নৈনিতালের দিনঃ কবিতার মহাসরণীতে নির্ভীক যাত্রা - তৌহিদুল আলম
$post->title

গ্রন্থের প্রচ্ছদ


মানব সমাজের সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-শিল্পকলার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেয়েছে সমাজে রাজনীতি, অর্থনীতির যত দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে তত দ্রুত হয় না বলা চলে কবিতার বাঁকবদলের গতি আরও মন্থর রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার যে রেনেসাঁ সৃজিত হয়েছিল, সেই ধারায় জীবনানন্দ পরবর্তী শামসুর রাহমান ছিলেন অধিক আলোচিত স্বাতন্ত্র্যধারার কবি এরই ধারাবাহিকতায় আরও অনেক কবিদের ভিড়ে মানিক বৈরাগীর মধ্যে লক্ষ্য করি তেমন এক স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য কবিতা অনেকেই লিখেন। অনেক কবিকে নিজের কন্ঠস্বর চিনতে লিখতে হয়েছে প্রচুর। কিন্তু মানিক কবিতালোকে ‘গহীনে দ্রোহনীল’ কাব্যের যে বীজ বপন করেছিলেন,  ‘শুভ্রতার কলঙ্ক মুখস্থ করেছি’ কাব্যে দেখি তার অঙ্কুরোদ্গম আর 'নৈনিতালের দিন' কাব্যে বিস্তৃত হয়েছে তার ডালপালা। এই বৃক্ষের ফল যখন পাঠক হাতে তুলে নেয়, তখনি বুঝতে পারে বৃক্ষের নাম 'মানিক বৈরাগী'। প্রেম ও প্রকৃতি, নাগরিক ও রাজনীতির প্রতি তার যে আগ্রহ পূর্ববর্তী গ্রন্থে আমরা দেখেছি, এর আরও বলিষ্ঠ নিরীক্ষণ দেখি ‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যে।

নৈনিতালের দিন’মানিক বৈরাগীর তৃতীয় কবিতা গ্রন্থ এখানে ৪টি পর্ব ভাগ আছে মোট কবিতার সংখ্যা ৬৯টি প্রথম পর্বের নাম ‘রোদের ভিড়ে একা’ এ পর্বে কবিতা আছে ৩০টি মুখবন্ধ কবিতা ‘নৈনিতালের দিন’ এই নামেই কাব্যের নামকরণ

‘নৈনিতাল’ নামের সাথে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে মহাকাব্য ‘মহাভারত’ এর একটি পৌরাণিক রাজ্য হিসেবে সেখানে আমরা দেখি রাজ্য গঠনের যে ইস্তেহার রাজা প্রদান করেছিলেন, তা আর বাস্তবায়ন করতে পারেননি অমাত্যবর্গের নৈতিক স্খলনের কারণে। স্বাধীনতা পরবর্তী বন্ধবন্ধু দেশ গঠনের যে বিপ্লব শুরু করেছিলেন তা বাস্তবায়িত না হওয়ার মুলে ছিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও অমাত্যবর্গের নৈতিক অধপতন। 'চাটার দল সব খেয়ে ফেলে' বঙ্গবন্ধুর এই উক্তিতেই সেই সত্য দৃশ্যমান। একাত্তর থেকে আজ অবধি এর কি খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে ? এই সত্যকে আবিষ্কার করতে গিয়ে মানিকের মানসলোকে জেগে উঠেছে আশা-হতাশা-যন্ত্রনা-দ্রোহ। তাই  স্বদেশকে চিত্রিত করতে গিয়ে মানিক 'নৈনিতাল' প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন।  

‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যনামের মধ্য দিয়েই আমরা মানিকের পুরাণ মনস্কতার পরিচয় পাই তার বন্ধুপ্রীতির কথা আমরা জানি এবং সতীর্থ সানিধ্যে তিনি উদারপ্রাণ আবার কখনো ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে পেয়েছেন অত্যধিক রূঢ় ব্যবহার ফলত নদীর পাড় ভাঙার মতো ভেঙ্গেছে কবি-হৃদয় এরই প্রতিফলন আছে 'নৈনিতালের দিন' কবিতায়। অনুযোগ-অভিমান-শ্লাঘার রসায়নে কবি প্রতিক্রিয়ার মার্জিত কাব্যভাষা এই কবিতা। কবি সহজ আয়াসে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন-

‘আমি বুঝে গেছি বহুকাল আগে

তুমি তোমরা আস তোমাদের প্রয়োজনে’

কবির এমন অকপট শ্লাগা স্বার্থবাদীদের আঁতে ঘা লাগার জন্য যথেষ্ট পরক্ষণে কবি তাদের সর্বপ্রকার বাণী বা কৈফিয়ত অবজ্ঞা করে বলেন-

‘কেউ আসুক চাইনি, চাইনি কেউ খুঁজুক মোরে’

কবিতার শেষ স্তবকে কবি ঐসব কুঠিল মানুষদের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মারফতি ভাষার,  যাকে প্রতীকীও বলা যায় আসলে দেহ-মন এক না হলে সত্যিকার অর্থে তাকে মানুষ বলা যায় না এই প্রশ্নই কবি দ্ব্যর্থহীনভাবে ছুড়ে দিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে কবির ভাষায়-

‘কায়া আছে ছায়া আছে

কলব গেছে কই

দেহ কলব এক না হলে

বানর গোত্র কই’

মানিক 'বানর গোত্র' শব্দদ্বয় মানব জাতির প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছেন, যা আমাদের বিজ্ঞানী ডারউইনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। তিনি গবেষণা করে দেখিয়েছেন, আরও অনেক প্রাণীদের মধ্যে বানর ও মানুষ একই 'প্রাইমেট' ভুক্ত। এখানে মানিক স্বীয় অভিজ্ঞতার যে অভিযোজন ঘটিয়েছেন, তা কবিতাকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে।

 

‘চিয়ার্সঃ অধরা অধরে নহর শুকায়’- কবিতাটির শিরোনামে দেখি নন্দিত কাব্যিক আবহ বলা যায় কবির কাব্যশৈলীর স্বাক্ষর কবিতাটি স্বনামধন্য কবি হাফিজ রশিদ খানকে কবিতাটি উৎসর্গ করা হয়েছে আধুনিক কবিরা স্বপ্নচারী নয় এমন কি অনুপ্রেরণালব্ধ সত্যের পশ্চাৎধাবনও তারা করেন না দৈনন্দিন জীবনের বিবিধ বস্তুর প্রত্যক্ষলব্ধ অভিজ্ঞতাকে স্বীয় প্রজ্ঞায় কবিতার উপজীব্য করে তুলেন ‘অর্কেস্ট্রা’ কাব্যের ভূমিকায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন-‘স্বপ্নচারী পথিককে যেমন তিনি ভয় পান, তেমনি অনুপ্রাণিত কবিকেও’ এখানে আমরা লক্ষ্য করি, নিছক কল্পলোকে বিচরণ করেননি মানিক স্বপ্নতাড়িত কাতরতাও তাকে স্পর্শ করেনি তিনি অধরা প্রেম চিত্রিত করতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতার উপর তাই একটি চুমুর অভাবে তার ‘শ্রাবণের ভেজা সৈকতে’ ভিজা হয়না, বসা হয়না কিটকট চৌকিতে, এমন কি ‘ইলিশ ভাজার সাথে দুচোয়ানির চিয়ার্স’ এর আনন্দও কবির জীবনে আর এলো না

যুগে যুগে আমরা দেখেছি কবিগণ প্রেমকে কতো বিচিত্রভাবে কবিতায় চিত্রিত করেছেন ইরানি কবি তো প্রিয়তমার চিবুকের একটি তিলের জন্য সমরকন্দ বিলিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন মহাদেব সাহাও ছিলেন প্রেমকাতর ‘চিঠি দিও’ কবিতায় তাকে অসম্ভব কাতরগ্রস্থ হতে দেখি প্রেয়সীর চিঠি পাওয়ার জন্য মানিকের প্রেম উচ্ছ্বাসে তেমন হিন্দোলিত হয়না তার মধ্যে দেখতে পাই সুশীল পরিমিতবোধের প্রকাশ তাই আষাঢ়-শ্রাবণের ধারাজল এবং বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির সামনেও তার অধর শুকিয়ে আসে প্রিয়তমার অনুপস্থিতিতে তারপরও কবি প্রিয়তমাকে মনে করিয়ে দেন অঙ্গীকারের কথা এই কবিতার তৃতীয় স্তবকের শব্দগুলো তাদের অঙ্গীকারের অতন্দ্র সাক্ষী বলে মনে হয় যেমন-

‘কথা ছিল মানকচু পাতার ছাতায় লুকাবো আমরা

খালি পা, ভাঁটফুল, ঝাউবীথি, মাসির গরম পিঁয়াজু,

মাধুরী রাখাইনের দুচোয়ানি

থুড়ি থুড়ি চিয়ার্সির পিয়ারিতে

ঘোলাটে হবো চোখে ও মুখে’

চূড়ান্তভাবে আশায় আশায় বেড়ে উঠে কবির বিরহ, প্রেম থেকে যায় অধরা

 

বলা হয়ে থাকে আধুনিক কালে শিল্পের স্তব্ধতা নেই অর্থাৎ শিল্প গতিময় কবিতার ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে কেননা একযুগ থেকে অন্যযুগে ঘটে কবিতার প্রসার যুগের ঘটনা পরম্পরাকে স্পর্শ করা, যুগসত্য ও প্রাণধর্মকে আবিষ্কার করা বা করবার চেষ্টা করা হচ্ছে কবির দায়িত্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনীতির নামে মানুষের উপর হিংসাত্মক নিষ্ঠুরতা ইত্যাদির প্রভাব কবি চৈতন্যে প্রবলভাবে নাড়া দেয় ফলত কবি হন যুগের সাক্ষী ‘জ্বলন’ কবিতায় মানিক তেমন একটি যুগসত্যকে তুলে ধরেছেন ক্ষমতার অন্ধমোহে বিগত বছরগুলোতে জাতীয়তাবাদী ও স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মান্ধগোষ্ঠী জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে দেশে যে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল, তা দেখে কবি হয়েছেন ভীষণ মর্মাহত এরই প্রতিবাদ স্বরূপ তিনি নিজেই যেন জ্বলছেন বিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির ন্যায় অগ্নিদ্বগ্ধে অঙ্গার হওয়া মানুষদের তিনি তুলনা করেছেন কাঠ-কয়লার স্তূপের সাথে মানুষ পুড়িয়ে মানুষ যে স্বপ্ন দেখে কবির দৃষ্টিতে তা অনর্থক তাই তিনি সখিকে সতর্ক করছেন এই বলে-

‘আমি সেই বিশুদ্ধ বিসুভিয়াস

পুড়িয়ে নতুন সম্ভাবনা দিই,

মানুষ স্বপ্ন দেখে মানুষ পুড়িয়ে

কাছে এসো না, পুড়ে যাবে সখি’

এমন রাজনৈতিক অবক্ষয়ের পরও কবি ভুলে থাকেননি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস ২৫শে বৈশাখের কথা কোন আড়ম্বর আয়োজনের সুযোগ সামর্থ্য না হলেও বালিয়াড়ির অন্ধকার চৌকিতে বসে নিভৃতে একাকি তিনি স্মরণ করছেন কবিগুরুকে তার এই স্মরণমুহূর্তে প্রাসঙ্গিকভাবে এসে পড়েন আরও একজন, তিনি ‘মনুহু’ কে এই ‘মনুহু’? তিনি আমাদের জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা এক সময় হয়তো কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা আরও অনেকের মতো মানিককেও স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বভূমে কবিতার মান মন্দির হবে, উৎসব হবে তাঁর প্রবল উদ্যম ও উৎসাহে যে জোয়ারি স্রোত ছিল, সেখানে আজ ভাটির মন্থর টান ‘মনুহু’ আর আসেন না হতাশগ্রস্থ মানিক তবুও আশায় বুক বাঁধেন, ‘মনুহু’ একদিন আসবেন কারণ তিনি যে চাঁদ সওদাগরের পুত্র বলা যায় ২৫শে বৈশাখকে উপজীব্য করে দায়িত্ববান অগ্রজ কবির নির্লিপ্ততায় মানিকের চিত্তপ্রদাহের প্রকাশ ‘রজনী ও যামিনীর আলাপন’ কবিতাটি তাই বেদনা ভারাক্রান্ত মানিকের কন্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠে-

‘কবিতা মঞ্চটি এখন নীরব, ঝাউয়েরা সরব

চা খেতে খেতে কুয়াশা মিশ্রিত বাতাসের আর্দ্রতার লোবান চুষি’

 

কবিতার এক অপরিহার্য প্রকরণ হচ্ছে মানুষ কবি যেমন মানুষ, তেমনি তিনি যাদের নিয়ে ভাবেন তারাও মানুষ মানুষ আছে বলেই প্রকৃতি সুন্দর কবি নজরুলের কণ্ঠে ছিল মানুষের জয়গান পৃথিবীর সবকিছু তুচ্ছ করে তিনি মানুষকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন বলেছেন-‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ বিষ্ণু দে মানুষকে আবিষ্কার করেছেন প্রাত্যাহিক কর্মব্যস্ততায় কর্মযাত্রায় মানুষের কোনো অবসর নেই এবং কর্মের মাঝেই যে মানুষের পরিত্রাণ তিনি তা অনুসন্ধান করেছেন ‘প্রকৃতি আমি মানুষ ভালোবাসি’ কবিতায় দেখি মানিকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন এখানে তিনি মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন তিনি মানুষকে ভালোবেসে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তারই সাবলীল স্বীকারোক্তি আছে এই কবিতায় মানুষকে ভালোবেসে তিনি হয়েছেন বহু ষড়যন্ত্রের শিকার হুলিয়া, জেলজীবন, মৃত্যু-পরোয়ানা এবং আরও কতো গঞ্জনা তাকে সয়ে নিতে হয়েছে আবার মানুষের ভালোবাসাও তিনি পেয়েছেন তিনি মানুষের দ্বি-দ্বান্দ্বিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকেই স্বীয় দক্ষতায় চিহ্নিত করেছেন তারপরও তিনি মানুষের ভেদাভেদ ভুলে মানুষের জন্য লড়াই করেন এখানে কিঞ্চিৎ হলেও আমাদের কবি নজরুলের সাম্যবাদী মনস্কতার কথা মনে পড়িয়ে দেয় মানুষের আদর-স্নেহ, অভিনন্দন-শুভেচ্ছা পেয়েছেন বলেই তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন, তার কবি হয়ে উঠার মূলে মানুষের অবদানের কথা যেমন-

‘আমি মানুষের কোন কোন অবদান অস্বীকার করব

মানুষকে ভালোবাসি, মানুষের জন্য লড়ি’

 

‘রৌদ্র করোটিতে’ আমরা শামসুর রাহমানকে রৌদ্রদগ্ধ হয়ে পুরো শহর চষে বেড়াতে দেখেছি ‘রোদের ভিড়ে একা’ কবিতায় মানিকও প্রচণ্ড রোদের ভিড়ে শহর ঘুরে নির্মাণ করেন আত্ম বিরহ পুরাণ আজকাল ভোরের হাল্কা রোদও প্রচন্ড তাপদাহ ছড়ায় তিনি বিজ্ঞানের দৃষ্টান্ত টেনে বলেন, এটা জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল এর দায়-দায়িত্ব মানুষের উপর বর্তায় কেননা মানুষ হরদম ধ্বংস করে চলেছে পরিবেশ ফলে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য তাই বেড়ে উঠে কবির মনস্তাপ রোদ ও অসংখ্য মানুষের ভিড়ে কাটেনা তার নিঃসঙ্গতা তবুও তিনি নির্ঘুম চোখে লিখে যান মানুষের প্রয়োজনে কবির ভাষায়-

‘প্রচন্ড রোদের ভিড়ে জনজটে তবুও নিঃসঙ্গতা

আমাকে ঘিরে নির্ঘুম চোখে পাহারা লেখা মানুষের প্রয়োজনে’

 

‘নৈনিতালের দিন’ কাব্যের দ্বিতীয় পর্বের নাম ‘খুন হয়ে যায় তোমার অতীত’ ৮টি কবিতা দিয়ে এই পর্বটি সাজানো হয়েছে এই পর্বের প্রথম কবিতার নাম ‘পুরুষ’ আমাদের সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক মোদ্দাকথা সারা পৃথিবীতে জারি আছে পুরুষতন্ত্র পুরুষের স্বভাবধর্ম সর্বক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করা নারীর উপরও চলে তাদের আধিপত্য বিভিন্ন শাস্ত্র পুরুষকে দিয়েছে নারীর চেয়ে অধিক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ফলে নারী হয়ে পড়েছে পুরুষের অধীন এবং কখনও দাসী গোত্রের আর পুরুষ হয়েছে স্বেচ্ছাচারী এই কবিতার প্রথম স্তবকে তেমন এক পুরুষের চিত্রই দৃশ্যমান হয়ে উঠে তাছাড়া ক্ষমতার মসনদে যদি নারীও অধিষ্ঠিত হয়, তিনি আর নারী থাকেন না তিনিও হয়ে পড়েন পুরুষ সমাজের প্রতিনিধি আর নারীবাদ হয় উপেক্ষিত এবং নারী হতে পারে না শৃঙ্খল মুক্ত এমন দশাগ্রস্থ বৈষম্যময় সমাজে বাস করার কারণে কবির মধ্যে জেগে উঠে ক্ষোভ ও আক্ষেপ তাই তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছেন অহিংস মানুষ ও কবি হয়ে কবির ভাষায়-

‘কবি তুই কবিই থাক,

কবিতার সরস্বতী তোকে ছাড়বে না তুই অহিংস মানুষ থাক’

কখনও কখনও দেখা যায় ভাষার বলিষ্ঠতা কবিতার সৌন্দর্যহানী ঘটায় কবি যথেষ্ট সচেতন না হলে এর থেকে উত্তরণ দূরহ হয়ে পড়ে এই কবিতায়ও বক্তব্যকে প্রধান্য দিতে গিয়ে মানিক খুব সচেতন ছিলেন না বলে প্রতীয়মান হয় তবে তিনি এখানে থেমে থাকেন নি উত্তরণের পথ খুঁজে নিয়েছেন ‘গ্লানি’ কবিতায় এখানে তিনি নারীকে চিত্রিত করেছেন এক দ্রোহী সত্ত্বা হিসেবে বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম সেই দ্রোহী নারীদের প্রতিনিধি, যাদের মানিক তুলনা করেছেন ‘প্রতিবাদের বহ্নিশিখা’ হিসেবে নারীর অবক্ষয়, অধপতন, চরমপন্থা ও উগ্র মৌলবাদে জড়িত হওয়া, এমন কি আত্মঘাতী জঙ্গি হওয়ার দায় পুরুষ-সামজ ও রাষ্ট্র কিছুতেই এড়াতে পারেনা এই গ্লানি বুকে চেপে মানিক হয়েছেন জর্জরিত তাই তিনি আঘাত করেছেন সনাতনী পুরুষ-সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়, কবি হৃদয়ে লালন করেন মার্ক্সিয় সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা

 

প্রখ্যাত ভাস্কর নভেরা আহমদকে নিয়ে রচিত কবিতার নাম ‘নভেরা’ এই কবিতারও মূল উপজীব্য মানুষ এবং মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ ‘প্রকৃতি আমি মানুষ ভালোবাসি’ কবিতার সাথে এই কবিতার ভাবগত মিল খুঁজে পাই ‘খুন হয়ে যায় তোমার অতীত’ নামটি বেশ আকর্ষণীয় হলেও কবিতাটি রচিত হয়েছে কবির অনুজ এক ছাত্রনেতার উদ্দেশ্যে ১৫ আগস্ট সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কবি বন্ধুকে সান্তনাস্বরূপ বলেছেন-

“‘যারা আখের গোছাতে চায়, গুছিয়ে নিক তারা

‘দুঃখ করো করো না বন্ধু, বাঁচো’

খুন হয়ে যাক তোমার অতীত”

বিশেষ উদ্দেশ্যে রচিত বলে কবিতাটি পাঠক মনে কোন কাব্যিক আবহ সৃষ্টি করে না, কেবল ইতিহাসের সংবাদ দেয় মাত্র

সক্রেটিস বলেছিলেন-Know the self. অর্থাৎ নিজেকে জান কিন্তু আমরা ক’জন আর নিজেকে জানি ! জানলেও তা প্রকাশ করার সৎসাহস থাকেনা কিন্তু মানিক ব্যতিক্রম ‘মনুষ্যচারী’ কবিতায় তিনি নিজেই দিলেন তার চারিত্রিক সনদ শারীরিক-মানসিক ভাবে অসুস্থ ও আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত কবি ২০১৪ সালে ঘোষণা দিলেন আত্মহত্যা করবেন অবস্থান নিলেন কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদীতে কিন্তু সে যাত্রায় আত্মহননের পথ থেকে তিনি ফিরে আসেন সে অন্য ইতিহাস আমরা এখানে কবিতার প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করব আত্মহননের ব্যর্থতায় তার মনে কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে তিনি সেগুলোর উত্তর খুঁজেছেন ‘মনুষ্যচারী’ কবিতায় নিজেকে তুলনা করেছেন জীবনানন্দের সাথে কারণ জীবনানন্দের জীবনেও ঐ রকম এক ট্র্যাজেডি আছে তিনি ট্রামের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন এই কবিতায় মানিক নিজের চরিত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, জীবনানন্দ যা করতে পেরেছিলেন মানিক তা করতে পারেন নি আশা-আকাঙ্ক্ষা, জীবনের প্রতি লোভের বৃত্ত ভাঙ্গতে পারেন নি বলে মানিকের কন্ঠে দেখি সগোতক্তি-

‘মানুষ, ব্যক্তি, কবি জীবন দাশ সহজলভ্য নয়

আমি কী রকম সহজলভ্য হয়ে গেছি

জীবনের লোভে হাতপাতি ধারে ধারে’

 

‘মনুষ্যচারী’ কবিতায় আমরা যে অনুশোচনা-দগ্ধ কবিকে পাই, ‘সেই সব মানুষেরা ফিরে আসে’ কবিতায় দেখি তার বিপরীত চিত্র এখানে কবির মধ্যে জেগে উঠে দ্রোহ ও প্রেম কবিতাটি বেশ দীর্ঘ দীর্ঘ কবিতার বেলায় দেখা যায় কবি যথেষ্ট সচেতন না হলে বাঁধন আলগা হয়ে যায় কবি নজরুলের দীর্ঘ কবিতাগুলোতেও সেই সমস্যা আছে শামসুর রহমানের দীর্ঘ অনেক কবিতা পাঠকের কাছে ক্লান্তিকর তবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন মানিকের এই কবিতাটিও পাঠ বিচারে উত্তীর্ণ এ কথা বলা যায় নিজের জীবনের নিগুঢ় সত্যকে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ইতিহাস খ্যাত সেই সব নির্যাতিত-নিপীড়িত ব্যক্তিদের ফিরিস্তি দিয়েছেন সক্রেটিস, গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, শমসেত তাবারেজি, ওমর খৈয়াম, মনসুর হল্লাজ, ইবনে সিনা, আবু হানিফা, খনা, রাজা রাম মোহন, ঈশ্বরচন্দ্র, নজরুল, গোর্কি, হুমায়ূন আজাদ, শামসুর রাহমান, আহমদ ছফা, জাফর ইকবাল প্রমুখ এর জীবন-কর্ম-ত্যাগ মানিককে উজ্জীবিত করেছে ফলে তার ভেতরে জেগে উঠেছে অসম্ভব দ্রোহ ও আপোষহীন এক সত্ত্বা তাই ধর্মান্ধ ধর্মব্যবসায়ী, দলদাস ও স্বার্থবাদীদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এই বলে-

'পথ যদি রুখে দাঁড়াও চাপাতি বল্লম হাতে

পথ যদি রুখে দাঁড়াও লাল কাস্তে আর ছোরা হাতে

পথ যদি রুখে দাঁড়াও পাগলা শহিদ অভি মিলে

পথ যদি রুখে দাড়াও স্রোতে ভেসে আসা লগি বৈঠা হাতে

আমি যিসাস হবো, জোড়াস হবো না'

এইখানে শব্দ-বিন্যাস ও ছন্দের যে প্রবাহ ছড়িয়ে দিয়েছেন তা সহজেই পাঠককে উদ্দীপ্ত করে।

 

তৃতীয় পর্বের নাম 'মৃত্যুর গান'। এই পর্বেও ৮টি কবিতা আছে। 'সং অব ডেথ-৩' থেকে 'সং অব ডেথ-৬' শিরোনামে ৪টি কবিতা আছে। কবিতাগুলোর মূল উপজীব্য মৃত্যু চিন্তা ও স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের অভিলাষ। মধ্যবয়সে কবির মানসজগতে যে রূপান্তরের হওয়া বইছে তা বিস্ময়কর। আমরা শামসুর রাহমানের পৌঢ়ত্বে রচিত কবিতাগুলোর মধ্যে সেইরূপ একটা আবহ লক্ষ্য করেছি। এইসময়ে রচিত কবিতাগুলোতে বারবার মৃত্যু ও কবরের কথাই ব্যক্ত হয়েছে। মনো চৈতন্যে মানিকের যে দ্বিমুখী দ্বান্দ্বিক যাতনা 'সং অব ডেথ-৩' কবিতায় তা প্রতিভাস হয়ে উঠেছে। হিন্দুশাস্ত্র মতে কলিকাল হচ্ছে শেষকাল আর মুসলমানশাস্ত্র বলছে একালেই ঘটবে কেয়ামত। তাই কেয়ামত ঘটবার পূর্বে স্রষ্টার কাছে আশ্রয় চেয়ে মানিকের মন কাঁদছে এই বলে-

'এই কলিকালে কেয়ামত ঘনিবার পূর্বে

আমার চিরায়ত মন কাঁদে এবাদতে

ওফাত দাও খোদা, না হয় নিজেই করিব

প্রাণত্যাগ'। 

'বুলবুলের নূপুর নিক্কন' কবিতায় ললিতকলার প্রতি মানিককে খুব নিষ্ঠাবান মনে হয়। তদসংশ্লিষ্ট খ্যাত শিল্পীদের কথাও কবিতায় উঠে এসেছে। জননেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর ঐতিহাসিক জানাজার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে 'বুকে আছে ইহে নেই' কবিতায়। 'এই অশ্রু রোধের সাধ্যকার' কবিতায় জননেতা প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সৎ ইমেজের কথাই বিধৃত হয়েছে। এই পর্বের শেষ কবিতা 'দেহ যাতনা'। প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ূন আজাদ উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছিলেন। তাঁর এই শারীরিক যন্ত্রণাকে স্মরণ করে রচিত হয়েছে এই কবিতাটি। মুক্তকন্ঠ চর্চার জন্য এই কবিতা প্রেরণাদায়ক হিসেবে বিবেচিত হবে। কবির প্রেরণাদায়ক উক্তিটি স্মরণযোগ্য-

'সক্রাতাস থেকে দীপন অস্থিমজ্জায় লড়াই করে

মুক্তবাক মানবের তরে…….'

 

চতুর্থ পর্বের শিরোনাম 'মঞ্চের অনল বর্ষণে'। এই পর্বে কবিতা আছে ২৩টি। এই নামের মধ্যেই মানিকের রাজনৈতিক মনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রন্থের মলাটে ছোট্ট পরিসরে মানিকের কর্ম ও রাজনৈতিক জীবনের পরিচয় আছে। তা থেকে জানা যায় তিনি ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। সুতরাং তার মানসলোকে কিছুটা হলেও দলগত প্রভাব থাকবে বৈকি ! আর রাজনীতি এমন একটা জটিল বিষয়, একে কবিতায় নিয়ে আসতে গেলে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হয়।

 

কলাকৈবল্যবাদীদের ধারণা কবিতা ও রাজনীতির অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। এই দ্বিতকে এক করতে গেলে কবিতা হয়ে পড়বে স্লোগান সর্বস্ব। বুদ্ধদেব বসুও ছিলেন কবিতায় রাজনীতির অনুপ্রেবেশে ঘোর বিরোধী। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের এই ধারণা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ে। আমরা দেখেছি নজরুল ও সুকান্তের মধ্যে প্রখর রাজনৈতিক চেতনা। তাঁদের এই ঘরানার কবিতাগুলো বেশ সমৃদ্ধ। প্রথম কাব্যগ্রন্থে শামসুর রাহমানকে পেয়েছি বিবরবাসী স্বপ্নচারী কবি হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠলেন নিপীড়িত ও সংগ্রামী মানুষের কন্ঠস্বর এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। ফলে আমরা পেয়েছি প্রচুর জনপ্রিয় রাজনৈতিক ধারার কবিতা। তিনি রাজনৈতিক চেতনাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন স্বদেশ থেকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে। কোন বিশেষ দলের প্রতি প্রত্যক্ষ অনুরাগ ছিল না বলে তাঁর রাজনৈতিক ধারার কবিতাগুলো সার্বজনীন রূপ পায়।   কবিতায় মানিকের রাজনৈতিক চেতনাও স্বদেশের গণ্ডির ভেতর আবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক রাজনীতি সম্পর্কেও তিনি অত্যন্ত সচেতন। কেননা কোনো দায়িত্ববান কবি নির্লিপ্ত থাকতে পারেন না। 'গণহত্যা' কবিতাটি এরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে বিবেচিত হতে পারে। এই কবিতায় উঠে এসেছে জাতিসংঘে শক্তিধর রাষ্ট্রের অমূলক ভেটো প্রদান, আরাকানে গণধর্ষণ, একাত্তরের গণহত্যা, ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনে মা ও শিশু হত্যার মতো ঘটনাবলী।

 

'বিশ্বায়ন', 'গণক্ষুধা','যমজ বটবৃক্ষ','পথিক','দেহখানা','শেখ মুজিবের গীত গাই','মাথিনের কান্না, ঘুমাতে দেয় না','মাঠ কর্মীর চোখ','বঙ্গপিতার লন্ঠন','ফিলিস্তিনি বিজয় কেন আসে না','দুর্বৃত্তের পকেটে রাজনীতি','জেগে আছি আপা','প্রতারক বিচারযন্ত্র','লাকি','রাজনীতি আসবেই গুপ্তধনের কাছ' প্রভৃতি কবিতায় আশা-হতাশা-দ্রোহ মিলিয়ে মানিকের প্রখর রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। পাঠকদের জন্যে এখানে কিছু পঙক্তি উদ্ধৃত করলাম। যেমন-

''ভাদাইম্যা পাগলের সাথে বেঁধেছ বাঁধন

শাস্ত্রে কয় 'বিধির বিধান যায় না খন্ডন'

ব্যর্থ রাজনীতির অনলে জ্বলে জীবন

জীর্ণ সমাজ রুগ্ন রাষ্ট্রে অপুষ্ট জনগণ''(কবিতা-'গণক্ষুধা')

                  ---------

'দেহখানা বড় লোভী শুধু শুধু জীবন খুঁজে ফিরে

অচিন পাখিটি নাছোড় নচ্ছার লটকে থাকে বেলাজ

কোথাও কোন জীবন দেখি না, শুধু মায়া-মরীচিকা

অতঃপর স্বপ্ন-বেদনার আশাই কি ?' (কবিতা-'দেহখানা')

 

পার্বত্য এলাকায় আদিবাসী সংকট দীর্ঘদিনের। সমতলি-পাহাড়ি দ্বন্দ্ব এখনো জিইয়ে আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সূচিত হয়েছিল ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি। কিন্তু চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন আজো হয়নি। ফলে মুক্তি ও স্বস্তি মিলেনি আদিবাসী জীবনচর্যায়। 'চুক্তিতে মুক্তি কত দূর' কবিতায় মানিক এই প্রশ্নই তুলেছেন বেশ দৃঢ়তার সাথে। তিনি বলেন-

'চুক্তিতে এখনো মুক্তি মিলেনি

আবারো কি ফিরে যাব নাকি

আমরা স্বশস্ত্র সংগ্রামী'?

সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিলে আমাদের আর কোন অর্জন থাকে না। আমরা হয়ে পড়ব দেওলিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের কবিরা সেই দেওলিয়াত্ব থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছেন। তাঁরা দায়িত্ব নিয়েই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কবিতায় তুলে এনেছেন। মানিকের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও পিতৃ মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা জেনেছেন। সেই স্মৃতিকে পুঁজি করে রচনা করেন 'অমরপুরে বাবার কাছে' ও 'রক্ত থেকে পাওয়া' কবিতাদ্বয়। বঙ্গবন্ধুকে মানিক দেখেননি, কেবল তাঁর কথা জেনেছেন বাবার কাছ থেকে। তার বাবা ছিলেন মুজিববাদে বিশ্বাসী। আর সেই বিশ্বাস মানিক পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। 'অমরপুরে বাবার কাছে' কবিতা হিসেবে উৎরে গেলেও 'রক্ত থেকে পাওয়া' যেভাবে শুরু করেছিলেন তার ব্যত্যয় ঘটেছে কবিতার শেষের দিকে এসে। শেষের কিছু অংশবিশেষ স্লোগানের মতো শুনায় পাঠকের কানে। 

 

শব্দ হচ্ছে কবিতার প্রধান উপাদান। ইটের উপর ইট না বসালে যেমন ইমারত হয় না, তেমনি পরিকল্পিত শব্দ-বিন্যাস ছাড়া উৎকৃষ্ট কবিতা হয় না। আধুনিক কবিতায় যতটা না ছন্দ থাকে তার চেয়ে অধিক থাকে শব্দ বিন্যাসের কলা-কৌশল। ফরাসী কবি মালার্মে বলেছেন, শব্দ হচ্ছে বক্তব্য প্রকাশের পরিসীমা। তিনি দৈনন্দিন প্রচলিত শব্দকে কবিতার উপযোগী করে ব্যবহার করেছিলেন। এজরা পাউন্ডের কৌশল ছিল ইউরোপের মধ্যযুগের কাব্য থেকে শব্দ আহরণ। কবি ওমর আলী, মোহাম্মদ রফিক, আল মাহমুদও কবিতায় লোকজ শব্দের ব্যবহার করেছেন। মানিকও সচেতনভাবে শব্দ আহরণ করেছেন মিথ, আরবি, ফার্সি, লোকজ ও প্রতিদিনের ব্যবহার থেকে। যেমন-দুচোয়ানি, কিটকট, চিয়ার্সি, নহর, মৌতাত, ধোঁই পিঠা, কুদঙ গুহা, তাড়িখোলা, ফানা, ইশকে সুফিয়ানা, লোবান, কামোষ্ণ, কাটমোল্লা, রঙচঙ্গা, মুখবই, নফস, ইলহাম, জনজট, হঁলা, জলরেণু, ওফাত, গুজরি, মান্না-সালোওয়া, ওরস, ভাদাইম্যা, চিনাজোঁক, বালুচিকা, গোমরাহি ইত্যাদি। কবির শব্দজ্ঞান ও ব্যবহারের দক্ষতা নিঃসন্দেহে কবিতাকে সমৃদ্ধ করে, যা আমরা এই গ্রন্থে অবলোকন করেছি। উপমা-রূপকের সাবলীল প্রয়োগ এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অনুরণনে 'নৈনিতালের দিন' কাব্যকে সুপাঠ্য গ্রন্থের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

 

কবি ও শিল্পিকে বলা যায় মানব চৈতন্যের অগ্রপথিক। তাঁরা বস্তুর বর্ণ-বৈচিত্র, মানুষের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, আগ্রহ, যন্ত্রণা-প্রশান্তি, সমাজ-রাষ্ট্রের অবক্ষয় সহজেই অনুভব করতে পারেন। মোটকথা তাঁরা একটি জাতির চূড়ান্ত সচেতনতাকে ধারণ করেন। তাই 'নৈনিতালের দিন' কাব্যকে কোন আকস্মিক রচনা এ কথা বলা যাবে না। গ্রন্থ পাঠে মনে হয়েছে এটি মানিকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফসল। যেন স্বভুমে লাল পোস্টার হাতে কবিতার মহাসরণীতে মানিকের নির্ভীক যাত্রা।  

 

কিছু কিছু মুদ্রণজনিত ভুল-ভ্রান্তি ধর্তব্যের মধ্যে না নিলে, 'নৈনিতালের দিন' গ্রন্থকে একটি ভাল প্রকাশনার স্বীকৃতি দেয়া যায়। এটি প্রকাশিত হয়েছে 'খড়িমাটি' থেকে, প্রচ্ছদ করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ। বিনিময় মূল্য- ২০০ টাকা।


লেখক-

তৌহিদুল আলম

কবি-প্রাবন্ধিক-গল্পকার।      


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান