অন্তিম পলাতক ULTIMATE FUGITIVE ( একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটগল্প ) - সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক
$post->title

 

             

০১.১.

একজন দীর্ঘদেহী মধ্যবয়স উত্তীর্ণ পুরুষ প্রচণ্ড অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝড় বৃষ্টির একটি রাতের প্রায় শেষ দিকে সমান্তরাল দুটি রেললাইনের মাঝ দিয়ে প্রবল বেগে দৌড়ে চলেছে সামনের দিকে, শুধুই সামনের দিকেডান, বাম অথবা পশ্চাৎ- কোনো দিকেই তাঁকাবার প্রয়োজন মনে করছে না, এমন কি রেল লাইনের মাঝ দিয়ে বেছানো রাশি রাশি পাথরের টুকরো আর স্লিপার গুলির দিকেও মোটেই ভ্রুক্ষেপ করছে না- অথচ যেগুলি যে কোনো মুহুর্তে ওর জন্যে মারাত্মক দূর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে পারে ও ওই পাথর গুলির ওপরসে ক্ষেত্রে আহত হতে পারে ও, ক্ষত বিক্ষত হয়ে যেতে পারে, অধিকন্তু দ্রুতগতির ট্রেনও এসে পড়তে পারে যে কোনো মুহুর্তে- বিচিত্র কিছুই নয়তবুও ও শুধু দৌড়চ্ছেইমাঝে মাঝে চমকিত বিদ্যুতের আলোতে যতটুকু দেখা যায় সে টুকুই যেন ওর খুব বড় ভরসাএবং এ ভরসা টুকুর ওপর ও যে দারুণ আত্মবিশ্বাসী সেটি ওর দৌড়োনোর ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায়মুষলধারে অব্যাহত বৃষ্টিপাত, এর ওপর বাতাসের একটানা প্রচণ্ড গতিবেগ, বিদ্যুত চমকের পরপরই মেঘের ভয়ংঙ্কর আকাশ বিদীর্ণ করা গর্জন- কোনো কিছুই যেন ওর দৌড়োনোর গতিকে রোধ করতে পারছে নাবরং কখনও কখনও মনে হচ্ছে দৌড়োনোর গতি যেন ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে ওরকোথাও কোনো জন মানবের চিহ্ন নেই, নেই কোনো হিংস্র জীব জন্তুর অস্তিত্ব- যারা কিনা ওকে অকস্মাৎ আক্রমণ করে বসতে পারে- তারপরেও ও ভীত, ভীষণ রকমের ভীত- কিন্তু এসব কারণে নয়, ওর ভীতির জায়গাটি অন্যখানেএত ঝড় বৃষ্টির উন্মাদ তা-ব, বাতাসের এত প্রবল তোড়, কোথাও নিশ্চিত বিদ্যুত পতনের ধ্বংসলীলা- এ সবের কোনো কিছুতেই ওর বিন্দুমাত্র ভীতি নেইভীতি কেবল ওর পশ্চাৎ-তাড়নাকেওর মনে এ বিশ্বাস স্থির হয়ে গেঁথে গেছে যে, পেছন থেকে দুর্বার গতিতে ওকে তাড়া করে ধেয়ে আসছে অশরীরি একটি ভয়াল মৃত-আত্মা’- ওরই মৃত্যুদূত হয়ে- যে কিছুতেই বাঁচতে দেবে না ওকেকিন্তু কেন মৃত্যু ওকে তাড়া করছে, কেন ওকে বাঁচতে দেবে না- সেটি কেবল লোকটিই জানেআর কারও পক্ষেই সেটি জানা সম্ভব নয়আত্মাটি নারী কি পুরুষের তা-ও জানা সম্ভব নয় লোকটি নিজে থেকে না জানালে   

 

লোকটি পঞ্চাশোর্ধসুঠাম দেহ, দীর্ঘকায়শরীরের রং একেবারে ফর্সা না হলেও কালো তো নয়ই, শ্যামলও নয়বলা যায় মোটামুটি শ্যামল আর ফর্সার মাঝামাঝিলোকটির পড়নে সাদা ফুলপ্যান্টের সাথে ম্যাচ করে কালো শার্ট ইন করাশার্টের ওপর হাটু অবধি প্রলম্বিত অর্ধ-হাতা একটি সাদা এ্যাপ্রনএ্যাপ্রনটি ইঙ্গিত করে লোকটি একজন চিকিৎসকহ্যাঁ, আসলেও তাই- লোকটি প্রকৃতই একজন উচ্চ শিক্ষিত চিকিৎসক এবং Surgery and Medicine Specialist.Operation Theatre থেকে অতিদ্রুত বেরিয়ে কাউকে কিছু না বলে, ডান বাম কোনো দিকেই না তাঁকিয়ে কতকটা যেন উদভ্রান্তের মতো সোজা সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছেচোখে মুখে স্পষ্ট একটি ভীতির ছাপহাঁটতে হাঁটতে ভীতিসঙ্কুল দৃষ্টি নিয়ে পেছন ফিরে দুবার তাকাবার চেষ্টা করেছে লোকটিএরপর হাঁটার গতি বৃদ্ধি পেয়েছে ক্রমান্বয়িকভাবেএক পর্যায়ে এসে হাঁটার গতিটি  দৌড়ের গতিতে রূপান্তরিত হয়েছেকিন্তু আর পেছন ফিরে তাকায়নি লোকটিবলা যেতে পারে উর্দ্ধ-গতির দৌড়ের কারণে পেছন ফিরে তাকাবার আর কোনো সুযোগই জোটেনি ওর  

 

এক সময় ধীরে ধীরে দৌড়ের গতি স্তিমিত হয়ে আসে লোকটিরশ্বাস প্রশ্বাসের গতিও একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে আসেলোকটি পৌঁছে যায় একটি Ship-Yard-G| IB Yard এ সাধারণতঃ জাহাজ মেরামত করা হয়আবার অর্ডার থাকলে অর্ডার অনুযায়ী নতুন জাহাজ নির্মাণও করা হয়আকাশে প্রভাতী সূর্যের উদিত হবার সময়ও হয়ে গেছেকিন্তু অবিরাম বৃষ্টি আর মেঘাচ্ছন্ন আকাশের কারণে প্রভাতী সূর্যের অপরূপ মোহনীয় মাধুর্যটি প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না লোকটিরযতবার তাঁকাবার চেষ্টা করে পূব আকাশের দিকে ততবারই ব্যর্থ হতে হয় লোকটিকেদেখা মেলে না পূব আকাশের শেষ কোণে সুপ্রভাতের আগমনী বার্তা নিয়ে ফুটিত সেই চিরায়ত রক্তিম আলোক সম্ভারের  

                                                                                                                                 ০১.

এই Ship-Yard GB Ship-Yard জাহাজ ঘাটের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটারের কাছাকাছিলোকটি ওইShip-Yard--এ খুব বেশীক্ষণ থাকলো নাশুধু চারদিকটি একটু ভালো করে দেখে নিয়ে বৃষ্টির ভেতর দিয়েই আবার হাঁটতে শুরু করলো জাহাজ ঘাটের দিকেসর্বাঙ্গ শরীর ভেজাপরনের কাপড় চোপড় ভিজে একেবারে জবুথবুবৃষ্টির পানিতে ভিজে গায়ের এ্যাপ্রনটির ওজনও বোধকরি কয়েকগুণ বেড়ে গেছেওটিকে বহন করাই যেন এখন লোকটির কাছে অতিরিক্ত আর একটি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেপ্রগাঢ় প্রতিভাধর এ লোকটি এখন সকরূণ দৃষ্টি মেলে শুধু একটি লঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে- হয়তো কোথাও যাবার জন্যে, যদিও কোথায় যাবে নিজেই জানে না লোকটিআর আরও আশ্চর্যের- কোনোক্রমেই যার এভাবে লঞ্চের দিকে হেঁটে আসবার কথা নয়অথচ হেঁটে আসছে সেই অপরিমেয় প্রতিভার অধিকারী এ মানুষটি- যেখানে এখন সে একেবারেই অসহায় 

 

সবার ভেতর সমান মাত্রার প্রতিভা থাকে নাপ্রতিভাকে আমরা সাধারণভাবে ঈশ্বর প্রদত্ত অতিউচ্চ মানের জ্ঞানের পরিধিকে বুঝে থাকিযা সাধারণতঃ ব্যক্তি বিশেষের মননে সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং যাকে সেই ব্যক্তিবিশেষ কর্তৃক বিকশিত করতে হয় তার চিন্তারাশির সঞ্চরণশীল ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় স্থাপিত করে- আর এ লোকটি সে প্রতিভারই একজন জান্ত্যব প্রতিনিধিএতক্ষণ ধরে অতি দ্রুত হেঁটে আসা এ লোকটি যাত্রী বোঝাই একটি লঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালোকিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে প্রচ- ভীড় ঠেলে যাত্রীদের লঞ্চে উঠবার মরণ-পণ যুদ্ধের মর্মটি উপলব্ধি করবার চেষ্টা করলোতারপর নিতান্তই একজন দীনহীন অসহায় মানুষের মতো লঞ্চটিতে উঠবার লক্ষ্যে ধীর পায়ে লঞ্চটির দিকে এগুতে থাকলোলঞ্চটির গন্তব্য কোথায়, কোন ঘাটে ভিড়বে, কখন ভিড়বে অথবা আদৌ ভিড়বে কি না- কিছুই জানে না লোকটিতবুও এক সময় অতীব কষ্টে লঞ্চটিতে উঠে পড়লো লোকটিলঞ্চটিতে উঠে সোজা ডেকের ওপর গিয়ে ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়ালোকেটে গেলো অনেকটা সময়জানবার প্রয়োজনও বোধ করলো না লোকটি- কতটা সময় কেটে গেছে এর মধ্যে        

 

০১.২.

কিছু আগে লঞ্চটি চলতে শুরু করেছেএর মধ্যে গতিও বৃদ্ধি পেয়েছে বেশ কিছুটাপুরুষ আর মহিলা যাত্রী দিয়ে লঞ্চটির ডেক পরিপূর্ণএ যেন ঠিক রবীন্দ্রনাথের- ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই ছোট সে তরীর মতো বাস্তবতাএরই মধ্যে কেউ কেউ জটলা পাকিয়ে ডেকের মেঝের ওপর বসে উচ্চৈস্বরে কথাবার্তা বলছে, কেউবা ডেকের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত খুবই উদ্বিগ্নতার সাথে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে দ্রুত গতিতে ছুটোছুটি করে কাউকে হয়তো খুঁজে পাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে কান্না শুরু করে দিয়েছেকান্না জড়ানো কণ্ঠে এর ওর কাছে ওর কাঙিক্ষত মানুষটির খোঁজটি জানাবার আকুতি জানাচ্ছেপাশাপাশি এক বাদাম বিক্রেতার সাথে এক যাত্রীর কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে যাত্রীটি কর্তৃক বাদাম বিক্রেতার গালে একটি চড় মারবার পরপরই যাত্রীদের ভেতরও তীব্র উত্তেজনা, কেউ বাদাম বিক্রেতাটির পক্ষে আবার কেউ বা বিপক্ষেচূড়ান্ত পর্যায়ে যাত্রীদের মধ্যেই সংঘর্ষ বেধে যাবার উপক্রমকেউ কেউ বা আবার সে সবকে গুরুত্ব না দিয়ে ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নদীর সৌন্দর্য দেখছেবিপরীত গতির বাতাসের প্রবল তোড়ে ওদের শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা জামা কাপড়ও যেন উড়ে যেতে চাইছেতবুও ওরা এই বাতাসের পৃষ্ঠে আরোহণ করে নিজেরাও ভেসে যেতে চাইছে কোন সুদূরের নীলিমার ওপারেডেকের ওপরে অসংখ্য মানুষের চিৎকার, চ্যাচামেচি, ঝগড়া ঝাটি আর হাসি, কান্নার বিচিত্র শব্দের সাথে মিশে গিয়ে লঞ্চের ইঞ্জিনের ভয়াবহ বিকট শব্দ যেন এক অভূতপূর্ব অসহ্য সচলমানতা যা মুহুর্তের জন্যেও থামছে নাবরং বৃদ্ধি পাচ্ছে অতি দ্রুত মাত্রায়

 

কিন্তু সে সবের দিকে ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশেষ ব্যক্তিটির বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই