফিল করতে বলেহুসনা জাহান এমফিল করে

৩.

হুসনা জাহানের জীবনপর্বের এসমস্তই আমরা জেনে ওঠি তার লেখা ডায়রি থেকেলেখক অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে হুসনা জাহান চরিত্রটি

পাঠকের কাছে তুলে ধরতে থাকেন

হুসনা জাহানের বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েনশয্যাশায়ী হয়তার প্রস্টেটক্যানসারজীবন সংগ্রামী মানুষ তিনিজীবনের প্রারম্ভেই বাবা-মাকে হারিয়েএতিম আব্দুল আলী লজিং থেকে পড়াশুনা করেছেনবি.কম পাশ করে রোডস এন্ডহাইওয়েজ ডিপার্টমেন্টে কেরানির পদে চাকরিতে ঢুকেনএই কেরানির পদে চাকরিকরেই তিনি ছেলে- মেয়ে মানুষ করেছেন,শ্বশুরের দেয়া জমিতে চার তলা বিল্ডিংতুলেছেনসেকশন অফিসার হয়ে রিটায়ারমেন্টে আসেনরিটায়ারমেন্টে আসার আগ দিয়েই তার অসুখটা ধরা পড়েএতদিন শরীরকে নানাভাবে সামাল দিয়েছেন,এবার আর সামালদিতে পারছেন নাহুসনা জাহান বাবার শুশ্রুষা করতে থাকে

এদিকে পাঁচ বছরপর নূর হোসনের সুযোগ হয় দেশে ফেরারদেশে ফিরে এসে বউকে তুলে নিতে চায়কিন্তু বাবার এরকম গুরুতর অসুস্থতার মধ্যে হুসনা জাহান কীভাবে স্বামীরসংসার করতে যাবে!হুসনা জাহান পরিষ্কার বলে দেয়,সে যাবে নাদুই পরিবারেরমধ্যে প্রচুর ঝামেলা হয়ওদিকে উকিল দাদাভাইয়ের মুহুরি ডিভোর্সের কাগজপত্ররেডি করে ফেলে

বাবা আব্দুল আলী এবার যেন বুঝতে পারে তার দিন শেষ হয়েআসছেসে দিশাহারা বোধ করেসে তার দুই ছেলে-মেয়েকে কাছে ডাকেসে তাদেরকেএকটি আমানত দিয়ে যেতে চায়তার দাদার আমানতএতদিন তিনি সেই আমানত রক্ষা করেএসেছেনএখন ছেলে-মেয়ে সেই আমানত রক্ষা করুককী সেই আমানত? সেই আমানত একগুপ্ত বিদ্যা ---মোরাকাবামানে ধ্যান করাইংরেজিতে যাকে বলা চলে মেডিটেশনবাবা আব্দুল আলী ছেলে-মেয়েকে মোরাকাবার বিধি-বিধান বুঝিয়ে দিতে থাকেনতিনি একবার বলেই ক্ষান্ত হন নাবারবার ছেলে-মেয়েকে বুঝিয়ে বলতে চানছেলেব্যস্ত থাকায় তাকে কাছে পান নাহুসনা জাহান যখনই বাবার শুশ্রুষার কাজে কাছেআসে,তখনই তিনিমেয়েকে পুনঃপুনবার মোরাকাবার নিয়মকানুন বুঝিয়ে বলতেথাকেনবারবার শুনতে শুনতে হুসনা জাহানের মোরাকাবার নিয়মকানুন মুখস্ত হয়েযায়

বাবা হুসনা জাহানকে বলেন,মোরাকাবা অন্তর দিয়ে করতে হয়'এটা অনেকদামি এক জিনিস! এইটা অতি সাধনারএক বিষয়যে এই বিদ্যার সন্ধান পায়,তার মতোভাগ্যবান বিরল' তিনি আরো বলেন--'লোকে তো কেবল ভাত-কাপড়ের জন্য এই জীবনেরেপায় নাআরো গূঢ় এক সাধনারও জন্য এই মানব-জনম' তিনি হুসনা জাহানকে বলেন'মোরাকাবার রাস্তা ধরে চলতে থাকলে পথের দিশাখান পাওয়া যায়।...তোমার পথয্যান তোমারে ধরা দিতে দেরি না করে।...মোরাকাবা করায় গাফিলতি দিয়ো না'

 

একদিন দুপুরের পর-পর বাবাকে জাউ খাওয়াতে গিয়ে এক বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষীহয়দেখে,বাবা শান্ত হয়ে শুয়ে আছে,কোনো গোঙানি নাইহুসনা জাহান ভয় পেয়েযায়হঠাৎ সে বাবাকে সুস্থ মানুষের মতো কথা বলতে শুনেবাবা যেন ডাকছে,যেনএকটা পথ দেখতে বলছেঘরের মধ্যে পথ আসবে কোথা থেকে!বাবা কী প্রলাপ বকছে!বাবা বলছে, ' কী সুন্দর পথখান! ওই যে রাস্তা! সিধা গেছে গা রাস্তাখান! ওই কতদূরে...দেখো গো মা! ' এবার হুসনা জাহানও যেন পথখান দেখতে পায়পায়ে-হাঁটাছায়ায় মোড়ানো এক দীর্ঘ পথপথের একপাশে দিঘি,দিঘিভরা পদ্ম,পদ্মফুলেরসুগন্ধ! পথের আরেক পাশ দিয়ে সারি সারি আমগাছ,গাছভরা বোল!পথের শেষ মাথায়একটা ভিটি-বাড়ি!ভিটি-বাড়ির মুখে সাদা সাদা ফলেভরা কামিনী ফুলের গাছ! আরঝরে-পড়া ফুলে ছেয়ে আছে সবুজ ঘাস! বাবা হা হা করে কেঁদে ওঠে! 'আহা!এই ভিটিকোন ভিটি!এই রাস্তা কোন রাস্তা! আমি কী চিনি নাই নাকি! '

সেই দুপুরেরচমক-লাগা ঘটনাটির কথা হুসনা জাহান কখনো ভুলতে পারে নাবাবা মারা যায়বাবার মৃত্যুর পর হুসনা জাহানের উপর ভাবীর গঞ্জনা বেড়ে চলেহুসনা জাহানেরনিজেকে 'তুফানে আছড়ানী খাওয়া একটা গাছ ' মনে হয়ঝড়কে সামাল দিতে দিতেহুসনা জাহানের মনে হয় 'এইবার হয় আমারে যেইদিক দুইচোখ যায় চলে যেতে হবে!নইলে নিজেরে শেষ করে দিতে হবে' হুসনা জাহান চাকরির খোঁজে বেরোয়শেষমেষকলেজের চাকরিটা পেয়ে যায়

হুসনা জাহান বাবার রেখে যাওয়া আমানতটির কথাভুলে নাবাবার মৃত্যুর তিনমাস পর একদিন সন্ধ্যায় সে তাদের কোনোরকমে বানিয়েতোলা চার তলা বাড়িটার ছাদে যায়লেখক ছাদটির একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেনযে বর্ণনার মধ্য দিয়ে হুসনা জাহানদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা,তাদের মানসিককাঠামোর পরিচয় ফুটে উঠেছেছাদে আসার পর হুসনা জাহানের মনে আরেকটা বিষয়ওরেখাপাত করেসেটা হলো, মাগরিবের আজানের পরের পনের-বিশ মিনিট সময়েরসন্ধ্যার রূপটাসে লক্ষ করে,এই সময়টায় মাটিতে 'হুড়মুড়'করে অন্ধকার নেমেআসেকিন্তু আকাশে তখন অন্য ব্যাপারআকাশে তখন অনেকখানি ফিকে ফর্সা ভাবথাকেসেই ফর্সা ভাবটা আকাশ থেকে 'ধুড়মুড়' করে সরে যায় নাযেতে থাকে আস্তেআস্তে'কেমন একটা ছাই ছাই বরণের ঢেউ ছড়ায়ে পড়তে থাকে আসমানে' অনেকক্ষণলাগে অন্ধকার হতেব্যাপারটা হুসনা জাহানের খুব ভালো লাগতে থাকেতারমনেএকটা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়বিষয়টা তার লিখে রাখতে ইচ্ছে করেসেই থেকেহুসনা জাহানের ডায়রি লেখা শুরু

ছাদে এদিক-ওদিক হাঁটতে হাঁটতেই একসময়হুসনা জাহান সিমেন্টে বাঁধা একটা টবে লাগানো পেয়ারা গাছেরকাছে,ছিঁড়ে-যাওয়া পরিত্যক্ত একটা লোহার কাঠামো সর্বস্ব প্লাস্টিকের চেয়ারেবসে মোরাকাবা করা শুরু করে দেয়আর বাবা যেন পাশে বসে থেকে নিয়মনীতিগুলো বলেযেতে থাকেহুসনা জাহানের চোখ বন্ধ হয়ে থাকে একক নিমগ্নতায়

৪.

এরপর থেকে প্রতিদিন হুসনা জাহান ছাদে গিয়ে মোরাকাবা করতে থাকেএই মোরাকাবাকরাকে কেন্দ্র করে লেখক হুসনা জাহানের জীবনে এক অভিনব ঘটনার অবতারণাকরেনআর আমরা ক্রমে এক কল্পবিজ্ঞানের পরিমণ্ডলে ঢুকে পড়িহুসনা জাহানেরডায়রি থেকে আমরা সে ঘটনার কথা জেনে ওঠি

একদিন হুসনা জাহান সন্ধ্যারঅনেক আগেই ছাদে যায়পেয়ারা গাছটার কাছে পরিত্যক্ত চেয়ারটায় বসে থাকেজীবনেরঅনেক কথা তারর মনে আসেমাগরিবের সময় চলে যায়ইশারও আজান হয়ে যায়হঠাৎ তারমনে হয় এখনও মোরাকাবা করা হয়নিসে মোরাকাবা শুরু করেমোরাকাবার শেষপর্যায়ে হঠাৎ তার মুখে গলায় মাকড়সার জালের মতো কিছু একটার ঝাপটা লাগেসাথেসাথে শরীরে চুলকানী শুরু হয়ে যায়কোনেরকমে হুসনা জাহান মোরাকাবা শেষকরেসে হাত দিয়ে মুখ থেকে গলা থেকে মাকড়সার জাল সরানোর চেষ্টা করেকিন্তুকোনো কাজ হয় নাচুলকানি বেড়ে চলেসে ঘরে আসেসে মুখ-হাত ভালো করেধোয়এরপরেই সে এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে দেখেদেখে,তার কনুই থেকে হাতের পাতাপর্যন্ত অংশে পানি লাগামাত্র একটা লালল রঙ ঝটকা দিয়ে দিয়ে ভেসে উঠছেমাংসের ভেতর থেকেকিছুক্ষণ পর সেই লাল রঙটা 'ছবলাতে ছবলাতে' কচি কলাপাতারমতো সবুজ হয়ে যাচ্ছেআতঙ্কে আর্তচিৎকার দিয়ে ওঠেকিন্তু তার দাদাভাই এসেকিছু দেখতে পায় নাসে বলে কোনো কিছু লেগে এলার্জি হয়েছে

হুসনা জাহানশরীরের চুলকানি থামানোর জন্য হাতে গরম সেঁক দেয়সেঁক দেয়ার সাথে সাথে আরওভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেসেঁক লাগামাত্র হাতের মাংসের ভেতর থেকে লাল রঙের বলক উঠতেথাকেতারপর সবুজ বলকসে কি করবে বুঝে উঠতে পারে নাসে বাতি নিভিয়ে বসেথাকেঅনেকক্ষণ পর আবার বাতি জ্বালায়আয়নায় মুখ দেখেআশ্চর্য ব্যাপার সবআগের মতোই ঠিক আছেশুধু শরীরে চুলকানি রয়েছেকিন্তু পানি লাগলে, সেঁক দিলেআবার আগের মতো হয়তারপর আবার ঠিক হয়ে যায়শুধু চুলকানিটা থাকেতার মনেহয়, তার ব্লাড ক্যানসার হয়েছে

 

সারাটা রাত ভয়ে-দুর্ভাবনায় কাটে হুসনা জাহানেরসে চোখ বুজে বিছানায় পড়েথাকেঘুম-অঘুমের মধ্যে যেন সে দেখতে পায়,অনেক দূর থেকে একটা মেঘ ছুটে আসছেতাদের বাড়িটার দিকেমেঘটা এসে তাদের বাসার উপর থির হয়তারর মনে হয়, মেঘটা যেন হুসনা জাহান হুসনা জাহান বলে ডাকছেতার ঘুম ভেঙে যায়দেখেবাইরে প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছেখোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির তোড় ঘরে ঢুকেমেঝে, বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছেসেও ভিজে গেছেহঠাৎ তার খেয়াল হয় বৃষ্টিরপানিতে তার শরীর ভিজে গেলেও শরীরে কোনো রকমের রঙের বলকানি হচ্ছে নাশুধুচুলবুলানিটা আছেহুসনা জাহানআশ্চর্য হয়

পরদিন কলেজে পহেলা বৈশাখেরঅনুষ্ঠানতার উপর দায়িত্ব পড়েছে মঞ্চ সাজানোর ফুল নিয়ে যাওয়ারকিন্তু বাইরেতখনও বৃষ্টিহুসনা জাহান বৃষ্টির মধ্যেই রিক্সায় হাইকোর্টের বটতলায় আসেএখানে ফুল পাওয়া যায়এসে দেখে কেউ নাইতিনটা 'আউলা' মেয়েকে বসে থাকতেদেখেমেয়েগুলো কাকে যেন ডাকেকোথা থেকে দুইজনলোক দুইপাতি ফুল নিয়ে আসেএকশ পঁচিশটা লাল গোলাপহুসনা জাহান ফুল নিয়ে ভিজে-টিজে কলেজে এসে পৌঁছায়আসতে দেরি হওয়ায় বড় আপার ভর্ৎসনাও শুনে

কলেজ থেকে দুপুরে বাসায়ফিরেডায়রি লেখেশারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ভাবেকাঁদেওতারপর কখন যেন ঘুমিয়েপড়েঘুমের মধ্যে সে শুনতে পায় কেউ যেন তাকে ডাকছেগতরাতে ঘুমের মধ্যেমেঘটা যেমন করে ডাকছিল তেমন করেঘুমের মধ্যেই হুসনা জাহান খেয়াল করে দেখতেপায়, মানুষের ছায়ার মতো দেখতে কিছু একটা তাকে ডাকছে---'হুসনা জাহান,একটুআসবেন? আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিছাদে কি একটু আসতে পারেন? খুবদরকার!আসবেন?' হুসনা জাহানের ঘুম ভেঙে যায়ছাদে যাওয়ার জন্য মনস্থিরকরেসে ছাদে আসেতখন সন্ধ্যার মাগরিবের আজানের পরের সময়টা

হুসনাজাহান ছাদে এসে কাউকে দেখতে পায় নাতার মনে ভয় ঢুকেসে ফিরে যেতে চায়'এইযে আমি!একটু সতর্ক চোখে যদি তাকান,দেখতে পাবেন!' এবার হুসনা জাহানদেখে,রেলিংয়ে ভর দিয়ে আধা বসা হয়ে আছে মানুষের মতোই একটা মিহি ছায়াছায়াটাতাকে তার কোনো প্রিয় পুরুষের কথা মনে করতে বলেতাহলে সে তার কাঠামোটা পেয়েযাবেহুসনা জাহানের হঠাৎ করেই মাহবুব শরীফের কথা মনে আসেএকদিন যাকে তারভালো লেগেছিলকিন্তু যাকে কিছুই বলা হয়নিযার জন্য সে খুব কষ্ট পেয়েছিলযে কষ্টটা তার বুকের মধ্যে রয়ে গেছে

হুসনা জাহান দেখে ছায়াটা নেই   সেখানে আধা বসা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মাহবুব শরীফহুসনা জাহান চমকে ওঠেলোকটা বলে, সে অনেক দূর থেকে এসেছেএসেছে হুসনা জাহানের জন্যেইহুসনাজাহানের শরীরে যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে,যার জন্য সে কষ্ট পাচ্ছে,তার ভুলেরজন্যই সেটা হয়েছেসেটা দূর করার জন্যই তার আসাএদিকে হুসনা জাহানের মনেহয় তার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে,সে আর বেশি দিন বাঁচবে নাতার চোখ ভরে পানিচলে আসেসে দেখে লোকটা সেখানে দাঁড়িয়েই তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে তারচোখ বরাবরতারপর লোকটা হাত মুঠো করে এগিয়ে আসে তার কাছেকিছু একটা দেয়ারজন্য হাত বাড়িয়ে দেয়দ্বিধাগ্রস্ত হুসনা জাহান হাত বাড়ায়লোকটা মুঠো খুলেকিছু একটা রাখে হুসনা জাহানের হাতের পাতায়হুসনা জাহান দেখে তার চোখেরটলোমলো কয়েক ফোটা পানিপলকে সেই পানি সবুজ মুক্তা হয়ে যায়একটু পরমুক্তাগুলো নীল জোনাক হয়ে উড়ে যেতে থাকে দূর আকাশের দিকেহুসনা জাহানের মনথেকেও যেন সব ভয় দূর হয়ে যায়তার খুব ভালো লাগতে থাকেশরীরের চুলকানিরকথা আর মনে থাকে নালোকটা চলে যায়আর হুসনা জাহানের মনে হতে থাকে--- যা ঘটলো তা সত্য না মনের ভুল! কিন্তু তার মনের ভেতরে লোকটাকে মাহবুব শরীফ বলেডাকতে ইচ্ছে করে

হুসনা জাহান লোকটার জন্য এক ধরণের ব্যাকুলতা অনুভবকরেরাতে লোকটাকে স্বপ্নে দেখেকোথায় যেন তারা চলে এসেছেলোকটা একটাবিশাল স্রোতভরা নদীতে নেমে যায়মাঝনদীতে গিয়ে আজলাভরে কী যেন তোলেতারপরতা আবার পানিতে নামিয়ে রাখেলোকটা কী যেন দেয়ার জন্য মাঝনদী থেকেই আজলাবাড়িয়ে দেয় হুসনা জাহানের দিকেহুসনা জাহানের ঘুম ভেঙে যায়ঘুম ভেঙে দেখেতার বিছানাভরে বেলী ফুল

লোকটার সাথে হুসনা জাহানের আরও দুদিন দেখাহয়একদিন দুপুরে কলেজ থেকে বেড়িয়ে বড় রাস্তায় এসেছে তখনআরেকদিন লোকটাইদেখা করার কথা বলেলোকটা তাকে কোথায় যেন নিয়ে আসেএমন জায়গায় সে কখনোআসেনিকিন্তু তার খুব ভালো লাগেলোকটা অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে,অদ্ভুতঅদ্ভুত ঘটনা ঘটায়হুসনা জাহান খুব অবাক হয়কিন্তু তার ভালোও লাগতেথাকেলোকটাকে আপন মনে হয়

লোকটা হুসনা জাহানকে তার জীবনের গল্প বলতেবলেহুসনা জাহান দুঃখ-কষ্টেভরা বিষ-জর্জর জীবনের গল্প বলেবলতে বলতে তারচোখভরে পানি চলে আসেলোকটা তার হাতেরপাতা চোখের কাছে এনে বলে 'এসো'পাতাঝরার মতো করে হুসনা জাহানের চোখের পানি লোকটার হাতের পাতায় পড়তে থাকেপড়তেপড়তে সবুজ আলোর রূপ নিতে থাকেলোকটা সেগুলোকে আলগোছে বুক পকেটে রাখেতারসারা শরীরে নীলচে-সাদা আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠেহুসনা জাহান তাকে 'আলোকুমার' নামে ডেকে ওঠে

এবার আলোকুমার তার পরিচয় দেয়এ উপন্যাসে আলোকুমার একটিচমকপ্রদ কল্পচরিত্রএকই সঙ্গে তা লেখকের কল্পনাশক্তিরও পরিচায়কআলোকুমারবলে,সে পৃথিবীর সৌরজগতের বাইরে অন্য একটি গ্যালাক্সির গ্রহের বাসিন্দাতারা পৃথিবীর মানুষের চেয়ে অনেক অগ্রসরসেখানকার একদল বিজ্ঞানী পৃথিবীরমানুষের ইচ্ছাশক্তি নিয়ে গবেষণা করছেসে তাদের প্রকল্পের প্রধানবিজ্ঞানীতারা পৃথিবী গ্রহের ইচ্ছা-শক্তি বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত ও নমুনাসংগ্রহের জন্য তাদের তৈরী ইচ্ছারশ্মি পৃথিবীর দিকে পাঠিয়েছিলহুসনা জাহানযখন ছাদে মোরাকাবায় ধ্যানে নিমগ্ন হয়েছিল,যখন তার 'ইচ্ছা-শক্তি চরাচরের সকলবস্তু ও শক্তির সূক্ষ্ম ইচ্ছা-কণার সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিল' সে সময় তাদেরপাঠানো ইচ্ছারশ্মি তার ভেতরে ঢুকে তার রক্ত কণিকার থেকে তথ্য-উপাত্তসংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলফলে হুসনা জাহানকে শারীরিকভাবে কষ্টেভুগতে হচ্ছেএটা বুঝতে পেরে সে দ্রুত পৃথিবীতে চলে আসে তাকে নিরাময় করারজন্যতার ঘরে বৃষ্টি পাঠিয়ে,একশ পঁচিশটা গোলাপের মধ্যে বেদনানাশক রশ্মিদিয়ে,বিছানা ভরে বেলী ফুল দিয়ে,নীল জোনাকের মাধ্যমে সে তার যন্ত্রণা উপশমকরার চেষ্টা করেছেকিন্তু সে সম্পূর্ণ সফলকাম হচ্ছিল নাসে বুঝতে পারে, তার নিজের শরীর দিয়ে হুসনা জাহানের ভেতরে লেপটে থাকা রশ্মিগুলো শুষে নিতেহবেসে আরও বুঝতে পারে, হুসনা জাহান তার নিজের অন্তরেলাঞ্ছনা,দুর্গতি,অসন্মান, বঞ্চনার যে শত শত বিষ জমিয়ে রেখেছে,সেটাও তাকেদূর করতে হবেআর এসব করতে গিয়ে আলোকুমার তার ভেতরে হুসনা জাহানের জন্যব্যাকুলতা,ভালো লাগার মতো মানুষের গুণাবলির অনেক কম্পন টের পায়কিন্তুতাকে চলে যেতে হবেসেই সময় চলে এসেছেতবে সে আবার আসবে হুসনা জাহানেরজন্যআলোকুমার চলে যায়

এই হলো আকিমুন রহমানের 'অচিন আলোকুমার ও নগণ্যমানবী'র গল্পএ আলোচনায় উপন্যাসটির ঘটনাংশ তুলে ধরে উপন্যাসটির সম্পর্কেএকটি সম্যক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছেকিন্তু উপন্যাসটিতে আরও চমকপ্রদঘটনা রয়েছে, রয়েছে অসাধারণ বিবরণ-----যার মধ্য দিয়ে লেখকের অসাধারণসৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তির প্রকাশ ঘটেছেউপন্যাসটিতে লেখক বাস্তব চরিত্রেরপাশাপাশি একটি অবাস্তব কল্পচরিত্রের মধ্যে মানবীয় গুণাবলিফুটিয়ে তুলেছেনযালেখকের উপস্থপনার বৈগুণ্যে অনন্য হয়ে উঠেছেআকিমুন রহমানের এ উপন্যাসটিতার অন্যান্য উপন্যাসের বিবেচনায় একটি অভিনব উপন্যাস

 

 

আলোচক : আহমদ আজিজ

       কবি ও সম্পাদক

 

 



সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান